হাড়ের বাঁশি ( নবম পর্ব)

কড়ি বরগার ওপর উইপোকাদের নক্সা। আলকাতরা মাখানো হয়েছিল সেই বুড়ো কর্তার আমলে, তারপর আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে এসেছে কালো রঙ। দুটো তির ছাদ থেকে খসে পড়েছে গত বর্ষায়। পুরনো রাজমিস্ত্রি ফকির মোল্লা দেখে বলেছিল,
—ছোটকত্তা ইবার জলছাতটা করন লাগবি যি! নাইলে ধসি পড়বি ছাত।
সে জলছাদ আজও করা হয়নি। কবেকার জমিদারবাড়ি। ভাঙা খড়খড়ির জানলা খুললে যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ পদ্মবিল। শনশন বাতাসে উড়ে বেড়ায় গাঙশালিখের দল। আশ্বিনে বিল আলো করে ফোটে গোলাপি পাপড়ির পদ্ম। দু’টাকা তিনটাকা দাম ওঠে তখন একেকটা ফুলের। ছেলেপিলেরা চুবড়ি ভরে তুলে গঞ্জের পাইকারদের কাছে বিক্রি করে। দুটো পয়সা আসে ঘরে। সন্ধিপুজোয় একশো আট সদ্য ফোটা পদ্ম চাই। সেই রামচন্দ্র তো আর নেই যে কম পড়লে নিজের পদ্মআঁখি নিবেদনের সংকল্প করবেন!
বিলের একধারে ছোটকর্তার ঘন তালবন। ভাদ্র মাসে পাকা তালের গন্ধে ম ম করে চারপাশ। যে যেমন পারে কুড়িয়ে নিয়ে যায়, হাটে বিক্রি করে। কিছুই বলে না ছোটকর্তা। যাক! নিয়ে যাক, দুটো তাল বই তো নয়। কে খাবে এবাড়িতে তাল! বাড়ির গিরিধারীর জন্মাষ্টমীর পুজোয় এককালে তালক্ষীর, তালের বড়া ভাজা হত বড় বড় পিতলের কড়ায়। তালমারি ঘষে ঘষে ঘন হলুদ কাথ বের করত দুপুরবেলা বাড়ির বউ ঝিরা। প্রহরে প্রহরে নামসংকীর্তন, সদ্যজাত গোপালের নাড়ি কাটা, নামকরণ- কত সব আচার। নমো নমো করে এখন পুজো করে যায় ভটচায্যি মশাই।
তালবন পার হয়ে দত্তদের সুপারিবাগান। শুকনো বাকল রোদ্দুরে ঝনঝন করে বেজে যায় নিজের মনে। তারও পর পঞ্চায়েতের পাকা রাস্তা চলে গেছে সেই ময়ূরাক্ষীর ঘাট অবধি। দুপাশে বাগদি কাহার নিকিরিদের সার সার মেটে ঘর। ভর দুপুরে ধান শুকোতে দেয় রাস্তায় বউদের দল। পাশের মাঠে আখ ফলেছে খুব এবার। আলুর দাম নেই মোটে, তিন চারটাকা কিলো। অল্প সর্ষে বুনেছে কেউ। বেশিরভাগ জমিই ছোটকর্তাদের। কিছু বর্গা হয়েছে, কিছু হয়নি। সব বাপ-দাদার আমলের ভাগচাষি। ফসল বিক্রি করে টাকার ভাগ দিয়ে আসে তারা কর্তাকে। যে যেমন পারে দেয়, হিসেবপত্র কিছুই রাখে না ছোটকর্তা।
একেকদিন সন্ধেয় পঞ্চা বাগদি আসে। দুঃখী গলায় বলে
—কত্তা, ই করলি চলবি ক্যামনে! হেসিব ল্যান না, দেকতি যান না, বুড়ো কত্তা বলতিন মুরে জমিন হলি নক্কী।
কিছুই উত্তর করেন না ছোটকর্তা। মৃদু হাসেন মাঝে মাঝে। জোয়ান শরীর, এই তো খাটার বয়স, জমি বাড়ি দলিল শরিকি-মামলা সব বুঝে নেওয়ার সময়। কথায় বলে জমি বাপের নয়, জমি হল দাপের। তা সেসব কিছুই করেন না তিনি। ভাসানো দুটো চোখে কীসের যেন ছায়া। সারাদিন বাড়িতেই বসা। মদ না, মেয়েছেলে না, আফিং তাস কিচ্ছু না। আড়ালে গাঁয়ের লোকে বলে, কুঁড়ের হদ্দ! কী বাপ, ঠার্কুরদা ছিল, লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ সব আর তাদের বংশে কী ছেলেই না হল!
