পঞ্চকোট রাজাদের রাজধানী

রাজা নীলমণি সিংদেও ছিলেন এই রাজবংশের খুব জনপ্রিয় ও স্বাধীনচেতা এক রাজা। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ইনি বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং তাঁর উদ্যোগেই তৎকালীন ইংরেজ সরকারের ট্রেজারি লুঠ হয়েছিল।

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

ব্যস্ততম রেল জংশন আদ্রা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কাশীপুর এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এই গ্রাম পঞ্চকোট রাজপরিবারের অধিষ্ঠানক্ষেত্র ছিল। বর্গি অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পঞ্চকোট রাজারা পাঞ্চেত পাহাড়ের কোল থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করে কাশীপুরে নিয়ে আসেন। কাশীপুর গ্রামটি ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দ থেকে পঞ্চকোট রাজাদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। পাঞ্চেত পাহাড়ের সানুদেশের রাজধানী, গড়, মন্দিরের অংশ কালের গর্ভে প্রায় অবলুপ্তির পথে হলেও কাশীপুরে বিশাল রাজপ্রাসাদ আজও দ্রষ্টব্য বস্তু।

রাজা জ্যোতিপ্রসাদ সিংদেও এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। শোনা যায়, কোনও এক আমেরিকান শিল্পীর পরিকল্পনায় ও চিনা মিস্ত্রিদের দ্বারা নির্মিত রাজপ্রাসাদ তৈরি হতে তৎকালীন মুদ্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ অলংকরণ ও স্থাপত্য বিস্ময় উদ্রেককারী। রাজপ্রাসাদের ভেতরে রয়েছেন গড়ের দেবী। রাজবাড়ির পাশে বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি লেখা রয়েছে রাজকুমারী মাহেশ্বরী দেবীর আদেশানুসারে প্রবেশ নিষেধ বিনা অনুমতিতে। জনসাধারণের জন্য রাজবাড়ি খোলা থাকে কেবলমাত্র দুর্গাপূজার সময় এবং এখানে দুর্গাপূজা বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। রাজবাড়ি সংলগ্ন কয়েকটি ঘর নিয়ে একটি স্কুল চলছে বর্তমানে। পঞ্চকোট রাজভগিনী নিবেদিতা বিদ্যাপীঠ। কাশীপুর রাজবাড়ির কথা বলতে গেলে রাজা নীলমণি সিংদেওয়ের কথা উল্লেখ করতেই হয়। ইনি ছিলেন এই রাজবংশের খুব জনপ্রিয় ও স্বাধীনচেতা এক রাজা। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ইনি বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং তাঁর উদ্যোগেই তৎকালীন ইংরেজ সরকারের ট্রেজারি লুঠ হয়েছিল। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর আমলেই এই রাজবাড়িতে ম্যানেজার পদে কিছুকাল কর্মরত ছিলেন।

কাশীপুর রাজবাড়ি ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পড়বে কাশীপুর বনবাংলো (এক কিলোমিটার দূরে)। বনবাংলোটি ছোটর ওপর ছিমছাম সুন্দর। এখানে থাকতে গেলে কংসাবতী ভূমি সংরক্ষণ বিভাগ, কে-১, নর্থ ডিভিশন এক্সটেনশন ফরেস্ট্রি, পুরুলিয়া-– এই ঠিকানায় বুক করে আসতে হবে।

কাশীপুর মোড় থেকে পায়ে পায়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলেই অনেকটা জায়গা জুড়ে রাজরাজেশ্বরী দেবীর মন্দির ও ঠাকুরবাড়ি। এগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নীলমণি সিংদেও। ঠাকুরবাড়ির দেবতা ছিলেন রঘুবীর, শ্যামচাঁদ, বঙ্কবিহারী ও মদনমোহন। ঠাকুরগুলি চুরি হয়ে যাওয়াতে বর্তমানে শালগ্রাম শিলায় পূজা হয়। মন্দিরটি দালান শ্রেণির। রঘুবীরের পালকি রয়ে গেছে।

