পায়ে পায়ে বহরমপুর

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ও সতর্কতাব্যবস্থা ছাড়া এখনও বাড়ির বাইরে বেরতে মানা। করোনাভাইরাস জনিত লকডাউন পরবর্তী আনলক-৫ পর্ব চলছে। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

বহরমপুরের অনেক আগেই সৈদাবাদ ও কাশিমবাজার অভিজাত্যপূর্ণ এলাকা ছিল। ১৭৬৭ সালে নবাব মির জাফর ব্রহ্মপুর মৌজার চারশো বিঘে জমি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দান করেন। পলাশির যুদ্ধের পরে মুর্শিদাবাদের কাছে সেনা রাখার প্রয়োজনে তারা এখানে সেনানিবাস তৈরি করে। শাসনকাজ ও নীলচাষ পরিচালনার জন্য তৈরি করে কালেক্টরেট বিল্ডিং, ক্যান্টনমেন্ট প্রভৃতি। প্রাচীন জনপদ ব্রহ্মপুরই ব্রিটিশদের বিকৃত উচ্চারণে ‘ব্রাহমাপোর’ থেকে রূপান্তরিত হয়ে আজকের বহরমপুর।
সেই থেকে বহরমপুরের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। তারপর শহরে বিভিন্ন সময়ে প্রাসাদ, বড় বড় ইমারত, স্কুল, কলেজ, সমাধিক্ষেত্র, গির্জা, মসজিদ, মন্দির, ঠাকুরবাড়ি প্রভৃতি তৈরি হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর হওয়ার সুবাদে এবং পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থানের সঙ্গে যাতায়াতের সুবিধার কারণে বহরমপুর এখন একটি জমজমাট ব্যস্ত শহর। এখানে ঘুরে দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলি দেখে ও তার ইতিহাস জেনে ভ্রমণার্থীরা আনন্দ পাবেন।

ব্যারাক স্কোয়ার : এটি বহরমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত। নবাব মির জাফরের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে জমি দান হিসাবে পেয়েছিল সেই প্রশস্ত জমিতে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মাঠে কোম্পানি ব্যারাক স্কোয়ার তৈরি করে। এর চারপাশ দিয়ে চওড়া রাজপথ নির্মিত হয়। ব্যারাক স্কোয়ারের পূর্ব দিকে তিনটি বড় বড় বাড়ি তৈরি হয়েছিল গোরা সেনাদের থাকার জন্য যা এখন টেক্সটাইল কলেজ, ফৌজদারি কোর্ট ও কালেক্টর অফিস হয়েছে। এক একটি বাড়ির আয়তন ছিল প্রায় ২৮ হাজার বর্গফুট। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সেনা অফিসারদের বাড়ি ছিল। পশ্চিম দিকে ছিল সেনানায়কদের বাড়ি ও অতিথিনিবাস। এই অতিথিনিবাসে লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংস কিছুদিন ছিলেন। বর্তমানে এখানে সার্কিট হাউস ও বিভিন্ন সরকারি ভবন হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব কোণে ইউরোপীয়ান ক্লাব ও উপাসনাগৃহ, উত্তর-পশ্চিম কোণে অস্ত্রাগার, রেলস্টেশনের কাছে দেশীয় সৈন্যদের আবাসন ও বাবুলবোনায় অশ্বারোহী বাহিনীর আস্তাবল ও সমাধিক্ষেত্র ছিল। এই সেনানিবাসের মূল বাস্তুকার ছিলেন কর্নেল এ ক্যাম্পবেল। এখনও এর চারপাশ ঘুরে পুরনো ইতিহাস জানতে ও মাঠে প্রোথিত কামান ও অন্যান্য জিনিস দেখতে ভাল লাগবে।