কীসব পড়েন সারাদিন। দেরাজ আলমারি হাতড়ে উইধরা তামাদি দলিল দস্তাবেজ লাল চামড়া বাঁধানো কবেকার হিসাবের খাতা উল্টেপাল্টে দ্যাখেন। অস্পষ্ট অক্ষর, ঝাপসা সময়ের গায়ে হাত বুলোন নিজের মনেই।
খুব বেশি বললে পঞ্চাকে হেসে বলেন
—কী হবে বল দিনি! দুটো পয়সা কম দিলেই বা কী! খাওয়া পরা তো জুটে যাচ্ছে
—কী ছ্যালো বুড়োকত্তার আমলি, আর কী হল…
—দ্যাখ পঞ্চা, যা ছিল বুঝলি, সবই আছে।
—কুন কথা কন দিনি কত্তা, কত আলা কত জাঁক পুজো পাব্বন
—আছে রে আছে। বুড়োকত্তাও আছে তোর। একটু চোখ খুললেই দেখতে পাবি। এখনও আলো সানাই বাজে। নহবত বসে। নাচঘরে হীরাবাঈয়ের ঠুমরি ঘুঙুর… গিরিধারীর সাতপদে ভোগ…সব আছে! সব আছে!
—সি বুড়োকত্তা যি ঘুরে বেড়ায়, মুই জানি। দেকিচি তো কত রেতে!
হা হা করে হেসে উঠে ছোটকর্তা বলেন
—সে তো তুই ভূত দেখিস! হাঁড়িয়া টেনে চুর হয়ে থাকিস তো সন্ধে হলেই! আমি বলছি, সব ঘটে চলেছে রে এখনই, এই রাতেই! কিছুই হারায় না!
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে পঞ্চা। মনে মনে ভাবে, নোকে নায্যস বলি, মাতা বিগড়েছে ছোটকত্তার! সব আচে! ক্যারাসিন কিনার ট্যাকা নেই বলি ঘুটঘুটি পারা হয়ি থাকি ঘর দালান, বলে কিনা সব আচে!
গাঢ় হয় রাত। ফুটফুটে ভাদ্রের জোছনায় বান ডেকেছে আজ। থমথম করছে কবেকার ঘর দালান। অস্পষ্ট সব ছায়া শুয়ে আছে এখানে ওখানে। বারবাড়ির উঠোনে মাধবীলতায় ঝেঁপে ফুল এসেছে। টুপটুপ করে শিউলি ফোটার দিন ঘনিয়ে এল। এমন সব মধুরাতেই তারা জেগে ওঠে ঘুম ভেঙে। এতবড় বাড়িতে কেউ কোথ্থাও নেই। হুট হুট শব্দে গম্ভীর গলায় ডেকে ওঠে এক অনেকদিনের লক্ষ্মীপ্যাঁচা। এলোঝেলো বাতাস ভেজা ঠোঁট রাখে ছাদের ভাঙা আলসের ওপর। পাশেই একটা পোড়ো ঘর, কোনকালে গলায় দড়ি দিয়েছিল নাকি হৈমবতী।ভর যৌবন শরীরে, ছোটকর্তার মা। কী যেন কলঙ্ক রটেছিল গাঁ দেশে।
ছোটকর্তা একাহারী, রাতে খাওয়ার পাট নেই। লম্ফটা নিভিয়ে শোওয়ার ঘরের জানলাদুটো খুলে দিলেন হাট করে। খালি গা, শুধু পরনে একটা সাদা ধুতি। আকাশে দু এক টুকরো সাদা মেঘের সারি। মিহি বাতাসের দোলায় উড়ে বেড়াচ্ছে। পদ্মবিলের জলে হাজার টুকরো চাঁদ। ঝিমঝিম জ্যোৎস্না। টলমল করছে কচি পদ্মডাঁটি।ওই দূরে অস্পষ্ট দিকচক্রবাল রেখার কাছে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে জলরেখা আর আকাশ। তাল সুপুরি গাছের পাতায় খেলা করে বেড়াচ্ছে বাতাস। নশ্বর জগতের মায়া মুছে যায় মানুষের মন থেকে এমন রাতে। সব আছে। এখানেই আছে সবাই।
তানপুরোটা কোলে তুলে মেঝের ওপর বসেন আচার্য বাড়ির শেষপুরুষ, হেমেন্দ্রনারায়ণ আচার্য, আমাদের ছোটকর্তা। পরম যত্নে সুর বাঁধেন একমনে তারের ওপর। দামাল শিশুর মতো উড়ে বেড়ায় সেই সুর পাখা মেলে। জোছনায় ভেসে যায়। লেগে থাকে দরদালানে। কোন অপরূপ জগতের দুয়ার খুলে যায়। আবছা শোনা যায় এক গন্ধর্বপুরুষের পায়ের শব্দ। দূর উর্দ্ধলোক থেকে তিনি নেমে এসেছেন যেন আজ সুরের মায়ায়।
