মানুষটি একা তৈরি করেছেন দুর্ভেদ্য অরণ্য, যেখানে থাকে বাঘ হাতি গণ্ডার

গত ৪১ বছরে যাদব মোলাই পায়েং-এর খামারের ৮৫ টি গরু, ৯৫ টি মোষ, ১০ টি শুয়োর খেয়েছে জঙ্গলে থাকা বাঘেরা। খামারের পশু হারিয়ে একটুও বিচলিত হননি যাদব।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৭৮ সালের জ্বালা ধরানো গ্রীষ্ম। অসমের ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ভাসছে ছোট্ট একটি দ্বীপ অরুণা সাপোরি। সেই দ্বীপের বালির চড়া ধরে হাঁটছিল ১৬ বছরের কিশোর যাদব পায়েং। জোরহাটের বালিগাঁও জগন্নাথ বড়ুয়া আর্য বিদ্যালয় থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়ে জন্মস্থানে ফিরছিল সে। প্রায় ১০ বছর পর। এগিয়ে চলেছিল যাদব আর বুকের ভেতরটা তার হু হু করছিল। এ কী দেখছে সে! মাত্র কয়েক বছরে দ্বীপের সবুজ উধাও! কত গাছ ছিল। সেই গাছের ডালে দোলনা বানিয়ে ঝুলত বালক যাদব। আজ সেখানে শুধু বালি আর বালি। সবুজের লেশমাত্র নেই।

ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে উঠছিল বালুচর।
আর একটু এগিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল যাদব

প্রখর রোদ মাথায় নিয়ে মাটিতে বসে পড়েছিল। অরুনা সাপোরি দ্বীপে ধূ ধূ মরুভূমির মতো তীরে মরে পড়েছিল কয়েক হাজার সাপ। এঁকেবেঁকে, গায়ে গায়ে জড়িয়ে, কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় কাঠ হয়ে পড়েছিল প্রাণীগুলি।কারণ, দ্বীপের বনজঙ্গল চেঁছেপুঁছে সাফ করে দিয়েছে মানুষের লোভ আর ব্রহ্মপুত্রের খামখেয়ালি গতিপথ।

অরুণা সাপোরি দ্বীপেই ছিল যাদব পায়েংদের গ্রাম। যদিও পায়েংদের পরিবার সেই গ্রামে আর থাকত না। ভূমিক্ষয়ের কারণে ১৯৬৫ সালে পায়েং পরিবার অরুণা সাপোরি ছেড়ে উঠে গিয়েছিল নদীর অন্য তীরে, ১২ কিমি দূরের মাজুলিতে। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে পায়েংদের যোগাযোগ ছিল। কারণ অরুণা সাপোরি দ্বীপে অবস্থিত যাদব পায়েংদের গ্রামে ছিল পায়েং পরিবারের পশুখামার। যেখানে থাকত প্রচুর গোরু -মোষ। চাষও করা হতো শুয়োরও। যাদব পায়েং-এর বাবা খামারটি চালাতেন।

কিন্তু যাদবের বাবা লক্ষ্মীরাম ও মা আফুলি মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মারা গিয়েছিলেন। ১৩ ভাইবোন নিয়ে গড়া, ভরা সংসারের হাল ধরতে কিশোর যাদব তাই তার জন্মস্থানে ফিরতে হয়েছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দুধের ব্যবসা দেখার জন্য। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের বালির চড়ায় মৃত সাপেদের ভাগাড়, যাদবের কিশোর মনকে সেদিন খেয়ালি ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের মতই অন্যপথে বইয়ে দিয়েছিল।

