রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭

আগে হত স্ট্রবেরি চাষ, এখন শুধুই বইয়ের বাস, মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশনের নাম এখন ‘বই-গ্রাম’

চৈতালী চক্রবর্তী

বই পড়তে ভালোবাসেন? অবসরে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আস্ত একটা বই গোগ্রাসে গেলার মধ্যে যে আনন্দ আছে সেটা আর কোনও কিছুতেই তেমন ভাবে পাওয়া যায় না। অথবা দক্ষিণের বারান্দায় বসে বই পড়তে পড়তে কখনও যদি আপনার বই-প্রেমী মনে ভাবনা যাগে যে আপনার বাড়ি বা গোটা পাড়াটাই যদি হত একটা লাইব্রেরি, তাহলে কেমন হতো? অনেকটা ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’এর স্বপ্নের দেশে চলে যাওয়ার মতো, তাই না! বাস্তবে এমন জায়গা কিন্তু সত্যিই আছে, আর আমাদের দেশেই আছে। যেখানে একটা আস্ত গ্রামই বদলে গেছে লাইব্রেরিতে। যে দিকে দু’চোখ যাবে শুধু বই আর বই। মানুষের থেকে সেখানে বইয়ের সংখ্যা বেশি। চলুন জেনেনি এমনই এক বই-গ্রামের গল্প।

সে গ্রাম রয়েছে মহারাষ্ট্রে। মহাবালেশ্বর ও পঞ্চগনির মাঝে সাতারা জেলার ছোট্ট গ্রাম ভিলার। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ভিলার ২০১৭ সালের আগে ছিল নিতান্তই ছাপোষা একটা হিল স্টেশন। স্ট্রবেরি চাষের জন্য ভিলারের নাম জানতেন পর্যটকেরা। তাজা স্ট্রবেরি ক্ষেত দেখতে মাঝে সাঝে ভিন রাজ্যের লোকের আনাগোনা হত এখানে। বদলটা আসে ২০১৭ সালের পর থেকে। সরকারি উদ্যোগে ভিলার গ্রামের খোলনলচেই বদলে যায়। এখন ভিলারের কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড়ে এই গ্রাম এখন গোটা বিশ্বের কাছে পরিচিত। আগন্তুকরা বলেন বই-প্রেমীদের গ্রাম, সরকারি ভাষায় ‘দ্য ভিলেজ অব বুকস’ আর স্থানীয়দের কাছে ‘পুস্তকাঞ্চ গাব’, মারাঠি ভাষায় যার অর্থ বইয়ের গ্রাম।

বইয়ের গ্রাম, মানে এক গ্রাম বই। বাড়ির ভিতরে, বাইরে, রাস্তা-ঘাটে, দোকান-বাজারে, গাছের নীচে যেন বইয়ের মেলা। বাড়ির দালানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে লাইব্রেরি, পথ চলতে দু’পাশের দেওয়ালে থরে থরে সাজানো বই, বাজারের বাঁক ঘোরার মুখে কাঁচের আলমারিতে সাজানো বই, পথের ধারে ঝুপড়ি দোকানের চালার পাশে সাজানো বই। বই ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারেন না এই গ্রামের মানুষ। বই পড়াতেই আনন্দ, বই-ময় জীবন। বইয়ের সঙ্গেই বন্ধুত্ব, বই সেখানে অর্ধেক আকাশ। এমন বই-পাগল গ্রামের বইয়ের চাহিদা মেটাতে উদ্যোগী হয়েছে খোদ রাজ্য সরকার। বইয়ের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ভিলারের পর্যটনকেন্দ্র। একচালের ছোট বাড়ি থেকে অট্টালিকা— বই প্রীতিতে কোনও ভেদাভেদ নেই সেখানে। শীতের নরম রোদের মতোই বই প্রেমে মজে সে গ্রামের বাসিন্দারা। অন্ধ সংস্কার আর বিভেদের কালো ধোঁয়া সেখানে নাক গলাতে ভয় পায়।

ভিলারের বই-গ্রামে রূপান্তরের পালা শুরু হয় ২০১৭ সালের ৪ মে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ গ্রামের মানুষের বই-প্রেমের কথা শুনে এক অভিনব পন্থা নেন। গোটা গ্রামটাকেই বদলে দেন লাইব্রেরিতে। সরকারি নির্দেশেই, ভিলারের প্রায় দু’কিলোমিটার জুড়ে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট জুড়ে বই সাজাতে শুরু করেন গ্রামবাসীরা। বাড়ি, স্কুল, দোকান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি দফতর-সহ বেছে নেওয়া হয় গ্রামের ভিতর ২৫টা জায়গা। সেখানেই তৈরি হয় ছোট ছোট গ্রন্থাগার। কোনও বাড়ির ভিতরে আবার কোনও বাইরের বাইরের দেওয়ালেই সাজিয়ে দেওয়া হয় বই দিয়ে। শুরুটা হয়েছিল মারাঠি ভাষার ১৫ হাজার বই দিয়ে। বর্তমানে মারাঠি ভাষায় বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তা ছাড়াও বই-গ্রামে হিন্দি ও ইংরাজি সাহিত্যেরও দেখা মিলবে।

