শুধু হিংস্র চিতাবাঘ নয়, জীবনও নিত্য লড়াইয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে লীলাকে

দ্য ওয়াল ব্যুরো, আলিপুরদুয়ার: চলতি বছরের জানুয়ারিতে চিতা বাঘের সঙ্গে লড়াই করে খবরের শিরোনামে এসছিলেন চা-বাগান শ্রমিক লীলা ওরাঁও। আলিপুরদুয়ারের কালচিনি ব্লকের ভাতখাওয়া চাবাগানের শ্রমিক লীলার সেই সাহসিকতার গল্প, এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখে মুখে।

তবে, লীলার লড়াই শুধু চিতাবাঘের সঙ্গেই নয়, জীবনের সঙ্গেও পাল্লা দিয়ে লড়ে চলেছেন তিনি। জীবনের কঠিন পথ পার করে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করাই আদিবাসী এই চা শ্রমিকের একমাত্র লক্ষ্য। ৪৫ বছরের লীলার বক্তব্য, ‘হামি সব কাম কইরতে পারি। খুব ভাল আছি।’ বৈভব্য-বিলাসিতার স্বপ্ন থেকে বহু দূরে, অভাবী লীলার আত্মবিশ্বাস শুধুই তাঁর কর্মক্ষমতার জোরেই টিকে রয়েছে।

জানুয়ারি মাসের গোড়ায় ভাতখাওয়া চাবাগানের ১৫ নম্বর সেকশনে ঝুরনির কাজ করছিলেন ৪৫ ছুঁইছুঁই লীলা। ধারালো বিশেষ ধরনের লোহার পাতলা দা দিয়ে চা গাছের ডালপালা ছেটে দেওয়াকেই বলে ঝুরনি। সেই কাজ করার সময় আচমকাই পেছন থেকে লীলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি স্ত্রী চিতাবাঘ। ভয় পেলেও হাল ছাড়েননি লীলা।

চিতাবাঘটি তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই পাল্টা আক্রমণ শানান তিনি। হাতে থাকা দা দিয়ে চিতাকে এলোপাথাড়ি মারতে  থাকেন লীলা। বেগতিক বুঝে লীলাকে ছেড়ে দিয়ে প্রাণ ভয়ে ছুটে পালায় চিতাবাঘটি। প্রাণে বেঁচে যান লীলা। জখম এই চা শ্রমিককে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন শুশ্রূষার পরে সেরে ওঠেন তিনি।

কালচিনি ব্লকের ভাতখাওয়া চাবাগানের স্থায়ী শ্রমিক লীলার কাঁধে এখন রয়েছে স্বামী-সন্তানদের দায়িত্ব। তাঁর পরিশ্রমের টাকাতেই সংসারের চারজনের পেট চলে। স্বামী বুধু মুন্ডা দিনভর হাঁড়িয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। বেশির ভাগ দিনই কাজে যান না বুধু। তাই, ১২ বছরের ছেলে সিধু এবং ১০ বছরের মেয়ে বিনুকে বড় করার দায়িত্বও লীলার। চা-বাগানের ভাঙা ঘরে গাদাগাদি করে চারজনের সংসার।

এতে বঞ্চনার মধ্যে নারী দিবস তাৎপর্য না জানালেও লীলা কিন্তু সাহসিকতার নজির রেখে চলেছেন নিত্য। তাই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “নারী দিবস কি লা বাবু। হামি সব কাম কইরতে পারি। সিধু আর বিনুকে নিয়ে হামরা খুব ভাল আছি।”

লীলার কাছে নিজেকে প্রকাশের একমাত্র নিষ্পাপ হাসি। ওই হাসিতেই জগৎ জয় করতে পারেন তিনি।

এই এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য কমল ওরাঁও বলেন, “লীলা একদিন চিতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। প্রতিদিন তাঁর জীবনের লড়াইটাও কম নয়। সেই লড়াই যাঁরা দেখেছেন, তাঁরাই সকলেই আমরা সঙ্গে একমত হবেন। লীলার এই লড়াইকেই কুর্নিশ জানাই। একা মহিলা একটা গোটা সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। বাগানের কাজ, সংসারের কাজ, সবই একাই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ভাতখাওয়া শ্রমিকদের গোটা বস্তি গর্বিত সাহসী লীলার জন্য। তাঁর সাহসিকতা বাঘিনীর থেকে কম নয়।”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More