ভারতের রামদেওড়া থেকে পাকিস্তানের আলাইয়ার, লোকদেবতা হয়ে আছেন রামদেব পীর

যাঁর অলৌকিক ক্ষমতার পরীক্ষা নিতে এসেছিলেন পাঁচ পীর সাহেব।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সোনারকেল্লা সিনেমার বিখ্যাত উটের দৌড়ের দৃশ্যটি মনে পড়ে? যে দৃশ্যে অনেক কসরত করে লালমোহন বাবু উটের পিঠে বসে পড়ার পর ফেলুদা চেঁচিয়ে উঠেছিল, “চলো রামদেওড়া”। প্রথম তিনটি উটে ছিল ফেলুদা, তোপসে ও লালমোহন বাবু। দূরে ট্রেনের শব্দ শুনে তোপসে চিৎকার করে উঠেছিল,”ফেলুদা, ট্রেন!”

নীল আকাশে কালো ধোঁয়া ছেড়ে সোনালি বালির বুক চিরে ছুটে আসা সেই ট্রেনেই ছিল মুকুল আর নকল ডক্টর হাজরা ওরফে ভবানন্দ। রামদেওড়া যাবার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছিল ফেলুদা। উটচালকদের বলেছিল, “ঘুমাইয়ে উট, উহ ট্রেন কো রোকনা হোগা, চলিয়ে।” ট্রেনের দিকে উর্ধশ্বাসে ছুটেছিল উট। কিন্তু থামানো যায়নি সেই ট্রেন। অগত্যা পরের ট্রেন ধরতে ফেলুদাদের যেতে হয়েছিল নিকটবর্তী স্টেশন রামদেওড়াতেই।

সোনারকেল্লার সেই বিখ্যাত দৃশ্য

রাজস্থানের জয়সলমীর জেলার পোখরান থেকে বারো কিলোমিটার উত্তরে আছে এই রামদেওড়া গ্রাম। সত্যজিৎ রায়ের জন্য ‘রামদেওড়া’ নামটি বাঙালির কাছে পরিচিত হলেও, অনেকেই জানেন না নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন চোদ্দশো শতাব্দীর এক হিন্দু পীর বাবা রামশাহ’র নাম। মরুভূমির মধ্যে থাকা এই ছোট্ট জনপদের বুকে, প্রায় ছ’শো বছর ধরে শুয়ে আছেন সেই মানুষটি। যিনি আজ পরিণত হয়েছেন জাগ্রত লোকদেবতায়। যাঁর অলৌকিক ক্ষমতার আখ্যান কিংবদন্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দূর থেকে দূরান্তরে। কেবল রাজস্থানেই নয়, পাকিস্তান সীমান্তের ওপারে থাকা সিন্ধু প্রদেশেও।

রামদেব জী মহারাজ বা বাবা রামশাহ পীর

সুখ ছিল না পোখরানের রাজার মনে

চোদ্দশো শতাব্দীর মধ্যভাগ। পোখরানের রাজা ছিলেন মেঘবংশী রাজপরিবারের আজামল জী তোমর। তাঁর রানি ছিলেন জয়সলমীর রাজের কন্যা মৈনাদে দেবী। বিবাহের পর কেটে গিয়েছিল বহু বছর। কিন্তু সন্তানলাভ হয়নি। প্রজাবৎসল রাজা আজামল জী তাঁর প্রজাদেরই সন্তান মনে করতেন। এভাবেই কাটছিল দিন। পোখরান বহুকাল বৃষ্টিপাতের মুখ দেখেনি। তাই কৃষকদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে গিয়েছিল। রাজার সাহায্য নিয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হত। কিন্তু হঠাৎই এক বছর বর্ষায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। রাজ্যের মানুষদের চাষের কাজে উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রাসাদ থেকে ঘোড়ায় করে বেরিয়েছিলেন রাজা। পথে রাজার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিছু কৃষকের। বীজ ফেলার জন্য তাঁরা নিজেদের জমিতে যাচ্ছিলেন।

