দূষণের ভারে বিপন্ন, গঙ্গা পরিষ্কার হবে কি?

সঞ্জীব আচার্য

কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

গঙ্গা বাঁচাতে সেই কবে থেকেই চলছে উদ্যোগ-আয়োজন। একাধিক সরকারি প্রকল্প, কর্মসূচী, প্রচার-প্রসার। কমতি নেই কিছুরই। কিন্তু এতকিছুর পরেও গঙ্গা সংস্কারের কাজ কতদূর এগিয়েছে, মানুষ কতটা সচেতন হয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

 

দূষণ বাড়ছে গঙ্গায়

গঙ্গা সংস্কার বিষয়ে আস্ত একটা দফতরই তৈরি করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। এর পরেও গঙ্গা দূষণ রোধে কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একগুচ্ছ মামলাও হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। গঙ্গা দূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব পরিবেশ বিজ্ঞানী ও নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশ। এই সব মামলার জেরেই ১৯৮৬ সালে রাজীব গাঁধীর জমানায় প্রথম ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি হয়। দু’দফায় সেই কাজে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা জলে গেলেও গঙ্গার হাল বিশেষ ফেরেনি বলে অভিযোগ। বরং দিনের পর দিন গঙ্গার জলে দূষণ বেড়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, গঙ্গার জলে দূষণ বা রোগজীবাণুর অস্তিত্ব মাপা হয় ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা দিয়ে। ফিক্যাল কলিফর্ম যত বেশি হবে, রোগজীবাণুর পরিমাণও তত বেশি হয়। ফিক্যাল কলিফর্মের উৎস হল মানুষ ও অন্যান্য পশুর মল এবং কীটনাশক। মানুষের পেটে এক বার তা ঢুকলে আমাশা-সহ পেটের বিবিধ রোগ তো বটেই, এমনকী টাইফয়েড, কলেরাও হতে পারে।

Revival of Ganga wetlands gets government's attention | India Water Portal

দেখা গেছে, হরিদ্বার থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত গঙ্গার জলে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি।  পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ জায়গাতেও এই ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অথচ গঙ্গায় দূষণ ঠেকাতে কেন্দ্রীয় প্রকল্প স্বচ্ছ ভারত মিশনের পাশাপাশি রয়েছে রাজ্যের নির্মল বাংলা।

Ganga Water Pollution Severe, Only One Of 39 Locations Clean: CPCB

‘ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, গঙ্গা তীরবর্তী দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে দৈনিক গড়ে ৩০ কোটি লিটার বর্জ্য নদীতে এসে পড়ে। সাকুল্যে তার ১০ কোটি লিটার পরিশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মল, কীটনাশক ও শিল্প-বর্জ্যের ছোঁয়াচ থেকে নদীকে মুক্ত করা। তা করা যায়নি।

 

কীভাবে দূষিত হচ্ছে গঙ্গা?

গঙ্গার তীরবর্তী শহর-গ্রামের নিকাশি এবং শিল্পাঞ্চলে বর্জ্য থেকেই বেশি দূষণ ছড়ায়। গঙ্গার তীরবর্তী চাষের খেত থেকে জলে ধুয়ে আসা কীটনাশকও দূষণ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গা দূষণ হয় মূলত দু’ভাবে। একটি ক্ষেত্রে দূষণের উৎস চিহ্নিত করা যায়। অন্য ক্ষেত্রে সেটি করা যায় না। যে নালাগুলি গঙ্গায় মিশে দূষণ ছড়াচ্ছে সে ক্ষেত্রে সরকার বা প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি গঙ্গার তীরে যত্রতত্র মলত্যাগ, নানা ধরনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে সরকারের দিক থেকে আরও অনেক বেশি জনসচেতনতা প্রসার প্রয়োজন।

Pollution board identifies industries causing harm to environment

কারণ আরও রয়েছে। গঙ্গার উপনদীগুলিতেও নিকাশি নালার বর্জ্য গিয়ে মেশে। সেই বর্জ্য সবটাই গিয়ে পড়ে গঙ্গায়। সেই দূষণ রোধের জন্য যে সংখ্যক নিকাশি বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট তৈরির দরকার ছিল, তা করা হয়নি। পরিবেশকর্মীরা আবার দাবি করে, যে নিকাশি বর্জ্য পরিশোধন প্লান্টগুলি তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে একাধিক প্লান্টই বর্তমানে কাজ করে না।

