বাংলাজুড়েই জ্বরে আক্রান্ত শিশুরা, বাবা-মায়েদের জরুরি পরামর্শ দিচ্ছেন বিশিষ্ট চিকিৎসকরা

চৈতালী চক্রবর্তী

 

রাজ্য জুড়েই জ্বরের (Viral Fever) প্রকোপ সাঙ্ঘাতিক। উত্তরবঙ্গে এখনই হাজার দুয়েক শিশু জ্বরে কাবু। জলপাইগুড়ি, মালদায় গত চার-পাঁচদিনে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। জ্বরের কারণ খতিয়ে ও জেলাগুলির স্বাস্থ্য পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পাঠানো পাঁচ বিশেষজ্ঞের টিম গতকালই উত্তরবঙ্গের নানা হাসপাতাল চষে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর প্রতিবছরই হয়। এবারে করোনার কারণে টেস্ট বেশি হয়েছে। তাতেই এত বেশি শিশুর মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের দাবি, ভয়ের কারণ খুব একটা নেই। ঠিকমতো ওষুধপত্র খাওয়ালে ও সঠিক সময় অ্যান্টিবায়োটিক দিলে জ্বর সেরে যাচ্ছে। একেই কোভিডের তৃতীয় ঢেউয়ের সতর্কতা জারি হয়েছে। তৃতীয় ঢেউতেও বাচ্চাদের সংক্রমণের সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু তার আগেই বাংলা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে জ্বর। কলকাতার দুই বিশিষ্ট চিকিৎসক জানাচ্ছেন, ঠিক কী কারণে জ্বর হচ্ছে বাচ্চাদের। বাবা-মায়েরা কীভাবে সতর্ক থাকবেন, কী কী লক্ষণ দেখলেই বাচ্চাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন।

ডা. সুবর্ণ গোস্বামী

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (সিনিয়র পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট) ডাক্তার সুবর্ণ গোস্বামী বলেছেন, উত্তরবঙ্গ শুধু নয়, গোটা রাজ্যেই শিশুরা জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে রেসপিরেটারি সিনসিটিয়াল ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। তাছাড়া স্ক্রাব টাইফাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ও টাইপ-বি ছড়াচ্ছে বাচ্চাদের মধ্যে। ডাক্তারবাবু বলছেন, প্রতি বছরই এই বর্ষার মরসুমে জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। সিজন চেঞ্জের সময় সর্দি-কাশি, জ্বর ঘরে ঘরেই হয়। রেসপিরেটারি ভাইরাস বলে আতঙ্ক ছড়াবার কোনও কারণ নেই। প্রতি বছরই এই সময় রেসপিরেটারি ভাইরাসের প্রভাব বাড়ে। তাছাড়া অন্যান্য ভাইরাল জ্বরও দেখা দেয়। এই বছর করোনার কারণে আরও সচেতনভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে বাচ্চাদের। গোড়াতেই লক্ষণ চেনা ও দেরি হওয়ার আগেই ডাক্তারের পরামর্শ নিলে জ্বর দ্রুত সেরে যাবে বাচ্চাদের।

Bengal: 130 children hospitalized with high fever, dysentery in Jalpaiguri  | India News – India TV

বাবা-মায়েরা কী কী দিকে খেয়াল রাখবেন—

১) সবচেয়ে প্রথম দেখতে হবে সর্দি-জ্বর কতটা বাড়ছে। তাপমাত্রা বেশি উঠে গেলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

২) ১০৪ ডিগ্রি অবধি তাপমাত্রা উঠতে দেখা যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর সাধারণ ২-৩ দিন থাকে, বারে বারেই ধুম জ্বর আসতে পারে। কিন্তু চার থেকে পাঁচ দিন পরেও জ্বর না কমলে সতর্ক হতে হবে।

৩) বাচ্চাদের প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন দেওয়া যেতে পারে। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা অন্তর দিনে পাঁচ থেকে ছয় বার ওষুধ খাওয়ানো যাবে।

৪) অ্যাসপিরিন কোনওভাবেই দেওয়া যাবে না বাচ্চাদের।

Third wave in West Bengal? 130 children hospitalised in Jalpaiguri with  fever, dysentry - Oneindia News

৫) জ্বরের সঙ্গে যদি খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বাচ্চাদের।