রাজাকে দেখেই কৃষকেরা বাড়ি ফেরার পথ ধরেছিলেন। অবাক হয়ে রাজা কৃষকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, জমিতে না গিয়ে হঠাৎ তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে কেন! উত্তর দিতে ভয় পেয়েছিল কৃষকেরা। রাজা তাদের কোনও শাস্তি না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তখন কৃষকেরা বলেছিলেন, অপুত্রক রাজার মুখ দেখে চাষ করতে যাওয়াটা অশুভ। তাই এখন বীজ ফেললে সেই বীজ থেকে ফসল ফলবে না। তাই তাঁরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন। রাজার মনে ভীষণ আঘাত দিয়েছিল সেদিন সরল কৃষকদের কথাগুলি।

কৃষ্ণভক্ত রাজা দ্বারকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন

দ্বারকায় গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের পূজা করার পর রাজা কৃষ্ণের মূর্তিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর মতো ভক্তকে এত দুঃখ দেওয়ার কারণ কী! পাথরের মূর্তি কোনও উত্তর দেয়নি। রাজা বারবার একই প্রশ্ন করে চলেছিলেন। উত্তর না পেয়ে তীব্র হতাশা থেকে ক্রুদ্ধ রাজা কৃষ্ণের মূর্তির মাথায় শুকনো লাড্ডু ছুঁড়ে মেরেছিলেন। মন্দিরের পুরোহিত ভেবেছিলেন রাজা আজামল সিং পাগল হয়ে গিয়েছেন। মন্দির থেকে রাজাকে সরাবার জন্য পুরোহিত বলেছিলেন, “প্রভু এখানে নেই। তিনি পুরাণের দ্বারকায় অনন্তশয়ানে আছেন। আপনি সাগরের তীরে থাকা পুরাণের দ্বারকায় গিয়ে প্রার্থনা করুন। সেখানে অবশ্যই প্রভুর দেখা পাবেন এবং প্রভু আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবেন।”

দ্বারকার কৃষ্ণ মন্দির

রাজা ছুটে গিয়েছিলেন সাগরের তীরে। কিন্তু পুরাণের দ্বারকাকে কবেই গ্রাস করে নিয়েছে আরব সাগর। উন্মত্ত রাজা সাগরের গভীরে ডুবে থাকা পুরাণের দ্বারকায় পৌঁছানোর জন্য ঝাঁপ দিয়েছিলেন সাগরে। ডুবন্ত ভক্তকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। ভক্তের অগাধ বিশ্বাসে তুষ্ট হয়ে বর দিতে চেয়েছিলেন রাজাকে। রাজা বলেছিলেন, ভগবান কৃষ্ণ যেন তাঁর পুত্র হিসেবে জন্ম নেন। ভক্তের কাঙ্ক্ষিত বরই দিয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।

রাজা বলেছিলেন, “আমি কী করে বুঝব যে আপনি আমার ঘরে সন্তান হয়ে এসেছেন?” শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, “যখন আমি তোমার ঘরে যাব, দরজার বাইরে দেখতে পাবে গৈরিক পদচিহ্ন, সেদিন মন্দিরের শঙ্খ নিজে থেকেই বাজতে শুরু করবে।” ফিরে আসার মুহূর্তে ইষ্টদেব শ্রীকৃষ্ণের কপালে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন রাজা। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনার কপালে ও কীসের আঘাতের চিহ্ন প্রভু!” ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, “কপালে লাড্ডু ছুঁড়ে মেরেছিল এক ভক্ত।” কাঁদতে কাঁদতে ভগবানের পায়ে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন অনুতপ্ত রাজা।

আরবসাগরের তলায় ডুবে যাওয়া প্রাচীন দ্বারকার ধ্বংসাবশেষ

এ ছেলে কৃষ্ণের অবতার

ভাদ্র দ্বিতীয়ার সন্ধ্যায় নিজে থেকেই মন্দিরে বাজতে শুরু করেছিল শঙ্খ। প্রাসাদের বাইরে দেখা গিয়েছিল গৈরিক পদচিহ্ন। রানি মৈনাদের কোল আলো করে এসেছিলেন রামদেব। ছোটবেলা থেকেই রামদেব ছিলেন আর পাঁচটা রাজপুত রাজপুত্রের থেকে আলাদা। রামদেবের অস্ত্রগুরু রোজ বিকেলে শিষ্যকে প্রাসাদে দেখতে না পেয়ে ফিরে যেতেন। কারণ ঠিক ওই সময়ে রামদেবকে প্রাসাদে খুঁজে পাওয়া যেত না। তাঁকে খুঁজে পাওয়া যেত, বালির মধ্যে থাকা বাবলা গাছের নীচে, ধ্যানরত অবস্থায়। বালক রামদেবকে বিরক্ত করতে বারণ করতেন রাজা। কারণ তিনি জানতেন এ ছেলে কৃষ্ণের অবতার। কারণ বাল্যকাল থেকেই রামদেবের মধ্যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখা গিয়েছিল।

