হাড়ের বাঁশি (একাদশ পর্ব)

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, দিনান্তের আকাশ মলিন আলোয় কোনও বিদেশির আঁকা পটচিত্রের মতোই নিঃসঙ্গ, দূর পশ্চিমে ডানা মেলে একসারি বক কোথায় যেন উড়ে চলেছে। আষাঢ় মাস, তবে আজ মেঘ নাই, পুবালি বাতাস বইছে আপনমনে, কে একটা সিড়িঙ্গে মতো লোক কাঁধে মই নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে রাস্তায় গ্যাসের বাতিগুলি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ঝলমলে রূপসী হয়ে উঠছে কলিকাতার রাজপথ। পথচারীরা অবাক হয়ে দেখছে এই আঁধার মুছে দেওয়ার খেলা! কয়েকদিন মাত্র হল পথের দুপাশে লোহার ফাঁপা থাম বসানো হয়েছে, সেই থামের ভেতর আবার সরু চোঙ আছে, ওই চোঙ বেয়েই গ্যাস এসে মাথায় বসানো চৌকোণো কাচে ঢাকা লন্ঠনের মুখে জমা হয়, কাচ খুলে আগুন ধরলেই ফুলের মতো আলো জ্বলে ওঠে।

ইদানীং রেড়ির তেলের বাতি এই চৌরঙ্গি অঞ্চলে আর দেখা যায় না। তবে পথের দুধারে যাদের বাড়ি, তাদের এই আলোর জন্য প্রতিমাসে অতিরিক্ত পাঁচ টাকা কর দিতে হয়। তা হোক, সন্ধ্যা হলেই চারপাশ কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সাহেবদের মনে হয় এবার তারা সত্যই সভ্য কোনও দেশে বসবাস করছে। সকলের তা মনে হলেও এই সাদা আলো মেরি হলওয়েলের মোটেও পছন্দ নয়, তরুণী মেরী এখনও পুরাতন দিনের অস্পষ্ট আলোছায়া ভালবাসে। এই যে আজ নির্মেঘ আকাশে অল্পক্ষণ পরেই চাঁদ উঠবে, কেমন ফিনফিনে দুধের সরের মতো জ্যোৎস্নায় ঢেকে যাবে চরাচর, মানুষের তৈরি ওই গ্যাসবাতি সেই মায়াজ্যোৎস্নাকে হত্যা করে তখন নিষ্ঠুর প্রতারকের মতো হেসে উঠবে। এই দৃশ্য মেরী সহ্য করতে পারে না, ক্যালকাটা গেজেট-এর সম্পাদককে সে গত সপ্তাহে চিঠি লিখে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। দীর্ঘ চিঠির শেষে মেরী লিখেছে, কলিকাতার নাগরিক সমাজের মনে সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তুলতে প্রতি পূর্ণিমায় গ্যাসের বাতি বন্ধ রাখার কথা যেন সরকার বিবেচনা করেন! 

 

টেবিলের উপর মাথা নীচু করে সদ্য লেখা কতগুলি শব্দের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেরী। সামনে খোলা জানলার ওপারে করুণ আলোর তন্তু দিয়ে বোনা কাপড় পরে বসে আছেন সন্ধ্যা। ঘরে এখনও সেজবাতি জ্বালানো হয় নাই, বেদনার মতো হয়ে উঠেছে চারপাশ। মেরীর পরনে একখানি স্কার্ট, উর্ধ্বাঙ্গে সেমিজের উপর একটি কালো রেশমবস্ত্র জড়ানো রয়েছে। অনাবৃত হাত দুটি সমুদ্র শঙ্খের মতো সাদা, একরাশ সোনালি চুল পিঠের উপর এলিয়ে পড়ে আছে। বাড়ির সামনে বাগান আলো করে অতসী ফুল এসেছে, মৃদুমন্দ বাতাসে কদম গাছের পাতাগুলি ঝিরিঝিরি করে কাঁপছে। কাগজের উপর কলম দিয়ে কী যেন লিখল মেরী, কয়েক মুহূর্ত পর খসখস করে আরও কয়েকটি শব্দ লিখল, একটি পঙক্তি শেষ করে এগিয়ে গেল পরবর্তী পঙক্তির দিকে।

