জলের অক্ষর পর্ব ১০

কুলদা রায়

সত্যি ঘটনাকে হুবহু লিখলে সেটা গল্প বা ফিকশন হয় না। আবার অভিজ্ঞতার বাইরে ফিকশন করতে গেলে সত্যিটাকেও হেলা করা যায় না। গল্পকার তার মতো করে সত্যি ঘটনা বা অভিজ্ঞতাকে কেটে-ছেঁটে গল্পের আকারে নিয়ে আসেন। 

অথবা বানানো ঘটনাটিকেই এমনভাবে বলেন যেন তা সত্যি হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতার মিশেল দিতে হয়। 

যেভাবেই বলুন না কেন সত্যি সৃষ্টি করাই একজন গল্পকারের কাজ। হতে পারে সে সত্যি ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। অথবা ঘটতে পারত। ঘটতে পারে। ঘটবে। আবার ঘটতে নাও পারে। এগুলো সবই সত্যির নানা রূপভেদ মাত্র। 

এর মধ্যে আরেকটি সত্যি আছে। সেটা কী? লেখক এই সত্য কে বা অসত্যকে যখন গল্পে পরিণত করেন তখন কিন্তু যে স্পেস, যে ডিটেইলস বা চরিত্র ব্যবহার করেন সেগুলো যদি তাঁর অভিজ্ঞতায় না থাকে, তবে বাস্তবের সত্যি বা অসত্যিকে গল্পের সত্যি বানানো খুবই কঠিন হয়ে যায়। তখন সেই গল্পটিকেই আমরা বানানো গল্প বলি। তা পড়তে আমাদের কষ্ট হয়। কানেক্ট করা যায় না।

আর হুবহু সত্যি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা লিখলে সেটা গল্প নয়, হবে রিপোর্ট বা প্রতিবেদন। 

প্রকাশ্যে দিনের বেলা কুপিয়ে কুপিয়ে একজন মানুষকে খুন করা হল, তার স্ত্রী ঠেকাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু পারলেন না। বেচারা রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করে মারা গেলেন। 

এর মধ্যে এখন কোনও গল্প নেই। এটা এখন খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

স্বাভাবিক ঘটনা নিয়ে কোনও অভিনব গল্প হয় না। অনন্য গল্প হয় না। যেমন, অভিজিৎ রায়কে প্রকাশ্যেই হত্যা করা হয়েছিল। কেউ এগিয়ে আসেনি। হত্যাকারীরা হত্যা করে সবার সামনে দিয়ে চলে গেছে।

নিলয় নীলকেও হত্যা করা হয়েছিল এভাবেই। এরকম প্রকাশ্য হত্যার সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবে না। এরা নাস্তিক বলে যারা খুন করল প্রকাশ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের জন্য ওয়াজ মাহফিলে দোয়া করা হল। বলা হল, এদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব। রাষ্ট্র এই ওয়াজিবের সঙ্গেই দেখা করে হাত মেলালো। 

বিশ্বজিৎ নামে একটি ছেলেকে দিনের বেলা পিটিয়ে মারা হল। তার বিচার-কাজটি ধীর লয়ে চলতে থাকল। কয়েকজনকে শাস্তিও দেওয়া হল। আবার কিছুদিন পরে শাস্তিপ্রাপ্তরা ছাড়া পেয়ে গেল। এর মধ্যে গল্প থাকে কী করে?

কুমিল্লার এক নেতার ছেলের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল বিচারক। সে ছেলেটিও সবার সামনেই খুন করেছিল। বিচারক মৃত্যুদণ্ড দিলেও রাষ্ট্রপতি তাকে মাফ করে দিলেন। গল্প থাকে কী করে এর মধ্যে!

তাহলে ব্রাদার, এর মধ্যে গল্প আছে কোথায় তাহলে? 

গল্প আছে এই খুনের ঘটনার কাছেই। তবে সামান্য একটু দূরে। 

উৎসবের মতো করে রাস্তায় খুন করা হচ্ছে একটি মানুষকে। খুন করা হচ্ছে অসংখ্য মানুষের মধ্যেই। এইসব মানুষদের মধ্যেই হতভাগ্য মানুষটি হেঁটে যাচ্ছিল। তারা তাঁর গায়ের গন্ধও পাচ্ছিল তখন। তাঁর ছায়ার সঙ্গে তাদের ছায়াটিও মিশে গিয়েছিল। সবাই মিলেমিশে হয়ে উঠেছিল একটি মানুষই। 

কিন্তু যখন সেই হতভাগ্য মানুষটিকে আক্রমণ করা হল, তখন আর সব মানুষগুলো যার যার মতো করে অকুস্থল থেকে সরে গেল। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে শ্বাসরোধী এই হত্যাকাণ্ডটি দেখতে লাগল। হত্যাকাণ্ডটি উপভোগ করতে লাগল। অথবা নিজের জান বাঁচানোর তাগিদে অপেক্ষা করতে লাগল কখন এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডটি শেষ হবে। তারপর তারা বাড়ি ফিরবে। চোখে মুখে পানি দেবে। দু রাকাত নফল নামাজ পড়বে। এদের কেউই এগিয়ে গেল না ছেলেটিকে রক্ষা করতে। ছুটে গেল না একজন মানুষকে বাঁচাতে। মানুষটি অবাক হয়ে মারাই গেল।

তারা একটু এগিয়ে গেলেই হত্যাকারীদের রোখা যেত। তারা সাহস পেত না— সু্যোগ পেত না একজন মানুষকে মেরে ফেলতে। 

কেন এই নিরীহ নিরাপদ আশ্রয়লোভী মানুষগুলো এগিয়ে গেল না? কেন তারা ছেলেটিকে রক্ষা করল না? কেন তারা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকল? দাঁড়িয়ে থেকে হত্যাকাণ্ডটি দেখতে থাকল, উপভোগ করতে থাকল অথবা দেখতে বাধ্য হল? কেন তারা ভয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল? কেন তারা মনুষত্ববোধটি হারিয়ে ফেলল? 

এই প্রশ্নের মধ্যেই একটি অনন্য গল্প আছে। ফলে, হতভাগ্য মানুষটিও নয়, নয় হত্যাকারীরাও- গল্পের মূল চরিত্র হয়ে উঠেছে হাত গুটিয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় লোকগুলো। 

রাষ্ট্র তার ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য তার সব নাগরিককে প্রতিবাদহীন প্রতিরোধহীন পাথুরে মূর্তিতে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। রাষ্ট্র বলছে, ভয় পাও, ভয় পাও। আর আমপাবলিক ভয় পেতে ভালোবাসছে। এটাই গল্প। এই গল্পটি এখন সৃষ্টিশীল। অভিনব। এবং অনন্য। 

চমৎকার, ধরা যাক দু একটা ইঁদুর এবার…

রাষ্ট্র, তোমারে সেলাম।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী মাসের দ্বিতীয় রবিবার…

 

জলের অক্ষর পর্ব ৯

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More