চিকিৎসক নিগ্রহে ভারত এক নম্বরে, কোভিড-যুদ্ধ কি বদলে দেবে এ চিত্র: ডক্টর সৈকত গুপ্ত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সদ্য পার হয়েছে ১ জুলাই, চিকিৎসক দিবস। ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশে পালিত হয় এই দিবস। গত বছরের মতোই এবছরও এমন একটা সময়ে এই দিবসটা এসেছে, যখন চিকিৎসকরা তাঁদের জীবনের এবং পেশার এক অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্যে দিয়ে পার হচ্ছেন। এই দিনেই এই যুদ্ধকালীন সময়টি নিয়ে দ্য ওয়ালের মুখোমুখি অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হসপিটালের সার্জিক্যাল অঙ্কোলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডক্টর সৈকত গুপ্ত।

দ্য ওয়াল: গত দেড় বছরের এই কোভিড পরিস্থিতি, কীভাবে দেখছেন, কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন এই সময়কে?

ডক্টর গুপ্ত: প্রথম যখন কোভিড সংক্রমণ শুরু হল, তখন তো এ নিয়ে আমরা কেউ কিছুই জানতাম না। একটা অজানা, অচেনা ভাইরাস নিয়ে সবাই অন্ধকারে। হাসপাতালগুলোতেও হুলস্থূল অবস্থা। ধীরে ধীরে কোভিড চিকিৎসার গাইডলাইন এল। প্রোটোকল মেনে চিকিৎসা শুরু করলাম আমরা। এই দেড় বছরের লড়াই শেষে এসে বলতে পারি, সাফল্যও পেয়েছি আশাতীত।

তবে এই সময়ে যেটা হয়েছে, নন-কোভিড চিকিৎসায় বেশ ক্ষতি হয়েছে। ক্যানসারের কথা এ প্রসঙ্গে বিশেষ করে বলার। এই প্যানডেমিকে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা সবসময় খোলা রেখেছি হাসপাতাল, তৈরি থেকেছি। কিন্তু রোগীরা ভয় পেয়েছেন। যাঁরা ক্যানসারের রোগী, তাঁরা এমনিই নিজেদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে যেহেতু ভয় পেয়ে রয়েছেন, তাই তাঁরা ডাক্তারখানায় বা হাসপাতালে যেতেই ভয় পাচ্ছেন। আবার যাঁদের কোনও উপসর্গ দেখা দিয়েছে, তাঁরাও দেরি করেছেন, ফেলে রেখেছেন এক বছর বা তারও বেশি সময়। এর ফলে ক্যানসার ধরা পড়েনি সময়ে।

কোভিডের প্রথম ঢেউ স্তিমিত হওয়ার পরে দেখা যায়, ক্যানসার রোগীদের আসার সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তবে দুর্ভাগ্যজনক হল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দেরি হয়ে গেছে অনেকটা। আর ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে দেরি মানেই সারার সম্ভাবনাও কমে যাওয়া। এই বিষয়টা শুধু এ শহরে বা এ রাজ্যে ঘটছে তা নয়, সারা দেশেই এখন এমনই চিত্র ক্যানসারের।

এছাড়া ক্যানসারের ফলোআপ চিকিৎসার রোগীরাও অবহেলা করেছেন। ক্যানসার আসলে এমন একটা অসুখ, যার এককালীন চিকিৎসা হয় না। রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, সার্জারি– সব রকম মিলিয়ে একটা প্রসেস চলতে থাকে লম্বা সময় ধরে। ক্যানসারের চিকিৎসা দীর্ঘকালীন। এটা ঠিক ভাবে না করা হলে ক্যানসারের চিকিৎসা অধরা থেকে যায়।

এই প্রসঙ্গে আমি একটা কথা বলতে চাই। কোভিড সংক্রমণের নিরিখে হাসপাতাল কিন্তু অনেক নিরাপদ। আমরা প্রতিটি রোগীর পরীক্ষা করে তবেই ভর্তি করছি। আমরা চিকিৎসকরা ভ্যাকসিন নিয়েছি। আমরা সবসময় আধুনিক ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা অবলম্বন করি। নন-কোভিড রোগীদের সঙ্গে কোভিড রোগীদের কোনও সংস্পর্শই ঘটে না। হাসপাতালে এসে সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় নেই-ই। দেখা যাচ্ছে, রোগীদের দেখতে আসা বাড়ির লোকেদের থেকে কোভিড সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এই নিয়েও আমরা নানা পদক্ষেপ করেছি। কিন্তু সবটা জোরজবরদস্তি করাও যায় না।

দেখুন, কী বলছেন ডাক্তারবাবু।

দ্য ওয়াল: গত দেড় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?

ডক্টর গুপ্ত: প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে একটা দিনও হয়নি, যে আমরা কাজ বন্ধ রেখেছি। কেমো, রেডিও, সার্জারি, সব চলেছে যেমনটা চলত তেমনই। প্রথম যখন ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে লাগল, তখন হাজারো সংশয় ছিল। কিন্তু ক্যানসারের চিকিৎসায় কোনও আপস কখনও ছিল না। এটা আমাদের সাফল্য বলেই আমার মনে হয়। যেখানে সারা পৃথিবী থমকে গেছিল, কেবল জরুরি পরিষেবা চালু ছিল, সেখানে আমরা একটা দিনও থামিনি।

এখন কোভিডের ঢেউ ফের নিম্নমুখী হলেও, আমাদের চ্যালেঞ্জ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন। যেমন একটা উদাহরণ দিই, লাং ক্যানসারের রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছেন। এর কারণ হল, বুকের সিটি স্ক্যান হচ্ছে অনেক বেশি। কোভিজ সংক্রমণের কারণে বা সেরে ওঠার পরে চেস্ট সিটি স্ক্যান অনেকেই করাচ্ছেন। আর তাতেই ধরা পড়ছে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। ফলে অনেক আর্লি স্টেজে লাং ক্যানসার পাচ্ছি আমরা, যা আগে পেতাম না। ফলে এখন আমরা মনে করছি, একটা বয়সের পরে এবং যাঁরা ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের বছরে একটা করে বুকের সিটি স্ক্যান করানো হলে ভাল। এটা গাইডলাইন হতে পারে।

আসলে কোভিডে আমরা বহু কিছু শিখলাম। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, সেটাও শিখলাম। এটাই হয়তো শেষ মহামারী নয়। আরও মহামারী আসতে পারে পৃথিবীতে। কোভিডেরও আরও ঢেউ আসতে পারে নতুন করে। ফলে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য যতটা ব্যয় করা হয়, ততটাই স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও করার সময় এসেছে। কারণ আগামীর পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হতে পারে। কোভিডের থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

দ্য ওয়াল: ১ জুলাই ডক্টর্স ডে, এই দিনটার তাৎপর্য আপনার কাছে কীরকম?

এই দিনটা আমরা প্রতি বছরই উদযাপন করি। কিন্তু এবার আমার মনে হচ্ছে, দেশের মানুষ হয়তো এবার এই পেশাটিকে এবং এই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষদের আর একটু গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের প্রতি হিংসার লিস্টে ভারত প্রথমে। কোনও পিছিয়ে থাকা দেশ নয়, ভারতবর্ষই সবচেয়ে বেশি চিকিৎসক নিগ্রহ করে। হয়তো এই যুদ্ধের পরে মানুষ খানিকটা বুঝতে শিখবে, চিকিৎসকদের লড়াই ঠিক কতটা কঠিন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More