হাড়ের বাঁশি (চতুর্থ পর্ব)

নদটির পোড়ো ঘাট,ছোট ছোট বাংলা ইঁট বের করা পৈঠা। নরম শ্যাওলার পরত, খালি পা রাখলে সবুজ রঙ লেগে যায় পায়ের তলায়। মোটা কাছি দিয়ে টুকরো একখান নৌকো বাঁধা থাকে দিনমান,এপার ওপার করে। এদিককার মোতিগঞ্জ থেকে ওদিকের সোনারুন্দি যায় আর আসে, আসে আর যায়। দরিদ্র ব্রাহ্মণের মতো শীর্ণকায় নদের নামটি যে কী, কেউ তা মনে রাখেনি। ধরা যাক তার নাম অপ্রতিম।

নৌকো বায় এক মেঝেনি, সোমত্ত যুবতি। দিয়াসিনি মায়ের মতো একঢাল চুল, কপালে সিন্দুরের টিপ, খাঁড়া নাক, তবে নাকটি একটু বাঁকা। ছোট্ট পাথর বসানো নথ ঝলমল করে আলোয়। লোকজন ছাগল-মুরগি, ঝাঁকা বোঝাই তাজা সবজি, রূপশালী ধানের বস্তা নিয়ে নৌকোয় ওঠে। মেঝেনি তাদের কুসুমপুরে নিয়ে যায়। ষোলো আনা ভাড়া ফেরির।

বর্ষার জলে তেমন ফুলে ফেঁপে ওঠে না অপ্রতিম, যা খায় তার শরীরে লাগে না কিছুই। তবে মেঝেনি বলে, মাঝখানে দু’এক জায়গায় নাকি চোরাবালি আছে, পা টেনে ধরলে কোন অতলে তলিয়ে যেতে হবে। অনেক বছর আগে এক যুবক মরেছিল। শ্রাবণ মাস, মেঝেনি বহু চেষ্টা করে যখন তুলে আনে তখন যুবকটি মরে কাঠ। ফুলে ঢোল দেহখানি। ভারী ঠোঁট দুটো কালচে নীল হয়ে গেছিল, মেঝেনির চোখ দুটি খুলে দেখার বড় বাসনা হয়েছিল। মরা মানুষের চোখ তো খোলে না সহজে,তাই আগুন খেয়েছিল যুবকের চক্ষুদুটি।

কার্তিক মাসে নদের ওপর সারা রাত ধরে কুয়াশা পড়ে। ভোরবেলা সেই ধোঁয়ার তন্তুজাল কেটে বেরিয়ে আসে মেঝেনির নাও। দুপাশে নিথর গাছপালা, অনেক দূরে সাদা চাদরের মতো জনপদ, বালুচর, বেথুর আর শটিবনের দল। দু একটি গাঙশালিখ অস্পষ্ট জলরেখার মতো ওড়াওড়ি করে। নৌকোয় হাল ধরে চুপ করে বসে থাকে মেঝেনি, থুতনিটা শুধু একটু নামানো অপ্রতিমের দিকে। মেঝেনি তাকে মনে মনে বলে, সব ভালবাসা কি একরকমের হয়, বলো, বামুন ঠাকুর?

তারপর বেলা হয়, আলো হয়, নৌকো পারাপার করে, মোতিগঞ্জের সওয়ারি নামে সোনারুন্দির ঘাটে আর সোনারুন্দির যাত্রী ফেরে মোতিগঞ্জে। এপারে পীরের মাজার আছে, গরীব ন্যাংটা পীর। ওই দু’পয়সা চার পয়সার খদ্দেররা আসে। সস্তা ধূপ জ্বালায়, সিন্নি মানত করে। সবুজ চাদর দেয় কেউ। মেঝেনি কদিন হল প্রতি রাতে কোন এক আবছা জগতের স্বপ্ন দ্যাখে, দুটো দাঁড়কাক উড়ে উড়ে কোথায় যেন যায়, সারাদিন মনমরা হয়ে চেয়ে থাকে। পীরের থানে তিনটাকার সিন্নি মানসিক রেখেছে, স্বপ্নদোষ যেন সেরে যায় তার। নাহলে পার করবে কী করে মানুষকে!