অস্পষ্ট আঁধার নেমে এসেছে সারা ঘরে। মুখখানি তুলে বাইরের দিকে একবার তাকাল মেরী, চোখদুটি মেঘছায়ার মতো স্বপ্নারুণ, ঠোঁটের উপর একবিন্দু কালি লেগে রয়েছে, যেন পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যাতারা ফুটে উঠেছে। তার মনে পড়ছে এক যুবকের কথা, কুমোরটুলির সরকার বাড়ির সূর্যকান্ত সরকার, তিন মাস পূর্বে বাবু রাজনারায়ণ বসুর বাড়িতে একটি আলোচনা সভায় তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কিন্তু সেই আলাপ এখন ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়েছে। ইদানীং প্রায়শই তাদের দেখা হয়। ওয়ার্টালু স্ট্রিটের অভিজাত স্পেন্সেস কফিহাউসই সূর্যকান্ত ও মেরীর গোপন অভিসারস্থল। মাঝে মাঝে অবশ্য তারা রানি মুদি গলির অকল্যান্ড হোটেলেও যায়। তবে মেরীর পছন্দ হল সূর্যকান্তর ব্রুহাম গাড়ি চড়ে শহরের বাইরে দূরে কোথাও যাওয়া, গঙ্গা তীরবর্তী দক্ষিণেশ্বর বা অন্য কোথাও। নদী দেখলেই চব্বিশ বছরের তরুণী এখনও কিশোরীর মতোই উচ্ছল হয়ে ওঠে। নিজের লেখা পঙক্তিটি একবার পড়ল সে, দ্য ব্লু আইজ দ্যাট কনকিউর, মিট দ্য ডার্কার আইজ দ্যাট ড্রিম! মেরির বিষাদনীল চোখদুটির সঙ্গে দেখা হল সূর্যকান্তর ভ্রমরকৃষ্ণ চোখের, আষাঢ়ের মেঘছায়াতলে রচিত হল একটি বিজুরিরেখা, ছুটে গেল কত অশ্বারোহী সেনার দল, কুসুম সুবাসে ভরে উঠল বাতাস, একখানি মৃদু দীপ কে যেন জ্বেলে দিল ভুবনডাঙায়।

মেরি কলম তুলে নিয়ে পুনরায় লিখল পরের পঙক্তি, দ্য ডার্কার আইজ টু ইস্টার্ন, এন্ড দ্য ব্লু আইজ ফ্রম দ্য ওয়েস্ট! পূর্ব দেশের এক যুবকের সঙ্গে দেখা হল পশ্চিমদেশের এক যুবতির… তারপর? তারপর কী হল? পুব দেশ থেকে বয়ে আসা বাতাস পক্ষীরাজের মতো পাখা মেলে উড়ে গেল যুবতির হৃদয়ের দিকে। ওই দিকে তুষারাবৃত শৈলরাজি রয়েছে, কতদিন ওই হিমদেশে কোনও কুসুম ফোটে নাই, মেরী মনে মনে সেই কুসুমকথা ভাবল, আরও কয়েকটি পঙক্তি দুয়ারে অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই মরজগতে আলো ফুরিয়ে গেছে, সেজবাতির জন্য গলা তুলে বাড়ির ভৃত্যকে দুবার ডাকল সে। এই বঙ্গদেশের ভৃত্যরা বড় অলস, চোখে চোখে না রাখলে একটিও কাজ করতে চায় না! ওদিকে আপিস থেকে মেরীর স্বামী জর্জ হলওয়েলের ফেরার সময় হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স, রাজস্ব বিভাগের সিনিয়র অফিসার! বঙ্গদেশে ইংরাজ সরকারের উচ্চপদে চাকুরিরত ওই বয়সের মানুষদের আজকের দিনে পাত্র হিসাবে যুবক বলেই মনে করা হয়, মেরীর বাবা রিচার্ড হেন্সম্যানও তাই বিনা দ্বিধায় চব্বিশ বছরের তরুণী কন্যাকে তুলে দিয়েছেন তাঁর হাতে! তারপর কলিকাতায় শুরু হয়েছে মেরি আর জর্জের নূতন সংসার। এই দাম্প্যতের বয়স মাত্র আট মাস, গতবছর অর্থাৎ আঠারশো ঊনষাট সালের নভেম্বর মাসে তাদের বিয়ে হয়েছে। ওই যে সদর দুয়ারে গাড়ির কোচোয়ানের গলা শোনা যাচ্ছে, বগি গাড়ি করে আপিস থেকে মনে হয় ফিরলেন জর্জ। লেখার খাতাখানি বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল মেরী। এই খাতার কথা সংসারে কেউ জানে না, এমনকি সূর্যকেও বলেনি। এটিই মেরির নিজের ভুবন, লোকচক্ষুর অন্তরালে এখানে এসেই দুদণ্ড নিজের সঙ্গে কথা বলে সে!