খামারে না গিয়ে যাদব গিয়েছিল দেওরি সম্প্রদায়ের গ্রামে

গ্রামবাসীদের বলেছিল সাপগুলির করুণ পরিণতির কথা। গ্রামবাসীদের অনেকে যাদবকে ওসব নিয়ে ভাবতে বারণ করেছিলেন। পারিবারিক দুধের ব্যবসার দিকে মন দিতে বলেছিলেন। কিন্তু এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী যাদবকে গ্রাম থেকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিশোর যাদবের হাতে ৫০ টি বীজ ও ২৫ টি বাঁশগাছের চারা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “গাছ লাগাও বাবা, শুধু সাপরা কেন আমরা সবাই বাঁচব। একটা কথা মাথায় রেখো, যেখানে গাছ, সেখানেই পাখি। যেখানে পাখি, সেখানে ডিম। যেখানে ডিম, সেখানে সাপ। আবার যেখানে গাছ, সেখানে চারা। যেখানে চারা, সেখানে জঙ্গল। যেখানে জঙ্গল, সেখানে বৃষ্টি। যেখানে বৃষ্টি, সেখানে চাষাবাদ ও তোমাদের গোরু -মোষের ঘাস।”

অবাক হয়ে বৃদ্ধ মানুষটির কথা শুনছিল কিশোর যাদব। বুকের ভেতর বৃদ্ধের প্রতিটি শব্দ গেঁথে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ মানুষটির কাছে শুনেছিল গাছ লাগাবার আদর্শ সময় এপ্রিল থেকে জুন। তাই বৃদ্ধের দেওয়া গাছের চারাগুলি প্রথমে সে খামারের পাশেই বসাল। যাতে রোজ জল দেওয়া যায়।

একাই সবুজ যুদ্ধে নেমে পড়েছিল কিশোর যাদব পায়েং

১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসের শেষে অরুনা সাপোরি দ্বীপের ক্ষয়ে যেতে বসা অংশে একাই বিভিন্ন গাছ ও বাঁশের কয়েকশো চারা লাগিয়েছিল যাদব। একই সঙ্গে ছড়িয়েছিল হাজার হাজার বীজ। যে বীজগুলি যাদব সংগ্রহ করেছিল, এক বছর ধরে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে। সে বছর একটু আগেই অসমে এসেছিল বর্ষা। যাদব পায়েং-এর লাগানো চারা গাছগুলির শিকড় আঁকড়ে ধরেছিল ক্ষয়ে যেতে থাকা মাটি। তারপর থেকে প্রতিবছর একই ভাবে গাছ লাগিয়ে চলেছিল কিশোর যাদব।

গাছগুলি বয়সে ও মাথায় বাড়ছিল, একই ভাবে বয়সে ও মাথায় বাড়ছিলেন যাদব পায়েং। এভাবেই কেটে গিয়েছে প্রায় ৪১ বছর। আজ, বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে বিশ্ব তাকিয়ে দেখে, ব্রহ্মপুত্রের নিরাশার বালুচরে ১৩৬০ একর জায়গা জুড়ে জেগে উঠেছে আস্ত একটা দুর্ভেদ্য অরণ্য। চার দশক ধরে রক্তজল করা পরিশ্রম করে যাদব পায়েং যা ভারতকে উপহার দিয়েছেন।

যাদব পায়েং-এর তৈরি ‘মোলাই ফরেস্ট’।

যাদব পায়েং-এর লাগানো বাঁশ, বহেরা, সেগুন, গাম্ভরি, কাস্টার্ড আপেল, তারা ফল, গুলমোহর, ডেভিল’স ট্রি, তেঁতুল, তুঁত, কাঁঠাল, কুল,জাম, কলা গাছ, এলিফ্যান্ট গ্রাসেরা এখন যাদবের মাথা ডিঙিয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। যাদবের তৈরি করা অরণ্যে এখন পাঁচটি রয়াল বেঙ্গল টাইগার, তিন বা চারটি একশৃঙ্গ গণ্ডার,শতাধিক হরিণ, বুনো শুয়োর, কয়েকশো শকুন, শতাধিক প্রজাতির পাখি বাস করে। আর বাস করে হাজার হাজার সাপ। যাদের জন্যই যাদব তাঁর এই অবিস্মরণীয় মিশন শুরু করেছিলেন। আজ স্থানীয় মানুষরা তাঁদের ‘নয়নের মণি’ যাদবকে ডাকেন ‘মোলাই যাদব’ নামে। মোলাই শন্দটির অর্থ জঙ্গল। আর সারাভারত বা বিশ্ব তাঁকে চেনে ‘ফরেস্ট ম্যান’ নামে।