আজকের এই রাত্রি, হেমেন্দ্রনারায়ণ, এই ভাঙা আচার্যবাড়ি, জমি জিরেত সবই একদিন মুছে যাবে আয়ুর পাতা থেকে। শুধু ওই সুরটুকু লেগে থাকবে অনাগত ভবিষ্যতের গর্ভকুসুমে। সেখানে মন রাখলেই দেখা যাবে কালস্রোত। তারই হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে অতীত। কিছুই হারায় না।
এক আকাশ সুরের নীচে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়তে থাকে কর্ণফুলি গ্রাম। জেগে থাকেন শুধু এক একাকী পুরুষ।
প্রসন্না কালের দেবীর আশীর্বাদ ঝরে পড়ে শারদ জ্যোৎস্নায়।
ইদানিং অবশ্য হেমেন্দ্রনারায়ণের সব গেছে, ভেক ধরেছেন নামে, সার্কাসের দল ফেঁদে বসেছেন। নতুন নাম বিশ্বনাথ বড়াল।
গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের তাঁবু পড়েছে চড়কতলার মাঠে। রিক্সা নিয়ে দিনভর ফিনফিনে গোলাপি কাগজ বিলি করে ঘুরছে একটা সিড়িঙ্গেপানা লোক। হাতে চোঙা মাইক ফুঁকে বলে চলেছে, আসুন আসুন সপরিবারে আসুন! আফ্রিকার সিংহ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, রুশ দেশের মেয়েদের ট্র্যাপিজের খেলা দেখুন! প্রত্যহ তিনটে শো! আসুন! আসুন! কচি কাঁচার দল রিক্সা ধাওয়া করে কুড়িয়ে নিচ্ছে গোলাপি কাগজ।
আসল কথা হল রাত সাতটার শোয়ে গণপতি জুনিয়রের যাদু! দিনে একবার মাত্র। গাঁ ঘরে শীতকালে সাতটা মানে অনেক রাত। অঘ্রাণের শেষে ন্যাড়া মাঠ। অস্পষ্ট জলের দাগের মতো কুয়াশা জমে থাকে থরথরে। তার মাঝেই বেজে ওঠে সার্কাসের বাজনা। ধান বিক্রির কাঁচা পয়সা লোকের হাতে। মেলাখেলা সার্কাস যাত্রা আমোদ আহ্লাদের মোচ্ছব। হিম হিম বাতাস। কাঠের চেয়ারে সাতটাকা ভাড়া, সামনের সারি। তার পিছনে চটের বস্তা পাতা আসন মাঠের ধুলোর ওপর, দু টাকা তিন টাকা চার টাকা। লাল সবুজ নীল টিকিট।
তিরিশ বছর এই তাঁবু নিয়ে হাটে গঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বনাথ বড়াল। একমাথা টাক। সাদা ধপধপে ধুতি পাঞ্জাবির ওপর উলের মোটা জহর কোট। লালচে হেনা করা গোঁফ। সেই পঁচিশ বছর বয়সে ঢুকেছিলেন সার্কাসে। হিসাবপত্র দেখতেন। ঘর পালানো ছেলে। আখড়া মেলা বাইজি-নাচ সাত ঘাটের জল খেয়ে শম্ভু বিশ্বাসের সার্কাসে নাড়া বাঁধেন। বিশ্বেস মশাইয়ের সাতকুলে কেউ ছিল না, ছেলের মতোই ভালবাসতেন। মারা যাওয়ার আগে লেখাপড়া করে বিশ্বনাথকে দিয়ে যান গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস। সেও হল আজ বিশ বাইশ বচ্ছর।
বড়াল বাবুর মেয়েছেলের দোষ কোনওদিনই ছিল না। সার্কাসের লোকজনদের বুক দিয়ে আগলে রাখেন। নেশা বলতে সন্ধের বাজনা বেজে উঠলে সার্কাসে নিজের খুপরি তাঁবুতে দিশি বোতল খুলে বসেন। লাল সুতোর বিড়ি টেক্কা মার্কা দেশলাই পাঞ্জাবির পকেট থেকে বেরোয়। দিনমানে ওই একবারই। সবাই বাবা বলেই ডাকে। চোখ লাল হয় যত রাত বাড়ে। ইদানীং একটা গান শুনতে বড় সাধ হয় তাঁর। সেই কবে কলকেতার প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটে শুনেছিলেন লালবাঈয়ের গলায়। রূপ দেখে সই কুল হারালেম বকুলতলায় এসে! নিজের মনেই হাসেন। নিজের কুলও নেই, বকুলতলার সখীও নেই!
