জলের অক্ষর পর্ব চার

কুলদা রায়

 

মেক্সিকো সিটি থেকে ৩০ মাইল দূরের একটি প্রাচীন শহর। এটাকে বলা হত পিরামিডের শহর। নাম তেওতিহুকান। এ শহরে গেলে ঈশ্বর হওয়া যায়। এ শহরে এসেছি। এখানে মিগুয়েলের সঙ্গে দেখা। মিগুয়েল আমাদের গাইড। গাইড মিগুয়েল অবাক করে দিয়ে বলল, তার ভগ্নিপতির নাম রাজু আলাউদ্দিন। কবি। কবিতা লেখে। এখন আবাস ঢাকা।

মিগুয়েল ঘুরে ঘুরে শহরটি দেখাল। এই শহরে তিন হাজার বছর আগে ‘মিগুয়েল’ নামে এক লোক চিকিৎসাবিদ্যা শিখেছিল। পূর্বসূরীদের ইতিহাসও তাঁর আগ্রহের বিষয়। কিন্তু এই ইতিহাস পাঠ করতে করতে তাঁর মনে হত—এই লেখা ইতিহাসটাই আসল ইতিহাস নয়। এর বাইরে আরও কিছু সত্যি আছে। সেই সত্যিটা জানার ব্যাকুল বাসনা তার ছিল।

মিগুয়েল একদিন পাহাড়ের একটি গুহায় ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ করে দেখতে পেল তার সামনে একটি লোক ঘুমিয়ে আছে। লোকটি আগে ছিল না। যে দেখছে আর যাকে দেখছে—দুজনে ভিন্ন দুটো লোক। লোকটিকে সে ধরে দেখতেও পারে। জামাজুতো সব মিগুয়েলেরই। লোকটির নাক চোখ মুখ গা হাত পা সব তারই। তাহলে ঐ লোকটিও আর কেউ নয়—মিগুয়েল নিজেই। মিগুয়েল নিজেই দুটো লোক হয়ে আছে। যে ঘুমন্ত মিগুয়েলকে দেখছে—সে ঘুমন্ত মিগুয়েলেরই আরেকটি রূপ।

সেদিন ছিল শুক্লপক্ষের একাদশী। কাস্তের মতো সূক্ষ্ম চাঁদ উঠেছে। আকাশ পরিষ্কার। মেঘ নেই। আকাশ ভরা অসংখ্য তারা। এই আকাশ ভরা তারা দেখতে দেখতে মিগুয়েলের মধ্যে অন্যরকম কিছু ঘটে গেল।

মিগুয়েল তার নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার হাতটি থেকে আলো বের হচ্ছে। তার পুরো শরীরটা খুঁটে খুঁটে দেখল। সব কিছুই আলোময়। রক্ত মাংস নেই—তার শরীরটা আলো দিয়ে গড়া। বিস্ময়ে বলে উঠল—আমি আলো দিয়ে তৈরি! আমি তারা দিয়ে তৈরি! তার নিজের কণ্ঠটি থেকেও আলো বের হচ্ছে।

তারাগুলোর দিকে মিগুয়েল চেয়ে দেখল। বুঝতে পারল—এই তারাগুলো আলো তৈরি করতে পারে না। আলোই তারাগুলোকে তৈরি করেছে। এই জগতের সব কিছুই আলো দিয়ে তৈরি। আলোই সব কিছু সৃষ্টি করেছে। এই মহাকাশ শূন্য নয়। চারিদিকে যা কিছু আছে সব কিছু্‌ই জীবন্ত। আলো হল সেই জীবনের বাহক। আরেকটু খেয়াল করে দেখল—আলোরও জীবন আছে। আলোতে সকল তথ্য আছে। আলো দিয়ে সব কিছু জানা যায়।

মিগুয়েলের প্রথমে ধারণা হয়েছিল, সে তারা দিয়ে তৈরি। পরে বুঝল সে তারা নয়। অথচ তারার মধ্যে সে আছে।

এই তারার নাম দিল টোনাল (Tonal)। তারার মধ্যে যে আলো আছে তার নাম দিল নাগুয়েল (Nagual)।এই শব্দটির অর্থ প্রভু। এই আলো ও তারার মধ্যে ছন্দময় শৃঙ্খলা ও মহাকাশ আছে। এটা তৈরি করেছে জীবন বা ইনটেন্ট (intent)।

