কেমন ছিল কবির জীবদ্দশায় ‘পঁচিশে বৈশাখ’

রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রথম উদযাপন করা হয়েছিল  ১৮৮৭ সালে। কবির তখন বয়স ২৬ বছর।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

 ১৮৮৬ সালের ২৫শে বৈশাখে, একটি চিঠিতে শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “আজ আমার জন্মদিন। পঁচিশে বৈশাখ। পঁচিশ বৎসর পূর্বে এই পঁচিশে বৈশাখে আমি ধরণীকে বাধিত করতে অবতীর্ণ হয়েছিলুম। জীবনে এখন আরও অনেকগুলো পঁচিশে বৈশাখ আসে এই আশীর্বাদ করুন। জীবন অতি সুখের।”  চিঠির অংশটুকু পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে রবীন্দ্রনাথ নিজের জন্মদিন নিয়ে বেশ সচেতন ছিলেন। কিন্তু এই ধারণা ভেঙে যাবে যদুনাথ সরকারকে লেখা অন্য একটি চিঠিতে। সেখানে কবি লিখছেন,“এই সমস্ত বাহ্য আড়ম্বরের উদ্যোগ আয়োজনে আমি যে কিরূপ সঙ্কোচ অনুভব করিতেছি তাহা অন্তর্যামীই জানেন।”

হ্যাঁ এটাই সত্যি। নিজের জীবদ্দশায় নিজের জন্মদিন উদযাপন নিয়ে একেবারেই উৎসাহী ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। তাই কিছুটা জোর করেই, রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রথম উদযাপন করা হয়েছিল  ১৮৮৭ সালে। কবির তখন বয়স ২৬ বছর। কবির ভাগ্নি সরলা দেবীর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ বইটিতে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তীর উল্লেখ আছে।

সরলা দেবী লিখছেন, ” রবিমামার প্রথম জন্মদিন উৎসব আমি করাই। তখন মেজমামা ও নতুন মামার সঙ্গে তিনি ৮৯ নং পার্ক স্ট্রিটে থাকেন। অতি ভোরে উল্টোডিঙির কাশিয়াবাগান বাড়ি থেকে পার্ক স্ট্রিটে নিঃশব্দে তাঁর বিছানার কাছে গিয়ে, বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা বাজার থেকে আনানো বেলফুলের মালার সঙ্গে অন্যান্য ফুল ও একজোড়া ধুতি-চাদর তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করে তাঁকে জাগিয়ে দিলুম। তখন আর সবাই জেগে উঠলেন – পাশেই নতুন মামার ঘর। রবির জন্মদিন বলে সাড়া পড়ে গেল। সেই বছর থেকে পরিজনদের মধ্যে তাঁর জন্মদিনের উৎসব আরম্ভ হল।

হ্যাঁ পরবর্তী বাইশ বছর ঠাকুরবাড়ির অন্দর মহলের আড়ালে ছিল কবির জন্মদিন। সেখানে হাতেগোনা কিছু মানুষ ছাড়া বাইরের কারও প্রবেশাধিকার ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীকালে কবি তাঁর গুণগ্রাহীদের আকুল আবেদন ফেরাতে পারেননি। ভক্তদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন কবি। উৎসবের আকার নিয়ে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল থেকে রবীন্দ্রজয়ন্তী বেরিয়ে এসেছিল নীল আকাশের নীচে। তবে সর্বজনীনভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রথম পালিত হয়েছিল শান্তিনিকেতনে, ১৯১০ সালে। কবি সেবার ঊনপঞ্চাশ থেকে পঞ্চাশে পা দিয়েছেন। ‘আত্মীয়দের উৎসব’ নাম দিয়ে, বিপুল উৎসাহে আশ্রমিকরা রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেছিলেন।

রবীন্দ্রজয়ন্তী প্রথমবার মহাসমারোহে পালিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। সেই শান্তিনিকেতনেই। সে বছর পঞ্চাশ পূর্ণ করে একান্নতে পা দিয়েছিলেন কবি। রবীন্দ্রজয়ন্তীকে সফল করার জন্য বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ প্রশান্ত মহলানবিশের নেতৃত্বে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন কলকাতার বেশ কিছু গুণীজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন, সত্যেন দত্ত, সুকুমার রায় ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। বেদ-উপনিষদ পাঠ করে এবং মালা পরিয়ে কবিকে বরণ করা হয়েছিল। কবির মনের কথা সেদিন অনুচ্চারিত থেকে গেলেও,সে কথা বুঝি প্রকাশ পেয়েছিল নেপালচন্দ্র রায়ের ভাষণে। নেপালচন্দ্র তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “তোমরা সকলেই গুরুদেবকে ভক্তি কর, কিন্তু তাঁকে কখনো যেন ঈশ্বরের স্থানে বসিও না”।

