বাংলার হেঁশেল- আমের বাহারি পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

আম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে আমাকে থামানো মুশকিল। কারণ আমি শুধু আমের-ই ভক্ত নই, আম্রপল্লবও আমার অতি প্রিয় জিনিস। মরচে রঙের কচি আমপাতা চিবিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন সে-ও কত স্বাদের! আমাকে একজন কচি আমপাতা বেটে তার সঙ্গে আরো হ্যানো-ত্যানো মিশিয়ে শরবত বানিয়ে খাইয়েছিল। তার স্বাদ বর্ণনা করে বোঝানোর আমার ক্ষমতা নেই। ফাল্গুন মাসে প্রেমের কবিতা পড়তে পড়তে সেই শরবতে চুমুক দিতে পারলে জীবনের অনেক কষ্ট লঘু হয়ে যেতে বাধ্য।
আমের ঝরা মুকুল দিয়ে চাটনি খাওয়ার সৌভাগ্য আপনাদের হয়েছে? আমার হয়েছে। আহামরি কিছু না হলেও বৈচিত্র্য এনে দিতে পারে দুপুরের ভোজনে। তবে আমের মুকুল দিয়ে মুগের ডাল কিন্তু সুপারহিট। অল্প আমাদা কুচো পড়বে ওই ডালে। আহ্!গুটি আম বা গুটির চেয়ে একটু বড় সাইজের আমের ঝোল অল্প চিনি দিয়ে গরমে খুব মুখরোচক। আম বড় হওয়ার মুখে দুচারটে কালবৈশাখীর হ্যাঁচকা টানে বাজারে কাঁচা আম গড়াগড়ি খাবে। তখন করিৎকর্মা গিন্নিদের বা টকপ্রেমীদের আচার, আমসি, আমচুর বানানোর সেইরকম তোড়জোড় চলবে। এদিকে মধ্যাহ্নভোজনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাঁচা আমের একাধিক পদ। আম-ডাল তো বৈশাখ জষ্টিমাসের জবরদস্ত খাওয়া। আলুভাতে আমডাল। আমডাল আলুভাজা। আলুপোস্ত আমডাল। নিকুচি করেছে আমডাল বলতে না বলতেই গ্রীষ্মের দহন তাপে রোদ্দুর থেকে ফিরে আপনার মুখের সামনে কাচের গেলাসে আম পোড়ার শরবত। আহ্! কী শান্তি! বেঁচে থাক বাবা আম। আম পুড়িয়ে শাঁস চটকে বিটনুন আর চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হয় আম পোড়ার শরবত। আবার কাঁচা আম কুচি কুচি করে কেটে তার সঙ্গে পুদিনা পাতা, লংকা সব একসঙ্গে বেটে নুন চিনি যোগ করে তারপর ছেঁকে নিয়ে ঠান্ডা জল মিশিয়ে নিলেই ব্যাস!

গরমে আমপোড়ার শরবত

ওদিকে গাছে আর একটু বড় হয়েছে আম। আঁটি তৈরি হয়ে গেছে ভেতরে। আমডাল বাদ হয়ে গিয়েছে দুপুরের মেনু থেকে। তার বদলে আম-মৌরলা, আম-চিংড়ি, আম-পাবদা, আম-চিকেন যেকোনও একটা হলেই দৌড়বে। শেষ পাতে আচার টাইপের ঘন আমের চাটনি। কোনও কোনও রাঁধুনি আম নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে গিয়ে আম দিয়ে এঁচোড় বানিয়ে ফ্যামিলিতে হল্লা মাচিয়ে ফেলবেন। সে পদও সুপারহিট হয়ে উঠবে। ওদিকে কেউ কেউ আমের মোরব্বা বানিয়ে বয়ামে ভরে রাখবেন। দুপুরে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে কাঁচা আম, নুন, লংকার গুঁড়ো আর কাসুন্দি চটকে টকাস টকাস খাওয়া। কবি লিখেছিলেন বটে আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে কিন্তু গাছপাকা আমের জন্য সেই জষ্টি পর্যন্ত সবুর করতেই হয়। গাছপাকা আমের সোয়াদই আলাদা। মুড়ি দিয়ে আম, দুধ-ভাত দিয়ে আম, রুটি দিয়ে আম, আমের পায়েস, দুধ ঘন করে রাবড়ি বানিয়ে গাছপাকা আম কুরে লাস্ট মিনিটে মিশিয়ে নেওয়া- সব চলবে এই আমের সিজনে। আমের জুস, আমের আইসক্রিম, কুলফি, আমদই, আমসন্দেশ… কাঁচা-পাকা হাতে সব কিছু তৈরি হবে রান্নাঘরে। জামাইষষ্ঠীতে পাকা আম দিয়ে ইলিশ কিংবা কাতলা মাছের পদও জামাইকে জোর করে গেলানো হবে।
তবে সে রেসিপিও হিট।
আম নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতা দেখে পোষা হুলো বা মেনির গা রি-রি করে জ্বলবে। ঢং! আম নিয়ে উৎসাহের চোটে হুলোর জন্য ভাজা বাটামাছের গায়েও রাঁধুনি লেপে দেবে হিমসাগর বা আম্রপালির গন্ধ। গোপনে পাপোশে বমি করে শোধ তুলবে হুলো। দিনরাত আম খেয়ে আমাশার কুথুনি, ক্যালরি বেড়ে যাওয়ার ভয়… তবুও আমের সঙ্গে সখ্য কমবে না আম-বাঙালির।
আম নিয়ে এতক্ষণ আমার ভ্যাজরভ্যাজর সহ্য করার পুরস্কার হিসেবে তিনটে সহজ রেসিপি উপহার রইল-

