ময়নাপুরের প্রাচীন কথা

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

ময়নাপুর একটি প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম। জয়পুর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মোরাম রাস্তায় জয়পুর থানার জনবহুল গ্রাম হল ময়নাপুর। অনেকের দাবি, এটি নাকি শূন্যপুরাণের রচয়িতা রামাই পণ্ডিতের জন্মস্থান। শুধু তাই নয়, এই গ্রাম তাঁর সাধনক্ষেত্রও বটে। অপর দিকে, ধর্মমঙ্গলের লাউসেনের বাবা কর্ণসেন ও মা রঞ্জাবতীর উপাখ্যানের সঙ্গেও জড়িত এই গ্রাম।

কিংবদন্তি আছে যে, এই গ্রামের হাকন্দ দিঘির তীরে কঠোর তপস্যায় রঞ্জাবতীর মৃত্যু হলে ধর্মরাজ তাকে পুনর্জীবিত করে বর দেন। হাকন্দের জলকে তাই গঙ্গাজলের মতো পবিত্র ধরা হয়। এই দিঘির পশ্চিম তীরে হাটতলার মধ্যে ভাঙাচোরা হাকন্দ মন্দির অবস্থিত। ভাঙা হলে কী হয়, গবেষকদের মতে পাথরের সপ্তরথ এই পীঢ়া দেউলটি বাঁকুড়া তথা বঙ্গের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি। প্রতিষ্ঠালিপি নেই ঠিকই তবে স্থাপত্যের বিচারে দেউলটি প্রাক-মুসলিম যুগের বলেই মনে হয়। মূল মন্দিরের ভেতরে বর্তমানে শিবলিঙ্গ (হাকন্দেশ্বর নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অতীতে নাকি এটি ধর্মরাজের মন্দির ছিল।

গ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে আধুনিক এক মন্দির। এই মন্দিরে ‘যাত্রাসিদ্ধি রায়’ নামে ছোট কূর্মমূর্তি বিরাজ করছেন। এই ধর্মরাজ নাকি রামাই পণ্ডিতের উপাসিত। সামনের প্রাঙ্গণে মাকড়া পাথরের চাঙড়ের নীচে রয়েছে সমাধি। জনশ্রুতি, সমাধিটি রামাই পণ্ডিতের। ধর্মরাজ যাত্রাসিদ্ধির বার্ষিক পুজো হয় ভাদ্র মাসে আর গাজন অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখ মাসে। এই গাজনের সূত্রপাত হয় অক্ষয় তৃতীয়ার আর শেষ হয় পূর্ণিমায়।

বৈতল

বিষ্ণুপুরের বাইরেও মল্লভূমে যে বিস্তৃত মল্ল স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে তার খুব একটা প্রচার নেই। এরকমই এক প্রচারবিহীন স্থাপত্য হল বৈতল গ্রামের শ্যামচাঁদ মন্দির। বৈতল গ্রামটি বেশ প্রাচীন ও বড়। কেবল তাই নয়, অবস্থানহেতু অর্থাৎ বাঁকুড়া, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলার সঙ্গমস্থলের কাছাকাছি হওয়ার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম।
বিষ্ণুপুর থেকে মেদিনীপুরগামী সড়কে খানিক এগোলেই পড়বে বাঁকাদহ। বাঁকাদহ থেকে বাঁহাতি যে পাকারাস্তাটি জয়রামবাটির দিকে চলে যাচ্ছে, সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে আসবে বৈতল পাথরপুকুর মোড়। এখান থেকে ডান দিকের রাস্তায় ঢুকলে পড়ে কসবা গ্রাম। গ্রামে ঢোকার মুখে চোখে পড়বে পুরাতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড যাতে তিরচিহ্ন দিয়ে নির্দেশ দেওয়া আছে শ্যামচাঁদ মন্দিরের। নির্দেশিত পথে গ্রামের কাঁচারাস্তা ধরে এগোতে এগোতে পাওয়া যাবে অভীষ্ট শ্যামচাঁদ মন্দির।