ওদিকে সোনারুন্দির রাজবাড়ির মেজোকত্তাবাবা পালা বসাবে আসছে পৌষ মাসে। শহর থেকে থেটারের লোক আসবে, খ্যামটা নাচ হবে। নবান্নের ধান বেচে লোকের হাতে দুটো পয়সা আসে তখন, জোর আমোদ হবে। সারারাত, তিনরাত ধরে গমগম করবে ভটচায বাড়ির উঠান। হ্যাজাক জ্বলবে, লোহার হাঁড়িতে পাঁচমেশালি চাল ডাল আনাজপাতি নতুন আলোর খিচুড়ি ফুটবে গুবগুব করে। সে রবরবা আর নাই ভটচাযদের, তবু দালান কোঠা রক্তটুকু তো আছে।

কত্তাবাবার চাই ওখানে আমাদের মেঝেনিকে! মল পরে নাচবে কেমন ঝুমুর ঝুমুর। কেষ্ট সাজে সে, মাথায় শোলার মুকুট, নীল রঙ অঙ্গে। আড়বাঁশিটি ধরা হাতে, তাতে ফুঁ দিলে দুলে ওঠে অপ্রতিম! বেথুর ঝোপে কদম ফুল ফোটে থোকা থোকা। কেষ্টর রাধা নাই, একা একাই ঘুরে ফিরে নাচে কাঁদে, নিজেই নিজের সখা।

তা কেষ্ট সাজলেই তো হল না, দিন কতক অভ্যেস তো চাই। অঘ্রানের মাঠে ধান নাই, ফসল নাই, খাঁ খাঁ করছে নদটির চর। সেখানে রাত হলে নাচ শুরু করে মেঝেনি। দিনমানে তার সময় কই! সূয্যি ডুবলে, নাওখানি ঘাটে বেঁধে তবে শান্তি, দু দণ্ডের ছুটি।

কুয়াশা নামে একটু একটু করে। কেমন ঘোলা ঘোলা চারপাশ। একেকদিন চাঁদ ওঠে, সেও মরা আলোর পিদিমের মতো। মেঝেনি নাচে, দুলে দুলে নাচে। অঙ্গের কাপড়খানি খুলে যায় কত সময়। কেষ্ট সাজা কি মুখের কথা!

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, একতাল আবছা আলো উঠছে আর নামছে, কখনও আবার ঢেউ হয়ে গড়িয়ে পড়ছে মাটির ওপর। টি টি করে ডেকে ওঠে রাতচরা পাখি, ডানা ঝাপটে উড়ে যায় নিশুত রাতে।

চন্দ্রদেব চেয়ে থাকেন অপলক।

 

ওদিকে মাণিক্যহারে বিকেলে দূর দেশ হতে মেঘ ভেসে এসেছে। দিঘির চারপাশ কেমন আঁধার হয়ে উঠল, থলকমলের গাছখানি মুখ নীচু করে কৃষ্ণবর্ণ জলে নিজের রূপের দিকে চেয়ে আছে, বাগানে আমগাছের ডালটি কয়েকদিন আগের ঝড়ে অনেক নেমে এসে দিঘিটিকে যেন সোহাগ করে জড়িয়ে ধরেছে। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। তোমার ভাঙা দালানে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছ। গোপাল জিউয়ের শয়ানের সময় হল। মিছরি আর কাঁচা ছানা রাখা ওই বালকের সামনে। শঙ্খ বাজবে এইবার। পাকা জামে গাছ থইথই, ফলের গন্ধে উঠানে পাকুড়তলায় কলাবাদুড়ের দল চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তুমি কি ফিতা-আয়না নিয়ে চুল বাঁধতে বসেছ ?

