হাড়ের বাঁশি ( সপ্তম পর্ব )

দিন তখনও শুরু হয়নি, কুয়াশাচ্ছন্ন খড়গপুর স্টেশনে রেলগাড়ির কামরায় উঠে বসল বন্যা। আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই মন হঠাৎ স্থির করেছে দুটো দিন কাছেই কোথাও কাটিয়ে আসবে, মাথায় কয়েকটি নাম চকিতে ভেসে উঠল, তার মধ্য থেকে বেলপাহাড়ি পার হয়ে কাঁকড়াঝোড় বলে একটি ক্ষুদ্র জনপদ পছন্দ হল বন্যার, প্রথমবার পৃথ্বীশের সঙ্গে যাওয়া, তাও হল বছর তিনেক, এবার একা, তা হোক, অনেকদিন অরণ্য দেখা হয়নি, হেমন্তবন বহুদূর থেকে নিঃসঙ্গ পুরুষের মতো তাকে চোখের ইশারায় যেন বলে উঠল, এসো, তোমাকে ঝরা কুসুমদলের গান শোনাব!

 

ঝাড়গ্রামের পথে রেলগাড়ি ছুটতেই জানলার পাশে বসে নিজ অন্তরমহলে কিশোরীবেলা উথলানো হাসির সুবাস স্পষ্ট বুঝতে পারল বন্যা, একবার ভাবল মেসেজ করে পৃথ্বীশকে জানায় কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, থাক কী দরকার!

কামরায় ভিড় তেমন নেই, সকলেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। একজন অন্ধ মানুষ খালি গলায় ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে কী সঙ্গীত ভেসে আসে’ গাইতে গাইতে প্রতিজনের সামনে এসে হাত পেতে দাঁড়াচ্ছেন। পাশে দশ বারো বছরের এক বালক, মলিন জামা আর হাফ প্যান্ট পরনে, সম্ভবত ওঁর পুত্র, পিতার হাত ধরে ভিক্ষা সংগ্রহে বেরিয়েছে। বন্যার কাছে আসতেই ব্যাগ খুলে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট নিয়ে অতি সংকোচে বালকের হাতে দিয়ে সামান্য হাসল। উত্তরে ছেলেটির মুখেও হাসিরেখা ফুটে উঠল, বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী নাম তোমার?’

ভেসে যাওয়া গানের কথাগুলির মাঝে বালক মুখ নামিয়ে বলল, ‘পিন্টু।’

–ইস্কুলে যাও না?

কোনও উত্তর না দিয়ে পাশের যাত্রীর দিকে এগিয়ে গেল পিতা-পুত্র। বালকটির একমাথা ঝুমুর ঝুমুর চুল, স্বপ্নারুণ দুটি চোখে দুধতোলা আকাশের রঙ এসে পড়েছে, খালি পা। কী মনে হওয়ায় গলা তুলে বন্যা ডাকল, ‘পিন্টু একবার শোনো।’

অবাক হয়ে কয়েক পা পেছন ফিরে সামনে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে চাইল পিন্টু, তাকে এমন নরম আদরমাখা গলায় কেউ কখনও ডাকে না। রুকস্যাক থেকে ছ’টা কলা, এক প্যাকেট কেক আর বিস্কুট বার করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বন্যা বলল, ‘এগুলো নাও, তোমার জন্য, খিদে পেলে খেও।’

কচি দুখানি হাত পেতে খাবারগুলি সব নিল। হাতের পাতা কী ময়লা, যেন জগতের সব কালো এসে জড়ো হয়েছে, বাবার কনুইয়ে ঝোলানো চটের শতচ্ছিন্ন একটি থলের ভেতর সেগুলি রেখে বন্যার দিকে তাকিয়ে শুধু মৃদু জোৎস্নার মতো একবার হাসল।

–খাবে না?

–পরে খাব।

–বাড়ি গিয়ে খাবে?

ঘাড় নেড়ে রিণরিণে গলায় পিন্টু নিঃস্পৃহ ভঙ্গিমায় উত্তর দিল, ‘খিদা চাপলি বোন কাঁদে, ওরে দেব।’  

সহসা বন্যার চোখ দুটি অশ্রু টলোমলো হয়ে উঠল। মনে হল বালকটি যেন পৃথ্বীশ, ক্ষুধায় অপমানে হয়তো এমন করেই পথে পথে ভিক্ষা করছে সে এখন অন্য কোনও জন্মে, বন্যা কখনও তাকে চিনতে পারেনি। সেও গাঢ় অভিমানে দূরে চলে গেছে, অথচ কথা দিয়েছিল ঠিক চিনে নেব তোমায়! কত কথাই তো মানুষ দেয়, এই মায়া জগতে তার কিছুই ফলবতী হয় না। অতি কষ্টে অশ্রু সংবরণ করে বাইরের দিকে তাকাল বন্যা। শত চেষ্টার পরেও কয়েকটি জলবিন্দু স্বাতী নক্ষত্রের বেদনার মতো নরম গালের উপর তার অজান্তেই নেমে এল, ওই মহার্ঘ্য জলকণাই তো মানুষের অন্তরে জমা হয়ে একদিন মুক্তা হয়ে ফুটে ওঠে!