আম চিংড়ি

উপকরণ: স্লাইস করে কাটা আধখানা কাঁচা আম, মাঝারি সাইজের চিংড়ি ১০টা, জিরে, নারকেলকোরা এক টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা কুচি ৩/৪ টে, সর্ষে হাফ চা-চামচ, কারিপাতা অল্প(না দিলেও হবে), হলুদ গুঁড়ো, নুন চিনি স্বাদমতো।প্রণালী:  কাঁচা আম, জিরে, নারকেল আর কাঁচা লঙ্কা বেটে একটা পেস্ট তৈরি করতে হবে। কড়ায় অল্প সর্ষের তেল গরম করে কারিপাতা এবং সর্ষে ফোড়ন দিতে হবে। এবার আমের পেস্টটা দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়তে হবে কড়ায়। এক কাপ গরম জল দিয়ে দু’মিনিট ঝোলটা ফোটাতে হবে। এবার ওই ঝোলে ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখা চিংড়িগুলো দিয়ে দিতে হবে। ঢাকনা দিয়ে নিভু আঁচে রান্না করতে হবে কিছুক্ষণ। এপিঠ-ওপিঠ করে চিংড়ি মাছগুলোকে উল্টে দিতে হবে। গা-মাখা গ্রেভি হলে গ্যাস বন্ধ করে দিতে হবে।

আমচুর- বেগুন

উপকরণ: বেগুন, আমচুর, সর্ষের তেল, কাঁচা লঙ্কা, কালোজিরে, ধনে জিরেবাটা, নুন, হলুদ, চিনি।

প্রণালী: সবার আগে বেগুন লম্বা লম্বা করে কেটে ভেজে নিতে হবে। কড়াইতে তেল গরম করে ওতে দুটো কাঁচা লঙ্কা থেঁতো করে ফোড়ন দিতে হবে। কালোজিরেও দিতে হবে।
এবার ধনে জিরেবাটা, পরিমাণ মত আমচুর, নুন, হলুদ, চিনি দিয়ে একটু কষে খানিকটা জল দিতে হবে। ঝোল ফুটতে শুরু করলে ভাজা বেগুনগুলো তার মধ্যে দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। চার মিনিট পর কড়াই নামিয়ে নিলেই হবে।

পাকা আমে কাতলরসা

পাকা আম কাতলা রসা, ছবিঋণ- গুগল

উপকরণ : মাছ ৬ পিস, ১টা হিমসাগর আমেরশাঁস, সর্ষেবাটা, পোস্ত বাটা, কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা, নুন, চিনি, হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো, জিরের গুঁড়ো, সর্ষের তেল।

প্রণালী : সর্ষের তেল গরম করে নুন হলুদ মাখানো কাতলা মাছের পিসগুলো ভেজে নিতে হবে। মাছ ভাজা তেল ফেলে দিন। এবার নতুনভাবে তেল গরম করে কালোজিরে আর কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিন। হলুদ, লংকার গুঁড়ো, জিরের গুঁড়ো, পোস্ত বাটা দিয়ে কষান। এবারে আমের শাঁসটাও যোগ করুন। সবটা আরও একটু কষিয়ে জল দিয়ে দিন। ঝোল ফুটলে একে একে ভাজা মাছগুলো দিয়ে দিন। পরিমাণমত নুন দিন। অল্প চিনি দিন। নামানোর আগে সর্ষেবাটা আর আস্ত কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আরও একবার ফুটিয়ে গ্যাস অফ করুন। এবার গরমগরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- মরশুমি শরবত

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More