জলের অক্ষর (পর্ব পাঁচ)

কুলদা রায়

 

মায়া শব্দটি আমার খুব প্রিয়। স্নেহ, ভালোবাসা, আদর মেশানো। মাঝে মাঝে মনে হয় ‘মা’ শব্দ থেকেই মায়া শব্দটি এসেছে। 

যেমন মায়া হরিণ। মায়া হাঁস। যেমন, সেজো মাসি বলত, তোকে আমি মায়া করি। 

বলি, জ্যোৎস্নাটি বড়ো মায়াময়। তার জন্য আমার মায়া লাগে। আবার ভারতীয় দর্শন এসে বলে, এ জগৎ মায়াময়। যা দেখছ, এই যে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত যুযুৎসবা, হে অর্জুন, সবই মায়া। কিছুই সত্যি নয়। বিভ্রম মাত্র।

এখানে লক্ষ্য করে দেখো হে অর্জুন,

‘মা’, ‘সেজো মাসি’- এই মানবিক চরিত্র দুটি আনার ফলে মায়া সৃষ্টি হল।

‘সেজো মাসি বলত, তোকে আমি মায়া করি’। 

এখানে মায়া আরো গাঢ় হল। 

এখানে মায়া করির বদলে মনে করি বললেও মায়ার ঘাটতি হত না।

জীবনানন্দ লিখেছেন- ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়’ 

মায়াময় বাক্য।

আখ্যানটিকে যখন প্রাণে ধারণ করবে, হে অর্জুন, আখ্যানটি আপনার নিজের হয়ে উঠবে, সত্যি হয়ে উঠবে- প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, তখনই সেটা মায়াময় হবে। তার আগে আখ্যানটিতে কিছুদিন ডুব দিতে হবে। বসবাস করতে হবে।

ধরা যাক, বৃষ্টি হয়েছে। জল পড়েছে। সে জল খালে বিলে গর্তে জমেছে। আছে পাতার উপরে। আবার কারো চুলে লেগে আছে। 

একে বৃষ্টির জল বললেই চলে। 

কিন্তু যখন বৃষ্টির জলের মধ্যে চিহ্নিত শব্দটি যুক্ত করি, করে তুলি ‘বৃষ্টিচিহ্নিত জল’ শব্দবন্ধ। 

তখন, একটা বিভ্রম তৈরি হল। সেটা একটা ঘোর সৃষ্টি করল। এটা কবিতা। এটা মায়া।

মায়ার আরেকটি অর্থ টান। মানুষের প্রতি মানুষের টান, প্রকৃতির সঙ্গে টান, অপ্রকৃতির সঙ্গে টান, আবার ভাষার সঙ্গে ভাষার টান সৃষ্টি করতে পারলেও মায়া এসে যায়। এভাবে আমি নানাভাবে মায়া সৃষ্টি করে রাখি, হে অর্জুন। কে কখন কোথায় ধরা পড়ে কে জানে!

লক্ষ্য কর-

বিভূতিভূষণের মেঘমল্লার গল্পে অধ্যক্ষের মেয়েটি মেলা থেকে ফেরার পথে প্রদ্যুম্নের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, একটু লুকিয়ে– এটা মায়া।

মেঘমল্লার রাগটি যখন বাঁশিতে বাজায়, তখন যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সে সুর শুনে সরস্বতী চলে আসেন তক্ষশিলার বনে, মুগ্ধ হয়ে বাঁশি শোনেন, তারপর ফিরে যেতে যেতে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে যান, সে আলো লেগে থাকে লতায় পাতায়– এগুলোও মায়া।

মায়া কোথায় নেই? 

সেই যে পাহাড় থেকে নেমে এসেছেন সরস্বতী, জল নিয়ে আবার উঠে যাচ্ছেন আচ্ছন্নের মতো– এটাও মায়া।

বিভূতির গল্প মানেই মায়ার খেলা।

হে অর্জুন, বৃথা শোক করো না। যে জল ছল ছল করে নদীরূপ আঁখিতে প্রবাহিত হয়, সেই জলই আবার হাওয়ায় বায়ু রূপেন, মেরুপ্রদেশে বরফ রূপেন সংস্থিতা। এই রূপে রাধা, এই রূপে দ্রৌপদী, এই রূপে মেরেলিন মনরো আবির্ভূতা। এই রূপ দেখে আঁখি ঝুরে হে অর্জুন। এই রূপে জলে স্থলে অন্তরিক্ষে–

