স্বাস্থ্যক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ভূমিকাও অপরিসীম, প্রয়োজন আরও নিয়োগ

শুভজিৎ বসাক

করোনা আমাদের নতুন করে বুঝিয়েছে হাসপাতালের ভূমিকা। চারপাশে যখন মৃত্যুর বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, তখন আমাদের আলো দেখিয়েছেন চিকিৎসক তথা স্বাস্থ্যকর্মীরা। শুধু চিকিৎসক নন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অক্লান্ত পরিশ্রমও হাসপাতালের পরিকাঠামোকে সুদৃঢ় করে। আমাদের দেশে ২০ জুলাই “বিশ্ব অপারেশন থিয়েটার ও অ্যানাস্থেশিয়া টেকনোলজিস্ট দিবস” পালিত হয়। প্যারামেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের সম্মান জানাতে ও উৎসাহ জোগাতে দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজ্যে কোভিড পরিস্থিতি দিনদিন যত উদ্বেগজনক হয়েছে, ততই বেড়েছে কোভিড হাসপাতালে বেডের সংখ্যা। চিকিৎসা পরিষেবার নিরিখে এই পদক্ষেপ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক, তবে সঠিক পরিষেবা পেতে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ মেডিকেল টেকনোলজিস্টেরও নিয়োগ প্রয়োজন।

রাজ্যে এখন জরুরিকালীন ছাড়া অস্ত্রোপচার বন্ধ, তাই প্ল্যান করে রাখা শল্যচিকিৎসা এই মুহূর্তে তেমন হচ্ছে না। ফলস্বরূপ অন্যান্য রোগী ভর্তিতে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। এইসব ওয়ার্ড থেকে প্রশিক্ষিত নার্স ও চিকিৎসকদের কোভিড পরিষেবায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এঁদের সংখ্যাটা অনেক, তাই অনায়াসে এই স্রোতে নিয়োগ করা সম্ভব। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটা বিভাগের দায়িত্ব সমান পরিসরে থাকে, যা হলো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বিভাগ।

আধুনিক পরিকাঠামোয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ হয়। গত বছর থেকে এঁদের অনেককেই কোভিড পরিষেবায় নিয়োগ করা হলেও সংখ্যাটা নার্স ও চিকিৎসকের সমতুল্য নয়।

অথচ মেডিকেল টেকনোলজিস্টরাও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নার্সিং পরিষেবার কাজ আজ প্রায় দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে। যখন চিকিৎসাবিদ্যার এত ব্যপ্তি হয়নি, তখনও এই নার্সিং মহিলাকর্মীরা রোগী পরিষেবায় চিকিৎসকদের সাথে নিয়োজিত থাকতেন। পরে চিকিৎসার ব্যপ্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নার্সিং পরিষেবার আওতা বহির্ভূত অনেক কাজ নার্সদের ওপর বর্তায়। ফলে তাঁরা মূল রোগী পরিষেবার কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকেন।

১৯৫৪ সালে স্বাস্থ্যক্ষত্রে উন্নত পরিকাঠামোর সাথে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা পরিষেবা আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ‘অপারেশন থিয়েটর টেকনোলোজি’ বিভাগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৩ সালে AORN (Assosiation Of Peri-Operative Registrated Nursing)- এর জাতীয় উপদেষ্টা বোর্ড এই অপারেশন থিয়েটর টেকনোলজিস্টদের কাজ নির্ধারিত করে শল্যচিকিৎসা বিভাগের অ্যানাস্থেশিয়া, শল্যবিভাগ ও যন্ত্রপাতির বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জীবাণুমুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ করতে শুরু করে। এই শাখাগুলি থেকেই থেকে আজকের ক্রিটিক্যাল কেয়ার টেকনোলজিস্ট, পারফিউসন টেকনোলজিস্ট ইত্যাদি শাখার উদ্ভাবন হয়েছে।

ক্রিটিক্যাল কেয়ার টেকনোলজিস্টরা মূলত আর্টারিয়াল ব্লাড গ্যাস (ABG) পরীক্ষা করে। যার ওপর ভিত্তি করে করোনা আক্রান্ত রোগীরা অক্সিজেন থেরাপির আওতায় আসে।রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কম বা বেশী বুঝে ওঁরাই চিকিৎসকের পরামর্শে সেই থেরাপির ব্যবস্থা করে, কোভিড রোগীর আইসিইউ বিভাগের খুবই জরুরী পর্যায় এটি। এছাড়া প্রতিদিন চিকিৎসা পরিষেবার আধুনিক যন্ত্রপাতির সাথে ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য অক্সিজেন ডিভাইসগুলোর বিষয়ে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে নিরন্তর যোগাযোগ রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও ওঁদের ওপরেই ন্যস্ত রয়েছে।

পারফিউসনিস্টরা ওপেন হার্ট সার্জারিতে কৃত্রিমভাবে তাকে সচল করে শল্যচিকিৎসা চালাতে যেমন সাহায্য করে, তেমনই একমো মেশিন চালিয়ে কোভিড আক্রান্ত ফুসফুসকে বিশ্রাম দিয়ে দেহে কৃত্রিমভাবে রক্ত চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করে।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নার্স ও চিকিৎসকদের সঙ্গে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদেরও একই সারিতে গণনা করে একটা সুবৃহৎ পরিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংখ্যাটা প্রতিটা বিভাগেই খুব কম। শুধু তাই নয়, গোটা চিকিৎসা পদ্ধতির এত গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগ নিয়ে আজও অনেকে উদাসীন। ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট’ ও ‘টেকনিশিয়ান’- এই দুইকে এখনও গুলিয়ে ফেলেন অনেকে।

“টেকনিশিয়ান” তাঁরাই যারা প্রথাগত পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের যন্ত্রাংশ মেরামতি করেন এবং “টেকনলোজিস্ট” নতুন প্রযুক্তি গঠনে সদাসচেষ্ট থাকেন এবং চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক ভাবধারায় প্রতিপন্ন হন। এই বিষয়ে ভ্রান্তি দূর করতে অবশ্যই তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

(লেখক বাঙ্গুর হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার টেকনোলজিস্ট, মতামত তাঁর নিজস্ব।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More