বালক অবস্থায় একবার রামদেব বাবার কাছে কাঠের ঘোড়া চেয়েছিলেন। খেলনা ঘোড়া তৈরির জন্য কাঠমিস্ত্রিকে প্রচুর চন্দনকাঠ ও ঘোড়াটিকে মুড়ে দেবার জন্য এক থান নতুন কাপড় দিয়েছিলেন রাজা। কিন্তু কাঠমিস্ত্রি নতুন কাপড়ের প্রায় পুরোটাই দিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। চন্দনকাঠ বিক্রি করে দিয়ে সাধারণ কাঠ এবং পুরোনো কাপড় দিয়ে ঘোড়া বানিয়েছিলেন। তারপর নতুন কাপড়ের অবশিষ্ট অংশ দিয়ে ঘোড়াটিকে মুড়ে রাজপ্রাসাদে এসেছিলেন।

বালক রামদেব খেলনা ঘোড়ার পিঠে বসামাত্রই উঠেছিল প্রচণ্ড ঝড়। রামদেবকে নিয়ে আকাশে উড়ে গিয়েছিল কাঠের ঘোড়া। কাঠমিস্ত্রির ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা তাঁকে নিক্ষেপ করেছিলেন কারাগারে। কিন্তু অবাক কাণ্ড, কিছুক্ষণ পরে কাঠের ঘোড়ার পিঠে চেপেই ফিরে এসেছিলেন অক্ষত রামদেব। ঘোড়া থেকে নেমে সোজা গিয়েছিলেন কারাগারে। বাবাকে ঠকানোর জন্য তীব্র তিরস্কার করেছিলেন কাঠমিস্ত্রিকে। হতভম্ব রাজা কাঠমিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করতেই, কাঠমিস্ত্রি প্রাণের ভয়ে দোষ স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কাঠমিস্ত্রিকে আরও কঠোর শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন রাজা। কিন্তু বালক রামদেব বলেছিলেন ক্ষমা করে দিতে। সেই অলৌকিক কাহিনিটি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা রাজস্থানে।

চঁদের আলোয় রামদেওড়া

প্রাসাদ ছেড়েছিলেন রাজপুত্র

রাজা আজামল জী তোমরের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসতে চাননি রামদেব। প্রাসাদ ছেড়ে পরিব্রাজকের বেশে ঘুরতে শুরু করেছিলেন ভারতের পথে পথে। তীর্থে তীর্থে ঘুরে দর্শন করেছিলেন হিন্দুদের মন্দির, মুসলমানদের মসজিদ মাজার দরগা। কারণ তাঁর চোখে এগুলি ছিল একই ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন আবাস। একসময় ফিরে এসেছিলেন নিজের রাজ্যে। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে মরুভূমির বুকে বানিয়েছিলেন তাঁর সাধন কুটির। কুটিরের আঙিনায় পা পড়েছিল দুলিভাই নামে এক সংসারত্যাগী যুবকের। কালক্রমে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন সাধক রামদেবের প্রধান শিষ্য।

ক্রমশ ভিড় বাড়তে লাগল বাবার আখড়ায়। ভক্তেরা সাধক রামদেবকে বলতেন বাবা রামদেব জী মহারাজ। তাঁর কাছে আসা মানুষদের রামদেব জী মহারাজ বলতেন সাম্যের কথা। উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলমান, সব ভেদাভেদ ভুলে অসহায় মানুষের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। দিনের বেশিরভাগ সময়েই ধুনি জ্বালিয়ে সকলের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনায় মগ্ন থাকতেন তিনি। রামদেব জী মহারাজের কাছে আসতে শুরু করেছিলেন মুসলিম ভক্তেরাও।