সাতটার শোয়ের সব শেষে আলো কমে আসে মঞ্চের। থেমে যায় সব বাজনা। আবছা আঁধারে যেন দোলা খায় ভুতুড়ে কুয়াশা। কালো জোব্বা পরে উঠে আসে তখন গণপতি। মাথা মুখ পরিষ্কার করে কামানো। এমনকি ভুরু অব্দি। ঘোলা মরা দুটো চোখ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। কোনও যন্ত্রপাতি কিছুই নেই। একটাই খেলা দেখায় গণপতি। বাবু হয়ে চুপ করে বসে মঞ্চে। তারপর ভাসতে ভাসতে উঠে আসে একটু ওপরে। নীচে কিচ্ছু নেই। যেন হাওয়ায় বসে আছে। ওখানেই উঠে দাঁড়ায়। হাত পা নাড়ে। হেঁটে বেড়ায় শূন্যে। পাঁচ ছ মিনিট। আস্তে আস্তে নিভে আসে সব আলো। জোব্বার পকেট থেকে একটা আড়বাঁশি বের করে নিঁখুত সুরে বাজাতে থাকে।
সে সুর এই নশ্বর পৃথিবীর নয়। একবার শুনলে মানুষের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। হাহাকারে ছেয়ে যায় অন্তর। ভারী হয়ে আসে বাতাস। কে যেন ডেকে চলে ওই মায়া পর্দার আড়াল থেকে। আয়! আয়! আয়! কত কত জন্মের সঞ্চিত কামনা বাসনার দল কুসুম রেণু হয়ে ঝরে পড়ে মর পৃথিবীর বুকে।
নেশার ঘোরেও বিশ্বনাথ বড়ালের কানে বাজতে থাকে গণপতির বাঁশি। মনে পড়ে যায়, ফুরিয়ে আসছে সার্কাসের সংসার। হাতি সিংহ বাঘ আর নাকি রাখা যাবে না সার্কাসে। ট্র্যাপিজের বুড়ি দুটো রাশিয়ান মেয়ে আর পারে না খেলা দেখাতে। জোকারের মুখে বলিরেখার দাগ। অনেকেই চলে যাচ্ছে সার্কাস ছেড়ে। নতুন যুগের ভিডিও সিনেমার রমরমে বাজার এখন। কে থাকবে তবে? তিনি আর গণপতি? আর ওই কালান্তক বাঁশির খেলা?
ঘুম নেমে আসে বড়াল মশাইয়ের চোখে। সার্কাসের রংচটা তাঁবুর ওপর জেগে ওঠে অঘ্রাণের চাঁদ। আবছা জোছনায় ছেয়ে যায় ভুবনডাঙা। বুনো ফুলের গন্ধে জেগে থাকে ধূ ধূ মাঠ।
আলো নিভে আসে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাসের।
সার্কাসের আলো নিভে এলে চলবে কী করে গণপতির। তাই ইদানীং সে বহুরূপী হয়েছে! নতুন নাম নিয়েছে মহাদেব।
মাথায় বাঁকা চাঁদ। কণ্ঠলগ্না কালনাগিনী। পরনে বাঘছাল, ভস্মমাখা অনাবৃত দেহ। ঘুপচি অন্ধকার চা দোকানের বেঞ্চে বসে বিড়ি খাচ্ছেন মহাদেব। পাশেই রাখা ডম্বরু আর ত্রিশূল। দোকানের গায়ে লাগা বড় কদম গাছে ফুল আসার সময় হয়নি এখনও।
সামনে রাস্তার ধারে চট পেতে আবছা আলোছায়ায় সকালের শুকনো সবজি নিয়ে বসেছে বুড়োমতো একটা লোক। কানা বেগুন ধসে যাওয়া কুমড়ো চিমসে কাঁচালঙ্কা বেছেবুছে দেখছেন মহাকালী। জরিপাড় লাল শাড়ি, হাত গলা ভর্তি গয়না। মিশিকালো গায়ের রঙ। কোঁকড়ানো পিঠ ওপচানো চুল। লম্বা টকটকে জিভ আর খাঁড়া হাতের থলেয় রাখা আছে।
ক্লান্ত মফস্বলে সন্ধে নেমেছে। কিচির মিচির অটো সাইকেল রিক্সার ভিড় রাস্তায়। গোটা কয়েক চেয়ার দুটো মাইক পেতে বেসুরো গলায় ‘আমরা করব জয়’ গান গাইছেন একজন বয়স্কা মহিলা। আধবুড়ো দু চারজন চেয়ারে বসে ঢুলছেন। হাতরুটির দোকানে মানুষের ভিড়। গরম রুটি আলুর তরকারির চনমনে গন্ধ বাতাসে।
মহাদেব চা দোকানিকে বলছেন, একটা লেড়ো দাও দিনি!
মহাকালী মুখ করছেন, ও বাবা, পচা কুমড়া পনেরো টাকা করি লিবা ? তুমি যি ডাকাত গ!