সত্যিই কবি ঈশ্বর হতে চাননি, তাই বুঝি কবি লিখেছিলেন,

“যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে, সবার নীচে, সব-হারাদের মাঝে।”

কবি সবহারাদের মাঝেই ঈশ্বরকে খুঁজেছিলেন। সবহারাদের মাঝেই কবি থাকতে চেয়েছিলেন। বিজলি বাতির রোশনাই ছেড়ে কবি কাটাতে চেয়েছিলেন প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো মাখা ঘরে। কিন্তু মানুষ তাঁকে আপন খেয়ালে চলতে দেয়নি। কারণ তিনি যে সবার। তিনি যে বিশ্বকবি। তাই ১৯৩১ সালে, মহা সমারোহে উদযাপিত হয়েছিল কবির ৭০তম জন্মজয়ন্তী। যা আজও বাংলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। রবীন্দ্রজয়ন্তীর মুখ্য উদ্যোক্তা ছিলেন অমল হোম। উদযাপন কমিটিতে ছিল চাঁদের হাট।

উদযাপন কমিটির সভাপতি ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুভাষচন্দ্র বসু, প্রশান্ত মহলানবিশ, সি.ভি.রমণ, রাজশেখর বসু, নজরুল ইসলাম, ইন্দিরা দেবী, কালিদাস নাগ, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রাতঃনমস্য ব্যক্তিরা। কবির সম্বর্ধনা উপলক্ষে দুটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, বাংলা আর ইংরেজিতে। ইংরেজি বইটির নামকরণ করেছিলেন রঁমা রঁলা। নাম দিয়েছিলেন,’গোল্ডেন বুক অফ টেগোর’। বইটিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নিবন্ধ লিখেছিলেন কবির গুণমুগ্ধ আইনস্টাইন, ন্যুট হামসুন, হ্যারল্ড ল্যাসকি’র মত বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরা।

শুধু বৈশাখ মাস জুড়েই নয়, সে বছর ভরা শীতে, ২৫শে ডিসেম্বর থেকে ৩১শে ডিসেম্বর, কলকাতায় পালিত হয়েছিল ‘ঠাকুর সপ্তাহ’। রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহে ও টাউনহলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। টাউনহলে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি ও লেখার পাণ্ডুলিপি প্রদর্শিত হয়েছিল। যাত্রা, কীর্তন, জারি গান,কথকতা, রায়বেশে, দেশীয় খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছিল ইডেন গার্ডেন প্রাঙ্গণে।

১৯৪১ সালের ৮ মে। অত্যন্ত অনাড়ম্বর ভাবে শান্তিনিকেতনে পালিত হয়েছিল বিশ্বকবির জীবনের শেষ রবীন্দ্রজয়ন্তী। শান্তিনিকেতনের ‘উদয়নে’ বসে জীবনের শেষ জন্মদিন উপলক্ষে কবি লিখেছিলেন কয়েকটি লাইন, যা ছিল দার্শনিক কবির জীবনচর্যার নির্যাস,

আমার এ জন্মদিন মাঝে আমি হারা
আমি চাহি বন্ধুজন যারা
তাহাদের হাতের পরশে
মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে
নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ,
নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।

তবে শুধুই ফুলমালা নয়, এই রবীন্দ্রজয়ন্তীর জন্য জীবদ্দশাতেই চরম অপমানিত হয়েছিলেন বিশ্বকবি। ১৯১১ সালে বঙ্গীয় পরিষদ যখন রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন করেছিল, তখন সেই অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার জন্য কলকাতার একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। অনুষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রীতিমতো লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করা হয়েছিল সারা কোলকাতায় এবং একটি লিফলেট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল কবিকেও।

শোকাহত কবি ৪ মে (১৯১১) চিঠি লিখেছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে। সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আজ আমার পঞ্চাশ বৎসর পূর্ণ হইবার মুখে এই আর একটি নিন্দা আমার জন্মদিনের উপহার রূপে লাভ করিলাম এই যে, আমি আত্মসম্মানের জন্য লোলুপ হইয়াছি। এই নিন্দাটিকেও নতশিরে গ্রহণ করিয়া আমার একপঞ্চাশত বৎসরের জীবনকে আরম্ভ করিলাম – আপনারা আশীর্বাদ করিবেন সকল অপমান সার্থক হয় যেন”।  

তথ্য কৃতজ্ঞতা- জীবনের ঝরাপাতা: সরলা দেবী চৌধুরাণী, পুণ্যস্মৃতি: সীতা দেবী, পঁচিশে বৈশাখ: অনুত্তম ভট্টাচার্য, জন্মদিনের মুখর তিথি: সুনীল দাস

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More