স্মরণ স্তম্ভ : ব্যারাক স্কোয়ারের উত্তর-পশ্চিম কোণে সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিতে একটি স্মরণ স্তম্ভ আছে। ১৮৫৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯নং ব্যাটেলিয়নের সিপাহিরা প্যারেড করতে অস্বীকার করেন। এই ঘটনাটি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম বিদ্রোহের সূচনা তথা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সিপাহি বিদ্রোহের শতবর্ষে ১৯৫৭ সালের ১৫ আগস্ট এই স্মরণ স্তম্ভটি তৈরি হয়। এর পাশেই রয়েছে খাদি অ্যান্ড ভিলেজ ইন্ডাস্ট্রি বোর্ডের কার্যালয় মসলিন তীর্থ।
জেলখানা : বহরমপুরের এই জেলটি প্রথমে সেনানিবাসের হাসপাতাল ছিল। ব্যারাক স্কোয়ারের দক্ষিণে এটিই বর্তমানে বহরমপুর জেল।
লালদিঘি : অতীতের লালদিঘি বর্তমানে সুভাষ সরোবর, শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ব্যারাক স্কোয়ারের বিশাল পরিমাণ পোড়া ইটের প্রয়োজনে মাটি খনন করার কারণে এই দিঘির সৃষ্টি হয়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে তৈরি শেষ হয়েছিল সেনানিবাস। সেখানকার ব্যবহৃত জল ও বৃষ্টির জল গিয়ে পড়ত ভূগর্ভস্থ নালায়, সেখান থেকে লালদিঘিতে। লালদিঘির উদ্বৃত্ত জল ধোপঘাটি হয়ে চলে যেত চালতিয়ার বিলে। এখনও লালদিঘির চার কোণে চারটি ভূগর্ভস্থ নালার মুখ রয়েছে। বর্তমানে এই দিঘির সৌন্দর্যায়ন ঘটিয়ে সবুজ ঘাস আর নানা গাছ ও ফুলে সজ্জিত করা হয়েছে, দিঘির মাঝে রঙিন ফোয়ারা হয়েছে। এখানে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও আছে।
এই দিঘির কাছ থেকে স্টেশন অবধি আগে ঘোড়দৌড়ের মাঠ ছিল। এখন তার কোনও অস্তিত্ব নেই। লালদিঘি থেকে দক্ষিণে কাছের রবীন্দ্রভবনটি শহরের গর্ব। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে ১৯৭৭ সালে এই ভবনটির উদ্বোধন হয়।
ক্যাথলিক চার্চ : সেনানিবাসের প্রধান বাজার ছিল গোরাবাজার। এখনও ওই নামেই পরিচিত আছে। গোরাবাজারেই রয়েছে একটি সুদৃশ্য বৃহৎ গির্জা। কয়েক বছর আগে এই প্রাচীন ক্যাথলিক চার্চটির সংস্কার করা হয়েছে। শিল্পী কাঞ্চন কর্মকারের নির্দেশনায় নতুন রূপ পেয়েছে গির্জাটি। এর উপাসনাগৃহটি অতি সুন্দর।