দিনমানে টো টো করে একসঙ্গে ঘুরেছে দুজনে। ট্রেনে দশ বিশ টাকা রোজগার হয়েছে। সেই কোন সকালে বাজিতপুর গাঁ থেকে বেরিয়ে পায়রাডাঙা রাণাঘাট ব্যারাকপুর হয়ে এদিকে এসেছে। রাতে ট্রেন ধরে আবার ফেরা। গাঁ ঘরে তখন নিঝুম রাত। ভাত বসাবেন মহাকালী। মহাদেব দাওয়ায় বসে গান ধরবেন ভাঙা গলায়, ‘দুদিন এলি এই ভবে/ দুদিন পরে যেতে হবি/
খামারবাড়ি খামারজমি/ সময় হলে যাবে ছাড়ি।’
ঝিমঝিম হাওয়া বাতাস বয়, কোনওদিন গুমগুম গর্জে ওঠে মেঘ। পায়রাডাঙার গাজনে ভেক ধরে মহাদেব। তিনদিনের ভিখ মাঙা সন্নিসি। লাল শালু, হবিষ্যি, গাঁজা। মহাকালীকে ছেড়ে তিনরাতের বেম্ভচারী। ক’টা পয়সা হাতে আসে। নীলষষ্ঠীর দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুত্রবতী এয়োতিদের আশীর্বাদ করে। চাল মুলো কলা সিধে পায়। দু’চার টাকা পায়। আর চৈতগাবে গান ধরে। আগে চড়ক গাছে বাঁইবাঁই করে ঘুরত পিঠে লোহার শলা ফুঁড়ে। বছর পাঁচেক আগে পড়ে গিয়ে পা ভাঙে। সেই থেকে খুঁড়িয়ে হাঁটে।
সেই কবে মহাদেবের সঙ্গে ঘর ছেড়েছিল মহাকালী। কাঁচা যৈবন। গাঁয়ের মুরুব্বিরা বিধান দিয়েছিল মহাদেবকে গাঁ থেকে বের করে দেওয়ার। দুজনেই পালিয়েছিল। সেসব কতবছর আগের কথা। তা হল বিশ বাইশ বছর। ভাত জোটে না ঠিকমতো, খুদকুঁড়ো যা জোটে তাই দিয়ে দুটো পেট চলে। বেদম মার খায় কোনও কোনওদিন, সেও মারে, নড়া ধরে মাটিতে ফেলে বুকে পা দিয়ে দাঁড়ায়! চালে খড় নাই, টপটপ জল ঝরে বর্ষার রাতে, পেটভরা ভাত নাই সখ আহ্লাদ কিছু নাই। তবু বেশ আছে, মহাকালী। সেই যে গেলবার পুজোয় সস্তার একটা লালপেড়ে শাড়ি এনে দিয়েছিল! যখের মতো আগলে রেখেছে তা। মাঝে মাঝে পরে, টকটকে লাল সিঁদুর দেয় কপালে! সেদিন মেঘ করে খুব! ঝিঙে ফুল ফোটে ক্ষেতে। বেশ আছে! ওই যে লেড়ো খাচ্ছে, মহাকালী জানে ফিরতি টেরেনে গেঁজ থেকে ঠিক একটা লেড়ো বের করে তার হাতে দেবে। বলবে, ফিরতে ম্যালা দেরি, পিত্তি পড়বে, খেয়ে লে!
ফেরার সময় আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসবে ট্রেন। ঝমঝম করে সেতু বেয়ে পার হয়ে যাবে কত নদী খাল বিল। রাত বাড়বে। ক্ষেতে মাঠে ছুটে বেড়াবে শেষ চৈত্রের পাগলা বাতাস। লেবু ফুল ফুটবে খুব। দুপাশে সরে সরে যাবে কুপি জ্বলা জনপদ। ধূ ধু আকাশে হিরের কুচির হয়ে আলো দেবে নক্ষত্ররাজি। ভাঙা চাঁদ উঠবে নিজের মনে।
তার নীচেই আলতাব শেখ আর পারুল মণ্ডলের সংসার। মহাদেব আর মহাকালীর ভালবাসা। মুখে রঙ, পরনে সস্তার বাঘছাল, জরিপাড় শাড়ি হাতের থলেয় পরচুলো, বাঁকা চাঁদ, কালনাগিনী, লোলজিহ্বা, খাঁড়া, ডম্বরু আর ত্রিশূল।
মহাকালের বাতাসে দোলা খায় ঈশ্বর ঈশ্বরীর প্রেম।
শেষবার গণপতির সঙ্গে দেখা হয়েছিল দার্জিলিং ম্যালের সামনে। ঘোলাটে আকাশ, শনশন হাওয়া আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নেমেছে, সন্ধে আসব আসব করেও থমকে দাঁড়িয়ে আছে জলাপাহাড়ের রাস্তায়। জোয়ির দোকানে রামের গ্লাস হাতে নিয়ে গুলতানি শুরু করেছে ভিনদেশি পর্যটকের দল।