 

‘জগৎ এমনই মা, কষ্ট পেও না’। কথাগুলি শুনে একটু চমকে উঠে জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকাল বন্যা। এতক্ষণ ভালো করে খেয়াল করেনি, প্রৌঢ় মানুষ, মাথা ন্যাড়া, পরনে গেরুয়া ধুতি আর ফুলহাতা পাঞ্জাবি, একখানি কাপড়ের ব্যাগ কোলের উপর রাখা, গায়ের রঙ বেশ কালোই বলা চলে, উজ্জ্বল চোখে খুব মৃদু হাসির স্পর্শ যেন লেগে রয়েছে।

জোড় হাতে নমস্কার করে প্রৌঢ়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বন্যা বলল, ‘জানি, বড় কষ্ট চারপাশে।’

–কষ্ট চারপাশে নয় মা, কষ্ট আসলে রয়েছে আমাদের ভেতরে।

অবাক হয়ে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘তার মানে?’

সামান্য হেসে প্রৌঢ় সন্ন্যাসী বললেন, ‘ওসব অনেক কথা, সে থাক এখন। তোমার কি এদিকেই বাড়ি?’

–না না, আমার বাড়ি অনেকদূর, এদিকে এমনিই বেড়াতে যাচ্ছি!

–বাহ বাহ! বেড়ানো ভালো, ওতে আনন্দ হয় মনে। সাবধানে যেও।

কথা ক’টি বলেই চুপ করে গেলেন সন্ন্যাসী, কখনও যেন কথাই হয়নি এমনভাবে ঝোলা থেকে মলাট দেওয়া একটি বই বের করে পাতা খুলে তার মধ্যে চোখ ডুবিয়ে দিলেন।

চারধারের জগৎ পুরাতন দিনের চিঠির মতো আলতো রৌদ্রে ভরে উঠেছে। ধানখেত, ছোট ছোট পুকুর, মাঝে মাঝে মাটির খোড়ো ঘর সাজানো নির্জন ক্ষুদ্র পল্লী পার হয়ে ঝমঝম শব্দে রেলগাড়ি ছুটে চলেছে। আকাশে আজ মেঘ নাই- কুয়াশা সরিয়ে আশমানি বালিকার মতো উজ্জ্বল, সেদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত পর সন্ন্যাসীর পানে চেয়ে সামান্য ইতস্তত স্বরে বন্যা বলল, ‘আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? যদি কিছু মনে না করেন!’

গলার স্বর শুনে বই থেকে মুখ তুলে সুদূর কোন ভুবন থেকে ভেসে আসা গলায় সন্ন্যাসী বললেন, ‘বলুন।’

চোখদুটি ভারি আনমনা, এক মুহূর্ত সেখানে দৃষ্টি রেখে মনে মনে একটু অবাকই হল বন্যা। কিছুক্ষণ আগে তো তুমি সম্বোধনে বলছিলেন, আশ্চর্য! সে-কথা মনে চেপে রেখে মুখে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি তো সন্ন্যাসী, এদিকেই আপনার আশ্রম?’

সামান্য হেসে সন্ন্যাসী উত্তর দিলেন, ‘সন্ন্যাসী কিনা জানি না মা, বহুবছর পূর্বে নর্মদাতীরে আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস দীক্ষা হয়েছিল।’, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘আশ্রমও নাই কিছু। বেলপাহাড়ির দিকে একটি আদিবাসী গ্রামে থাকি, তাদের বাচ্চাদের পড়াই, অসুখ বিসুখ হলে ওষুধপত্র দিই, এই আর কী!’

‘নর্মদাতীর’ শব্দটি শুনে বন্যার মনে চকিত উল্কার মতো সেই আশ্চর্য স্বপ্নদৃশ্যের কথা ভেসে উঠল। কৌতুহলী হয়ে সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘ওষুধ দেন মানে আপনি কি ডাক্তার?’