কৃষ্ণনাথ কলেজ : বহরমপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৫৩ সালে। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন কাশিমবাজার বড় রাজবাড়ির রাজা কৃষ্ণনাথ নন্দীর স্ত্রী রানি স্বর্ণময়ীদেবী, কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি, মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবার, কান্দির রাজপরিবার, নসীপুরের রাজা, বহরমপুরের জমিদার, লালগোলার রাজা, বনওয়ারিবাদের রাজা, পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার ও অন্যান্য শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। কলেজের সমস্ত জমি দান করেছিলেন রানি স্বর্ণময়ীদেবী। ১৮৮৭ সালে সরকার ব্যয় বহনে অসমর্থ হলে রানি স্বর্ণময়ীদেবী দায়িত্ব নিয়ে কলেজটিকে রক্ষা করেন। মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর চেষ্টায় কলেজের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল। এই কলেজ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন কাশিমবাজারের রাজা কৃষ্ণনাথ নন্দী। মাত্র উনিশ বছর বয়সে জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে ১৮৪১ সালে উইলে তিনি লিখেছিলেন তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে কলেজ হবে। এর বাস্তব রূপ পেয়েছিল তাঁর মৃত্যুর আট বছর বাদে। রাজা কৃষ্ণনাথের স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন বহরমপুর কলেজ, তাই মহারাজা মণীন্দ্র চন্দ্রের উদ্যোগে ১৯০২ সালে কলেজের নাম হয় কৃষ্ণনাথ কলেজ।
ভাগীরথীর তীরে সুন্দর পরিবেশে এত বড় ও সুন্দর কলেজ এই বঙ্গে অল্পই আছে। মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকলে বাঁদিকে শতবার্ষিকী ভবন। মূল ভবনের ছাদ গথিক স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী সুচালো ধাঁচের ও সুউচ্চ ঢালু ছাদযুক্ত। ভেতর ও বাইরের দিকে সুদীর্ঘ পাঁচটি বারান্দা, পাঁচ নম্বর কক্ষের সংলগ্ন সুউচ্চ ঘড়িঘরের দীর্ঘ চূড়াটি এই ভবনের বিশিষ্ট সম্পদ। মোট আঠাশটি ছোট-বড় স্তম্ভ ছাদের ওপর রয়েছে যা ভবনটির শোভা বাড়িয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে এই কলেজ ভবনটি তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এই কলেজে বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি শিক্ষকতা করেছেন ও বহু কৃতি ছাত্র এখানে পড়াশোনা করেছেন।
কৃষ্ণনাথ কলেজের পাশে ভাগীরথীর দৃশ্য বেশ মনোরম। কলেজ থেকে একটু দূরে বাগচীবাড়ির ইমারতটি দেখার মতো। এই বংশের সুধাংশুশেখর বাগচী জমিদারির সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। খ্যাতনামা কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী এই পরিবারেরই। ভাগীরথীর দু’ধারে শ্মশানের কাছে রয়েছে সিদ্ধেশ্বরী কালী ও শ্মশানকালীর মন্দির। এখান থেকে সোজা গির্জা মোড়ে এসে ভাগীরথীর দিকে গেলে কতকগুলি দ্রষ্টব্য পড়ে।
সেন্ট জনস চার্চ : বহরমপুর শহরের মধ্যে এটি প্রটেস্ট্যান্ট চার্চ। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন মিশনারি সোসাইটি এই চার্চ তৈরি করে। বর্তমান সুন্দর উপাসনাগৃহটি নতুন করে তৈরি হয়েছে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে। প্রতি রবিবার প্রার্থনা হয় এবং বড়দিনের সময় প্রচুর জনসমাগম হয়। এই কৃষ্ণনাথ রোডের ওপর বেশ কিছু রাজকীয় ইমারত আছে দেখার মতো। সেসবের মধ্যে অন্যতম হল ভূমি রাজস্ব দফতরের অফিস, কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল, গ্রান্ট হল, মানসিক হাসপাতাল প্রভৃতি।

গ্রান্ট হল : বর্তমানে এটি যোগেন্দ্রনারায়ণ মিশনী নামে পরিচিত। এখানে একটি প্রাচীন গ্রন্থাগার আছে। সারা বছর শহরের বহু অনুষ্ঠান হয় এখানে। প্রথমে এটি জ্যারিয়ন সাহেবের কুঠিবাড়ি ছিল। ইউরোপীয়ানরা এখানে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে একটি ক্লাব চালু করেন, স্যার পিটার গ্রান্টের নামে বাড়িটির নাম হয় গ্রান্ট হল। বাড়িটির ভগ্নদশা হলে লালগোলার রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়ের অর্থসাহায্যে ১৯০৩ সালে বাড়িটি নতুনভাবে সেজে ওঠে। যাঁরা বইপত্র ভালবাসেন তাঁদের অবশ্যই গ্রান্ট হলের গ্রন্থাগারে যাওয়া উচিত।

কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল : বহরমপুর শহর তথা মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম ঐতিহ্যপূর্ণ বিদ্যালয় হল কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল। কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর দানে ও মণীশকুমার ঘটকের পরিচালনায় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ের সূচনা হয়েছিল। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন ছোট লাট লর্ড ফ্লেয়ার উইলিয়াম ডিউক। ছয়টি বিশাল আকৃতির স্তম্ভযুক্ত তিন দিক ঘেরা দ্বিতল ভবনটি এতটাই অভিজাত যে রাজবাড়ি বলে ভুল হয়ে যায়। একটি বিরাট হলঘর সমেত ওপরে ও নীচে বহু ঘর আছে। মূল প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করেই সামনে স্বাধীনতার সেনানীদের উদ্দেশে একটি ছোট শহিদ মিনার আছে।
বহরমপুরে রাত্রিবাসের ঠিকানা-– চৌধুরী প্যালেস, বাস স্ট্যান্ডের কাছে, চলভাষ : ৯৪৩৪০০৮২৪৬, ৯৭৩৩১০০৩৯৫।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More