এই জীবন বা ইনটেন্ট ছাড়া এই তারা ও আলো অস্তিত্বহীন। জীবনই হল শেষ কথা ও সর্বোচ্চ শক্তি। জীবনই হল সৃষ্টিকর্তা। জীবনই এইসব কিছু সৃষ্টি করেছে।
আমাদের চারিদিকে যা কিছু অস্তিত্ববান—দেখতে পারছি, শুনতে পারছি, ছুঁতে পারছি, এ সব কিছুই জীবিত সত্ত্বা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সব কিছু জীবিত সত্ত্বার সম্প্রসারিত রূপ। এই জীবিত সত্ত্বাটির নাম হল ঈশ্বর। মিগুয়েল জীবনে প্রথমবারের মতো জগতের সব কিছুর মধ্যেই ঈশ্বরকে দেখতে পেল। সবকিছুই যেন অখণ্ড সত্ত্বা। সব কিছুই ঈশ্বরের মধ্যে অবস্থান করছে। সব কিছুতেই ঈশ্বর রয়েছে। সব কিছু মিলিত চেহারাই এই ঈশ্বর।

মিগুয়েল একটি সিদ্ধান্তে এল—মানুষের এই দেখাটা আসলে আলো দিয়েই আলো’কে দেখা ছাড়া আর কিছু নয়। আলো’কে দেখতে হলে আলো দিয়েই দেখতে হয়। আলোই দেখছে আলো’কে।

এই জগতের প্রতিটি বস্তুই (Matter) আয়না (Miirror) । আয়না থেকে আলো প্রতিফলিত হয় এবং আয়নাটিই আলোর ছবি বা মূর্তি তৈরি করে। এই জগৎটা হল মায়া (Illusion)। আমাদের স্বপ্নগুলো কুয়াশা বা ধোঁয়ার মতো সবকিছুকে আড়াল করে রাখে। আমরা প্রকৃত বস্তুকে দেখতে পাইনা। প্রকৃত বস্তু হল ভালোবাসা—ভালোবাসা হল পবিত্র (pure)আলো।

মিগুয়েলের এই আবিষ্কারটি তার জীবনকে বদলে দিল। যখন সে বুঝতে পারল—প্রকৃত অর্থে সে কী, তখন সে অন্য সকল মানুষকে ভালো করে দেখল, জগতের দিকে চোখ মেলে চাইল—দেখতে পেল, সে নিজে যা—এই সব কিছুই হল তাই। সবকিছুর মধ্যে তার নিজেকে দেখতে পেল। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে, প্রতিটি পশুপাখি, কীট পতঙ্গ, প্রাণীর মধ্যে, প্রতিটি গাছপালার মধ্যে, জলের মধ্যে, বৃষ্টির মধ্যে, মেঘের মধ্যে, মাটির মধ্যে—সে কেবল নিজেকেই খুঁজে পেল। দেখতে পেল—জীবন আসলে নানাভাবে Tonal এবং Naguel এর মিশ্রণ। এই দুটির মিশ্রণে কোটি কোটি জীবনের বিস্তার ঘটছে।

এই অল্প সময়ে মিগুয়েল সব কিছুর মধ্যে একটি সংযোগ (connection) বুঝতে পারল। সে খুবই চমৎকৃত হল। তার হৃদয় শান্তিতে পূর্ণ হয়ে উঠল। সে দেরি না করে অন্যান্য লোকেদেরকেও তার এই দর্শন বা আবিষ্কারটি জানাতে লেগে গেল। কিন্তু এটা ব্যাখ্যা করার মতো ভাষা সে খুঁজে পেল না। একে ভাষা দিয়ে ব্যাখা করা যায় না। এটা অনির্বচনীয়। সে নানা ভাবে সবাইকে বোঝাতে চেষ্টা করল—কেউ তার কথা বুঝতে পারল না। শুধু তাঁরা বুঝতে পারল তাঁদের পরিচিত মিগুয়েল আর আগের মিগুয়েল নেই। সে পাল্টে গেছে। তার চোখ ও কণ্ঠ থেকে আনন্দ ঝরছে। তাঁরা আরও লক্ষ করল, সে আর আগের মতো কোনো কিছুকে সন্দেহ করে না—কোনো কিছুর পরিচয় নিয়ে বিচার করতে বসে না। সব কিছুই তার জানা। সে অন্য কারো মত নয়।

মিগুয়েল সবাইকে ভালো করে বুঝতে পারছে–কিন্তু কেউ-ই তাঁকে চিনতে পারছে না। তারা বুঝতে পারছে এই লোকটি ঈশ্বরের মতো কেউ। শুনে সে হাসল। বলল, এটাই সত্যি। আমি ঈশ্বরই। আমিই সে। সে-ই আমি। শুধু আমি একা নই—তোমরাও ঈশ্বর। আমি, তুমি, তোমরা—সবই সেই একই জন। এক অখণ্ড সত্ত্বা। আমরা আলোর মূর্তি। আমরা ঈশ্বর। তখনও লোকজন তাকে বুঝতে পারল না।