 

প্রশস্ত বারান্দা পার হয়ে বৈঠকখানায় ঢুকেই জর্জ দেখলেন মেরি দাঁড়িয়ে রয়েছে, কালো কোটটা খুলে হাতে নিয়ে মেরির দিকে তাকিয়ে সামান্য বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ডার্লিং এখনও প্রস্তুত হও নাই ?

অবাক হয়ে মেরি জিজ্ঞাসা করে,

-প্রস্তুত? প্রস্তুত কেন হইব?

-তোমাকে যে কহিয়াছিলাম, আজ মি. ডোভের গৃহে নিমন্ত্রণ রহিয়াছে! ভুলিয়া গিয়াছো!

হঠাৎ যেন মনে পড়েছে এমন ভঙ্গী করে মেরি বলল,

-হাঁ বলিয়াছিলে, সরি, আমি ভাবিয়াছিলাম আগামীকাল 

-না, আজ, তুমি শীঘ্র প্রস্তুত হইয়া লও।

অন্যদিকে তাকিয়ে ধীর গলায় মেরি জিজ্ঞাসা করল,

-আমি না যাইলে তোমার অসুবিধা হইবে ?

যুবতি স্ত্রীর কথা শুনে কয়েক পা এগিয়ে এলেন জর্জ। মেরীর চিবুকখানি হাতে ধরে নিজের মুখের দিকে ফিরিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন,

-তোমার কি শরীর খারাপ লাগিতেছে ?

কোনও কথা না বলে দুদিকে মাথা নাড়ল মেরী। বৈঠকখানার বড় জানলাটি খোলা রয়েছে, ভাবে অচৈতন্য শরীরের মতো নূতন জ্যোৎস্না এসে পড়েছে মুখে, বর্ষার জল পেয়ে কদম গাছটি ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে, নীল চোখ দুখানি তুলে জর্জের দিকে একবার চাইল মেরি। এখান থেকে বড় রাস্তাটি চোখে পড়ে, পথঘাটে তেমন লোকজন নাই আজ, দু একখানি ল্যান্ডো মাঝে মাঝে যাতায়াত করছে, কলিকাতার সাহেবরা এইসময় গাড়ি চেপে হুগলি নদীর হাওয়া খেতে বেরোয়। গ্যাসের বাতিগুলি সব জ্বলে উঠেছে। কোনও বাড়িতে কেউ মনে হয় পিয়ানো বাজাচ্ছে, কী একটি অচেনা বিদেশি গানের সুর ভেসে আসছে। মেরিকে নিরুত্তর দেখে পুনরায় জর্জ জিজ্ঞাসা করলেন,

-তাহা হইলে কী হইয়াছে ?

চিবুক থেকে স্বামীর হাতটি সরিয়ে মৃদু গলায় মেরি বলল,

-কিছু হয় নাই। আজ কোথাও যাইতে ইচ্ছা করিতেছে না।

কী যেন ভাবলেন জর্জ। বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনও তিনি যথেষ্ট রূপবান, লম্বা গৌড়বর্ণ দেহ, তীক্ষ্ণ নাক, চোখ দুটি আয়তনে তেমন বড় নয়, কেমন যেন ভাবলেশহীন, মনোজগতের ছায়া সেখানে একেবারেই পড়ে না। তবে মানুষটি বুদ্ধিমান, প্রথম জীবনে সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, অভিজ্ঞতার নিরিখে লোকচরিত্র অতি সহজেই বুঝতে পারেন। সামান্য হেসে বললেন

-ইচ্ছা না হইলে যাইতে জোর করিব না, তবে যাইলে ভালো লাগিত। তোমার বিশেষ পরিচিত একজন আজ আসিবেন! 