সন্ন্যাসী স্মিত হেসে বললেন, ‘আমাদের দেশে সন্ন্যাসীদের চিকিৎসা করার রীতি অতি প্রাচীন, জানেন তো? তাঁরা সংসারের মানুষকে এইভাবেই সাহায্য করতেন, পরিবর্তে দুটি ভিক্ষান্ন গ্রহণ করতেন। তবে আমি অবশ্য পূর্বাশ্রমে থাকাকালীন একটি কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশও করেছিলাম। বিদ্যা তো নষ্ট হয় না, এখন এইভাবে মানুষের কাজে লাগছে!’

 

অবাক হয়ে সন্ন্যাসীর দিকে চেয়ে রইল বন্যা। এমন মানুষ সে এর আগে কখনও দেখেনি, মন প্রশ্নের ঝড়ে উথালপাতাল, সেসব জিজ্ঞাসা করা অভদ্রতা ভেবে চুপ করে রইল, কিন্তু মুখে প্রশ্নছায়া ঘনিয়ে উঠতে দেখে প্রবীণ সন্ন্যাসী নিজে থেকেই বললেন, ‘আপনি আমার কথায় কোনও বিষয়ে কৌতুহলী হয়ে থাকলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন, আমি কিছু মনে করব না!’

সন্ন্যাসীর কথায় সামান্য লজ্জা পেয়ে মুখ নীচু করল বন্যা, তারপর মৃদুস্বরে বলল, ‘না তেমন কিছু নয়, ওই নর্মদাতীরে আপনার অভিজ্ঞতা শুনতে বড়ো ইচ্ছে করছে!’

–আপনি কি নর্মদাতীরের গহিন অরণ্যে গেছেন কখনও?

বন্যাকে নীরবে দুদিকে ঘাড় নাড়তে দেখে একটু অবাক হয়েই সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে ওই অঞ্চল নিয়ে কৌতুহল কেন?’

‘আসলে অনেকগুলি কথা… এমন কিছু ঘটছে…আমি নর্মদা বা পরিক্রমার নাম অবধি কখনও শুনিনি, কিন্তু’, এত ঘটনা কীভাবে বলবে বুঝতে না পেরে হঠাৎ চুপ করে গেল বন্যা। এক মুহূর্তের জন্য মুখে ভেসে ওঠা অসহায়তার চিহ্ন সন্ন্যাসীর চোখ এড়াল না, তিনি ভারি নরম স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এদিকে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন?’

–আমি বেলপাহাড়ি পার হয়ে কাঁকড়াঝোড় যাব! দিন দুয়েক থাকার ইচ্ছা রয়েছে।

বন্যার কথা শুনে সন্ন্যাসী উজ্জ্বল মুখে বললেন, ‘তাহলে এক কাজ করুন, একদিন আমার ওখানে আসুন। কাঁকড়াঝোড়ের পথে ভেন্দা গ্রামে নির্মলানন্দ সাধুর কুঠিয়া কোথায় জিজ্ঞাসা করলে যে কেউ আপনাকে পথ দেখিয়ে দেবে! তখন সময় নিয়ে আপনার কথা শুনব।’

নির্মলানন্দ স্বামীর কথায় বন্যা ছেলেমানুষের মতো চঞ্চল গলায় বলে উঠল, ‘কী যে ভালো হল! আপনার ফোন নাম্বারটি একটু দিন আমায়, তাহলে কালই একবার ফোন করে চলে যাব!’

নিজের নাম্বারটি ধীরে ধীরে মুখে বলে নির্মলানন্দ বললেন, ‘আমার ফোন সকাল নটা থেকে বিকেল চারটে অবধি পাবেন, তারপর সুইচ অফ করে রাখি।’

ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে নাম্বারটি সেভ করে নিয়ে বন্যা বলল, ‘আমি সকালেই ফোন করব আপনাকে!’

–বেশ। আরেকটি কথা মা, আপনার পরিচয় যে এখনও জানা হল না!

লজ্জা পেয়ে বন্যা বলল, ‘দেখেছেন, কখন থেকে বকবক করছি অথচ আমার নামই বলা হয়নি, আমি বন্যা, বন্যা রহমান। আইআইটির’, কথা শেষ না করে হঠাৎ কী যেন মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিমায় মুখ নীচু করে ধীর স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘সরি, আমার আগে বলা উচিত ছিল, আমি মুসলিম, আপনার আশ্রমে গেলে সমস্যা হবে না তো কোনও?’

সে জিজ্ঞাসার কোনও উত্তর না দিয়ে নির্মলানন্দ নির্বিকারভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আইআইটিতে আপনি কি পড়াশোনা করছেন? নাকি চাকরি?’