বই দিয়ে এমন একটা গ্রাম সাজানোর ভাবনার মূলে রয়েছে ওয়েলসের হেই-অন-ওয়ে টাউনের বই উৎসব। এমনটাই জানিয়েছেন, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বিনোদ তাওড়ে। তাঁর কথায়, ‘‘কয়েক বছর আগে ওয়েলসে গেছিলাম। সেখানকার বই উৎসব আমাকে অনুপ্রাণিত করে। একটা গোটা শহর সাজানো নানা রকম বইয়ের স্টোরে। ভাষা ও সাহিত্যের উপর তাঁদের আশ্চর্য দখল আমাকে মুগ্ধ করে।’’

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ভিলারের মানুষজনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখে এমন একটা বই-গ্রাম বানানোর পরিকল্পনা করে সরকার। পাশাপাশি, মারাঠি ভাষার বিকাশ ও পর্যটক টানাও লক্ষ্য ছিল। রাজ্য মারাঠি বিকাশ সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গ্রামের ভিতরেই তৈরি হয় ২৫ রকমের গ্রন্থাগার। কোথাও শুধুই আত্মজীবনী, আবার কোথাও সাহিত্য-দর্শনের ছড়াছড়ি, কোনও বাড়ির দেওয়ালে সাজানো রঙ বেরঙের শিশু ও কিশোর সাহিত্য, আবার কোথাও ধর্মশাস্ত্র, ইতিহাস, লোকসাহিত্য, পরিবেশ-বিজ্ঞান বিষয়ক বই।

বইয়ের পাশাপাশি ভিলারে আরও একটা জিনিস নজর কাড়ে, সেটা হল দেওয়াল-লিখন। সরকারের তরফেই ৭৫ জন শিল্পীকে দিয়ে গ্রামের ভিতর নানা জায়গায় তৈরি হয়েছে গ্রাফিত্তি। মজার কার্টুন, ল্যান্ডস্কেপ, সংস্কৃতির ভাবনা-সহ নানা বিষয় নিয়ে দেওয়ালে তুলির টান দিয়েছেন শিল্পীরা। এক ঝলক দেখলে মনে হবে গ্রাম তো নয় যেন বইয়ের বাগান, তাতে নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে।

বই-গ্রামের সব বই পাওয়া যাবে এক্কেবারে বিনামূল্যে। রাস্তায় রাস্তায় চেয়ার, টেবিল, রঙিন ছাতা পেতে দেওয়া হয়েছে। মনের মতো বই বেছে নিয়ে পড়তে শুরু করলেই হল। যতক্ষণ খুশি বই পড়া যাবে, কেউ মানা করবে না। তবে পড়া হয়ে গেলে সঠিক জায়গায় বই ফেরত দিয়ে যেতে হবে পাঠকদের। এটাই নিয়ম। প্রতিটি গ্রন্থাগারের তদারকি করেন গৌরব ধর্মাধিকারি। বললেন, ‘‘কম্পিউটারে প্রতিটি বইয়ের ক্যাটালগ করা আছে। বইয়ের উপর ট্যাগ দিয়ে রাখা আছে, যাতে সেগুলি হারিয়ে না যায়। অনেক দুষ্প্রাপ্য বই আছে গ্রন্থাগারগুলিতে, তাই এই বিশেষ ব্যবস্থা। বর্ষার সময় বইগুলো প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রাখা হয় যাতে নষ্ট না হয়ে যায়। প্রতিটি বইকে যত্নে রাখার চেষ্টা করি আমরা।’’

গত দু’মাস ধরে ভিলারে রয়েছে সূর্যবংশী। তাঁর কথায়, ‘‘আগে স্ট্রবেরির ক্ষেত দেখতে ভিলারে আসতেন লোকজন। এখন বই পড়তে আসেন। এখানকার সেরা আকর্ষণ এইসব বইয়ের লাইব্রেরি। পঞ্চগণি থেকে কাতারে কাতারে লোক আসেন বই পড়তে। পরিবার নিয়ে আপাতত এখানেই থেকে গেছি আমি।’’ এগারো বছরের কিশোরও স্কুল শেষে লাইব্রেরিতে ঢুকে মন দিয়ে বই পড়ে, জানিয়েছেন মুম্বইয়ের আইটি সেক্টরের তরুণ অমিত ভেঙ্গসরকার। বলেছেন, ‘‘আইটিতে চাকরি করার জন্য বই পড়ার বিন্দুমাত্র সময় পাই না। এখানে এসে আমি অভিভূত। শিশু থেকে বৃদ্ধ— এখানকার মানুষ বই পড়তে কত ভালোবাসেন সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না।’’

গত কয়েক মাসে ভিলারে পর্যটকদের আনাগোনা অনেক বেড়েছে। ভিলারকে দেশের প্রথম বই-গ্রাম হিসেবে ঘোষণাও করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। বই পড়তেও তো আপনিও ভালোবাসেন। কী ভাবছেন?  একবার ঘুরেই আসুন ভিলারে। স্ট্রবেরি থেকে শেক্সপিয়ার, মন্দ লাগবে না একটুও।

আরও পড়ুন:

ছবির মতো নিঃশব্দ গ্রামে জনা ৩০ বুড়োবুড়ি, আর শ’চারেক পুতুল

ছবির মতো নিঃশব্দ গ্রামে জনা ৩০ বুড়োবুড়ি, আর শ’চারেক পুতুল

Shares

Comments are closed.