পরিচিত জনের কথা শুনে চকিতে মুখ ফিরিয়ে মেরি জিজ্ঞাসা করে,

-কে আসিবে?

-তোমার মনে থাকিবার কথা, কয়েক মাস পূর্বে তোমার সহিত আলাপ করাইয়া দিয়াছিলাম!

একটু অধৈর্য স্বরে মেরি বলে ওঠে,

-কে? তুমি কাহার কথা কহিতেছ?

হুঁকোবরদার রহিম বক্স একটি গড়গড়া রেখে গেল, খাঁটি ভাগলপুরী তামাকের সুবাসে সমস্ত বৈঠকখানা সহসা ভরে উঠল। ঘরের মাঝখানে সাজানো সোফাসেটে বসে গড়গড়ার নলটি মুখে তুলে নিলেন জর্জ। দু-এক মুহূর্ত পর ধোঁয়া ছেড়ে মেরীর দিকে তাকিয়ে সামান্য কৌতুকের স্বরে বললেন, 

-যুবকটি হিন্দু কলেজে পড়িতেছে! মনে করিতে পারিতেছ না ?

হিন্দু কলেজ আর যুবক- এই শব্দদুটি শুনেই মেরীর মনে নদীর স্রোতের মতো ছলছল জলতরঙ্গ বেজে ওঠে! তাহলে কি সে আসবে? কিন্তু যতদূর সম্ভব নির্লিপ্ত মুখে বলে,

-না। বুঝিতে পারিতেছি না। আর কলেজে পড়া যুবক মি. ডোভের গৃহে কেনই বা আসিবে? 

মেরির কথা শুনে জর্জের মুখে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, ধীর গলায় বলেন,

-কুমোরটুলির সূর্যকান্ত সরকারের কথা কহিতেছি! শুনিয়াছি বাবু রাজনারায়ণ বসুর সহিত সে আসিবে।

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় বললেন,

-পারিতেছ মনে করিতে?

-নাম মনে পড়িতেছে না, তবে দেখিলে হয়তো চিনিতে পারিব! 

-দেখিবার জন্য তো যাইতে হইবে! তোমার যাইতে

জর্জের কথা শেষ হওয়ার আগেই মেরি বলে ওঠে,

-আচ্ছা আচ্ছা হইয়াছে! আমাকে না লইয়া তোমার যাইতে ইচ্ছা করিতেছে না সে-কথা মুখ ফুটিয়া একবার বলিলেই হয়!

আষাঢ়ের মেঘমুক্ত আকাশ চঞ্চলা নদীর মতো জ্যোৎস্না স্রোতে ভরে উঠেছে, বাগান থেকে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। কেউ কোথাও নাই, সন্ধ্যা পার হয়ে নির্জন রাত্রি এখন তাঁর আঁচলখানি বিছিয়ে দিয়েছেন ভুবনডাঙায়। একখণ্ড মেঘ ভেসে ভেসে চন্দ্রপ্রভার দিকে বয়ে চলেছে, পুব বাতাসে জলের সুবাস এখন স্পষ্ট, হয়তো দূরে কোথাও বৃষ্টি এসেছে। তরুণী স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন জর্জ। যৌবনবতী তরুণীর সারা অঙ্গে হঠাৎ যেন বসন্তের সুর শোনা যাচ্ছে। জর্জের মুখে শীতঋতুর মলিন অপরাহ্ণের মতো হাসি ফুটে উঠল, জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর আপনমনে নিজেকে শুনিয়েই যেন বললেন,

-তুমি না থাকিলে আমার যে কী হইত!

