পাঁচথুপির অন্দরে

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

কান্দি মহকুমার বড়ঞা থানার পাঁচথুপি গ্রাম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম। শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণে যখন স্বর্ণযুগ সেই সময়ে পাঁচথুপি গ্রামে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। এই গ্রামের এক কিলোমিটারের মধ্যে বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়। স্থানটিকে বারকোন বলে। নগেন্দ্রনাথ বসু সিদ্ধান্ত পরিধি প্রণীত বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস উত্তর রাষ্ট্রীয় কায়স্থ কাণ্ড থেকে জানা যায়, সৌকালীন ঘোষ বংশের ১৪তম পুরুষ সামন্ত রাজা নরপতি পাঁচথুপি গ্রামে রাজধানী স্থাপন করে বসতি স্থাপন করেন। মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আমলে তাঁর গৃহশিক্ষক মৌলনা হজরত এই গ্রামে বাস করতেন। গৃহশিক্ষকের সম্মানে সম্রাট অনেক ভূসম্পত্তি দান করেন ও একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন। পাঁচথুপি গ্রাম জমিদারপ্রধান গ্রাম, এখানে ঘোষ মৌলিক বংশ, ঘোষ বংশ, বন্দ্যোপাধ্যায় বংশ প্রমুখ জমিদাররা বাস করতেন। ঘোষহাজরা পরিবার, সিংহ পরিবার, অধিকারী পরিবার প্রমুখ এই গ্রামের সমৃদ্ধ পরিবার। লোকশ্রুতি থেকে জানা যায়, একসময় এখানে পাঁচটি বৌদ্ধ স্তূপ থাকার জন্য পঞ্চস্তূপ বা পাঁচস্তূপ নাম থেকে পাঁচথুপি নাম হয়েছে।
বহরমপুর থেকে পাঁচথুপির দূরত্ব ৪৪ কিলোমিটার ও কান্দি থেকে ১৫ কিলোমিটার। বহরমপুর, কান্দি, সালার, সাঁইথিয়া, কাটোয়া এবং কলকাতার সঙ্গে সরাসরি বাস যোগাযোগ আছে। কান্দি অথবা বহরমপুর থেকে পাঁচথুপি দেখে নেওয়া যায়। এই গ্রামের উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্যগুলি হল–-

পঞ্চায়তন মন্দির : এলাকার মন্দিরটি নবরত্ন শিবমন্দির নামে পরিচিত। কিন্তু বাংলায় নবরত্ন বলতে নয়টি চূড়াবিশিষ্ট মন্দিরকে বোঝায়। আদতে এই মন্দিরটি তেমন নয়। এই মন্দিরে নয়টি শিব প্রতিষ্ঠিত আছে বলে লোকমুখে এটি নবরত্ন শিবমন্দির নামে পরিচিত হয়েছে। আসলে এই মন্দিরটি একটি দুর্লভ পঞ্চায়তন রীতির মন্দির। পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দুইটি এই রীতির মন্দির আছে, একটি পাঁচথুপিতে আর একটি বর্ধমান জেলার বৈকুণ্ঠপুরে। কর্ণসুবর্ণে খননকার্যের সময় একটি বৃহৎ পঞ্চায়তন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে যেটির স্থাপনকাল আনুমানিক ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দী হবে।

প্রায় তিনশো বছর আগে পাঁচথুপির জমিদার জগন্নাথ ঘোষহাজরা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি উঁচু বর্গাকার ভিত্তিবেদির উপর মাঝের মন্দিরটি একটি রেখদেউল, এর উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট ও দৈর্ঘ্যে ২ ফুট ও প্রস্থে প্রায় ১৬ ফুট। মূল মন্দিরের চারকোণে একই রকমের দেউল আকৃতির ছোট চারটি মন্দির আছে। মূল মন্দিরে পাঁচটি ও চারকোণের মন্দিরে একটি করে পাঁচটি মোট নয়টি শিবলিঙ্গ আছে। প্রধান দেউলের প্রবেশদ্বারে বিভিন্ন দেবদেবী, দশাবতারের মূর্তি ও লঙ্কাযুদ্ধের টেরাকোটা ভাস্কর্য আছে। ছোট মন্দিরগুলিতে শুধু ফুলবাড়ি নকশা আছে। রাজ্য পুরাতত্ত্ব দপ্তর সংস্কার কাজটি তেমন গুরুত্ব দিয়ে না করার ফলে অনেক কাজ নষ্ট হয়েছে ও আবার আগাছা জন্মাতে শুরু করেছে। মন্দিরে নিত্যপূজা হয়। প্রতিবছর শিবরাত্রি উৎসব ও শ্রাবণ মাসে বহরমপুর থেকে ভক্তরা পদব্রজে গঙ্গাজল এনে গ্রাম প্রদর্শন করে দুধ ও গঙ্গাজল বাবার মাথায় ঢালেন। পৌষ মাসের উৎসবে বিরাট নরনারায়ণ সেবা হয়।