প্রত্নতত্ত্ব অধিকার দ্বারা অধিগৃহীত মন্দিরটি অনেকটা এলাকা জুড়ে। চারপাশ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তার ওপর তারকাঁটা। পুরাতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড থেকে জানা যায়, মল্লরাজ বীর হাম্বীরের পুত্র রাজা রঘুনাথের পত্নী সুবর্ণমণি শ্রীরাধাকৃষ্ণের সেবার উদ্দেশ্যে মন্দিরটি ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন। মন্দিরটি মাকড়া পাথরের নির্মিত পঞ্চরত্ন, রত্নগুলি খাঁজকাটা রেখ দেউলসদৃশ। মন্দিরের সবদিকেই ত্রি-খিলান যুক্ত প্রবেশপথ। চারচালা রীতির বাঁকানো ছাদের ঠিক মাঝখানে এক বিশাল রত্নশিখর এবং তারই চার কোণে চারটি ছোট ছোট রত্নশিখর দ্বারা পরিবেষ্টিত। মন্দিরের চার কোণে চারটি প্রকোষ্ঠ এবং তার লাগোয়া চারটি বারান্দা মিলেমিশে গর্ভগৃহকে বেষ্টন করে যেন পরিক্রমা রচনা করেছে। মন্দিরের উল্লেখযোগ্য দিক হল, দক্ষিণ দিকে বারান্দার ভেতরে একটি পার্শ্বকক্ষের মধ্য দিয়ে পাথরের সংকীর্ণ ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।
গর্ভগৃহের দেবতা কষ্টিপাথরের কৃষ্ণমূর্তি বাঁশি হাতে দণ্ডায়মান, সঙ্গে অষ্টধাতুর শ্রীরাধিকা। পাশেই বেদির ওপর নারায়ণশিলা। নিত্যভোগ ও নিত্যসেবা হয়। মূল মন্দিরের সামনে একটি বাঁধানো কুয়ো, যার জলস্তর সারা বছরই এক থাকে। গ্রীষ্মের দিনেও নাকি একতলিও শুকোয় না। মন্দিরের ঠিক দক্ষিণে রয়েছে গ্রামের ষোলোআনার শীতলা মন্দির। মাটির ঘর ভেঙে পাকা দালান মন্দির হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুজোর নির্দিষ্ট দিন ছাড়া মন্দির সাধারণ সময়ে বিগ্রহহীন পড়ে থাকে।

বিগ্রহের নামে প্রায় ২০-২৫ বিঘা দেবোত্তর জমি আছে। আর আছে মন্দিরের পশ্চিমে ইউক্যালিপটাসের বাগান, তা থেকেই ভোগ-পূজার ব্যয় নির্বাহ হয়। গ্রামের ভেতরে নির্জনতার মধ্যে এমন সুন্দর এক মন্দিরের অবস্থান মনকে অনাবিল প্রশান্তিতে অনায়াসে ভরিয়ে দেবে ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই ভুরু কুঁচকে উঠবে এই ভেবে যে, ছাদে অসংখ্য আগাছা ও বট-অশ্বত্থের অবস্থান কতদিন মন্দিরটিকে অক্ষত থাকতে দেবে?
শ্যামচাঁদ মন্দির ছাড়াও বৈতলের উত্তরবার মৌজায় হাটতলায় রয়েছে ঝগড়াই চণ্ডীর এক প্রাচীন মন্দির। ছোট সপ্তরথ দেউল শৈলীর মন্দিরটি চুনকাম করা তবে চটে যাওয়া অংশ প্রমাণ করে যে এটি মাকড়া পাথরের দ্বারা নির্মিত। মন্দিরের শিখরে দুই থাক আমলক, তার ওপর কলস, পতাকা দণ্ড ও দণ্ডের সঙ্গে রয়েছে একটি ধাতব চক্র। উত্তরমুখী মন্দিরের মূলদ্বারের দু’পাশে দুটি কুলুঙ্গি, একটিতে চতুর্ভুজ গণেশ, অপরটিতে ময়ূরবাহন কার্তিক। মন্দিরটিতে উল্লেখযোগ্য অলংকরণ কিছু নেই কেবলমাত্র দ্বারের ওপরে অল্প পঙ্খের কাজ ছাড়া। গর্ভগৃহের মধ্যে অবস্থান করছেন কালো কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তি। বিগ্রহের দুই চোখ ধাতু নির্মিত এবং মাথায় মুকুট পরিহিত, সর্বাঙ্গে কাপড় জড়ানো। মন্দির প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কিংবদন্তিটি সম্পর্কে অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি’ বইতে এরকম লিখিত আছে যে, মহারাজ প্রথম রঘুনাথ সিংহ চেতোয়াবরদা রাজ্যের বিরুদ্ধে সসৈন্যে অগ্রসর হবার সময় গভীর অরণ্যের মধ্যে এক অপরূপ সুন্দর মূর্তি ক্ষণিকের জন্য দেখতে পান। এই ঘটনাকে তিনি দেবীর কৃপা হিসাবে ধরে নেন। যুদ্ধ জয় করে ফেরার পর তিনি এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। ঝগড়ার ফলস্বরূপ এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত বলে দেবী ‘ঝগড়াই চণ্ডী’ নামে লোকমুখে পরিচিত হন। দেবী নিত্যপূজিতা। দুর্গাপূজার সময় দশমীর দিন মন্দিরে উৎসব হয় এবং সেই উপলক্ষে একটি মেলাও বসে।
মন্দিরের পূর্ব দিকে একটি বাঁধানো বেদির ওপর অস্পষ্ট একটি খোদিত মূর্তি রয়েছে যা স্থানীয়ভাবে দেবী ষষ্ঠী হিসাবে পূজিতা হন। মন্দিরের সামান্য উত্তরে একটি ছোট্ট দোলমঞ্চ আর রয়েছে একটি চার চাকার লোহার রথ।
এছাড়াও, এই গ্রামে আছে ধর্মরাজ বাঁকুড়া রায়ের মন্দির ও রাধাদামোদরের পঞ্চরত্ন মন্দির। ঘুরতে গিয়ে এগুলোর দেখা পেলে উপরি পাওনা মনে হবে।