কুমোরটুলির বড় রাস্তার উপর সরকারদের প্রাসাদতুল্য বাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন বনমালী সরকার। এই ভদ্রাসনের খ্যাতি সারা কলিকাতায় এমন ছড়িয়ে পড়েছিল যে এখনও অনেকে ছড়া কেটে বলেন, বনমালী সরকারের বাড়ি/ গোবিন্দ মিত্রের ছড়ি/ নকুধরের কড়ি/ আর উমিচাঁদের দাড়ি! বনমালী সরকার শেষ জীবনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ডেপুটি ট্রেডার ছিলেন, সারা জীবনে প্রভূত অর্থও তিনি উপার্জন করেন, হুগলি পরগণায় অনেকগুলি জমিদারি ক্রয় করার পাশাপাশি নুনের ব্যবসায় অল্প সময়েই ফুলে ফেঁপে ওঠেন। ধীরে ধীরে নানাদিক থেকে তাঁর আয় ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কুমোরটুলির এই বসত-বাড়িটি তিনি নির্মাণ করান। প্রায় একশো বছর অতিক্রম করেও বাড়ির জৌলুস বিন্দুমাত্র কমেনি। সামনে খিলান দেওয়া সদর দরজা, মাঝে প্রশস্ত আঙিনা ঘিরে চকমিলানো তিনতলা দালান, বড় রাস্তার উপর রেলিং দেওয়া লম্বা বারান্দায় দাঁড়ালে প্রায় গঙ্গার ঘাট অবধি দেখা যায়। সমস্ত ঘরের মেঝে সাদা মার্বেল দিয়ে তৈরি, চিনদেশের ফুল লতাপাতা ড্রাগন আঁকা নীল রঙের টালি দিয়ে সাজানো হয়েছিল কলঘর। সব মিলিয়ে গৃহে প্রায় চল্লিশটির উপর কক্ষ, একেবারে মাথায় ছাদের উপর একখানি সিংহমূর্তিও রয়েছে। সরকারদের অতীত যুগের সেই রবরবা এখন না থাকলেও বাবুয়ানি কিছুমাত্র কমেনি। এখনও দোলযাত্রায় প্রায় লক্ষ টাকা খরচ করা হয়। এছাড়া নূতন যুগের নিয়ম মেনে বাঁধা রাঁড়বাড়ি, সুরাপান, বাইনাচ, হাফ-আখড়াই, বুলবুলির লড়াই এসব তো রয়েইছে! তবে সূর্যকান্ত এই পরিবারের একমাত্র উজ্জ্বল ব্যতিক্রম! হিন্দু কালেজের বন্ধুরা অনেকেই তাকে ঠাট্টা করে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ বলে ডাকে। পঁচিশ বছর বয়স হল অথচ এখনও অবধি রাঁড়বাড়ি যায়নি, কলিকাতার বাবু সমাজের কলঙ্ক বললেও তার বিষয়ে কম বলা হয়! এমন সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড কেউ কখনও শুনেছে! সম্পর্কে বনমালী সরকারের পৌত্র এই সূর্যকান্ত, তারা ছোট তরফের শরিক, শোনা যায় বিদ্যাসাগর মহাশয় নাকি তাকে বিশেষ স্নেহ করেন।

 