রাস্তাঘাটও প্রায় চুপচাপ। শুধু আমিই এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছি, পাহাড়ি একটা লোমশ কুকুর পায়ে পায়ে হাঁটছে আমার সঙ্গে। আজ কেমন যেন অচেনা লাগছে পথঘাট, বারবার মনে হচ্ছে যে কোনও গলির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে রাস্তায় মস্ত একটা ফাটল,যে ফাটলের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া যায় আঠারোশো সালের প্রথম দিকে। মেরেকেটে শ’খানেক লোক তখন লেপচাদের ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম দার্জিলিঙে, দু চারজন ফিরিঙ্গি গরমের হাত থেকে বাঁচতে ক’দিনের ছুটি নিয়ে পালিয়ে আসে জমজমাট রাজধানী থেকে। মিঃ ওয়ারম্যান আর তার বউ মিলে প্রথম হোটেলটিও খুলে ফেলেছেন ততদিনে, যদিও খা খা করে সেই সরাইখানা, কলকাতা থেকে আসতেই সময় লেগে যায় এক মাস বা তারও বেশি! অত কষ্ট করে কেই বা আসবে।
হাঁটতে থাকি ম্যালের দিকে, রাস্তা একটু চড়াই। হাঁফ ধরছে, কনকনে ঠাণ্ডাও পড়েছে আজ। ফুটপাতের ওপর ছোট ছোট লঙ্কা সর্ষে শাক ব্যাঙের ছাতা লেটুস পাতা ধামায় করে নিয়ে বিক্রি করছে একটি নেপালি মেয়ে। মাথায় রঙিন ছাতা। এবার একাই এসেছি আমি, প্রধানদের বাড়িতে আছি, থাকা-খাওয়া নিয়ে অল্পই ভাড়া। ইচ্ছে আছে আশেপাশের ছোট ছোট গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখব, যেসব জায়গায় কোনওদিন কেউ বেড়াতে যায় না! কিন্তু তেমন গ্রামই বা আর কই, তারপর বাঙালি দেখলেই ইদানিং সবাই এখানকার সন্দেহের চোখে তাকায়। গোর্খাভূমির দাবী নিয়ে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে লোকজন। সামান্য লঙ্কার আচার রাই শাক মেখে একই থালা থেকে ভাত খেতে চাইলেও, আসলে তো আমি ভিনদেশি যুবক।
একটু খিদে খিদে পাচ্ছে, পাশেই ঝলমল করছে গ্লেনারিজ। তাজা পাঁউরুটি আর কেকের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। একপট সোনালি চা আর দু টুকরো সদ্য সেঁকা বিস্কুট নিয়ে ফায়ার প্লেসের উষ্ণ আগুনের পাশে বসলেই হয়, কিন্তু অত সাজানো রেঁস্তোরা আজকাল আর পছন্দ হয় না। কেমন যেন রূপকথার মতো, জোলো হাওয়া নাই, মেঘের ছায়া নাই, গনগনে অভাব নাই। পাহাড়ি বস্তির লেপচা মেয়েটির ঘরে চাল বাড়ন্ত, বরের ভাড়া খাটা জিপগাড়ি টুরিস্টের অভাবে বসে গেছে তিনমাস, সস্তার মদের গন্ধ মলিন বিছানায়, তাদের ছোঁয়া সযত্নে বাঁচিয়ে গড়ে তোলা সেই শৈলরাণীকে তেমন আপন মনে হয় না। রানির মুকুটে পুরোনো ব্রিটিশ রাজের রোমান্স লেগে আছে। তার থেকে বরং ওই আস্তাবলের পাশে একটা ঘুপচি দোকানে বসে একপ্লেট মোমো খাই। ট্যালটেলে আগজ্বলন্ত জলের মতো স্যুপ দেবে একবাটি আর পাঁচটা কি ছ’টা মোমো, খিদের মুখে অস্পষ্ট পাহাড়ি সন্ধ্যায় অমৃত মনে হবে।
ম্যালের কাছাকাছি আসতেই দেখা হয়ে গেল তার সঙ্গে। আজ ভিড় প্রায় নেই বললেই চলে, অন্যদিন এমন সময় থিকথিক করে লোকজন। গুটিকয় মানুষ এখানে ওখানে জটলা করছে, অক্সফোর্ড বই দোকানও বন্ধ। একরাশ গোলা পায়রা বকবকম করে উড়ে যাচ্ছে আকাশে তারপর আবার ঝাকবেঁধে মাটিতে এসে বসছে। লাল নীল বেলুনওয়ালা শূন্য কাঠের বেঞ্চির একপাশে বসে, ক্লিন্ন আকাশের গায়ে পতপত করে উড়ছে তার রঙিন বেলুন। ওর নাম দুঃখীলাল, বেগুসরাইয়ের লোক। গতকালই আলাপ হয়েছিল, ছমাসে নমাসে একবার মুলুকে যায়। চাচেরা ভাই কেশবলাল ম্যালে ঘোড়া চালায়, দুই ভাই একসঙ্গেই থাকে। কেশবলালের জরুও থাকতো এখানে, মাস দুয়েক হল হিল ডায়রিয়ায় মরে গেছে। এখন বেলুন বিক্রি করে রাত্রে বস্তির ঘরে ফিরে দুঃখীলালই রোটি পাকায়, স্কোয়াশ ভর্তা করে,আলুর খুব দাম এদিকে। কতদিন ঝাল ঝাল আলুচোখা খায়নি, বলছিল কাল সে-কথা।