খোলা জানলা দিয়ে ছুটে আসা এলোঝেলো হাওয়ায় মুখের উপর এসে পড়া দু-এক গুছি চুল হাত দিয়ে সরিয়ে বন্যা বলল, ‘না আমি রিসার্চ ফেলো। মেটালার্জি। আমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে।’

–উত্তরবঙ্গের কোথায়?

–আপনি কখনও ডুয়ার্স গেছেন? ওখানে চালসা বলে একটা আধা-মফস্বল শহরে আমার বাড়ি।

–বাহ! সে তো চমৎকার জায়গা, মূর্তি নদীটিও কত সুন্দর!        

নিজের দেশের প্রশংসা শুনে বন্যা সাগ্রহে শুধোল, ‘আপনি গেছেন?’

মৃদু হাসি মুখে টেনে সন্ন্যাসী বললেন, ‘অনেকবার। চালসা, মূর্তি, চাপড়ামারি, বড়ো ভালো জায়গা ওসব।’, কয়েক মুহূর্ত পর পুনরায় বললেন, ‘শুনুন আমার কুঠিয়ায় রামলালা আর সীতা মায়ের বিগ্রহ রয়েছে। সেই নর্মদা থেকেই ওঁরা আমার সঙ্গে রয়েছেন, ওঁদের কাছে জাতপাত নাই! মেয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার সময় কি কেউ তার জাত জিজ্ঞাসা করে!’

–আমায় ক্ষমা করবেন, আসলে চারদিকে যা দেখি, জাত নিয়ে এত মারামারি, দাঙ্গা, বড়ো বিব্রত লাগে। মনে হয় মুসলিম ঘরে জন্ম নেওয়াটাই অপরাধ!

–এ আপনি ঠিক কথা বলছেন না মা! আপনি নিজে উচ্চশিক্ষিতা, আমার দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন, আপনার নিশ্চয় হিন্দু বন্ধু রয়েছেন, হয়তো প্রিয় বন্ধুই তিনি, কিছুক্ষণ পূর্বে একজন হিন্দু ভিক্ষুককে সাহায্য করার সময় আপনার চোখ জলে ভরে উঠেছিল, কই কোথাও তো আপনি আমি বিচ্ছিন্ন নই! মা নিজেকে একাকী বিচ্ছিন্ন ভাবনা ঠিক নয়, প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা সর্বদা ঐক্য বোধের জন্ম দেয়।

মুগ্ধ হয়ে সন্ন্যাসীর কথা শুনছিল বন্যা, শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, তাই তো, কেন আলাদা ভাবছি আমি নিজেকে, পৃথ্বীশ তো হিন্দু, কই কখনও সে তো আমাকে আলাদা করে চিন্তা করেনি! 

নির্মলানন্দ স্বামীর দিকে চেয়ে নম্র স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু শুনি যে সন্ন্যাসী মাত্রই একা! একা না হলে ঈশ্বরলাভ নাকি হয় না। তাহলে?’

–এক তো আমরা প্রত্যেকেই, কিন্তু পৃথক নই, আপনিও যা আমিও তাই, অভিন্ন। অভেদ!

–তা কী করে হয়? আমি নারী আপনি পুরুষ, আপনি সন্ন্যাসী আমি গৃহী! অভিন্ন কী করে হব?

বন্যার কথায় শীতবাতাসের মতো নিঃশব্দে হেসে উঠলেন সন্ন্যাসী, বিষাদঋতুর রৌদ্র তাঁর মুখে এসে পড়ায় সমস্ত মুখখানি যেন পীতবসনা উদাসী অরণ্যভূমি হয়ে উঠেছে, করুণাপূর্ণ দুটি নয়ন বন্যার চোখে স্থাপন করে ধীর স্বরে বললেন, ‘মাটির থালা, মাটির বাটি, মাটির ঘর, সবই ভিন্ন, যেমন আমি ও আপনি, কিন্তু রূপ ও নাম শুধু ভিন্ন, ভেবে দেখুন সবই আসলে সেই মাটি দিয়েই তৈরি! এই কথাটি জানলে ঐক্য বোঝা যায়।’, দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় বললেন, ‘আপনি ও আমি পৃথক কেউ নই, আলাদা দেখায় মাত্র, আমরা সকলেই প্রকৃতপক্ষে পিওর কনসাসনেস! আমি আপনি এই রেলগাড়ি ওই দূরের মাঠ গাছপালা কীটপতঙ্গ জড় ও জীব সমস্ত কিছুই অভিন্ন।’

নাছোড় জেদি বালিকার মতো বন্যা শুধোল, ‘কিন্তু বুঝব কী করে? নাম ও রূপের ওপারে যাব কী করে?’