River Ganga could be responsible for polluting the Bay of Bengal: Report

দূষণের হাল হকিকত

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের রিপোর্ট বলছে, ২০১৪-র তুলনায় ২০১৮-এ দূষণ বেড়েছে গঙ্গায়। উত্তরাখণ্ডে এই চার বছরে দূষণের মাত্রা বেড়েছে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গায় দূষণের মাত্রা একই।

২,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গার মাত্র একটি স্থানে জল পানযোগ্য।

গঙ্গাকে দূষণ মুক্ত করার নরেন্দ্র মোদীর প্রকল্প ‘নমামি গঙ্গে’-য় মোট বাজেট ২০ হাজার কোটি টাকা, এখনও পর্যন্ত ব্যয় ৬,১০০ কোটি টাকা।

বর্জ্য-নিকাশি শোধন, সব বাড়িতে শৌচালয়, সচেতনতা তৈরিতে পাঁচটি রাজ্যকে প্রায় ৯৫১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪৯০ কোটি টাকা। দূষণে রাশ না টানার ফল, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, বিহারের ছ’টি শহরে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমেছে।

India's Ganges River Pollution in Photos

গঙ্গা-পুনরুজ্জীবনে কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

গঙ্গার ধারে যে সমস্ত সুয়ারেজ ট্রিটমেণ্ট প্ল্যাণ্টগুলো আছে সেগুলোকে কার্যকরী অবস্থায় আনা।
গঙ্গার ধারের বসতি ও বস্তি থাকলে, সেগুলিতে ১০০  শতাংশ নিকাশির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

গঙ্গার দূষণ নিয়ন্ত্রণই শুধু নয়, গঙ্গার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।

যে সমস্ত ঘাটে, প্রতিমার কাঠামো এবং অন্যান্য উপকরণ ফেলা হয়, তা থেকে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথক করা। জৈব বর্জ্য থেকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে জৈব রঙ ও অজৈব বর্জ্যগুলিকে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেণ্টের ব্যবস্থা করা।

Ganges and Yamuna rivers granted same legal rights as human beings | India  | The Guardian

গঙ্গার কোথাও ওপেন ড্রেনের মাধ্যমে নোংরা জল ফেলা হচ্ছে কি না, সে বর্জ্যের প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা।

গঙ্গায় ক্রম বর্ধমান দূষণের কারণে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি ১ লিটারে ১০ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনতে চাইছে কেন্দ্র। কঠিন ও তরল বর্জ্য পরিশোধন করে তা পুর্নব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ব্যবস্থা পুরসভাগুলিতে থাকতে হবে। কোনও অবস্থাতেই দূষিত জল আর গঙ্গায় ফেলা চলবে না।

কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে গঙ্গার দু’পাশের আর্সেনিক-কবলিত এলাকায় কাজ করছে। এই বিষয়ে প্রকল্প তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ভূজল পর্ষদ। আর্সেনিক পশ্চিমবঙ্গের ভয়ঙ্কর সমস্যা। বিশেষত গঙ্গা সংলগ্ন জেলাগুলিতে এর প্রকোপ বেশি। তার মোকাবিলায় কাজ করছে ভূজল পর্ষদ।

গঙ্গার জল আজ শুধু খাওয়া, গৃহস্থালির কাজ, স্নানের অনুপযোগী নয়, কৃষিকাজের পক্ষেও ক্রমেই বিষবৎ হয়ে উঠছে। গঙ্গাদূষণ জলের বাস্তুতন্ত্রকেও প্রচণ্ড প্রভাবিত করছে। এর প্রমাণ গঙ্গায় ডলফিনের সংখ্যা মারাত্মক কমে যাওয়া। গঙ্গায় অনেক মাছের দেহে অস্বাভাবিক পারদ ডিপোজিট হওয়া। আবার গঙ্গায় প্রচুর পরিমাণে বাঁধ নির্মাণের ফলে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত অনেক জীবজন্তুর স্বাভাবিক আবাসস্থলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More