দাওয়ার পাশ দিয়ে সুঁড়িপথটি চলে গেছে ভিটার আরও গহীনে। বনতুলসীর মঞ্জরীভরা পথ। বৃদ্ধ পুরোহিত মণিরাম ভট্টচা্য সকালবেলায় মুঠি করে তুলসী নিয়ে যান মন্দিরে, শ্বেতচন্দনে স্নান করে সেই তুলসী স্থান পায় রাধাগোবিন্দজীউয়ের চরণপদ্মে। ওই যে মন্দির দালান থেকে নেমে সরসর করে একটি সাপ চলে যাচ্ছে, ওর নাম বাসুদেব। মেজোকত্তা রেখেছিল নামটি। সেসব কতকাল পূর্বের কথা! কত্তার পরনে সাদা শান্তিপুরি ধুতি আর পায়নাপেলের চাপকান, মিশিকালো সরু গোঁফ, বামহাতের মধ্যমায় একখানি নিলা জ্বলজ্বল করছে। উত্তরের সেরেস্তায় একটি জলচৌকির উপর বসে আছেন, ভাগলপুরি তামাকের সুবাসে ম ম করছে ঘরখানি। নায়েব রামহরি দত্তকে বলছেন, হরি,এ বচ্চর দেবোত্তর জমিতে আউশ তেমন হল নাই ক্যানো ?
আজ্ঞা কত্তা,বানের জল ঢুকে
ও তো ড্যাঙার জমি! বানের জল এলো কত্তেকে ?
মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন রামহরি। বোকো মাখানো রুমাল দিয়ে মুখখানি মুছে মেজোকত্তা জিজ্ঞাসা করলেন, অঘঘানে লবাণের পর কীত্তনের দল আনতে বলচি, তা মনে আচে তো ?
আজ্ঞা, দাঁইহাটের নরোত্তম গোঁসাইয়ের সাথে কতা বলেই রাকচি!
হাঁ, তালেগোলে ভুলে যেও না যেন!
একগাল হেসে রামহরি বলেন, কী যে বলেন কত্তা!

রুমালটি মুখের কাছে ধরেই আছেন মেজোবাবু, কী যেন চিন্তা করছেন! এককোণে নীল সুতো দিয়ে দুটি ফুল আঁকা রয়েছে। হেমলতা ওই নক্সা তুলেছিল, ওই যে পুব দিকের মহালে থাকতো। দূর সম্পর্কের জ্ঞাতি, সোমত্থ বিধবা,গত চৈত্রে ধুতরা-বিচি খেয়ে মরেছে। মেজোকত্তা সুরেন্দ্রমোহনের লতার মুখখানি আবছা মনে পড়ছে। মাণিক্যহার গাঁয়ে সেবার খুব কথা রটেছিল, কেউ কেউ বলে লতার নাকি গর্ভ হয়েছিল। তা গাঁ-ঘরে ওমন গর্ভ কতই হয়,সব ধরতে নাই। গাঁয়ের লোকের আর কাজ কী, পানা পুকুরের মতো অলস জীবন, কেচ্ছা পেলেই হল, নাওয়া খাওয়া ভুলে তাই নিয়ে মেতে ওঠে। কদিন গাঁয়ের চণ্ডীতলায় জোর কানাকানি হল, তারপর চড়কের মেলা এল, দণ্ডীবাবার থানে গাজনের সন্নিসিরা ব্যোমব্যোম করে উঠল, পিঠে শিক ভুকিয়ে চড়কগাছে উঠে ঘুরল, ছেলে বিয়োনো শূন্য মাঠে বিবাগী বাতাস বয়ে গেল, জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রে ভুলোর চর দুধের সরের মতো পড়ে থাকল ভুবনডাঙায়, ধীরে ধীরে লতার কথা ভুলে গেল সবাই। 


পুব মহালের জাফরিকাটা বারান্দাখানি কবেই ভেঙে গেছে। ওখানে বসে এক আষাঢ় অপরাহ্ণে লতা টগরবালাকে শুধিয়েছিল, পুরুষ মানুষ এতো সাত্তোপর হয় ক্যানে দিদি!

মরা দিঘির জলে তখন মেঘের ছায়া পালদের ডাগর হাঁসগুলির মতো খেলা করছে। পশ্চিমাকাশ ফিকে লাল হয়ে উঠেছে, যুবতির অভিমানের মতো মলিন আলোর রেণু দিয়ে কে যেন সাজিয়ে দিয়েছে পাকুড়তলা, গোল উঠান, কুলদেবতার মন্দিরের চূড়া। নাটমন্দিরে গুব গুব করে আষাঢ় মাসের বৈকালের মতোই পায়রা ডাকছে। তুলসীতলায় ছায়াশরীরখানি নিয়ে বসে আছে কে এক রমণী। তার এলোচুলে পুরাতন ভিটার সুবাস লেগে রয়েছে। ছায়া ছায়া আঁধার হয়ে কামিনী কুসুম ফুটেছে কোথাও। ওই যে দূরে গাঁয়ের বাহিরমুখী পথখানি যৌবনবতীর আঁচলের মতো ধানখেত পার হয়ে ভুলোর চরের দিকে চলে যাচ্ছে, চরের ধু ধু বালুর উপর আষাঢ়ের বাতাস বইছে, দক্ষিণে দু ক্রোশ এগোলেই গঙ্গা। সুরধুনির ঘাটে বসন্ত মিঞার গস্তি বাঁধা রয়েছে এখনও। হেমলতার খুব ইচ্ছা বসন্ত দাদার নৌকো চড়ে ভাগীরথী বেয়ে মুকসুদাবাদের দিকে বেড়াতে যাবে! ওইখানে কাঠগোদামের গোলাপ বাগান থেকে কয়েকটি গোলাপ চারা নিয়ে ফিরে আসবে। সেই গোলাপ,যা কিনা গিরিধারীর উঠানে এখন ডানা মেলে ফুটে উঠেছে!