একটু দূরে নির্জন বেঞ্চির ওপর বসে আছে লোকটা, বসার ভঙ্গিটি খুব চেনা চেনা। কোথায় যেন দেখেছি! ভালো মনে পড়ছে না কিন্তু অচেনা তো নয়। বিদেশি ডাইনিদের মতো একটা চোঙা টুপি পরেছে মাথায়, গায়ে কালো আলখাল্লা,হাত দুটো ঢেকে রেখেছে ধূসর দস্তানায়। পথের কতগুলো পাহাড়ি কুকুর ঘিরে আছে লোকটাকে। সে হাতে করে দুটো বলকে কখনও তিনটে করে লুফছে আবার পরমুহূর্তেই একটা বল এসে পড়ছে হাতের মুঠোয়। কুকুরগুলো অবাক চোখে চেয়ে আছে সেই অপরূপ ভোজবাজির দিকে।
ভারী আশ্চর্য হলাম আমি। প্রায়ান্ধকার সন্ধে, পিছনে ধূসর আদিগন্ত মেঘের পরত,যার নিচেই লুকিয়ে আছে সোনার পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা, বৃষ্টির রেণু মাখা বাতাস বইছে শনশন করে, নির্জন লোকশূন্য ম্যালে বসে একজন মানুষ কুকুরদের মাদারির খেলা দেখাচ্ছেন। বড়ই অবাস্তব, সংশয়ী মনে বিশ্বাস হতে চায় না সহজে।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে, মুখ ফেরাতেই চিনতে পারলাম। হাতের ইশারায় আমাকে পাশে বসতে বললেন লোকটি। তারপর কুকুরগুলোকে বায়ুস্তর থেকে ক’টা বিস্কুট এনে খেতে দিলেন, মুখে অদ্ভুত একটা শিস দিয়ে বলে উঠলেন
“যা যা! আজকের মতো যা, কাল আবার আসিস”
কুকুররাও দলবেঁধে বিস্কুটের টুকরো মুখে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে হাঁটা দিল নিচের দিকে। আমার দিকে ফিরে এবার মৃদু হাসলেন, তারপর দস্তানা দুটো খুলে ফেললেন। আলো আর নাই তখন আকাশে। হ্যালোজেন ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে, হলদে আলোয় কুচি কুচি হীরের মতো এলোমেলো নেমে আসছে বৃষ্টিকণা। খাদের দিক থেকে ধেয়ে আসছে বরফওয়ালা বাতাস। নিভু নিভু আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, মুরগীর ঠ্যাঙের মতো আঙুলগুলো, কাঠি কাঠি হাড় বের করা, আর তর্জনিটি অস্বাভাবিক লম্বা। সেই হাত ঘুরালেন দুবার, ওই যেদিকে মেঘের তলায় ঢাকা পড়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সেদিকে।
আমার চোখের সামনে খুলে গেল সিনেমার মতো দৃশ্যপট। কোন মহাশূন্যে হতে ভেসে আসতে লাগলো সিনে-প্রোজেক্টার চালানোর মতো কিরকির শব্দ…
গড় নাসিমপুর রাজবাড়ির পশ্চিম প্রান্তে দোতলার জানলায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন এক দীর্ঘকায় পুরুষ। সম্পূর্ণ উদাস দৃষ্টিচেয়ে আছেন কিন্তু কিছুই দেখছেন না। অনাবৃত দেহ,পরনে একখানি মিহি পাড় শান্তিপুরী ধুতি। ডান হাতের আঙুলে ধরা একটি চিঠি।
 
প্রিয়তম
আমার অপরাধ লইবেন না। ঝুঁটিপঞ্চা গতকাল কাহার নিকট হইতে খবর লইয়া আসিয়াছে গত কয়েক দিবস যাবৎ আপনি গড় নাসিমপুরের রাজা কুমার বীরেন্দ্রনারায়ণের অতিথি হইয়া রহিয়াছেন জানিয়া, আপনাকে পত্র না লিখিয়া আর থাকিতে পারিলাম না। আমার যে কয়দিন কী ভাবে কাটিয়াছে! অহরাত্র আপনাকে লইয়া দুশ্চিন্তা।
 
গতকাল প্রিয়নাথ বসু মহাশয়ের সার্কাস হইতে নিবারণ বাবু মহাশয় স্বয়ং আসিয়াছিলেন। আমাদিগকে ফিরিয়া যাহিবার নিমিত্ত অশেষ অনুরোধ করিলেন। বসু মহাশয় আপনাকে উদ্দেশ্য করিয়া একখানি পত্রও লিখিয়াছেন। দুই বৎসর পূর্বে আমরা সার্কাস ছাড়িয়ে আসিবার পর হইতেই পূর্বের ন্যায় পসার জমিয়া উঠিতেছে না। দর্শক সকল আপনার অপূর্ব যাদুর খেলা দেখিবার নিমিত্তই নাকি সার্কাসের টিকি ট কাটিয়ে যাইত। এমনতরো বলিলেন আমাকে নিবারণ বাবু। আমি মেয়েমানুষ, কী আর বলিব ! আপনাকে ভালবাসা ভিন্ন কদাপি অন্য কোনও চিন্তা মনে রাখিতে পারি না। একবস্ত্রে আপনার সহিত সার্কাস ছাড়িয়া পথে নামিয়াছিলাম।
 