গ্রাম ছাড়লেও, অরণ্য ছাড়েননি যাদব

৩৯ বছর বয়সে, বিয়ে করেছিলেন ২৫ বছরের বিনীতাকে। জন্ম নিয়েছিল তাঁদের তিন সন্তান, মুনমুনি, সঞ্জীব ও সঞ্জয়। সন্তানদের পড়াশুনোর জন্য, যাদবকে গ্রাম ছেড়ে ২০১১ সালে চলে আসতে হয়েছিল জোড়হাটের কোকিলামুখে। তবু একদিনের জন্যও বিচ্ছেদ হয়নি অরণ্যের সঙ্গে। যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘মোলাই ফরেস্ট‘। এখনও রাত তিনটেতে ওঠেন যাদব পায়েং। শুরু হয় তাঁর ম্যারাথন দৌড়। এক ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে যাদব পৌঁছন কার্তিক সাপোরিতে। সেখান থেকে নিজেই ডিঙি নৌকা চালিয়ে, ব্রহ্মপুত্রের উজান বেয়ে পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে নামেন অরুনা সাপোরি দ্বীপে। সেখান থেকে আবার আধ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে পৌঁছন তাঁর পশু খামারে।

আজও গাছ লাগিয়ে চলেন যাদব,এই বালুচরেই জেগে উঠবে ঘন অরণ্য সেই আশায়।

চারজন কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও নিজে হাতে গরুদের গোবর পরিষ্কার করেন। দুধ সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য শহরে পাঠান। সকাল ৯ টার মধ্যে এসব করে, জলখাবার খেয়ে যাদব গোবর ছড়াতে আর নতুন গাছ লাগাতে ঢুকে পড়েন, তাঁরই সৃষ্টি করা জঙ্গলে। যে জঙ্গলে বছরে ৩~৪ মাসের জন্য আশ্রয় নেয় ১১৫টি হাতির প্রকাণ্ড একটি দল। যে জঙ্গলে থাকা বাঘেরা গত ৪১ বছরে যাদব মোলাই পায়েং-এর খামারের ৮৫ টি গরু, ৯৫ টি মোষ, ১০ টি শুয়োর খেয়েছে। খামারের পশু হারিয়ে একটুও বিচলিত হননি যাদব। তাঁর কথায়, মানুষ ওদের জঙ্গল কেড়েছে, তাই মানুষকে তার দাম দিতে হবেই। মজা করে বলেন, “বাঘেরা তো পশুপালন ব্যাপারটা বোঝে না। তাই ওদের দোষ দিয়ে লাভ কী!”

প্রচারের আলোয় আসতে চাননি যাদব

যাদব পায়েং ‘মোলাই’ ফরেস্টের আড়ালে রয়ে যেতেন, যদি না জিতু কলিতা নামে স্থানীয় এক ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার জঙ্গলের ছবি তুলতে গিয়ে যাদবের দেখা পেতেন। ‘ভার্নাকুলার ডেইলি’ নামে এক পত্রিকায় ২০১০ সালে তিনি যাদবের কথা লিখেছিলেন। সেই প্রথম বিশ্বের নজরে এসেছিল, এই অসামান্য মানুষটির অবিশ্বাস্য কীর্তি। যাদবের এই অসামান্য ও একক অবদানের জন্য জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি ২০১২ সালে ‘আর্থ-ডে’র দিন যাদব পায়েংকে ‘Forest Man of India‘ শিরোপা দিয়েছিল।

