শৈবক্ষেত্র মল্লারপুর

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুস করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

রামপুরহাট-সাঁইথিয়া পথের মাঝে অবস্থিত অতীতের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এই গ্রামে মল্লেশ্বর নামে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ শিব আছেন যাকে কেন্দ্র করে আরও পঁচিশটি শিব মন্দির গড়ে উঠেছে। তাই এই পল্লির নাম শিবগঞ্জ। রামপুরহাট থেকে বাসে এখানে সরাসরি আসা যায়। সাহেবগঞ্জ লুপ লাইনে মল্লারপুর স্টেশন অবস্থিত হলেও মন্দিরগুলি স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূরে, অতএব বাসে আসাই সুবিধের।

অতীতে মল্লারপুর যে কত সমৃদ্ধশালী ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় শিবগঞ্জে এর মন্দির-পল্লি দেখে। এই মন্দির-পল্লি তৈরি হয় আনুমানিক ১২-১৩ শতকে। চতুর্দিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এক বিরাট চত্বরের মধ্যে মল্লেশ্বর শিব মন্দির ব্যতীত বেশিরভাগই আকারে ছোট এবং চারচালা মন্দিরের রীতিতে তৈরি। প্রধান তোরণটি দ্বিতল এবং উত্তর দিকে অবস্থিত।
তোরণদ্বারের ওপর নহবতখানা। পূর্ব দিকেও শিববাড়িতে প্রবেশের একটি পথ আছে। শিববাড়ির অভ্যন্তরস্থ মন্দিরগুলি নানা অলংকরণ, দেবদেবী, মূর্তির এবং কীর্তনের দৃশ্যাবলিতে সমৃদ্ধ। মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের কাছে একটি মন্দিরে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর একটি শিলামূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। সিঁদুরচর্চিত মুখমণ্ডলে উজ্জ্বল হয়ে আছে জাগ্রত ত্রিনয়ন। এই সিদ্ধেশ্বরী দেবীকে মল্লেশ্বর শিবের শক্তিস্বরূপা বলা হয়।
মল্লেশ্বর শিব সম্পর্কে এ অঞ্চলে একাধিক জনশ্রুতি আছে। প্রাচীনকালে মল্লারপুর ছিল ঘোর অরণ্যসংকুল স্থান। সেই সময় এক মেষপালকের অসামান্য রূপসী কন্যা পদ্মিনীর সঙ্গে এক সন্ন্যাসীর মিলন ঘটে। ফলস্বরূপ এক সন্তান হয়, তার নাম রাখা হয় মল্লনাথ। একদিন গোচরণে বনের মধ্যে গিয়ে সে চমকিত হয় একটি দৃশ্য দেখে। একটি দুগ্ধবতী গাভী দলছাড়া হয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে একটি বটের ছায়ায় নির্জনে। আর সেই গাভীর স্তন্য থেকে বৃক্ষমূলে আপনাআপনি ক্ষরিত হচ্ছে পীযূষধারা। কয়েক দিন পরপর একই দৃশ্য দেখে মল্লনাথ তার পিতা সেই সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসা করে ব্যাপারটি সম্পর্কে। তিনি তাকে নির্দেশ দেন জায়গাটি খনন করতে। পল্লিবাসী আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মল্লনাথ জায়গাটি খুঁড়তে শুরু করে। প্রথমে উদ্ধার হয় ঘড়াভর্তি গুপ্তধন। তারপর কীসের ওপর যেন কোদাল প্রতিহত হতেই আগুন জ্বলে ওঠে অকস্মাৎ। মল্লনাথ শুনতে পায় দৈববাণী–- আমি জয়দ্রথ পূজিত দেব সিদ্ধিনাথ। এক্ষণে তোমার নাম অনুসারে মল্লনাথ বা মল্লেশ্বর নামে আত্মপ্রকাশে অভিলাষী। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও মন্দিরাদি নির্মাণের উদ্যোগ নাও তুমি। মল্লেশ্বরের মস্তকে এখনও সেই কোদালের ক্ষতচিহ্ন বর্তমান। গুপ্তধন পেয়ে মল্লনাথ হলেন রাজা মল্লনাথ। আর সেই মল্লনাথের নামানুসারে এই জায়গাটির নামও হল মল্লারপুর।