আমরা মায়া করি। মায়া গড়ি। মায়ায় বাঁচি।

 

শব্দের মধ্যে একটা মৃতদেহ শুয়ে আছে। কার মৃতদেহ? আমার বাবার। আমার ঠাকুরদার। তার ঠাকুরদার। আমার বন্ধু মোহসীনের পরদাদার। তিমথির নানাজানের। কল্পনা চাকমার পিসির মাসিশাশুড়ির শব, শব্দের মধ্যে শুয়ে আছে। আমরা যারা শব্দের মধ্যে আছি–শব্দে বাঁচি, শব্দে মরে যাই- সবাই সবার কাঁধে শব্দের শব বহন করে চলি। এটা ভাবতেই বিমূঢ় হয়ে যাই। আমার মেয়েরা আমারই শব শব্দের মধ্যে নিয়ে চলেছে তাদের সন্তানের কাছে। 

শব মানে মৃতদেহ। দেহে প্রাণ ছিল। এখন নেই। শুধু দেহ আছে। এ কারণেই এটা শব। শব বহন করে নিয়ে শ্মশানে পুড়িয়ে ফেলে। গোরস্থানে গোর দেয়। অথবা নদীতে ভেসে যায়। মিশে যায় পঞ্চভূতে। কিন্তু শব্দের মধ্যে যে শব থাকে তা পোড়ে না। গোরস্থানে থাকে না। জলে ভেসে যায় না। প্রাণের সঙ্গেই লেপ্টে থাকে। এটা এক আশ্চর্য কুহক বটে। শব্দ ন হন্যতে–শব্দকে খুন করা যায় না। হন্যমানে শরীরে– খুন করলেও শব্দ খুন হয় না। 

শব্দের শবের সঙ্গে ‘দ’ আছে। দ অর্থটি কি? কলিম খান বলেছেন, দ- অর্থ দেওয়া। যেমন জল যে দেয়–জলদ। ফল দেয় যে ফলদ। শব দেয় যে শব্দ। তাহলে কী দেয়? অন্ন দেয়, জ্ঞান দেয়, বুদ্ধি দেয়, ধাক্কা দেয়, মার দেয়, আঘাত দেয়, গলা ধাক্কা দেয়, প্রবোধ দেয়, সান্ত্বনা দেয়, আনন্দ দেয়, সুখ দেয়, দুঃখ দেয়, প্রাণ দেয়… এবং কী দেয় না। দ মানে দাতা। শবকে প্রাণ দেয়। 

যিনি শব্দের শবকে বহন করেন তার নিজের প্রাণ শব্দকে প্রাণ দান করে। যিনি এই প্রাণবন্ত শব্দকে গ্রহণ করেন–তার প্রাণের সঙ্গে শব্দের ওই প্রাণটি মেশে। আরেকটি প্রাণের সৃষ্টি হয়। এভাবেই শব্দ নতুন করে বেঁচে ওঠে। এই প্রাণকে দান করে আরেকটি প্রাণের কাছে।

আমি আসলে আমি নই–একটি শব মাত্র। তোমার কাছে গেলেই আমার শব প্রাণ পায়। প্রাণী হয়ে উঠি আমি। 

আদিতে শব্দ ছিল। এই শব্দ থেকে জগৎ হয়েছে। অন্তেও শব্দ আছে। 

শব্দই ব্রহ্ম।

একদা আমরা কুঁড়ি থেকে ফুল ফোঁটার শব্দ শিখেছিলাম। পাখি উড়ে গেলে তার পালক ঝড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। রং দিয়ে ছবি লেখার অর্থ জানতে চেষ্টা করেছিলাম।

সে সময়কে বলে ছেলেবেলা। অথবা কিশোরকাল। মাঝখানে যুবকবেলায় আমরা কে কোথায় চলে গেছি তার শব্দও আর জানতে পারিনি। এখন মধ্যযাম। এই শব্দই এখন এই মধ্যযামে আমাদের অন্ধকার থেকে আবার আলোতে এনেছে। দূরকে করেছে নিকট। এখন শব্দ মানেই হলো প্রাণ– প্রাণস্রোত। এই স্রোতে আমরা এমনি এসে ভেসে যাই।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী  সংখ্যায়…

 

জলের অক্ষর (পর্ব চার)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More