রাজরাজেশ্বরী দেবীর মন্দিরের বড় কাঠের দরজা পেরিয়ে বিস্তৃত ফাঁকা প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের মাঝে হাড়িকাঠ পোঁতা। তার বিপরীতে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গিয়ে দালান পেরিয়ে মূল মন্দির। বড় পাথরের সিংহাসনের ওপর দেবীর মাঝারি মূর্তি। লাল টকটকে বেনারসি পরিহিতা। অলংকারে ভূষিতা দেবীর মূর্তিটি ভারি সুন্দর। মন্দিরটি ১৩৩১ বঙ্গাব্দে বৈশাখী পূর্ণিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়। মন্দিরের ভেতরের অলংকরণ অতি সুন্দর। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ জ্যোতিপ্রসাদ সিংদেও মন্দিরটি সংস্কার করান। এই মন্দিরের মূল উৎসব দুর্গাপূজা। দেবীকে প্রতিদিন ভোগ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

এই গ্রামেরই ন’পাড়ায় রয়েছে কালভৈরবনাথ মন্দির। গ্রামের উঁচু-নীচু লাল ধুলোয় ভর্তি মেঠোপথ ধরে বেশ খানিকটা গেলে তবে মন্দিরে পৌঁছনো যায়। মন্দিরটির অবস্থান ফাঁকা আদিগন্ত বিস্তৃত চাষের জমির একপ্রান্তে পদ্মফুলে ভরা এক ছোট পুকুরের পাশে। প্রতিষ্ঠালিপিতে লেখা রয়েছে কার্তিক পূর্ণিমা, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ। গ্রামবাসীরা পুজো হিসাবে চাল, দুধ নিবেদন করেন ভৈরবকে। যেদিন যেমন চাল, দুধ পড়ে সেদিন সে রকম পরিমাণ পায়েস ভৈরবের বরাদ্দ।

রঘুনাথপুর ঘুরতে গেলে কাশীপুরকে পর্যটকদের আলাদা করে ঘুরে দেখতে হবে। কারণ, কাশীপুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পঞ্চকোট রাজাদের এক দীর্ঘ ইতিহাস। রাজারাজড়া দেশ থেকে উধাও হয়ে গেলেও অতীতের রাজবাড়ি, মন্দির, অচিনদেশের এক রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যায়। নিজস্ব বাহন থাকলে ভাল, না হলে অটো ভাড়া পাওয়া যায়। হাঁটুর জোর থাকলে অবশ্যই প্রকৃতি গ্রামবাংলার ঘ্রাণ নিতে নিতে পায়ে পায়ে হোক চলা শুরু।

ক্রোশজুড়ি

কাশীপুর থানার অন্তর্গত ছবির মতো সুন্দর ছোট একটি গ্রাম হল ক্রোশজুড়ি। পথে যেতে যেতে মাটির বাড়িগুলির দেওয়ালে যেন এক একটি পেন্টিং বোর্ড। মাটি দিয়ে মাটির দেওয়ালে কেবল আঙুলের কারিকুরি। মুগ্ধ হবার পক্ষে যথেষ্ট। গ্রামের এবড়োখেবড়ো রাস্তার কথা মনেই থাকবে না যখন ক্রোশজুড়িতে পৌঁছে জেলার অন্যতম প্রাচীন মন্দিরের সামনে দাঁড়ানো যাবে। মন্দিরটি সম্ভবত খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত। কেউ কেউ আবার এটিকে বারো শতকের সমসাময়িক বলেও মনে করে থাকেন। এটি উৎকৃষ্ট রেখ-দেউলের নিদর্শন এবং কাশীপুর থানার মধ্যে এটি কেবল সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দিরক্ষেত্রই নয়, কারও কারও মতে এটি জেলার প্রাচীনতম মন্দির স্থাপত্য।

প্রাচীন মন্দিরটির বেশিরভাগ অংশই ভগ্ন। ভিত্তি থেকে কয়েক ফুট উঁচু পর্যন্ত এখনও অক্ষত রয়েছে। এর ওপরের অংশ পরবর্তীকালে সিমেন্ট দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। এই মন্দিরের প্রবেশের দরজাটি ছিল সুন্দর কারুকার্য সমন্বিত। দরজার ফ্রেমটি কয়েক খণ্ডে ভেঙে যাওয়ার পর অংশগুলিকে কলকাতার জাদুঘরে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। দরজার চৌকাঠে খোদিত রয়েছে গঙ্গা, যমুনা ও দুটি করে চতুর্ভুজ দ্বারপালের মূর্তি। এই মন্দিরে অবস্থান করছেন সিদ্ধেশ্বরনাথ নামে বিরাট শিবলিঙ্গ। ৩ ফুট যোনীপট্টের ওপর অবস্থিত এই শিবলিঙ্গের উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট। শিবলিঙ্গটি ঘন কৃষ্ণবর্ণের পাথরের তৈরি। এত বড় শিবলিঙ্গ জেলায় আর নেই বলেই মনে হয়।