আজ সকাল থেকেই চারপাশ আঁধার করে বৃষ্টি নেমেছে, সুদুর কোনও জগত থেকে অশ্বারোহী সেনার মতো ছুটে আসছে জলকণা, আষাঢ়ের ঘন মেঘ গর্ভবতী রমণীর মতো অলস ভাবে আকাশ-শয্যায় যেন শুয়ে রয়েছে। চঞ্চল বাতাসের দোলায় গাছপালাগুলি উন্মুত্ত হয়ে উঠেছে, কে যেন শিকল দিয়ে তাদের পা মাটিতে বেঁধে রেখেছে আর সেই বন্ধন ছিন্ন করে তারা প্রতি মুহূর্তে পালিয়ে যেতে চাইছে। মুহুর্মুহু বজ্রপাতের শব্দে মনে হচ্ছে কলিকাতায় বুঝি প্রলয় শুরু হয়েছে, পথঘাট জনশূন্য, সকাল প্রায় দশ বাজে এখন, অন্যদিন এসময় কেরাঞ্চি আর ব্রাউনবেরি গাড়িতে ভরে থাকে পথ, বাঙালি কেরানিদের আপিসে যাওয়ার তাড়া থাকে, হু হু করে ছুটে যায় ঘড়ির কাঁটা। আজ তার গতিও কেমন যেন মন্থর। কালেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দোতলায় নিজের ঘরে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে সূর্য, মাঝে মাঝে জানলা খুলে দেখছে, এলোমেলো বাতাস আর জলের দাপটে প্রায় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দিতে হচ্ছে জানলা। বৈঠকখানায় ঢং ঢং করে মেকাবি ঘড়ির ঘণ্টা পড়ল, আজ বোধহয় আর যাওয়া হবে না। অথচ তার অপেক্ষা করার কথা ছিল, মেরীর মুখখানি মনে পড়তেই সূর্য আরও যেন অস্থির হয়ে উঠল। ইদানীং প্রায়ই কালেজের ক্লাস বন্ধ করে দুপুরের দিকে মেরীর সঙ্গে সময় কাটায়, সহপাঠীরা কিছু জিজ্ঞাসা করলে কোনও একটা অজুহাত দিয়ে তাদের এড়িয়ে যায়, মেরী হলওয়েল, নীলনয়না ওই বিদেশিনীকে দেখলেই সূর্যর ইংরাজ কবি জন কীটসের একটি পঙক্তি মনে পড়ে, দ্য পোয়েট্রি অব দ্য আর্থ ইজ নেভার ডেড! বাড়ির ব্রুহাম গাড়িটি ব্যবহার করে সূর্য, কোচোয়ান আসগর মিঞা আজ বোধহয় গাড়ি জুড়তে পারেনি। মেঘের ডাকে ঘোড়াগুলি বড় চঞ্চল হয়ে ওঠে, পথে বেরোলেই ভয় পেয়ে আবার আস্তাবলের দিকে ফিরতে চায়। মেরীর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল রাজনারায়ণ বসুর বাড়িতে। তার স্বামী জর্জ একজন শিক্ষিত হৃদয়বান মানুষ, এদেশে স্ত্রী-শিক্ষা এবং বিজ্ঞান চর্চার প্রসারের বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সঙ্গেও তাঁর আলাপ রয়েছে, বঙ্গদেশের অনেক দরিদ্র বিধবার বিবাহের জন্য নিয়মিত অর্থ সাহায্যও করে থাকেন, সেইদিন সন্ধ্যাবেলায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তখন চৈত্র মাস, রাজনারায়ণ বসুর বাড়ির বাগান পুলক জুঁইয়ে থইথই, ধীর পায়ে যৌবনবতীর বিরহের মতো সন্ধ্যা এসে দাঁড়িয়েছেন ভুবনডাঙার দুয়ারে, বৈঠকখানায় সেজবাতির আলোয় মেরিকে প্রথম দেখে সূর্যর শ্বেত গন্ধরাজ কুসুমের কথা মনে ভেসে উঠেছিল। মেরী সমুদ্র ফেনার মতো শুভ্র একখানি ক্রিনোলন পরেছে, পোশাকটি কাঁধে থেকে কোমর অবধি আঁটো হয়ে চেপে বসে আছে তারপর পদ্ম পাপড়ির মতো বিস্তৃত হয়ে পায়ের পাতা ছাড়িয়ে মেঝের উপর লুটিয়ে পড়েছে। ক্রিনোলনের হাতা বাহুমূলের উপরেই আকস্মিক শেষ হয়ে গিয়েছে, নিরাভরণ হাতদুটির দিকে চেয়ে থাকলে আকাশের কথা মনে পড়ে। শীতঋতুর ঊষালোকের মতো স্তনের আভাসটুকু শুধু ফুটে উঠেছে, গলায় একছড়া মুক্তোর মালা, ঘন কেশরাজির মাঝে যত্ন করে সিঁথি আঁকা হয়েছে, যেন একাকী কোনও বনবীথি। মাথার পেছনে চুলগুলি আঁটো করে বাঁধা, বামহাতের মণিবন্ধে মুক্তোর ব্রেসলেটের মাঝে জ্বলজ্বল করছে একটি নীলা। অল্প দু-একটি কথা হয়েছিল সেদিন, সকলের অনুরোধে একটি গান গেয়েছিল মেরী, সুর-কথা সবই অচেনা কিন্তু কিছুক্ষণ শোনার পর একসময় সেই সুরও খুব চেনা মনে হয়েছিল সূর্যর। গানের মাঝে দু-একবার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল, নির্মেঘ চৈত্র আকাশে সেদিন কোনও বিজুরি চমকে ওঠে নাই কিন্তু মধুবাতাস বয়েছিল, বিদায় নেওয়ার আগে সূর্য নাম জিজ্ঞাসা করায় চঞ্চলা কিশোরীর মতো নীল দুটি চোখে মৃদু হেসে বলেছিল, মেরী! 

