টলিউড জিতে নেবেন অবাঙালি জিৎ, অনেক আগেই বলে দিয়েছিলেন অঞ্জন চৌধুরী

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘নবাব কিনলে আরাম ফ্রি’ … নবাব গেঞ্জির বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেলে প্রথম জিৎকে দেখা গেছিল ছোট পর্দায়। এই বিজ্ঞাপনটি বিশাল হিট ছিল বহুকাল। কিন্তু তখন সে একজন অবাঙালি কালীঘাটের তরুণ। জিৎ বলে তাঁকে কেউ চিনত না। টালিগঞ্জ পাড়ায় প্রবেশের জন্য তখন সবে ঘোরাঘুরি করছেন। বড়পর্দার বিখ্যাত ভিলেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে যাতায়াত করেন জিৎ টলিউড এন্ট্রির টিপস নিতে। এসময় তপন সিনহা ছবি করছিলেন ‘Daughter of this Century’। সেই ছবিতে ছোট্ট এক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেল এই অবাঙালি ছেলেটি। তপন সিনহার ছবি বলে কথা। কিন্তু তখনও তাঁকে কেউ চিনত না। এক্সট্রার রোল প্রায়। যার আবার উচ্চারণ বাঙালিদের মতো নয় সে কি আদৌ হবে টলিউডের নায়ক?

সময়টা তখন ছিল একক প্রসেনজিৎ রাজত্ব। একার কাঁধেই প্রসেনজিৎ টেনে নিয়ে চলেছেন টলিউডকে। তখন সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো ধুঁকছে, আসেনি মাল্টিপ্লেক্স। অঞ্জন চৌধুরী, স্বপন সাহা, সুজিত গুহ, হরনাথ চক্রবর্তীর জমানা। আর্ট ফিল্ম বলতে একা ঋতুপর্ণ ঘোষ। বাংলাদেশ থেকে  ফিরদৌস বা বলিউড থেকে শরদ কাপুরকে নায়ক করেও ছবি হিট দেবার চেষ্টা চলছে, কিন্তু প্রসেনজিতের পর আর কেউ সেই টলিউড সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন না।

এমনই সময় জিতের কাছে এল ‘সাথী’ ছবি করার অফার। শ্যুটিং এ নিজেকে উজাড় করে দিলেন জিৎ। কিন্তু ছবিটার ভাগ্য নির্ধারণ তো করবে দর্শক। তবেই নবাগত নায়ক পাবেন নায়ক বলে প্রতিষ্ঠা। এমনই একদিন রিলিজ করল ‘সাথী’ ছবি। সেখান থেকেই শুরু এই গল্প। যা কেউই জানেন না। কিভাবে জিতের উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন স্বয়ং অঞ্জন চৌধুরী।

অঞ্জন চৌধুরী দর্শকের মন পড়তে পারতেন। তাই তিনি ছবি বানিয়ে সোনার ভল্লুক পুরস্কারের তোয়াক্কা করতেন না। লাল দিয়ে লেখা হাউসফুল বোর্ড তিনি করে দেখাতেন। দর্শকধন্য ছবি তিনি বারবার উপহার দিয়েছেন।

অঞ্জন চৌধুরীর ছায়াসঙ্গী প্রযোজক দিগ্বিজয় চৌধুরী সাক্ষী ছিলেন সেদিন, যেদিন ভাগ্য নির্ধারণ হয় জিতের।দিগ্বিজয় চৌধুরীর আরেকটি পরিচয় তিনি গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর পুত্র। দিগ্বিজয় চৌধুরী  জানালেন সেদিনকার ঘটনা।

“ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের তখন শুরুর জমানা। ‘সাথী’ ছবির ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো বেহালার অজন্তা সিনেমা হলে। আমন্ত্রিত অঞ্জন চৌধুরী। জিতকে তখন কেউ চেনেনা। তাই ছবির প্রথম দিন অজন্তা হল খাঁ খাঁ করছে। তখন আগের সিঙ্গেল প্লেক্স অজন্তা। যেখানে বাংলা ছবি তখন দেখতে বাঙালিরা যায়না। হিন্দি ছবিই বেশী আসে। অজন্তায় অঞ্জনদা আর আমাদের মিলিয়ে প্রথম দিন আট দশজন দর্শক। একদম শুনশান। আমার কাছে ছবিটা খুব একটা ভালো লাগেনি, সেই বাঙালি ফিলিংস পাইনি। কারণ জিতের অবাঙালিসুলভ সংলাপ বলা, অবাঙালি দক্ষিণী প্রভাব গানের সুরে কথায়। ছবি দেখে বেরিয়ে এসে অজন্তার সামনে অঞ্জনদা আমায় জিজ্ঞাসা করল ‘কি রে কী বুঝলি?’ আমি বললাম, ছবিটা তো ভক্কা হবে।”
অঞ্জনদা বলল ‘কিছুই বুঝিসনি।’

আমি তো অবাক। অঞ্জন বলল ‘ ‘সাথী’ ছবিটা সুপার ডুপার হিট হবে। এই হিরোও দাঁড়িয়ে যাবে।’ বলেই সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্কটেশের মণি আর শ্রীকান্তকে ফোন করল অঞ্জনদা। ততক্ষণে মণি শ্রীকান্ত হতাশ হয়ে ভেঙে পড়েছেন, কারণ সব হলে ‘সাথী’ দর্শকশূন্য প্রথম শোয়ে।
অঞ্জনদা ফোন করে বলল ‘তোদের ছবিটা সুপার ডুপার হিট হবে। তোরা শুধু কষ্ট করে হাউজে ছবিটা রেখে দে। ছবিটাকে হলে ধরে রাখার ব্যবস্থা কর। যথারীতি তাই হল, অঞ্জনদার ভবিষ্যৎবাণীও ফলল।’