–আপনি বুঝলেও আপনি যা, না বুঝলেও তাই! আপনি বন্যা রহমান, এ-কথা না জানলেও তো আপনি বন্যাই থাকবেন, তাই না? কারণ এইটি সত্য! তেমন ওই অদ্বৈততত্ত্বও ধ্রুব ও পরম সত্য!

 

কী একটা কথা বন্যা পুনরায় জিজ্ঞাসা করতে যেতেই হাত তুলে নির্মলানন্দ নিরস্ত করে সস্নেহে বললেন, ‘মা, পথেঘাটে এই অবধিই থাক, আপনি আগামীকাল এলে কথা হবে। আর আপনার কথাও শুনব।’

সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে বন্যা বলল, ‘তাই হবে। তবে একটা কথা, আমাকে প্লিজ আপনি বলবেন না!’

–কিন্তু আমি যে চট করে কাউকে তুমি বলতে পারি না।

–বাহ রে! আজ প্রথমে যে বললেন একবার!

জানলার বাইরে মুখ ফিরিয়ে সন্ন্যাসী নিরুত্তর বসে রইলেন, জীর্ণ পাতা আর আলোছায়ায় আচ্ছন্ন লোধাশুলির জঙ্গল পার হয়ে ছুটে চলেছে রেলগাড়ি, দুপাশে নির্জন শাল মহুয়া গাছের সারির দিকে চেয়ে বন্যার হঠাৎ মনে হল, বেঁচে থাকা আসলে ওইরকম অপরূপ রৌদ্রছায়ার কারুকাজ, বারবার কত আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে যে পথে দেখা হয়ে যায়, তারপর একদিন যোগাযোগ ছিন্ন হয়, আবার কোনও নতুন মানুষ আসেন, কত প্রেম পীরিত কত অভিমান বেদনা তবুও কী আনন্দময় এই জীবন!

ঝাড়গ্রাম স্টেশনে রেলগাড়ি থেকে নেমে বন্যা হাসি মুখে নির্মলানন্দের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বলল, ‘আমি আসি তাহলে, কাল সকালে ফোন করে আপনার কুঠিয়ায় চলে যাব!’

–আসুন, স্টেশনের বাইরেই আপনি বেলপাহাড়ি যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যাবেন। এদিকে আগে কখনও এসেছেন?

‘হ্যাঁ জানি, বছর তিনেক আগে একবার এসেছিলাম।’, দু-এক মুহূর্ত পর কী যেন চিন্তা করে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনিও তো ওই পথেই যাবেন?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে নির্মলানন্দ বললেন, ‘হ্যাঁ ও-দিকেই যাব, তবে তার আগে এখানে একটি কাজ রয়েছে, আপনি রওনা হন, কাল নিশ্চয়ই দেখা হবে।’, কথা ক’টি বলেই নমস্কার জানিয়ে দ্রুত পায়ে রেল ওভারব্রিজের দিকে হাঁটা দিলেন প্রৌঢ় সন্ন্যাসী। কোলাহলমুখর ভিড় থইথই স্টেশনে একটি বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে বন্যা তাঁর যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে ভাবল, পুরুষ মানুষ নিরাসক্ত হলে তার চারপাশে কী এক অপরূপ সৌন্দর্য-ই না ফুটে ওঠে!

 

বেলা প্রায় ন’টা, স্টেশনের বাইরে পথঘাট ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে মুখর, সাইকেল-রিক্সা মোটরবাইক গাড়ি সব মিলিয়ে বিচিত্র এক সুর যেন বেজে চলেছে। কার্তিকের আলতো রোদ্দুরে শীতের নূতন সবজির মতোই ভুবনডাঙা সেজে উঠেছে। কিছুক্ষণ পূর্বে হয়তো অল্প কুয়াশা ছিল- এখনও বাতাসে তার স্মৃতি রয়ে গেছে। বেশ বড়ো একটি মিষ্টির দোকানের বাইরে উঁচু লোহার কড়াই কাঠের উনানে চাপিয়ে ডুবো তেলে সাদা ফুলকো লুচি ভেজে তুলছে একজন মাঝবয়সী ময়রা, দোকানের পাশ দিয়ে গাড়ি স্ট্যান্ডে আসার সময় ওই চনমনে সুবাসে বন্যার হঠাৎ খিদের কথা মনে পড়ল! দু-এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দেখল লুচি ভাজা, দোকানে বেশ ভিড়, লোকে লাইন দিয়ে লুচি আর ছোলার ডাল কিনছে, ভেতরে বসে খাওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে, একবার ভাবল ঢুকে খাবে তারপর মনে হল খালি পেটে তেলেভাজা খেয়ে গাড়িতে উঠলে নিশ্চয়ই বমি অবধারিত। লোভ সংবরণ করে সামনে এগিয়ে যেতেই গাড়িওয়ালাদের হাঁকডাক কানে ভেসে এল। একজনের কাছে এগিয়ে বেলপাহাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করতেই লোকটি বন্যার দিকে কয়েকমুহূর্ত চেয়ে থেকে বলল, ‘রিজার্ভে যাবেন তো? ক’জন আছেন?’