 

বারিধারার বেগ কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, বাতাসও অনেক শান্ত এখন, উঠান পার হয়ে সদর দরজার কাছে এসে সূর্য দেখল আসগর মিঞা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে একমুখ হেসে বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, ছোটকত্তা যাবা নি ?

-মিঞা, গাড়ি চালাতে পারবে তুমি ?

-কত্তা, আসগর কি মর্চে ? 

তারপর একটু চুপ করে থেকে পুনরায় বলে,

-আসো দেকি, গাড়ি বাঁধি, আর চিন্তা কর্ত্তে হবে নাই! 

 

বৃষ্টি ধরে এলেও কলিকাতার পথঘাট জল থইথই, দুপাশে কাদা, চিৎপুরের কাছে পথের উপর একখানি বড় বটগাছ উপড়ে পড়েছে, যেন হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে শুয়ে আছে। গাছের মগডাল থেকে কাকের বাসা ভেঙে ছোট ছোট ডিমগুলি এদিক ওদিক পড়ে রয়েছে, কোনওক্রমে ডালপালা পাশ কাটিয়ে আসগর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলল চৌরঙ্গির দিকে। এখনও আকাশ অভিমানীর মতো মুখ ভার করে বসে রয়েছে, বাতাসে জলের রেণু ভাসছে, গাড়ির একফালি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে বসে আছে সূর্য। বর্ষা তার বড় প্রিয় ঋতু, কেমন আকাশ কালো করে বর্গি হানার মতো ছুটে আসে ঘন মেঘ, একদিক কৃষ্ণবর্ণ আর অন্যদিকে জেগে ওঠে রুপোর ফিতার মতো আলো, বাতাসে কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায় জলের নুপুরধ্বনি, গাছপালাগুলি মাথা নীচু করে যেন কাকে অভিবাদন জানায়। তবে বৃষ্টি আসার আগের রূপই বেশি পছন্দ সূর্যর, বৃষ্টি শুরু হলেই মনে হয় সমস্ত রূপোরহস্য ভেঙে গেল! 

পথঘাট জনশূন্য, একটি গাড়িও চোখে পড়ছে না, ইদানীং পালকির দিন শেষ হয়ে এলেও এখনও একেবারে উঠে যায়নি, অন্যদিন এই সময় বেহারারা হুম হুম করে কোনও বাবুবাড়ির বউ নিয়ে গঙ্গার দিকে যায়, আজ তাদেরও দেখা নাই। হঠাৎ সূর্যর মনে হল, আচ্ছা এমন দিনে বারাঙ্গনাদের গৃহও কি শূন্য থাকে? তার বন্ধুদের অনেকেরই বাঁধা রাঁড় রয়েছে, পিতাঠাকুরেরও চোরাবাগানে কে একজন বিন্তিরানি আছে বলে শুনেছে। কতবার ভেবেছে একবার গেলে হয়, কিন্তু পরমুহূর্তেই ইচ্ছা হয়নি আর! তবে লোকের মুখে সে পাড়ার গালগল্প শুনতে মন্দ লাগে না, বিশেষত গান, সেগুলো বেশ মধুর! ওই যে আসগর মিঞা নিজের মনে গান ধরেছে, বাদলা দিনে সুরটি প্রজাপতির মতো পাখা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে, আয় আয় মকর গঙ্গাজল/ কাল গোলাপের বিয়ে হবে সৈতে যাব জল! আসগরের বয়স হলেও গলাটি বেশ, ঝিপঝিপ বৃষ্টি শুরু হল আবার, অদূরে কোথাও মনে হয় কদম ফুটেছে খুব, কুসুম সুবাস ভেসে আসছে বাতাসে, সহসা মেরীর মুখখানি মনে পড়ল সূর্যর! 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More