সিহর

জয়রামবাটীর ২ কিলোমিটার পশ্চিমে সিহর গ্রাম। সিহরের অনাদিলিঙ্গ শিব ‘শান্তিনাথ’ এই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ দেবতা। জগমোহন সমেত মাকড়া পাথরের পুবমুখী শিখর দেউলটি এই জেলার অন্যতম পুরাকীর্তি। মন্দির বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওড়িশি ‘রেখ’ দেউল স্থাপত্যে খাঁটি ওড়িশি শৈলীর ছাপ পড়েছে। জগমোহনের দেওয়ালে আলো চলাচলের জন্য জাফরি কাটা জানালাগুলি দৃষ্টিনন্দন। মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। জনশ্রুতি, নিকটস্থ বীরসিংহপুর গ্রামের ক্ষত্রিয় রাজারা নাকি এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। কোনও প্রতিষ্ঠালিপি না থাকলেও অনুমান করা হয়, সম্ভবত খ্রিষ্টীয় সতেরো শতকে মন্দিরটি নির্মিত। মন্দিরটির সামনে রয়েছে আধুনিক কালে নির্মিত নাটমণ্ডপ। তার সামনে মাটিতে পোঁতা বৃষকাঠটি লক্ষণীয়। মন্দিরের দেওয়ালে রয়েছে বেশ কয়েকটি মূর্তি। সিহর জাগ্রত শৈবক্ষেত্র বলে বিশ্বাস। এখানকার গাজনের খুব সুনাম।
এছাড়াও, সিহর গ্রামটি অন্য কারণে উল্লেখযোগ্য। কারণ, এই গ্রামের মজুমদারপাড়ায় শ্রীশ্রীসারদামায়ের মামার বাড়ি। এই বাড়ির দক্ষিণ দিকে ‘এল্লাপুকুর’ নামে একটি দিঘি, যার ধারে শ্রীশ্রীমায়ের মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী এক সুন্দরী শিশুকন্যার দর্শন পান। কন্যাটি একটি বেলগাছ থেকে নেমে এসে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে তাঁর আগমনের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এর পরেই জয়রামবাটীতে মায়ের জন্ম হয়। যদিও মায়ের মাতুল বংশ এখন অবলুপ্ত। এই গ্রাম যে কেবল মায়ের পদধূলিধন্য তাই নয়। এর সঙ্গে রামকৃষ্ণদেবেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কারণ, এই গ্রামে শ্রীশ্রীঠাকুরের পিসতুতো দিদি হেমাঙ্গিনী দেবীর বাড়ি। এই দিদির পুত্রই হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় তথা হৃদে। এই বাড়িতে শ্রীশ্রীঠাকুর ও শ্রীমা কয়েকবার এসেছেন। তাঁর বংশধরের ঘরে আজও রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের হাতে লেখা পুথি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে জয়রামবাটী থেকে শেষবারের মতো কলকাতায় আসার পথে শ্রীশ্রীমা এখানে আসেন। নিকটবর্তী পুকুরে হাত-পা ধুয়ে তিনি শান্তিনাথ শিবমন্দিরে প্রবেশ করেন এবং তৎকালীন ২ টাকার অর্থাৎ আন্দাজমতো ৬ সের মেঠাই, চিনি প্রভৃতি দিয়ে পূজা দেন। এই গ্রামে মায়ের নামে একটি মঠও রয়েছে।

জয়রামবাটী ঘুরতে গিয়ে মাত্র ১ মাইল দূরে এত গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম না ঘুরলে বোধহয় ভ্রমণে কিছুটা খামতি থেকে যায়। অতএব পর্যটকেরা পায়ে পায়ে প্রত্যক্ষ করে আসতে পারেন সিহর গ্রাম ও তার প্রসিদ্ধ দেবতাকে।
বিষ্ণুপুরে রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। রাত্রিবাসের ঠিকানা : হোটেল হেরিটেজ, কলেজ রোড, বিষ্ণুপুর, দূরভাষ : ০৩২৪৪ ২৫৪২৯৮, চলভাষ : ৯৪৩৪১৬০১৯৩।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More