সিংহবাহিনী মন্দির : প্রায় ৬০ ফুট উঁচু সুদৃশ্য মন্দিরটি ১৩৫০ বঙ্গাব্দে নির্মাণ করেন ঘোষহাজরা পরিবারের হরিপদ ঘোষহাজরা। জমিদার পরিবারের ষষ্ঠপুরুষ দেবীদাস ঘোষহাজরা আনুমানিক সতেরো শতকে হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া থেকে এনে দেবী সিংহবাহিনীকে প্রতিষ্ঠা করেন। অষ্টধাতু নির্মিত দেবীই এই পরিবারের গৃহদেবতা। অভিনব দর্শনের এই মন্দিরটি ত্রিতলবিশিষ্ট। প্রথম দুটি তল অষ্টকোণ বিশিষ্ট, দোতলায় মূল মন্দির। তৃতীয় স্তরে চূড়াটি অষ্টকোণ বিশিষ্ট সরু হয়ে উপরে উঠে চূড়ার সৃষ্টি করেছে, তার উপরে আমলক ও পতাকাদণ্ড। গর্ভগৃহের সামনে দশমহাবিদ্যার মূর্তি, বিভিন্ন গ্রন্থের উল্লেখ, তৃতীয় স্তরে দশবতার মূর্তি ও দশবতার স্তোত্র খোদিত আছে। ছাদের উপরে পূর্বদিকে সিংহ, প্রবেশদ্বারের দু’পাশে টেরাকোটার কাজ ও দরজায় কারুকার্য রয়েছে। বহুদূর থেকে এই মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। পাশেই দালানমন্দিরে শ্রীশ্রীসিংহবাহিনীর চণ্ডীমণ্ডপ রয়েছে।

সিংহবাহিনী মন্দির থেকে কাছেই সতেরো শতকে সন্তোষকুমার ঘোষহাজরা লক্ষীজনার্দন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরটি জোড়বাংলা মন্দির ছিল, মন্দিরের অবস্থা খারাপ হয়ে যেতে উপরের অংশ ভেঙে ফেলে পুরাতন ভিতের উপরেই মন্দির হয়েছে। দেবতা এখানে নিত্যপূজিত হন। এই দেবালয় থেকে কাছে চট্টোপাধ্যায়দের প্রতিষ্ঠিত একটি জোড়বাংলা শিবমন্দির আছে।
দক্ষিণপাড়ায় অধিকারী পরিবারের গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের জোড়বাংলা মন্দিরটি প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার। পুরনো দেবালয় নষ্ট হয়ে গেলে আঠারো শতকে নতুন এই মন্দির তৈরি হয়েছে। গ্রামের পূর্ব প্রান্তে তিনগম্বুজ মসজিদটি শাহজাহানের সময়ে তৈরি হয়েছিল। পাঁচথুপিতে ঝুলন, দুর্গাপূজা, ধর্মরাজপূজা বেশ জাঁকের সঙ্গে হয়।

গ্রামের জমিদার বাড়িগুলিও দেখার মতো। পাঁচথুপির জমিদার কালিদাস ঘোষের বিশাল বাসভবন, হাতিশালা, অশ্বশালা প্রভৃতি লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। ঘোষমৌলিক বংশের বাড়িটি সিনেট হাউসের অনুকরণে তৈরি। এই বাড়িতে বিদ্যাসাগর মহাশয় কিছুদিন ছিলেন ও বালিকা বিদ্যালয়ের পরামর্শ দেন। এই গ্রামের দুর্গাপূজায় কন্যার পিতৃগৃহে আসার কাহিনি নিয়ে এই জমিদার বাড়িতে থেকে হরিসাধন দাশগুপ্ত ও অজয় কর একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে পাঁচথুপি গ্রাম ভ্রমণে বেশ মজা লাগবে।

মুনিয়াডিহি : পাঁচথুপি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রয়েছে মুনিয়াডিহি নামে প্রাচীন গ্রাম। এখানে বারাকোনার দেউল একটি বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ। পুরাতত্ত্ব বিধান একটি বোর্ড লাগিয়ে সে কথাই ঘোষণা করেছে। বহু বৌদ্ধ শ্রমণ এখানে বাস করতেন। হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে গ্রামের নির্জন প্রান্তে একটি ঢিপি ও কতকগুলি ভাঙা ইঁটের টুকরো দেখা যায়। গ্রামের আশপাশে প্রাচীনত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়। খুব উৎসাহ থাকলে একবার ছুঁয়ে আসতে পারেন স্থানটিকে। ঢিবির পাশেই কয়েক বিঘে জায়গা নিয়ে নতুন জটাধারী মন্দির প্রাঙ্গণ তৈরি হয়েছে। জটাধারী এখানে শিব, অন্যান্য দেবদেবীর পূজাও হচ্ছে। মন্দিরের পরিবেশটি সুন্দর।