৬) পাঁচ বছরের নীচে বাচ্চাদের মাস্ক পরানো যাবে না। তাই বাড়ির বড়রা যারা বাইরে বেরচ্ছেন তাঁরা নিয়ম করে মাস্ক পরুন, হাত ধোওয়া, স্যানিটাইজেশনের দিকে খেয়াল রাখুন।

৭) বাচ্চাদের গা গরম দেখলে জলপট্টি দিন, গা, হাত-পা ভাল করে স্পঞ্জ করে দিন। ফ্যান চালিয়ে রাখুন, সারা ঘরে যাতে ভেন্টিলেশন ঠিকঠাকভাবে হয় সেটা খেয়াল রাখুন।

৮) রেসপিরেটারি ভাইরাস সাধারমত হাঁচি-কাশি, ড্রপলেটে ছড়ায়। অনেকটা কোভিডের মতো। তাই মাস্ক পরা জরুরি, হাত ধোওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে হবে।

৯) স্ক্রাব টাইফাস এখ ধরনের উকুন থেকে ছড়ায় এর নাম ‘ট্রম্বিকিউলি়ড মাইটস’। সাধারণ মাঠে বা খোলা জায়গায় যাঁরা কাজ করেন তাঁদের শরীরে এই উকুন বাসা বাঁধতে পারে। এর থেকেই স্ক্রাব টাইফাস ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকে পড়ে। এর সংক্রমণ হলে সারা গায়ে চাকা চাকা দাগ দেখা যাবে, সেউ সঙ্গে ধুম জ্বর হবে। তাই যাঁরা চাষের কাজ করেন বা কাজের সূত্রে খোলা ও অপরিচ্ছন্ন জায়গায় যেতে হয়, তাঁরা অবশ্যই সতর্ক থাকুন। পায়ে জুতো, চটি পরা মাস্ট। খালি পায়ে অপরিষ্কার জায়গায় যাবেন না।

 

এই লক্ষণগুলো দেখলেই সাবধান হতে হবে

 

ডা. অনির্বাণ দলুই

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কমিউনিটি মেডিসিন) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ দলুই বলেছেন, জীবাণু বাহিত সংক্রামক রোগ বছরে একবার বা দু’বার দেখা যায়ই। এখন কোভিডের জন্য বাবা-মায়েরা অনেক বেশি সতর্ক। অনেকেই ভাবছেন জ্বর মানেই করোনা, তা কিন্তু নয়। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে জ্বরের কারণ কোনও জীবাণু বাহিত রোগ। এর লক্ষণ দেখে সতর্ক হতে হবে অভিভাবকদের।

যদি দেখা যায় টানা তিন-পাঁচ দিন জ্বর থাকছে, শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে বাচ্চাদের তখন ডাক্তার দেখাতে হবে।

শ্বাসনেওয়ার সময় নাকের দু’পাশ ফুলে উঠছে, বুক ওঠানামা করছে, পাঁজরের নীচের অংশ নেমে যাচ্ছে তখন সাবধান হতে হবে।

শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৯২ শতাংসের নীচে নেমে গেলে সতর্ক হতে হবে বাবা মায়েদের। বাচ্চাদের শ্বাস নিতে সমস্যা হলেই অক্সিজেন লেবেল চেক করুন।

আর একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে, যদি বাচ্চাদের খাওয়ার পরিমাণ হঠাৎ করে কমে যায় তখন চিন্তার কারণ আছে।

বাচ্চা যদি দিনে পাঁচ বারের কম প্রস্রাব করে তাহলে ডাক্তার দেখান।

 

নিজে থেকে ডাক্তারি করে ওষুধ খাবেন না

ডাক্তারবাবুরা বলছেন, সিজন চেঞ্জের সময় জ্বর হয়েই থাকে। এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। প্যারাসিটামল খেতে পারেন। অনেকে মাথা ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন খান। সেটা খাবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ভুলেও কোনও অ্যান্টি-ভাইরাল বা অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ওষুধ খাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হবে। প্রেসার ও সুগারের ওষুধ খেলে সেটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। মাল্টিভিটামিন, ভিটামিন সি খেতে পারেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা এ বা ইনফ্লুয়েঞ্জা বি ভাইরাসের সংক্রমণ হলে ওসেল্টামিভির ওষুধ দেওয়া হয়। সেটা টেস্ট করানোর পরেই দেন ডাক্তাররা। নিজে থেকে এই ধরনের ওষুধ খাওয়ার চেষ্টা করবেন না।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More