–আমি একাই আছি। হ্যাঁ, রিজার্ভ করেই যাব!

মুখ থেকে গুটখার পিক পিচ করে রাস্তার উপর ফেলে লোকটি বাঁকা সুরে জিজ্ঞাসা করল, ‘একাই যাবেন? তা বেলপাহাড়ির কোতা যাবেন?’

–ঠিক বেলপাহাড়ি নয়, আমি আসলে যাব কাঁকড়াঝোড়।

–অ! সে-কতা আগে বলেন, টুরিস্ট! ক্যাকড়াঝোড়ে মাহাতোর ওকেনে তো?

মৃদু হেসে বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘ওখানে তো থাকার জায়গা বলতে ওই একটিই রয়েছে। সেখানেই যাব, কত নেবেন ভাই?’

কয়েক মুহূর্ত মনে মনে কী যেন চিন্তা করে লোকটি বলল, ‘দ্যাবেন, দুই হাজার দ্যাবেন!’

–কী? দু-হাজার?! আপনি কি পাগল হয়েছেন দাদা, এইটুকু পথ, তার জন্য দু-হাজার!

–কী বলছ্যান ম্যাডাম, যাওয়া আসা নিয়ে একশো তিরিশ, তেলের দাম দ্যাখেন হিসাব করি, কমই বলছি আপনারে!

‘থাক ভাই, আমি অন্য কোথাও দেখি।’, বলেই আর একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটা দিল বন্যা। লোকটিকে এমনিও পছন্দ হয়নি, কেমনধারা কথাবার্তা, চোখের নজরও খুব সুবিধার কিছু নয়, বারবার অন্য দিকে চোখ চলে যায়! সে-অবশ্য কোন পুরুষেরই বা না যায়! ভেবেই হাসি পেল বন্যার, কী এক অদ্ভুত অসম্মান নিয়ে বাঁচতে হয় তাদের মতো মেয়েদের, পুরুষরা কেন যে সামান্য সৌজন্যও জানাতে শিখল না এখনও!

পুরুষের কথা মনে হতেই চকিতে পৃথ্বীশের মুখ মনে পড়ল, না পৃথ্বীশ তেমন নয়, বারবার তার চোখে আচরণে কী গভীর শ্রদ্ধা নজরে পড়েছে, অবাক হয়ে কতবার ভেবেছে বন্যা, দৃষ্টিপথে প্রেম থাকলে এতটা বিস্মিত হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু প্রেম নয়, পুরুষের শ্রদ্ধা তাকে অভিভূত করেছে। হয়তো পৃথ্বীশের মতো মানুষ খুব বিরল এই জগতে। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসব এলোমেলো চিন্তার মধ্যে হঠাৎ শুনল, বেলপাহাড়ি বেলপাহাড়ি, কাঁকড়াঝোড় কাঁকড়াঝোড়- চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে একটা প্রাইভেট বাসের গেটে দাঁড়িয়ে রোগা চেহারার একজন কন্ডাকটার চিৎকার করে লোক ডাকছে। কী মনে হওয়ায় সাত-পাঁচ না ভেবে বাসেই উঠে পড়ল বন্যা।   

বাসে উঠে মিনিট দশেক পর অবশ্য বুঝতে পারল কাজটা খুব একটা ভালো হয়নি! বেজায় ভিড় এবং লোকজন ক্রমাগত উঠেই চলেছে, তার মতো শহুরে পোশাক পরা একটিও মেয়ে নাই, বেশিরভাগই আদিবাসী রমণী, গ্রামের মেয়েরা বড়ো বড়ো ধামা বস্তা সঙ্গে নিয়েই উঠেছে, কারোর কারোর কাঁখালে আবার শিশু-ভিড়ের ঠেলায় তারস্বরে কাঁদছে, ঘামের গন্ধ মাথার তেলের সুবাস, ধামায় রাখা মুরগির ডাক সব মিলিয়ে বেশ হইচই জমে উঠেছে! বন্যার পাশে বসা রমণীটি তার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে চেয়েই রয়েছে, অস্বস্তি এড়াতে জানলার বাইরে চোখ রাখল বন্যা। লাল ধুলো উড়িয়ে বাস ছুটে চলেছে, দুপাশে রুক্ষ জমি, মাঝে মাঝে শাল আর মহুয়া গাছ চোখে পড়ে, দূরে অস্পষ্ট মালভূমি শান্ত স্রোতের মতো আকাশরেখার উপরে যেন ভেসে রয়েছে, ইতস্তত খোড়ো চালের বাড়ি, নিকোনো উঠানে মুরগি আর ছাগলছানার খেলা করছে। টলটলে দীঘির জলে একরাশ শাপলা ফুল বাতাসে মাথা দুলিয়ে কথা কইছে পরস্পরের সঙ্গে, হলদে শাড়ি পরা রৌদ্র-ঝলমল জগত যেন মায়াদেবীর অলঙ্কার-হঠাৎ পাশ থেকে শুনতে পেল কেউ যেন জিজ্ঞাসা করছে, ‘কুথায় যাবেক?’

