আজ ঘরে ঘরে পালিত হচ্ছে অশোকষষ্ঠী, জানুন এই দিনের মাহাত্ম্য

অশোক ষষ্ঠীর ব্রত যাঁরা পালন করেন তাঁদের এই দিনে অশোক ফুল দই-সহ খাবার চল রয়েছে। এই ব্রত পালন আসলে দেবী কল্পনায় প্রকৃতির পূজা।

অনির্বাণ

আজ অশোকষষ্ঠী। চৈত্র মাসের শুক্লাষষ্ঠীর দিনে বাড়ির সকলের মঙ্গলকামনায় বাংলার মায়েরা এই ব্রত পালন করেন। এই বিশেষ দিনে অশোক ফুল দেবতার পায়ে অর্পণ করে দইয়ের সঙ্গে খাওয়ার প্রথা আর সঙ্গে খেতে হয় মুগকলাই ভিজানো।

দেবীভাগবত পুরাণের নবম স্কন্ধের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে- “ষষ্ঠাংশা প্রকৃতের্যে চ সা চ ষষ্ঠী প্রকীর্তিতা /বালকানামধিষ্ঠাত্রী বিষ্ণুমায়া চ বালদা ।” অর্থাৎ – বালকগণের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, বালকদায়িনী বিষ্ণুমায়া প্রকৃতির ষষ্ঠকলা, এই জন্য ষষ্ঠী নামে কীর্তিত হয়েছেন। মা ষষ্ঠী ভগবতীর একটি রূপ। যিঁনি দুর্গা তিঁনিই ষষ্ঠী। ষষ্ঠী দেবীর বাহন মার্জার। এবং তাঁর হাতে বর মুদ্রা ও কোলে শিশু থাকে।

এই ব্রতের পিছনে রয়েছে এক পৌরাণিক কাহিনি।

বহুযুগ আগে অশোকবনের মধ্যে এক ঋষির পর্ণকুটীর ছিল। একদিন ঋষি স্নান সেরে ফেরার পথে একটি অশোক গাছের নীচে এক সদ্যজাত কন্যাকে কাঁদতে দেখেন। ধ্যানের মাধ্যমে ঋষি জানতে পারেন কন্যাটি এক শাপভ্রষ্টা হরিণী মায়ের সন্তান। ঋষি মেয়েটিকে আশ্রমে এনে লালন পালন করতে লাগলেন। নাম দিলেন অশোকা । ঋষিকন্যা বড় হতে লাগল। যৌবনে সে রূপবতী হয়ে উঠল।

এরই মধ্যে এক রাজপুত্র মৃগয়ায় বেরিয়ে ওই পরমাসুন্দরী অশোকাকে দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে পারলেন। ঋষিকন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের কথোপকথনের মধ্যেই ঋষি এসে উপস্থিত হন সেখানে। রাজপুত্র অশোকাকে বিয়ে করতে চান। ঋষি তাতে সম্মতিও দিয়ে দেন।

অশোকাকে রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঋষি বললেন, “আজ থেকে তুমি রাজার ঘরণী হলে। যদি কখনও কোনও বিপদে পড় তবে আশ্রমে চলে আসবে। রাজপুরী থেকে চিনে এই আশ্রমে যাতে আসতে পারো তার জন্য এই অশোকফুলের বীজ তোমাকে দিলাম। এখন যাওয়ার সময়ে এই বীজ ছড়াতে ছড়াতে যেও। পরে কখনও প্রয়োজন হলে এই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া অশোকগাছ বরাবর চিনে তুমি চলে আসতে পারবে।”

অশোকফুলের বীজ আঁচলে বেঁধে নিয়ে অশোকা রাজপুত্রের সঙ্গে পতিগৃহে যাত্রা করল। যাত্রাপথে বীজ ছড়াতে ছড়াতে চলল অশোকা। অশোকার সুখের সংসার হল। সাত ছেলে ও এক মেয়ের মা হল অশোকা।

অশোকার শ্বশুর অর্থাৎ রাজামশাই মারা গেলে শ্রাদ্ধের দিনে অশোকষষ্ঠীর কথা বিস্মৃত হল অশোকা। ভাত মুখে দিয়েই মনে পড়ল ষষ্ঠীর কথা। রাতে শুয়ে পড়ল মনখারাপ নিয়ে। পরদিন সকালে উঠে দেখল সাত ছেলে-বউ যার যার ঘরে মরে পড়ে আছে। সেই দৃশ্য দেখেই আশোকার ঋষির কথা মনে পড়ল। রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে আশ্রম বরাবর চলতে লাগল সে।

ততদিনে একদিন তারই ছড়ানো বীজ থেকে অশোকগাছ মহীরুহের আকার ধারণ করেছে । চৈত্রমাসে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। ঋষির আশ্রমের কাছে এসেই অশোকা ঋষিকে দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। ঋষি ধ্যানের বলে সব অবগত ছিলেন । কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়িতে ফিরে গেলেন। কমণ্ডুলু থেকে জল ছিটিয়ে দিলেন অশোকার মৃত ছেলে বউ নাতিপুতির গায়ে । দৈবগুণে সকলে চোখ মেলে চাইল ।

ঋষি বললেন, অশোকষষ্ঠীর ব্রত পালন করলে কখনও শোক প্রবেশ করবে না সংসারে। অশোক বৃক্ষে দেবী মহামায়া ‘শোকরহিতা’ দেবী নামে বিরাজ করেন । যিঁনি শোক রহিত অথবা যার আরাধনা করলে শোক থাকে না – তিঁনিই দেবী শোকরহিতা দুর্গা দেবী । তাই তো কলাবউ বা নবপত্রিকায় অশোক গাছ রাখতে হয়।

অশোক গাছ আয়ুর্বেদিক ঔষধি হিসেবে অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেই জন্যই হয়তো শাস্ত্রকারেরা ঔষধি বৃক্ষ গুলিকে প্রানদায়িনী ঈশ্বরের স্বরূপ বলে শাস্ত্রে স্থান দিয়েছেন । যেমন তুলসী, বেল, আমলকী, হরিতকী, নিম, ডালিম ইত্যাদি গাছে ঈশ্বর আছেন বলে মনে করা হয়।

অশোকষষ্ঠীর ব্রত যাঁরা পালন করেন তাঁদের এই দিনে অশোক ফুল দই সহ খাবার চল রয়েছে। এই ব্রত পালন আসলে দেবী কল্পনায় প্রকৃতির পূজা।

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.