ওই বছরেই ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এপিজে আব্দুল কালাম মুম্বইয়ে যাদব পায়েংকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করেছিলেন। ২০১৫ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী পুরস্কারও। ‘স্যাংচুয়ারি এশিয়া’ সংস্থাটির তরফ থেকে পেয়েছিলেন ‘ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৯০০ জন বিশেষজ্ঞের মধ্যে ছিলেন ভারতের যাদব পায়েংও।

পদ্মশ্রী পুরস্কার নিচ্ছেন যাদব পায়েং।
তবুও ম্লান যাদব পায়েং-এর মুখ

স্থানীয় প্রশাসন ও বনদফতরের কাছ থেকে উৎসাহ তো দূরের কথা, তেমন কোনও সাহায্যই পান না যাদব। একসময় বার বার দৌড়ে যেতেন বনদফতরের অফিসে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলতেন তাঁর জঙ্গলে লুপ্তপ্রায় গণ্ডার ঢুকেছে। তাদের সুরক্ষা দরকার। না হলে চোরাশিকারীরা গণ্ডারগুলিকে মেরে ফেলবে। কিন্তু তাঁর কথা কানেই তুলতেন না বনদফতর। ২০১২ সালে আগস্ট মাসে চোরাশিকারীরা তাঁর জঙ্গলের মধ্যে একটি গন্ডারকে মেরে খড়গ কেটে নিয়েছিল। গণ্ডারটির মৃতদেহ দেখার পর বনদফতরের বিশ্বাস হয়েছিল যাদবের তৈরি করা জঙ্গলে সত্যিই গন্ডার থাকে।

প্রসঙ্গটি উঠলে আজও ছলছল করে যাদবের চোখ,” জানেন, আমার ছোটো ছেলে আর আমি কয়েক দিন খেতে পারিনি, যখন দেখেছিলাম চোরাশিকারীরা গন্ডারটির খড়গ, লেজ আর নখ নৃশংসভাবে কেটে নিয়ে গেছে। কিন্তু কী করব, একটা বিশাল অরণ্যকে সুরক্ষা দেওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়।”

চোরাশিকারীদের হাতে প্রাণ হারাবার ঝুঁকি থাকা সত্বেও জঙ্গল পাহারা দেন যাদব পায়েং।
যাদব পায়েং চান, ‘মোলাই ফরেস্ট’ আয়তনে বাড়ুক

তাঁর আশা, অরণ্যটি মাজুলি, কমলাবাড়ি হয়ে একদিন ডিব্রুগড় জেলার সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলেছেন ‘ফরেস্ট ম্যান’ যাদব পায়েং। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া সমস্ত অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন ও করছেন বনসৃজনের জন্য। জঙ্গল লাগোয়া আরও ৫০০০ একর বন্ধ্যা জমিকে অরণ্যে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন যাদব। রোজ যখন অরুনা সাপোরি দ্বীপের আকাশে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ে, জঙ্গলের উঁচু উঁচু গাছেদের মগডালে চুমু দিয়ে সূর্যের শেষ রশ্মি যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদায় নেয়, তখন যাদব পায়েং-এর সাইকেল ছোটে উল্টো পথে। আবার সাইকেল-নৌকা-সাইকেল পর্ব মিটিয়ে বাড়ি ফেরেন যাদব। ঘড়িতে তখন বাজে রাত প্রায় আটটা।

রাতের খাবার খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন যাদব। কাকভোরে উঠতে হবে যে! বিছানায় শুয়ে যাদব মনে মনে হিসাব করেন আগামীকাল কতটা জমিতে কতগুলি চারা লাগাবেন। একসময় সবুজ যোদ্ধার সবুজ দুটি চোখে নেমে আসে ঘুম। সত্যিই ঘুমোন, না কি সবুজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে সবুজ ভোরের জন্য জেগে থাকেন ভারতের ‘ফরেস্ট ম্যান’ যাদব মোলাই পায়েং!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More