মিগুয়েল বুঝতে পারল, সে আসলে একটি আয়না। এই আয়নায় সবাই নিজেকে দেখতে পায়। এই লোকগুলোও আয়না। লোকগুলোর আয়নায় মিগুয়েল তার নিজেকে দেখতে পায়। সে বলল, সবাই আসলে আয়না। কিন্তু সে যেভাবে অন্যের আয়নায় নিজেকে দেখতে পায়, অন্যরা সে ভাবে তার আয়নায় তাদেরকে দেখতে পারছে না। তখন সে বুঝতে পারল প্রত্যেকে একটা স্বপ্নের ঘোরে আছে। তারা জেগে নেই—স্বপ্নের মধ্যে থাকার কারণে নিজেদেরকে চিনতে পারছে না।

এর একটা কারণও আবিষ্কার করল মিগুয়েল। বুঝতে পারল, আয়নাগুলোর মধ্যে কুয়াশা বা ধোঁয়ার বেড়া বা দেয়াল আছে। এই কুয়াশার দেওয়ালটি আসলে আলোর মূর্তি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এটাই মানুষের স্বপ্ন।

মিগুয়েল বুঝতে পারছিল সে যা শিখেছিল হঠাৎ করে—সে নিজেও তা ভুলে যাবে তাড়াতাড়ি। এই উপলব্ধিগুলো সে বারবার মনে করার চেষ্টা করল। সুতরাং সে নিজেকে ধোঁয়াময় আয়না বলে ডাকার সিদ্ধান্ত নিল। সে জানত এই জগতের সকল বস্তুই আয়না। আয়নারগুলোর মধ্যেকার ধোঁয়া বা কুয়াশাই আমাদেরকে প্রকৃত পরিচয় থেকে থেকে দূরে রাখে।

সে বলল, আমি ধোঁয়াময় আয়না। আমি তোমাদের সবার মধ্যে আমার নিজেকে দেখি। এই নদীটিও আমি। গাছটিও আমি। মাছগুলোও আমি ছাড়া অন্য কেউ নয়। যে গরুগুলো চরছে তারাও আমি। বাতাস, আকাশ, পোকামাকড়, যে শিশুটি আজকে জন্ম নিল, যে যুবকটি মাটিতে বীজ বপন করছে, যে নারীটি কলশি ভরে জল আনছে, যে বৃদ্ধটি একটি পুরনো গীত গাইছে—সবই আমি। সব কিছুকে নিয়ে আমি এক বড় আমিতে জীবন্ত হয়ে আছি। কিন্তু আমরা আমাকে চিনতে পারছি না এই ধোঁয়া বা কুয়ার কারণেই। এই ধোঁয়াই স্বপ্ন। আয়নাটি তুমি। তুমি সেই লোক যে স্বপ্ন দেখে।

একালের মিগুয়েল বলল সেকালের আরেক মিগুয়েলের কথা।
এই গাইড মিগুয়েলের কথা ফোনে শুধাই ঢাকার কবি রাজু আলাউদ্দিনকে। তিনি শুনে কিছুটা স্তব্ধ হয়ে থাকেন। ফোন হোল্ড করে তারপর তার মেক্সিকান স্ত্রী মরিশালের সঙ্গে কথা বলেন স্প্যানিশ ভাষায়। কথা শেষ হলে জানান, মিগুয়েল নামে যে লোকটির সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, তিনি তাঁর স্ত্রীর ভাই নন। এ’রকম কাউকে তাদের পিরামিডের শহর তেওতিহুকানে ভ্রমণকারী অনেক বিদেশি দেখে থাকেন। তাকে এলাকার মানুষ ঠিক দেখতে পান না। তবে সবাই বিশ্বাস করে মিগুয়েল নামের সেই লোকটি আছেন। সবার মধ্যে একটি আয়না হয়ে তিনি বিরাজ করেন।

মেক্সিকোর এই তেওতিহুকান শহর থেকে অনেক দূরে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার ভাড়ারা গ্রামে আরেকজন মিগুয়েল জন্মেছিলেন। তিনিও গান গেয়ে এই আয়নার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর—সেথা এক পড়শি বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’
তিনি লালন ফকির। তার গানের আরশিনগরটাই আমাদের আয়নামহল।

এই আয়নামহলে ঈশ্বরচন্দ্র থাকেন|

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী  সংখ্যায়…

জলের অক্ষর পর্ব ৩

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More