জলের অক্ষর পর্ব ৮

কুলদা রায়

আমি কাউখালি চিনি। এপারে হুলারহাট বন্দর। কালিগঙ্গা থেকে একটু পুবে গেলেই ডানদিকে কচা নদী বাঁক নিয়েছে সন্ধ্যার দিকে। এখানে এসে হাওয়া খেলে। বুঝতে পারি পাঙ্গাশিয়া এসে পড়েছি। সেখান থেকে নৈকাঠি। আরেকটু এগোলেই চিড়াপাড়া। চিড়াপাড়ায় এলেই রূপেশ্বর ধানের চিঁড়া খাব। 

পবিত্র সাহার বাড়ি এখানে কোথাও। তিনি বলেছেন- এখানে তিনি মোড়ের কাছে থাকবেন। ঈমন কল্যাণ শোনাবেন। তখন সন্ধ্যা হয়ে আসবে। 

পবিত্র সাহা জানেন না, আমাকে গন্ধর্ব যেতে হবে। দত্তবাড়ির টুটুল দত্ত কলাবাগানে উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। তাঁর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছে না। বলেছেন, আপনি এলে গাছগুলোর একটা হিল্লে হয়। 

এখান থেকে আরেকটু পশ্চিমে যাব। গ্রামের নামে মেঘপাল। এই গ্রামে শক্তি চট্টোপাধ্যায় নামে একজন কবি কখনও হয়তো এসে থাকবেন। না এলে কী করে জানলেন তিনি– এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে! পরান্মুখ সবুজ নালি ঘাস- দুয়ার চেপে ধরে?

মেঘপাল গ্রামে অবনীদের বাড়ি। আমি জানি। আর অবনী জানে। শক্তি জানেন না, অবনী বাড়ি নেই। সমুদ্রে গেছে। মাছ ধরতে। জানলে কবিতা লিখতে পারতেন না। 

এই গ্রামগুলোর আশেপাশেই কোথাও হয়তো অর্ঘ্যদের বাড়ি। বাড়ির নাম সিকদার-বাড়ি। এ বাড়ি ঘিরে পান বরজ আছে। পানের নাম সাঁচি পান।

এ পান খেয়ে অর্ঘ্যর বুড়ি ঠাকুমা হেসে কুটি কুটি। হাতে তাঁর রূপোর বালা। চুলে জবা কুসুম। আজ নাতি বউয়ের সঙ্গে রাধা মাই সেজেছেন। মাথায় একটু আঁচল টেনে বলে, ছিলাম বুড়ি। পান খাইয়া হইছি ছুড়ি। 

বুঝলে বাবা, রূপের লগে পাল্লা দিয়া পারবা না। ফালদে ফালদে রূপ পালটে যায়। 

এই দেখিছো– এই নাই।

……

আমি বহুদিন আগে বরিশালে থাকতাম। গ্রামে গ্রামে ঘুরতাম। জলাবাড়ি গ্রামটি ছিল সন্ধ্যানদীর পাড়ে। 

সেখানে একটি পুরনো জমিদারবাড়ি দেখতে পাই। এটা ছিলেন মুখুজ্জেদের জমিদারবাড়ি। গায়ক মানবেন্দ্র মুখার্জীদের আদি জমিদার বাড়ি। 

সে বাড়ির সামনে দিয়ে বকপাখি ঘুরে বেড়ায়। আর থেকে থেকে ফুল্ল হাওয়া ওঠে। এই হাওয়া মুখুজ্জে বাড়ি পার হয়ে সন্ধ্যানদীতে ঢেউ তোলে। 

আমি তখন মানবেন্দ্রর ‘আমি এতো যে তোমায় ভালোবেসেছি’ গানটি নিয়ে একটি গল্প লিখতে শুরু করি।

সেটা ছয় বছর আগের কথা। লিখে কোথায় যে রেখেছি, কে জানে! মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি। আজ এই বহুদূরে বসে ভাবি সত্যিই কি গল্পটি আমি লিখেছিলাম? সত্যিই কি সেই গল্পটি হারিয়ে গেছে? 

কাল মাইকেল এঞ্জেলোর বায়োপিক দেখছিলাম। তাঁর জন্য পাহাড় কেটে বিশাল একটি আয়তাকার পাথরখণ্ড আনা হয়েছে। সেটা দেখিয়ে তিনি বলছেন, এই পাথরখণ্ডের মধ্যে কেউ লুকিয়ে আছেন। একজন শিল্পীর কাজ তাকে খুঁজে বের করা। অর্থাৎ মাইকেল যে ভাস্কর্যগুলো গড়েছেন, সেগুলো পাথরের মধ্যেই ছিল। তিনি শুধু খুঁড়ে বের করেছেন।

এটা শুনে মনে হল- যে গানটি মানবেন্দ্র রচনা করলেন, সেটা তিনি নিজে করেননি। তা প্রকৃতিতেই ছিল। মানবেন্দ্র শুধু সেটাকে খুঁজে বের করছেন মাত্র। সব কিছুই অজঃ নিত্য শাশ্বত পুরনো। ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে। হারানোর কিছু নেই। গল্পটি আবার পাওয়া যাবে। আবার খুঁজে বের করব তাকে। 

মিলান কুন্ডেরা বলছেন, আমরা প্রকৃতিরই অংশ। 

সব কিছু প্রকৃতিতেই আছে। প্রকৃতিতেই থাকে। প্রকৃতি থেকে কিছুই হারায় না। 

কেউ কেউ এই সত্যিকে ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের লড়াইটা হল সেই ভুলিয়ে দেওয়া সত্যিটাকেই ফিরিয়ে আনা। এইখানে মানুষ আসলে শিল্পী।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী  সংখ্যায়…

জলের অক্ষর পর্ব ৭

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More