সত্যি তাই, বাংলা ছবির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল যে বাঙালী দর্শক, তাঁরাই সাথী দেখতে হল ভরালো মাসের পর মাস। বিশেষত নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা প্রাণপাত করে ফেলল হলে গিয়ে নতুন নায়ক জিৎ কে দেখতে। পাড়ায় পাড়ায় মাইকে বেজে উঠল ‘ও বন্ধু তুমি শুনতে কি পাও।’ জিৎ-প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী জুটি দর্শকের মনে জায়গা করে নিল। ‘সাথী’ রেকর্ড হিট ছিল। এত মাস হলে চলা ছবি খুব কম আছে ইতিহাসে। বাংলা ছবির নতুন ঘরানা দেখতে লোক হল ভরালো।

জিতের পরের ছবি ‘নাটের গুরু’। যেটা আবার কোয়েল মল্লিকের প্রথম ছবি। সেটাও ‘সাথী’র পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর শিষ্য হরনাথ চক্রবর্তীর পরিচালনায়। অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে সেভাবে কাজ করেননি, কিন্তু কোথাও অঞ্জন চৌধুরীর আশীর্বাদধন্য হয়েছিলেন যেন জিৎ।

এরপরে ভেঙ্কটেশের পরের ছবি ছিল ‘চ্যাম্পিয়ন’। এবার জিৎ শ্রাবন্তী জুটি।
সেইবারও সেই বেহালা অজন্তায় অঞ্জন চৌধুরীকে প্রথম দিন ছবি দেখতে আমন্ত্রণ জানাল ভেঙ্কটেশ। সঙ্গে ছায়াসঙ্গী দিগ্বিজয় চৌধুরী। অঞ্জন চৌধুরী বরাবর টিকিট কেটে সাধারণ দর্শকের মধ্যে বসে সাধারন মানুষের চোখ দিয়ে সব ছবি দেখতেন। চ্যাম্পিয়নের ক্ষেত্রেও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হল না।


দিগ্বিজয় চৌধুরী  জানাচ্ছেন পরের গল্প —

‘চ্যাম্পিয়ন’। তখন জিৎ স্টার। হলভর্তি দর্শক। হলের সামনে আবির ছড়াচ্ছে জিৎ ফ্যানস ক্লাবের ফ্যানরা। নানানরকম হৈ হৈ করা কান্ড। সে ডায়লগ শোনা যায় না এত চেঁচামেচি। ‘অজন্তা’ হল ফেটে পড়ছে আর কি। ছবিটা দেখে বেরিয়ে এল অঞ্জনদা।

আমায় বলল কী বুঝলি? আমি বললাম ‘সুপার ডুপার হিট’। অঞ্জনদা বলল ‘তুই কিস্যু বুঝিসনি। ছবিটা সুপার ডাব্বা হবে।’ বলে ঐখান থেকে যেদিন ‘সাথী’র সময় ভেঙ্কটেশকে ফোন করেছিল, ওঁদের ফোন করল সেখান থেকে মোবাইল টিপে অঞ্জনদা। তখন তো হাউসফুলের খবরে ফুটছে ভেঙ্কটেশ, এক্সিবিটররা সব বসে আছেন। কিন্তু অঞ্জনদা ফোন করে বলল ‘তোদের ছবিটা সুপার ডাব্বা হবে। তাই হল। ‘সাথী’র সাফল্য কিন্তু পায়নি ‘চ্যাম্পিয়ন’।

পরবর্তীকালে ভেঙ্কটেশ ফিল্মস অঞ্জন চৌধুরীকে একটি তামিল ছবির বাংলা ভার্সন চিত্রনাট্য লিখতে বলে এবং সেই ছবির পরিচালক ছিলেন নবাগত পরিচালক রবি কিনাগী। অঞ্জন চৌধুরী সেই তামিল ছবি কিছুটা দেখে বলে দেন ‘এ গল্প বাংলার দর্শক নেবেনা। আমি করতে পারব না স্ক্রিপ্ট। তোরাও এ ছবি করিস না।’

তখন রবি কিনাগী ও সর্বোপরি ভেঙ্কটেশ স্বীকার করে ‘সাথী’ ও ‘চ্যাম্পিয়ন’ ছবি দুটিতে অঞ্জন চৌধুরীর ভবিষ্যৎবাণীর কথা এবং এই আসন্ন ছবিটিও করা বাতিল করে দেয় ভেঙ্কটেশ।

এতটাই ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ছিলেন  অঞ্জন চৌধুরী। আজও টিভিতে রোজ দুটো করে অঞ্জন চৌধুরীর ছবি থাকেই। টি আর পি নিশ্চয়ই ওঠে তাই ছবিগুলো আজও রোজ দেয় টিভিতে।

‘সাথী’ ছবিটা সেদিন যদি হলে রাখার কথা অঞ্জন চৌধুরী না বলতেন তাহলে আমরা আজকের সুপারস্টার জিৎকে পেতাম না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More