টগরবালার চুল বাঁধা সাঙ্গ হল। সন্ধ্যা আলোয় গোলাপগুলি কেমন ঝলমল করছে। ভাঙা ভিটার দিক থেকে ঝিঙেফুল ফোটার শব্দ ভেসে আসছে। দুটি গোলাপ হাতে নিয়ে পুব মহালের দিকে যাবে সে। লতাকে সে কথা দিয়েছিল, প্রতি সন্ধ্যায় গিরিধারীজিউয়ের পাশে দাঁড়ানো রাধারাণীর জন্য কুসুম নিয়ে যাবে! তবে লম্ফ নিয়ে নেয় ইদানীং। এখন দিনের আলো আর নাই। সাপখোপ কি কম আছে ও-পথে! তবে বাসুদেব রয়েছে, ভিটার বাস্তুসাপ। পুরাতন বাতাসে লম্ফ নিভে গেলে মাথার মণি জ্বেলে সে পথ দেখাবে,চিন্তা কী!  উঠানের দিকে চেয়ে আপনমনেই টগর বলল, যাই আর দেরি করব না! 

ফিরে এসে আবার খেতে দিতে হবে। কোলের ছেলে গোপালচন্দ্র আজ ছমাস হল ভুগছে। বড় ক্ষুধা তার। কতই বা বয়স! গত পৌষে আট পুরল। রোগে ভুগে ভুগে মুখখানি কেমন কাজললতার মতো মলিন হয়ে উঠেছে, কালবাতাস বইলে গোপালের ক্ষুধা পায় খুব।

 

শিথিল কবরীর মতো আঁধার নেমে এসেছে। অল্পক্ষণ পূর্বে সাত ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে পশ্চিমদিকে রওনা দিয়েছে আলো। কাপাস তুলোর গাছ থেকে দু’একটি পাতা খসে পড়েছিল রথের উপর। মাণিক্যহারের পুরাতন পাটবাড়ির উঠানে সন্ধ্যারতি শুরু হবে এবার। বিশ্বাসদের রাঙা বউ কৃষ্ণকায় তেঁতুল দিয়ে মরাদিঘির পৈঠায় বসে পেতলের বাসন ঘষে ঘষে মাজছে। ওগুলি পূজার বাসন, বউটির গত কার্তিকে বিয়ে হয়েছে, ওর নাম বাসনা।