শিবমন্দিরের পূর্ব দিকে গড়ে উঠেছে নতুন মন্দির। ইটের তৈরি পাকা দালান। মধ্যে অবস্থান করছেন ব্যতিক্রমী তিনটি দেবী মূর্তি। এদের একজন বামাকালী। বাম পা শিবের মস্তকে রেখে একহাতে মুণ্ড, অন্য হাতে অস্ত্র, গলায় মুণ্ডমালা নিয়ে চতুর্ভুজা দেবী দণ্ডায়মান। দ্বিতীয় মূর্তিটি অলংকারে শোভিতা, নৃত্যশীলা দশভুজা, মহিষারূঢ়া-– এলাকায় ভৈরবী নামে পরিচিত। তৃতীয় মূর্তিটি এলাকায় বুদ্ধদেব/ ভৈরব/ বিষ্ণু নামে পূজা পান। এদের ভাস্কর্যরীতি বিস্ময় উদ্রেককারী।

মন্দিরের পিছন দিকে কিছু পাথরের কাজ জড়ো করা হয়েছে। দেওয়ালেও কিছু মূর্তি লাগানো হয়েছে। প্রবেশপথের মুখে বড় বড় পাথরের সিংহ দুটির ভাস্কর্য অতি সুন্দর। পাশেই রয়েছে কীর্তিশালা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। বর্তমানে মন্দিরটি পশ্চিমবঙ্গ পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত।

কাশীপুর থেকে শালডিহা, ধাতলা, ভুচকুরা, পাঁইজা হয়ে ক্রোশজুড়ি পৌঁছনো যায়। ট্রেকার চলে নিয়মিত।

সোনাথলি

কাশীপুর থানার সোনাথলি গ্রামে রয়েছে মনোহর খ্যাপার আশ্রম। বাংলা-বিহার-ওড়িশার মানুষের কাছে এই আশ্রম মনোহর খ্যাপার জন্য এক তীর্থে পরিণত হয়েছে। ইনি ১০৮ বিরাজনন্দ ভারতী নামে খ্যাত হয়েছিলেন। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত মানভূম জেলার সোনাথলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যাদবানন্দ স্বামী ছিলেন তাঁর দীক্ষাগুরু। পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় গুরু সদানন্দ স্বামী বা বুড়াবাবার সংস্পর্শে আসেন। ক্রোশজুড়ির সিদ্ধেশ্বর মন্দিরে রাজযোগের ক্রিয়াসাধন করেন। কিতনকিয়ারি শিবমন্দিরও তাঁর সাধনস্থল ছিল। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে বুড়াবাবার আদেশে সোনাথলি আশ্রম বেশ বড় আকার ধারণ করে। মন্দির, বাগান, সাধুদের আশ্রম সব নিয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। বহু নামীদামি সাধু-সন্ন্যাসীর আনাগোনা ছিল এই আশ্রমে। দোলপূর্ণিমার সময় তিন দিন ধরে বড় উৎসব ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। পরিণত বয়সে মনোহর খ্যাপা বাংলা-বিহার-ওড়িশা রাজ্যের অন্যতম প্রধান সন্ন্যাসী হিসাবে পরিগণিত হয়েছিলেন। পূর্ণদাস বাউল, চলচ্চিত্র প্রয়োজক হেমেন গাঙ্গুলি ও আরও বহু মানুষ তাঁর শিষ্য ছিলেন। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ৯৮ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। সোনাথলি আশ্রমে তাঁর সমাধিমন্দির রয়েছে। এই আশ্রম সেই কারণে একটি দ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠেছে। এখানে আসতে গেলে ইন্দ্রবিল স্টেশনে নেমে রিকশায় অথবা কাশীপুর থেকে ট্রেকারে অথবা রিজার্ভ অটো বা গাড়িতে ক্রোশজুড়ি মন্দির দেখে এখানে ঘুরে দেখে নেওয়া যায়।

রঘুনাথপুরে রাত্রিবাস করে এই জায়গাগুলি দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। মানভূম লজ, রঘুনাথপুর, দূরভাষ: ০৩২৫১ ২৫৬০৯৫, চলভাষ: ৯৯৩২৪১৫৬৪৮।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More