সিদ্ধিনাথ শিব সম্পর্কেও এই অঞ্চলে একাধিক জনশ্রুতি আছে। তার একটি হল–- বনবাসকালে যখন পাণ্ডবরা কাম্যক বনে অবস্থান করছিলেন তখন জয়দ্রথ গিয়েছিলেন দ্রৌপদীকে হরণ করতে। ভীমের হাতে অপমানিত হয়ে এই গ্রামের পূর্ব দিকে শিবপাহাড়ি নামে এক পাহাড়ে এসে সিদ্ধিনাথ শিবের কাছ থেকে বর লাভের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা শুরু করেন জয়দ্রথ। সিদ্ধিনাথ শিব শেষ পর্যন্ত জয়দ্রথের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে বর দেন এবং সেই বরের ফলে জয়দ্রথ যুদ্ধে অজেয়তা লাভ করেন।

মল্লেশ্বর শিব মন্দিরের প্রধান উৎসব গাজন ও শিবরাত্রি। উভয় উৎসবেই এখানে মেলা বসে। পঁচিশে চৈত্র থেকে চৈত্র সংক্রান্তির দিন পর্যন্ত মল্লেশ্বর শিবের গাজন উৎসব হয়ে থাকে। এই উৎসব উপলক্ষ্যে বহু ভক্তের আগমন ঘটে এবং তারা মল্লেশ্বর শিবের কাছে মানত করে।

গণপুর

সিউড়ি মল্লারপুর ‘সুপার এক্সপ্রেস হাইওয়ের’ ধারেই গণপুর একটি প্রাচীন সম্ভ্রান্ত গ্রাম। লাল কাঁকুরে মাটি দিয়ে মোড়া এ গ্রাম যেন শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি। এই গ্রামের ঐশ্বর্য হল পঁয়তাল্লিশটি শিব মন্দিরের অবস্থান। এত অলংকৃত ও কারুকার্যমণ্ডিত শিব মন্দির বীরভূম জেলার আর কোনও গ্রামে দেখা যায় না। খিলানের ওপর দাঁড়ানো ফুল-পাথরের অপরূপ অলংকারে সাজানো মন্দিরগুলি শুধু বীরভূমেরই গর্ব নয়, দেশেরও গৌরব। গ্রামের মাঝখানে কালীতলায় রয়েছে ১৪টি চারচালা টিনের নাটশালা, তার পূর্ব দিকে ৭টি, পশ্চিম দিকে ৪টি, উত্তরে ৩টি এবং একটি সুউচ্চ দোলমঞ্চ, দক্ষিণে একটি অর্ধবৃত্তাকার মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি মন্দিরে প্রতিষ্ঠার সন উৎকীর্ণ আছে। মন্দিরগুলির সম্প্রতি সংস্কার হয়েছে। কালীতলার দক্ষিণে আরও ৫টি টেরাকোটা শোভিত মন্দির রয়েছে। এই ১৪টি চারচালা শিব মন্দিরের সামনের দিকে রাম-রাবণের যুদ্ধ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, যুধিষ্ঠির-শকুনির পাশা খেলা, কাঠচেরাই, মহিষমর্দিনী দুর্গা ইত্যাদি বিভিন্ন মূর্তি উৎকীর্ণ আছে।

মন্দিরগুলির মধ্যে বেশ কিছু মন্দির দুশো-আড়াইশো বছরের প্রাচীন। এছাড়া, এখানে রয়েছে একটি আটচালা বিশিষ্ট বৃহৎনারায়ণ মন্দির। এই মন্দিরটিও কারুকার্যমণ্ডিত। এই মন্দিরের দেওয়ালে ফুল-পাথরের খোদিত দুর্গামূর্তি রয়েছে। এই গ্রামের রথযাত্রা উৎসব প্রসিদ্ধ। রথতলাটি গ্রামের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে এখানে এক দিনের জন্য মেলা বসে। মেলাটি একশো বছরের পুরনো।