অলৌকিক ক্ষমতার পরীক্ষা নিতে এসেছিলেন পাঁচ পীর সাহেব

বাবা রামদেব জী মহারাজের অলৌকিক ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর আরবেও। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মক্কা থেকে ভারতে এসেছিলেন পাঁচ প্রসিদ্ধ পীর সাহেব। রামদেব জী মহারাজ তাঁদেরকে কুটিরে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কথাবার্তার পর পাঁচ পীরকে আহার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছিলেন রামদেবজী। কিন্তু তাঁকে পরীক্ষা করার জন্যেই পাঁচ পীর সাহেব বাবা রামদেবজীকে জানিয়েছিলেন, আহার্য গ্রহণের পাত্র তাঁরা মক্কাতেই ফেলে এসেছেন। যেহেতু তাঁরা অন্য পাত্রে খান না, তাই তাঁরা রামদেবজীর কুটিরে আহার গ্রহণ করতে পারবেন না।

স্মিত হেসে রামদেবজী পাঁচ পীর সাহেবকে নিয়ে কুটিরের বাইরে এসেছিলেন। পশ্চিমের আকাশে তাকিয়ে বলেছিলেন, ওই দেখুন আপনাদের আহার্য গ্রহণের পাত্র এসে গেছে। পাঁচ পীর অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন, আকাশ পথে উড়ে আসছে পাঁচটি পাত্র। পাত্রগুলি উড়ে এসে তাঁদের সামনের বালিতে পড়েছিল। পীর সাহেবেরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন মক্কায় রেখে আসা পাত্রগুলি দেখে। রামদেব জী মহারাজের অলৌকিক ক্ষমতা নিজের চোখে দেখে তাঁকে আর অবিশ্বাস করতে পারেননি পাঁচ পীর সাহেব। রামদেবজীকে তাঁরা দিয়েছিলেন পীরের সম্মান। বাবা রামদেবজী মহারাজের নাম হয়ে গিয়েছিল রামশাহ পীর। পাঁচ পীর আর ফিরে যাননি আরবে। থেকে গিয়েছিলেন বাবা রামদেবজী মহারাজের আখড়া বা রামশাহ পীরের দরগায়। একসঙ্গে আরাধনা শুরু করেছিলেন।

কিন্তু পৃথিবীতে খুব কম দিনের জন্যে এসেছিলেন বাবা রামশাহ পীর। ১৩৮৪ সালের ভাদ্রমাসের শুক্লা একাদশীর দিন মাত্র তেত্রিশ বছর বয়েসে লোকান্তরিত হয়েছিলেন বাবা রামশাহ পীর। দরগার মধ্যেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, রামশাহ পীরের মৃত্যুর ঠিক দু’দিন আগেই মৃত্যু হয়েছিল রামশাহ পীরের প্রধান শিষ্য দুলিভাইয়ের। দরগার প্রাঙ্গণেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। রামশাহ পীরের প্রয়াণের পর দরগায় আরাধনা চালিয়ে গিয়েছিলেন মক্কা থেকে আসা পাঁচ পীর। একে একে পাঁচ পীরেরই প্রয়াণ ঘটেছিল রামশাহ পীরের দরগাতে। রামশাহ পীরের সমাধির পাশে আজও আছে তাঁদের সমাধি।

রামদেওড়ায় রামশাহপীরের সমাধি

স্থানটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘রামদেওড়া’

বাবা রামদেবজী মহারাজ বা রামশাহ পীরের নামেই এলাকার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘রামদেওড়া’। ১৯৩১ সালে আখড়া বা দরগাটিকে মন্দিরের রূপ দিয়েছিলেন বিকানিরের রাজা গঙ্গা সিং। মন্দিরের ভেতর আছে বাবা রামশাহ পীরের আবক্ষ মূর্তি ও ঘোড়ার ওপর বসা রামশাহ পীরের তৈলচিত্র। রাজস্থানের মেঘাওয়াল সম্প্রদায়ের মূল দেবতা তিনি। হিন্দু ভক্তেরা রামদেবজীকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার বলে মানেন। অন্যদিকে জাগ্রত পীর হিসেবে রামশাহকে শ্রদ্ধা জানান মুসলমান ভক্তের দল। দুলিভাই ও পাঁচ পীরের সমাধি ছাড়াও মন্দির প্রাঙ্গণে দেখতে পাওয়া যাবে আরও কিছু সমাধি। সেগুলি বাবা রামশাহ পীরের প্রিয় শিষ্যদের সমাধি।