রূপের ভারী দেমাক, ঝুমুর ঝুমুর পায়ের মল বাজিয়ে মনঅলিন্দে যাতায়াত করে,আষাঢ় আকাশের মতো এলোচুলে কদম সুবাস লেগে থাকে সর্বদা,চোখ দুটি দেখলে মনে হয় সন্ধ্যার পুকুর ঘাট থেকে কে যেন হাঁসেদের চই চই চই করে ডাক দিয়েছে। গাঁ ঘরের মেয়ে, তেমন ভালো শাড়ি নাই পরনে তবুও সাজিমাটি দিয়ে কাচা লালপেড়ে শাড়িটি বৈকালে অঙ্গে দিলে তরুণ অগ্নির মতো রূপ জ্বলে ওঠে। সে তখন শীল বাবুদের আম বাগান পার হয়ে, গ্রামের পুরাতন গড়ের পাশ দিয়ে লকলকে ধানখেতের মধ্যে কুমারী যুবতির সিঁথি পারা আলপথ ধরে হেঁটে হেঁটে দিকচক্রবাল রেখার দিকে বেড়াতে যায়। ওইদিকেই ভুলোর চর। চরের ওপারে ক্ষীণকায়া সুরধুনি। দু একটি পানসি আনমনা পথিকের মতো ভেসে যায়, কোথায় তারা যায় কে জানে! মাঝে মাঝে মাঝির গলা থেকে অস্পষ্ট গান ভেসে আসে, চরের দামাল শিশু বাতাসের দোলায় সদ্য বিধবার শাঁখা পলার মতো গানের শরীর থেকে সুর খসে পড়ে। তাদেরকে যত্ন করে দুই হাতের মুঠোয় তুলে নেয় বাসনা। অল্প আদর করে, তারপর আবার মুঠো খুলে দিনান্তের আলোর পানে ভাসিয়ে দেয়। ওই তার অপরাহ্ণের খেলা। সেসব দিনে ভুলোর চরে চখা চখী উড়ে বেড়ায়, ভাদ্র মাসে কাশফুল ফোটে ওইদিকে। শ্বেত তুলোয় তৈরি কাশ বনে তারা উড়ে উড়ে বাসনার সঙ্গে গল্প করে,কেমন সেই আখ্যান ?

কেউ কখনও শোনেনি ওই গল্পকথা, কিন্তু গ্রামের বৃদ্ধ মানুষেরা অনুমান করেন আখ্যানটি বহু পুরাতন। ওই কাশবনে যে দেবীর গড় ছিল তাঁর রূপজগতই সম্ভবত চখা চখীর দল বাসনাকে শোনায়। কে জানে হতেও পারে সত্যি! দেবীর গড়ে কত কী না হয়! পৌষ জ্যোৎস্নায় এক সালংকারা যুবতিকে কেউ কেউ এখনও দেখে,জ্যোৎস্নার বয়স যত বাড়ে যুবতিরও নাকি বয়স বেড়ে চলে। শেষরাত্রে ওই রমণীর যৌবন বিষাদঋতুর অনাম্নী নদী গর্ভের মতোই শূন্য হয়ে ওঠে। তখন সে লোলচর্মসার এক বৃদ্ধা। অপরাহ্ণে যুবতির কণ্ঠ আলো করে রেখেছিল যে শ্বেতকুসুমহার সেটিও সকল রূপ ত্যাগ করে বিসর্জনের বেদনার মতো হয়ে উঠেছে,পূর্ব দিগন্তে সুবহে সাদিক দেখা যাওয়ার পূর্বেই বৃদ্ধার শরীর নদীচরের বাতাসে মিলিয়ে যায়।

তবে এসব শোনা কথা। বাসনাও শুনেছে। অলীক আখ্যানের সন্ধানেই সে হয়তো এখনও দেবীর গড়ে, ভুলোর চরের উপর আনন্দের মতো বিছিয়ে থাকা কাশবনে চখা চখীর সঙ্গে খেলা করে। হয়তো কোনওদিন ওই যুবতির মতো বাসনারও শেষরাত্রে শরীর কুসুমরেণু হয়ে মিলিয়ে যাবে দূর আকাশে, ঊষালোকে বাসনা ক্ষয় হবে। আর কে না জানে বাসনাক্ষয় হলেই সুরধুনি,এই জগত,দেবীর গড়,সকল আখ্যান চিরতরে মুছে যাওয়ার পথে এগিয়ে যাবে আরও কয়েকটি পা। 

দেবীর গড়ের পশ্চিমে যে গহিন নিম গাছের অরণ্য রয়েছে সেখানকার নিম ফুলের মধু সামান্য তিতকুটে। গাছের ওপরের দিকে দুটো ডালের ফাঁকে কী বিশাল এক চাক বেঁধেছে ওরা। সারাদিন ছুটে ছুটে গুনগুন করে যায় আর আসে। ভেতরে ছোট ছোট খুপরি ঘর, শুধু ওদের কোনও উঠোন নাই।  

আমাদের আঙিনা আছে, তাকে গোল করে ঘিরে রেখেছে ভাঙা দালান। আগাছা জঙ্গল, বুনো লতা, লজ্জাবতী আর তুলসী ঝোপে ভরে আছে চারধার। আশি বছর নব্বই বছর আগে বাড়ির মানুষজন বাক্স-প্যাঁটরা তোষক বিছানা বালিশ মুখ দেখার আয়না পিঁড়ি কাঁসার থালা বাটি সব নিয়ে রওনা দিয়েছিল শহরের দিকে। উন্নতি করতে হবে, ছেলেপিলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে সওদাগরি হৌসের বাবুদের চাকর করতে হবে, ভিটার মায়া করে পড়ে থাকলে চলবে? 