মল্লারপুর থেকে সিউড়িগামী যে কোনও বাসে গণপুরে আসা যায়। বাস স্ট্যান্ড পেরিয়ে এই গ্রামে ঢুকতে হয়। গ্রামের ইতিহাস বেশ শ্রবণযোগ্য। দুর্গাপুরে লৌহ নিষ্কাশনের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে বীরভূম জেলার নারায়ণপুর-মহম্মদবাজার-গণপুর চৌধুরি বংশ এই লৌহ নিষ্কাশনের ব্যবসায়ে যথেষ্ট প্রসিদ্ধি লাভের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে উঠেছিল। চৌধুরিরা ছিলেন শৈব। কথিত আছে, এখানে এক সময় দারুণ দুর্ভিক্ষে এলাকার জনসাধারণকে অনাহারে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চৌধুরি পরিবার মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। মন্দিরগুলি তৈরি হতে সময় লেগেছিল প্রায় ১২ বছর। (১৭৬৭-১৭৭৯)। বীরভূমকে বলা হয় শৈব-শাক্ত-বৈষ্ণবের মেলবন্ধনের জায়গা, তার একটি ছোট্ট রেপ্লিকা হল গণপুর।

পর্যটন মানচিত্রে গণপুরের স্থান হওয়া উচিত ছিল প্রথম সারিতে কারণ কালাপাহাড় খ্যাত শিব পাহাড়ি। জেলার অন্যতম কৃষক আন্দোলনের ডামরা, ব্রজদুর্গার বাঁধ, সুলঙ্গার সাঁওতালি দুর্গোৎসব এমনকী মল্লেশ্বর শিব মন্দিরও গণপুরেই সংলগ্ন। এছাড়াও গণপুরের মূল আকর্ষণ হল গণপুরের জঙ্গল। সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত গণপুরের জঙ্গলে সবুজ বনানীর মাঝে হারিয়ে যেতে মন্দ লাগার কথা নয়। নির্জন অরণ্যে থাকার জায়গা বলতে বনবিভাগের বাংলো। সিউড়িস্থিত বিভাগীয় বনাধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

শিবপাহাড়ি : গণপুর থেকে বাঁধের রাস্তা হয়ে জঙ্গলের সুন্দর দৃশ্যপটের মধ্য দিয়ে শিবপাহাড়ি যাওয়া যায়। এখানেই কালাপাহাড়ের স্মৃতিবাহী শিব রয়েছে। নাম শ্রীশ্রী বাবা সিদ্ধিনাথ। প্রবাদ আছে, জয়দ্রথ এখানে তপস্যা করে সিদ্ধিলাভ করেছিল বলেই শিবের নাম সিদ্ধিনাথ হয়েছে। এখানে গুরুদেব শ্রীমৎ শম্ভুগিরি মহারাজ বিশুদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছেন। জগদ্ধাত্রী মন্দির, শিব মন্দির, যজ্ঞকুণ্ড, সমাধিস্থল প্রভৃতি নিয়ে নির্জন আশ্রমটি যেন মহাভারতের তপোবন হয়েই আছে।

গণপুরে থাকার জায়গা নেই। তবে রামপুরহাট রেঞ্জের মল্লারপুর বিটের গণপুর বনবাংলোয় থাকার ইচ্ছা থাকলে যোগাযোগ করতে হবে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের (সিউড়ি, বীরভূম) সঙ্গে। চলভাষ : ০৩৪৬২-২৫৫২৬২। রামপুরহাট অথবা সিউড়িতে রাত্রিবাস করেও জায়গাগুলি দেখে নেওয়া যায়।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More