রামদেওড়ার মন্দিরে বাবা রামশাহ পীরের আবক্ষ মূর্তি

এছাড়াও মন্দির প্রাঙ্গণে আছে বাবা রামশাহ পীরের খনন করা কুয়ো। ভক্তেরা বিশ্বাস করেন, কুয়োটির জলের রোগ নিরাময় ক্ষমতা আছে। প্রতিবছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর, এই দু’মাস ধরে বাবা রামশাহ পীরের মেলা চলে রামদেওড়ায়। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সেই মেলায় যোগদান করেন হাজার হাজার মানুষ। সারা রাত ধরে চলে বাবা রামশাহ পীরের ভজন কীর্তন। মন্দিরের কাছেই আছে রামসরোবর নামে একটি হ্রদ। জনশ্রুতি রামদেব পীর নিজেই এটি খনন করেছিলেন। সেই হ্রদে স্নান করে মন্দিরে পূজো দেন ভক্তেরা।

রামদেওড়ায় রামদেব বা রামশাহ পীরের মন্দির

রামাপীর হয়ে বিরাজ করছেন পাকিস্তানেও

বাবা রামশাহ পীরের দ্বিতীয় বিখ্যাত মন্দিরটি আছে বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশের তান্ডো-আলাইয়ারে। মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, তান্ডো-আল্লাইয়ারের এক ধনী ক্ষত্রিয় ব্যবসায়ী সন্তান পাওয়ার আশায় রামাপীরের (রামশাহ পীর) মেলার আয়োজন করেছিলেন। নিঃসন্তান ব্যবসায়ীটি সন্তানলাভের পর পুজো দেওয়ার জন্য রামদেওড়া গিয়েছিলেন। পুজো দেওয়ার পর রামদেওড়ার মন্দিরে জ্বলতে থাকা প্রদীপের শিখা থেকে অন্য একটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন। তারপর সেই জ্বলন্ত প্রদীপটি নিয়ে একমাস হেঁটে ফিরে এসেছিলেন সিন্ধুপ্রদেশের তান্ডো-আলাইয়ারে। সারা পথে একবারও নেভেনি প্রদীপ। মাঝে মাঝে কেবল ঘি ঢালতে হয়েছিল।

পাকিস্তানে রামাপীরের মন্দির

তান্ডো- আলাইয়ারে রামাপীরের প্রদীপ আনার পর, রামাপীরের মন্দির বানিয়ে সেই মন্দিরে প্রদীপটি স্থাপন করেছিলেন ক্ষত্রিয় ব্যবসায়ী। আজও আছে সেই মন্দির। মন্দিরের ভেতরে আছে রামাপীরের ঘোড়ায় চড়া মূর্তি। মন্দিরের গর্ভগৃহে শ্বেতপাথরের ছোট্ট মন্দিরে আজও জ্বলছে সেই প্রদীপ। ১৮৫৮ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে একবছরের জন্যেও বন্ধ হয়নি রামাপীরের মেলা। আজও প্রত্যেকবছর জুন মাসে অনুষ্ঠিত হয় রামাপীরের বাৎসরিক মেলা।

পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলমান ভক্ত রামশাহের ধ্বজা বা পতাকা নিয়ে খালি পায়ে মেলায় যোগ দেন। সারা রাত্রি মন্দিরের বাইরে ভজন করার পর ভোর পাঁচটার সময় মন্দির প্রাঙ্গণে পতাকা স্থাপন করেন ভক্তের দল। রামাপীরের বাৎসরিক তীর্থযাত্রাই হল পাকিস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু তীর্থযাত্রা। বৃহত্তম তীর্থযাত্রাটি অনুষ্ঠিত হয় মরুতীর্থ হিংলাজে।

পাকিস্তানের মন্দিরে রামাপীরের বিগ্রহ

রামদেওড়া রেলস্টেশনে ফেলুদাদের কাটাতে হয়েছিল বেশ কিছু ঘণ্টা। ফেলুদা ব্যস্ত ছিলেন মন্দার বোসকে নিয়ে। উটে চড়ার আনন্দে মশগুল ছিলেন লালমোহন বাবু ও তোপসে। স্টেশন থেকে একটু বের হলেই লালমোহন বাবু জানতে পারতেন রাজপুত্র থেকে লোকদেবতা হয়ে যাওয়া রামশাহ পীরের কথা। জানলে হয়ত জটায়ুর নায়ক প্রখর রুদ্রকে পরের উপন্যাসেই দেখা যেত রামদেওড়ায়।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে আছেন এক জাগ্রত হিন্দুদেবী, সে দেশের মানুষ তাঁকে বলেন ‘বিবি’ নানী
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More