তবে ছেড়ে গেলেই ওই ভিটাও যে ছেড়ে যাবে, এমন তো কোনও কথা নেই! সে দিব্যি আছে! পুরনো দিনের বাংলা ইঁটের গাঁথনি, নীচু নীচু কড়ি বরগার ছাদ ঘোরানো সিঁড়ি। ওই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই দোতলার টানা বারান্দা। কড়ি-বরগা খসে পড়েছে, মেঝের দু একটা টালি আলগা হয়ে গেছে অনেকদিন। সন্ধের মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গলা তুলে রাধু , রাধু বলে দুবার ডাকলেই হল! একটা লম্বা সিড়িঙ্গেপানা লোক বেরিয়ে আসবে উত্তরের মহল থেকে। হেঁটো ধুতি, সাদা ফতুয়া, গলায় একটা পাকানো উড়নি! হাতে টিমটিম করে জ্বলছে রেড়ির তেলের লম্ফ। মাঝখানে সিঁথি পাটি করে দুপাশে পাতা তেল চুকচুকে চুল। 

–ই, লাটের ব্যাটা লাট এয়েচে! আবার আলবটু কেটেচে! 

একগাল হেসে রাধু বলে উঠল, কত্তা, তামুক ?

–তামুক হবেখন। আগে খেতে দে দিনি কিচু ?

–আজ্ঞে, কাচাগোল্লা আচে, গাচপাকা ন্যাংড়া আচে, কেটে দি কখান ? বাউনদিকে বলি কখান নুচি ভেজে পাকা কুমড়োর ছক্কা দিয়ে দিক ? তেতেপুড়ে এয়েচেন! 

–আম? কোতাকার আম? কে দিয়ে গেল?

–আজ্ঞে, নায়েব ময়াই এয়েচিলেন, লালবাগের গাচপাকা আম নে!

–নায়েব এয়েচিল ? খপর দিল না তো একটা আমাকে!

–বলচিল, তেমন খাজনা আদায় হয়নিকো এবচর!

দু এক মুহূর্ত পর কী যেন চিন্তা করে মেজকত্তা বলে ওঠে

–যা তুই একন! 

–আজ্ঞে, বাউনদিকে বলি ?

একটু বিরক্ত স্বরে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করে কত্তা বলে ওঠে, না না,লাগবে না, তুই কাশেমকে গাড়ি জুড়তে বল, মোতিবাঈয়ের কাচে যাব আমি!

সন্ধে নেমে এসেছে তখন। উত্তরের গঙ্গা থেকে তপ্ত দিনের শেষে হা হা বাতাস উঠেছে। ছাদে দাঁড়ালে দূরে দেখা যায় ব্রজডাকাতের বিলের ধূ ধূ চর। আলসে দিয়ে ঘেরা উঁচু নীচু তেপান্তরের মাঠের মতো এক ছাদ। মনে হয় এখনই ডানা মেলে উড়ে যাবে পূব আকাশে সদ্য ভেসে ওঠা বগি থালার মতো চাঁদের দিকে। চরের বালি জোছনায় কেমন চকচক করছে,নিশুত রাতে লম্বা লম্বা পা ফেলে কে যেন ওই বালুর ওপর কেঁদে কেঁদে ঘুরে বেড়ায়। ব্রজডাকাতের বিলে থোকা থোকা পদ্ম ফুটেছে। দিনমানে পানসি নিয়ে বিলের জলে কী যেন খুঁজে চলে বুড়ো কাশেম মিঞা। রাতের বেলায় ঘোড়া জুতে মেজকত্তাকে মোতিবাঈয়ের কোঠায় নিয়ে যায়। সূয্যি উঠলে চোখ লাল করে কত্তা ফেরে। রাধু গন্ধরাজ লেবু দিয়ে পাতলা ঘোলের শরবত বানিয়ে কালো পাথরের গেলাসে ঢেলে কত্তার মুখের কাছে ধরলে তবে কাশেমের ছুটি। 