যুগশ্বরা

বড়ঞা থানার সামনে থেকে গ্রামের ভিতরে আরো প্রায় চার কিলোমিটার পথ গেলে প্রাচীন গ্রাম যুগশ্বরা। যোগেশ্বর শিবের নাম অনুসারে গ্রামের নাম যুগশ্বরা হয়েছে। গ্রামের শেষে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মেঠো রাস্তা,মাঠের ধারে, গ্রামীণ পরিবেশে প্রাচীর ঘেরা প্রশস্ত অঙ্গনের মধ্যে যোগেশ্বর শিবালয় প্রাঙ্গণ। সব মিলিয়ে মন্দির এলাকার পরিবেশটি সুন্দর। পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ দ্বারা অধিগৃহিত এই মন্দির এলাকা গাম্ভীর্যপূর্ণ তোরণদ্বার দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশস্ত অঙ্গনের তিনদিকে মন্দির। প্রায় সাড়ে তিনফুট ভিত্তিবেদির যোগেশ্বর ও আর একটি শিবমন্দির। যোগেশ্বর মন্দিরে বেশ খানিকটা নীচে ‘জাগ্রত’ দেবতা অনাদিলিঙ্গ যোগেশ্বর। প্রায় ৩০০ বছর আগে বীরভূমের রাজা রামজীবন রায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাশের মন্দিরটি সতেরো শতকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামের সমৃদ্ধশালী পাঠক পরিবার। দুটি মন্দিরই চারচালা রীতির ও প্রায় সমান মাপের, উচ্চতা প্রায় ৩৫ ফুট ও দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় ১৫ ফুট। যোগেশ্বরের পাশের মন্দিরটিতে দেবদেবীর মূর্তি, পৌরাণিক ঘটনা ও ফুলবাড়ি নকশার টেরাকোটা রয়েছে। এই দুটি মন্দিরের পাশে উত্তরদিক বরাবর প্রায় ২৪ ফুট উঁচু চারটি চারচালা শিবমন্দির রয়েছে, এগুলি উনিশ শতকে স্থানীয় জমিদার নায়কদের দ্বারা নির্মিত। তোরণদ্বারের পাশে পূর্বদিক বরাবর প্রায় একই উচ্চতার তিনটি চারচালা মন্দির রয়েছে যেগুলি দোরে পরিবারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই সাতটি মন্দিরের মধ্যে দু-একটিতে এখনও অল্প টেরাকোটা দেখা যায়। পশ্চিমদিকে তিনটি ভগ্ন মন্দির আছে। মন্দিরটি প্রায় ২৪ ফুট উচ্চতার পঞ্চরত্ন বিশিষ্ট মুর্শিদাবাদ রীতির। এই মন্দিরের দু’পাশে দুটি চারচালা মন্দির আছে। শিবালয় প্রাঙ্গণের এই ১২টি মন্দিরের মধ্যে ৯টিতে নিত্যপূজা হয়, প্রধান দেবতা যোগেশ্বর। এই মন্দির এলাকার দক্ষিণে গাছপালায় ছাওয়া মাকালীর থান আছে, সেখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন আছে।

প্রতিবছর চৈত্র মাসের ২৩ তারিখ থেকে পাঁচ দিনের বিরাট মহামিলন উৎসব হয়। ২৩ তারিখে গ্রামের ও অন্যান্য স্থানের শতশত ভক্ত ভাগীরথী নদী থেকে পদব্রজে গঙ্গাজল নিয়ে এসে দুপুর বারোটায় হরিনাম সংকীর্তন ও বাদ্য সহকারে বাবা যোগেশ্বরের মাথায় জল ঢালেন। এটিই বাবার স্নানযাত্রা উৎসব। এরপর নানান অনুষ্ঠান ও নামসংকীর্তন হয় পাঁচদিন ধরে, এই উপলক্ষে মেলা বসে। এই গ্রামে নায়ক পদবিধারী জমিদাররা উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছিলেন। জমিদার বাড়ির মধ্যে ঠাকুরবাড়িটি খুব সুন্দর, এটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত। এখানে জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের দালান মন্দির, লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, নহবতখানা রয়েছে। এটিই জমিদারদের গৃহদেবতার মন্দির। এই মন্দিরের কাছে দুটি শিবমন্দির আছে। গ্রামে প্রবেশের মুখে শ্মশানভূমিতে থাকা স্মৃতিমন্দিরগুলিও আকর্ষণীয়।

কান্দিতে রাত্রিবাসের ঠিকানা-– হিমালয় লজ, বাসস্ট্যান্ডের কাছে, চলভাষ : ৯৪৩৪৬১০২৪৭, ৯৭৩২৬১৩৯২০।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More