মুখ ফিরিয়ে দেখে পাশে বসা তরুণী উজ্জ্বল মুখে তাকিয়ে রয়েছে, সামান্য হেসে বন্যা জবাব দিল, ‘বেলপাহাড়ি পার হয়ে কাঁকড়াঝোড়!’

–ঘুরন লাগি?

–হ্যাঁ, তা তুমি কোথায় যাবে?

বন্যার কথায় খিলখিল করে হেসে উঠল তরুণী, পাশে দাঁড়ানো একদল মেয়েও যোগ দিল হাসি স্রোতে, যেন কী মজার কথাই না জিজ্ঞাসা করা হয়েছে! ফুল ফোটার মতো হাসির শব্দে অপ্রস্তুত মুখে চেয়ে রইল বন্যা, কী বলবে বুঝতে না পেরে হাত ব্যাগ খুলে বোতল বের করে একচুমুক জল খেল, এদিকে হাসির রেশ কিছুটা কমতেই পাশে বসা তরুণী কলকল করে বলে উঠল, ‘মু উকেনে যাবক কেনে গ, মু ঘরকে যাবক!’

এতক্ষণে বুঝতে পারল হাসির অর্থ, ওরা সবাই ভেবেছে বন্যা ওদের নিজের সঙ্গে যেতে বলছে, সরল একদল অল্পবয়সী মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কোন অজানা কারণে মন আনন্দে ভরে উঠল, যেন কতকাল পর সখীদলের সঙ্গে দেখা হয়েছে, হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাদের ঘরে আমাকে নিয়ে যাবে?’

তরুণীর পরনে সস্তার ডুরে শাড়ি, ফটফটে পরিষ্কার, একমাথা চুল টান করে খোঁপায় বাঁধা, শ্রীময়ীর মতো দুটি চোখ তুলে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমার মরদ বলবেক লাই কিছু?’

কৌতুকের স্বরে বন্যা বলল, ‘আমার যে মরদ নাই গো!’

এ-কথা শোনার পর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল তরুণী, পূর্বের সব উচ্ছলতা নিমেষে মুছে ফেলে শুধোল, ‘ছাড়েন চল গেছেক?’

মজা করে বলা সামান্য কথাও যে কারোর মনে এমন বেদনা কাজল এঁকে দিতে পারে তা এতদিন বন্যা কখনও দেখেনি, সহসা এই অপরিচিতার জন্য বুকের ভেতরে হু হু বাতাস বয়ে গেল, সরল গ্রাম্য মেয়েটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বড়ো ভালো মানুষ, কী নাম গো তোমার?’

বন্যার বাহুর উপর নিজের হাতখানি রেখে তরুণী নরম গলায় বলল, ‘ঝুমরী!’, একমুহূর্ত পর এলোঝেলো ভাবে আটকে রাখা বন্যার একরাশ চুলের দিকে ইশারা করে শুধোল, ‘লাজের মাথা খাঞছো? চুলটো বাঁধবেক লাই, ঘুরন লেগে বার হইছক!’

হঠাৎ এমন কথার উত্তরে কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল বন্যা, ঠিক যেন চালসার বাড়ির উঠানে বসে মা বকাবকি করছেন- কলকাতা থেকে এল, আর চুলের দশা দ্যাখো, বেদেদের মতো ইল্কিভিল্কি লাল রঙ করেছে আবার, দেখে মনে হয় বাপ-মা মরেছে, ছি ছি ছি!