ছোট পানসিখানা ঘাটের কাছেই বাঁধা থাকে কাশিমের। পদ্মপাতা লগি দিয়ে ঠেলে ঠেলে মুখ নিচু করে জলে কী দ্যাখে কাশেম? প্রাচীন বলিরেখায় ঢাকা তার নিজেরই মুখ ভেসে ওঠে জল তলে। কোঁচকানো চামড়া, কোটরে বসা দুটো হলুদ চোখ। মাথায় ফেজ টুপি, সাদা ফিনিফিনে কাপাস তুলোর মতো দাড়ি উড়তে থাকে ডাকাতে বিলের বাতাসে। 

বিলের এপারে আশশ্যাওড়ার ঘন বন। পুরোনো একটা বটগাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে কবে থেকে!  মোটা ঝুড়ি নেমেছে গা থেকে। তার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে ডেমিন সাহেবের পোড়ো নীলকুঠি।  ওই সাহেবকুঠি লুটপাট চালাতে ব্রজ ডাকাতের দলবল একবার হানা দিয়েছিল। মেমসাহেব’কে তুলে নিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল বিলের ধারে। অনেক পরে গঙ্গা সরে গেলে সেখানে এখন খাঁ খাঁ বালির চর। ফাল্গুন-চৈত মাসে তরমুজ ফলায় চাষারা। টকটকে লাল তরমুজের কী মিষ্টি স্বাদ! ভিনদেশি রক্ত মিশে আছে নাকি ওইসব অতিকায় তরমুজের শাঁসে ? ওই ঘটনার পর ডেমিন সাহেবও কেমন পাগল পারা হয়ে গেছিল। একমুখ কটা দাড়ি গোঁফ, ঘন নীল চোখ,রোদে পুড়ে তামাটে গায়ের রঙ, সারাদিন বিলের জলে কাশেমের মতোই কী যেন খুঁজে বেড়াত। তখন কাশেমের কতই বা বয়স, সাত আট হবে। বিলের ধারে সাহেব দেখতে ভিড় করতো গাঁয়ের যত ছেলেপুলে। সাহেবের তেজি ঘোড়াটাও কেমন বুড়িয়ে গেল অকালে। সারাদিন ওই বটগাছের ছায়ায় ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। কুঠির নোকর খানসামারাও একে একে চাকরি ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেল! কত নির্জন দ্বিপ্রহরে সাহেব আর তার ঝিমন্ত ঘোড়াকে বিলের ধারে বসে থাকতে দেখেছে কাশেম। মাথার ওপর খাঁ খাঁ আকাশ, শনশন করে ছুটে আসছে হাওয়া। দু একটা গলাউঁচু বক এক পা ডুবিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিলের জলে। ঝাপসা দিকচক্রবাল রেখার কাছে তিরতির করে কাঁপছে সবুজ গাছপালার সারি। 

সেসব কবেকার কথা। কাশেম মরল, রাধু মরল, মেজকত্তা মরে হেজে গেল কালের বাতাসে। কত্তার নাতিরা ভিটা ফেলে সব এদিক ওদিক। 

সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে মন্দিরে। কত্তাদের কুলদেবতা গিরিধারীজিউ দুপাশে দুটি রাধারাণী নিয়ে হাসিমুখে চেয়ে আছেন। গলায় জুঁই ফুলের মালা। বাতাসা কদমা লাল চিনি ছড়ানো চমচম পাথরের বাটি ভর্তি ক্ষীর আর লুচির সেবা দেওয়া হয়েছে গিরিধারীকে। নাটমন্দিরে বেজে উঠছে শ্রীখোল। টিউব লাইটের আলোয় সাদা চারপাশ। ঝাড়বাতি তামাদি হয়ে গেছে কবেই। কত্তার আমলের সে রবরবা আর নাই । উত্তরের মহল থেকে শোনা যায় মেজকত্তার ভারী গলার স্বর, রাধু,রাধু…এই হারামজাদা রাধু!

ছুটতে ছুটতে হাতের কাজ ফেলে এসে দাঁড়ায় রাধু, আজ্ঞে, কত্তা !

–গিরিধারীকে সর্ষের তেলের নুচি দিয়েচিস? হারামজাদা এত বড় সাহস তোদের!

–আজ্ঞে,ঘি শ্যাস…

–চুপ কর! খাগড়ায় ঘি আড়তের বিশ্বেস আচে কী করতে শুনি! 