কলিকাতায় এবৎসর প্রবল বর্ষা নামিয়াছে। অনেক মানুষ কলেরা রোগে আক্রান্ত। আপনি সর্বদা শরীরের খেয়াল রাখিবেন। দুবেলা অন্ন প্রস্তুত করিয়া আপনাকে দিতে পারিতেছি নাই,এ কষ্ট যদি বুঝিতেন আপনি। বিদেশে কী খাইতেছেন কী পরিতেছেন ভাবিয়া ভাবিয়া আমার দিনরাত্র কাটিয়া যায়।
 
আমি বুঝিতে পারি,আপনি আমাকে সম্পূর্ণ ভালবাসিতে পারেন নাই। যাহা আছে তাহা কর্তব্য,দায়িত্ব এবং স্নেহ। আমার ন্যায় অভাগীর জীবনে তাহাই বা কম কী! আপনার মন অধিকার করিয়া রাখিয়াছে,আপনার একমাত্র প্রেয়সী,বাল্য প্রেম,যাদুবিদ্যা। আত্মারামের সন্ধান করিতে ঘর ছাড়িলেন। লোকমুখে শুনিয়া থাকি আত্মারাম নাকি একটি উপকথা। আপনি যদিও সর্বতোভাবে বিশ্বাস করিয়া থাকেন উনি দিব্য শরীরে বাঁচিয়া আছেন। আপনার বিশ্বাসই আমার বিশ্বাস।
 
আমার জন্য দুশ্চিন্তা করিবেন না। আপনি জীবনে খুশী হইলেই আমি সুখী। যাদুবিদ্যার প্রতি আপনার প্রেমই আমার প্রেম।
 
প্রণাম লইবেন।
ইতি
হিঙ্গনবালা দাসী।
 
হরিমতীর চিঠিটি কতবার যে পড়লেন গণপতি। প্রিয়নাথ বসু আজ লোক পাঠিয়েছে, অথচ যেদিন মাতাল বলে সবার সামনে অপমান করেছিলেন! সেইরাত্রেই মদ আর সার্কাস দুটোই ছাড়লেন, শুধু এককথায় তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল হরিমতী। হিঙ্গনবালার নিজেরও কম খ্যাতি ছিল না সার্কাসে। অন্যায় করছেন কি হরিমতীর ওপর? নিজের মনকেই প্রশ্ন করলেন গণপতি।
 
সন্ধে ঘন হয়ে আসছে। ময়লা আলোটুকু লেগে আছে আকাশের গায়ে। কোথায় যেন কামিনী ফুল ফুটেছে। মিষ্টি গন্ধ ভেসে ভেসে চলেছে যেন কোন সুদূরে।
 
হরিমতীর জন্য ভারী হয়ে উঠল গণপতি যাদুকরের মন। দীপ জ্বলবে গৃহে, প্রিয় সঙ্গিনী প্রসাধন শেষ করে এসে বসবে মাথার কাছে। আহ! গৃহসুখ! সেই তো পরিপূর্ণ জীবন।
 
কিন্তু না, আত্মারামের সন্ধান তাঁকে পেতেই হবে। যাদুবিদ্যার পথ বড় কঠিন। ইন্দ্রিয় সংযম না থাকলে ভেসে যেতে হয়। গৃহের পথ তাঁর জন্য নয়।
 
আজ রাত্রে রাজবাড়ির প্রাচীন প্রাঙ্গনে বসবে যাদুর আসর। কুমার সাহেব আর রাজবাড়ির ঘনিষ্ঠ দু’চার মানুষ শুধু দর্শক। গণপতি দেখাবেন সব থেকে কঠিন যাদুবিদ্যা। ভোজবাজি বলা হত একেই প্রাচীন যাদুশাস্ত্রে। আত্মারাম হলেন  বিদ্যার একমাত্র প্রয়োগকর্তা। গত দু বছর নিজের চেষ্টায় অসীম মনোসংযোগ অভ্যাস করেছেন গণপতি। জানেন না, কী হবে তার ফল আজ। মন অবশ হলে চলবে না এখন, আর মাত্র কিছু সময়। হরিমতীর ভালবাসা সত্য হলে তিনি নিশ্চয় পারবেন।
 
রাত্রির তৃতীয় প্রহরে শুরু হবে সেই প্রাচীন যাদুবিদ্যার প্রয়োগ। অন্ধকার নাটমন্দির মৃদু মশালের আলোয় রহস্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। অষধা নক্ষত্র প্রবেশ করবেন বৃষরাশিতে। শুক্ল পক্ষের নির্মেঘ আকাশ। সেটিই প্রশস্ত সময়। শুরু হবে অলৌকিক এক ভোজবাজি।
 
ভোজবাজি আর শুরু হল না। অকস্মাৎ থেমে গেল দৃশ্যমালা। চেয়ে দেখি চারপাশে কেউ কোত্থাও নাই। আমার গরম পোশাক বৃষ্টির জলে ভিজে থুসথুস করছে। কতক্ষণ যে বসে আছি কাকভেজা হয়ে মনেও নাই। খা খা জনমানবশূন্য ম্যাল। এক অবাস্তব ভুতুড়ে কুয়াশা উঠে আসছে গহীন খাদের বুক থেকে। মাথা ভারী, ভালো করে নিঃশ্বাসও নিতে পারছি না। অস্পষ্ট আলোয় টলতে টলতে প্রধানের বাড়ি ফিরলাম।
সেই রাত থেকেই ধূম জ্বর। বুকে জল জমে মরতে বসেছিলাম। কী করে যে বেঁচে গেলাম তা ভাবলে আজও অবাক হই।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  মাসের দ্বিতীয় শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (অষ্টম পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More