অনেকদিন পর অবিকল সেইরকম স্নেহ শাসনে অন্তরমহলে কোথাও একটি বেনেবৌ পাখি কণ্ঠে শিস তুলে ডেকে উঠল, মুখ তুলে ঝুমরীকে কিছু বলতে যাবে আর সেই মুহূর্তেই হাত ব্যাগের ভেতর ঝনঝন শব্দে ফোন জানান দিল নিজের অস্তিত্ব। খুলে দেখে স্ক্রীনে ফুটে উঠেছে ‘পৃ’ অক্ষর, পৃথ্বীশ, থাক, এখন ফোনে কথা বললে ঝুমরীকে কিছু বলা হবে না আর, এই মুহূর্তে পৃথ্বীশের তুলনায় ঝুমরী অনেক বেশি মূল্যবান। ফোন ব্যাগে রেখে শান্ত গলায় ঝুমরীকে বলল, ‘আচ্ছা পরের বার থেকে চুল বেঁধে বেরোব!’

চৈত্র দিনে ঝরে পড়া মহুয়া ফুলের মতো হাসি মুখে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঝুমরী জানলা দিয়ে দূরে কয়েকটি খোড়ো চালের মাটির ঘরের সারি দেখিয়ে বলল, ‘ঘর আইছেক, মুরা নামি যাবেক’। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে কী যেন চিন্তা করে পুনরায় বলল, ‘পথি কিছু হলি মুর মরদের নামটো করবেক, লছন, ই তল্লায় সকলে উরে জানেক!’

মরদের নাম বলার সময় বন্যা খেয়াল করল গরবিনী ঝুমরীর চোখ দুটি চাপা আনন্দে অপরাহ্ণ আলোর মতো ঝলমল করে উঠল, মাথা নেড়ে সামান্য হেসে সম্মতি জানাল বন্যা। ব্যাগ খুলে একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট হাতের মুঠোয় দিয়ে বলল, ‘খুব মিষ্টি, খেয়ে দেখো, ভালো লাগবে!’

 

বাস থেকে নেমে হাত তুলে হাসল ওরা সবাই, জানলা দিয়ে হাত বের করে বন্যাও উত্তর দিল, রুক্ষ ধুলাপথের উপর দিয়ে বাস না চলে যাওয়া অবধি দাঁড়িয়েই থাকল কোন জন্মের সখীর দল। মুখ ফিরিয়ে যতদূর অবধি চোখ যায় চেয়েই রইল বন্যা, তারপর লাল ধুলা বাতাস মুছে দিল দৃশ্যপট। চোখ বন্ধ করে বন্যা ভাবল, হয়তো আর কখনও দেখা হবে না, তবুও ঝুমরী রয়ে যাবে চিরকাল। সেই যেখানে তেমন কেউ একটা যায় না-হৃদমাঝারে টলটলে পদ্মদীঘির ধারে কুসুমবনে উজ্জ্বল মেয়েটির সঙ্গে তার দেখা হবে, কত নির্জন চৈত্র দ্বিপ্রহরে ঘেঁটুফুলের জোসনায়, অতসী সুবাসে আচ্ছন্ন বর্ষাদিনে কত আশ্বিন অপরাহ্ণে থলকমলের দোলায় দুজনের নিভৃত গোপন আলাপে মুখর হয়ে উঠবে মনোজগত! পথের সখী পথেই রয়ে যাবে শুধু তার সুবাস নিয়ে ফিরে যাবে বন্যা।

 

বেলপাহাড়ি পার হয়ে সামান্য খাড়াই পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে বাস। বামদিকে ঢেউ তোলা মালভূমির উপর গহিন অরণ্য ভাঙা দিনের আলোয় মুখর, ক্রমশ ভিক্ষার সাপি শূন্য করে দ্বিপ্রহর ঢলে পড়ছে কার্তিকের দরিদ্র অপরাহ্নের কোলে, মুগ্ধ নয়নে এই পুরাতন অথচ চিরনূতন অপরূপ মায়া জগতের পানে চেয়ে রয়েছে বন্যা, তার দুচোখে এখন রূপহাটের ঝিলিমিলি। পৃথ্বীশ, বিচিত্র স্বপ্ন, নর্মদাভূমি, কিছুক্ষণ পূর্বে আলাপ হওয়া নির্মলানন্দ- সকলেই মুছে গেছে। এমনই হয়, প্রকৃতির সামনে তার আভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন মানুষের অন্তরতমের কথাই শুধু মনে থাকে!

 

সহসা বন্যার সামনে দপ করে নিভে এই দৃশ্যপট। অস্পষ্ট আঁধারে গহিন অরণ্যের মধ্য থেকে কে যেন গম্ভীর অথচ উদাত্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘দিনয়ামিন্যৌ সায়ং প্রাতঃ,শিশিরবসন্তৌ পুনরায়াতঃ।কালঃ ক্রীড়তি গচ্ছত্যায়ু-স্তদপি ন মুঞ্চত্যাশাবায়ুঃ।’

           চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                       পরের পর্ব : মাসের চতুর্থ শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।  

 

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More