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে রাধু।

–কী রে মুকে রা নেই ক্যানো ? আর ওই ক্যানকেনে গলায় কোন গুখেকোর ব্যাটা কীত্তন করচে শুনি ?

–আজ্ঞে, শক্তিপুরের…

গর্জে ওঠে মেজোকত্তা, শক্তিপুর! ছ্যা ছ্যা, শ্যামবাবাজির আখড়ার দল কোতায়? 

একটু থেমে ফের হিসহিসে গলায় বলে ওঠে কত্তা, কাশেমের বিটির মতো ডাকাতে চরায় তোর লাশ পুঁতে দেব রাধু! বড্ড বাড় বেড়েচে তোদের!

দুপুরের দিকে শুনশান মন্দিরে কেউ থাকে না। দরজা বন্ধ করে নিদ্রা গিয়েছেন গিরিধারী। দু একটা পায়রা গলায় মটর তুলে বকবকম বকবকম করে চলেছে নিজের মনে। পাশের ঘরে শ্রীনিবাস আচার্যের পট। ঝাপসা হয়ে এসেছে হাতে আঁকা পট, চন্দনের ফোঁটা কপালে, একটা বেলকুঁড়ির মালা পরানো গলায়। ঠাণ্ডা পাথরের মেঝে, কোথায় একটা ঘুঘু একসুরে ডেকে চলেছে। আচার্যের চোখে ঘুম নেই। সেই পদটা যে এখনও শেষ হয়নি। দরজা বন্ধ করে রেখে দিয়েছে, বড় ইচ্ছে করে গিরিধারীর সামনে গিয়ে একবার বসে। নতুন পদ গেয়ে শোনায় মাধবকে। উপায় নেই, সিংহাসনে জড়ভরতের মতো আটকে রেখেছে। এরা এমনকি ছোটবউ পদ্মাবতীর একটা পট পর্যন্ত এনে রাখতে পারেনি তাঁর পাশে! এমন দ্বিপ্রহরে পদ্মা একখিলি পান রেখে যেত, সারা ঘর চন্দন গন্ধে আমোদিত! সবাই ভুলে গেল পদ্মাকে। আচ্ছা সেই যে তরুণ, নিজের বংশ, লিখছিল কী যেন একটা নতুন আখ্যান, শ্রীনিবাসচরিত, সে কি লিখবে পদ্মার কথা? জানে সে?

একদিন সন্ধেয় কীর্তনের আসরে রাধুকে সঙ্গে নিয়ে দালানে এসে দাঁড়িয়েছেন মেজোকত্তা। ফিনফিনে চুনোট করা ধুতি, সাদা বেনিয়ান, সারা গায়ে হিনা আতরের গন্ধ ম ম করছে। নাটমন্দিরে এক যুবককে বসে থাকতে দেখে ভারী অবাক হলেন মেজোকত্তা। কোথায় যেন দেখেছেন, মনে পড়ছে না, খুব চেনা, খুব নিজের মনে হচ্ছে! ভারী অদ্ভুত পোশাক পরেছে তো ছেলেটি, ফিরিঙ্গিদের মতো! রাধুকে হাত তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছোঁড়াটা কে রে রাধু? চেনা চেনা ঠেকচে!

একটু নীচু স্বরে হাসিমুখে রাধু বলে, কত্তা, আপনার নাতির নাতি! কলকেতা থেকে এয়েচে!

বিস্মিত হয়ে রাধুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন মেজোকত্তা, তোর মাতা কি খারাপ হয়েচে রাধু? নাকি সূয্যি ডুবতেই আফিম চড়িয়েচিস? আমার ছেলেই হল না একনও, তাই নাতি! 

–নিয্যস সত্যি কতা কত্তা!

–চুপ কর! তবে মুখটা আমার পারাই বটে! কী করে ছোঁড়া জানিস?

–শুনেছি তো কী সব পদ লেকে টেকে! শিনিবাস ঠাকুরকে নিয়ে কী যেন লিকচে!

–বলিস কী? আচার্য কে নিয়ে? কীত্তন মিটলে একবার নিয়ে আসিস তো আমার কাচে!

 

         চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                       পরের পর্ব : আগামী মাসের  দ্বিতীয় শনিবার

 

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।  

 

 

আরও পড়ুন: 

হাড়ের বাঁশি (তৃতীয় পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More