হাড়ের বাঁশি (দশম পর্ব)

কাঁসার বাটিতে রাখা কাতলা মাছের একবিঘত বড়ো পেটির দিকে তাকিয়ে ঈশ্বর রাওয়ের ইতস্তত ভাব দেখে ঋষা পাশ থেকে অল্প হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর ইউ কমফোর্টেবল উইথ দিস?’

স্নান শেষে একফেরতা করে সাদা ধুতি পরেছেন ঈশ্বর, গায়ে একখানি সাদা ফুলহাতা জামা, উজ্জ্বল মুখে ঋষার দিকে চেয়ে বললেন, ‘নেভার ট্রাইড দিস! বাট থিঙ্ক আই ক্যান ম্যানেজ!’

–আর ইউ শিওর?

ঋষার প্রশ্নের ধরন দেখে খাওয়া থামিয়ে হেসেই ফেললেন ঈশ্বর, জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এত কি কুক আপনি করলে?’

‘তেমন কিছুই করতে পারিনি, এইটা আমাদের পুকুরের মাছ, আজ সকালেই জাল ফেলে ধরানো হয়েছে’, কথার মাঝেই টেবিলের ওদিকে পৃথ্বীশের দিকে একবার আড়চোখে চেয়ে ঋষা ঈশ্বরকে বলল, ‘প্লিজ লেট মি হেল্প ইউ!’

পুরাতন দিনের কড়ি-বরগার ঘর, প্রশস্ত আয়তকার মেহগিনি কাঠের টেবিল ঘিরে আটখানি পায়া ভারী চেয়ার সাজানো রয়েছে, দোতলার এই ঘরটিই ভট্টাচার্য পরিবারের খাওয়ার ঘর, খড়খড়ি দেওয়া চারটি জানলা হাট করে খোলা, ওপারে বৌডুবির দিঘি, ছোট ছোট পাড়া, খোড়ো চালের ঘর দু-একটি পাকা দালান পার হয়ে ধূ ধূ প্রান্তর অপরূপ পটচিত্রের মতো কার্তিকের কবোষ্ণ রৌদ্রে ঝলমল করছে। উত্তরপথগামী বাতাস এখন ঈষৎ রুক্ষ। গাঢ় দ্বিপ্রহরে বাগানের তেঁতুল গাছে একদল শালিক পাখি হুটোপুটি লাগিয়েছে, সেদিকে একপলক তাকিয়ে ঈশ্বর মুখ ফিরিয়ে ঋষার দিকে চেয়ে বললেন, ‘দিস প্লেস ইজ রিয়েলি বিউটিফুল!’

বাটি থেকে আরেকটি ছোট থালায় মাছ তুলে দুটি মাত্র আঙুল সন্তর্পণে ছুঁইয়ে কাঁটা বেছে আলাদা করতে করতে ঋষা বলল, ‘বাড়ির বাইরে অনেকদিনের পুরনো মন্দির রয়েছে, আমাদের কুলদেবতা, আই থিঙ্ক ইউ উইল লাইক ইট!’

‘কুলদেবতা’ শব্দটি ভালো বুঝতে না পেরে ইশ্বর কিছুটা আন্দাজেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গড অব দ্য ফ্যামিলি?’

–ইয়েস! 

–বাট হাউ ডু ইউ নো দ্যাট আই স্যাল লাইক ইওর ফ্যামিলি টেম্পল?

অন্য কেউ হলে এমন প্রশ্নের সামনে দ্বিধাগ্রস্ত মুখে হয়তো তাকাত, কিন্তু ঋষা অত্যন্ত সপ্রতিভভাবে রাওয়ের চোখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ হ্যাভ রুদ্রাক্ষ ইন ইওর নেক! আওয়ার ফ্যামিলি গড ইজ শিবা, বাণেশ্বর লিঙ্গা ফ্রম নর্মদা সাইড!’

ঋষার স্পষ্ট কথায় একমুহূর্তের জন্য চমকে উঠে নিজের গলায় ঝোলানো রুদ্রাক্ষ মালাটি জামার উপর থেকেই বামহাতে একবার স্পর্শ করলেন ঈশ্বর, তারপর মৃদু হেসে বললেন, ‘ইউ হ্যাভ ভেরি সার্প আইজ!’

 

কাঁটা ছাড়ানো মাছের একটুকরো মুখে দিয়ে রাও মন দিয়ে খেলেন, তারপর আবার অল্প ভাতের সঙ্গে মেখে মুখে দিলেন, দু-এক মুহূর্ত পর ঋষার দিকে চেয়ে বললেন, ‘ইউ আর আ ভেরি নাইস কুক! দিস ইজ রিয়েলি টেস্টি!’ 

কথা শেষ করেই পৃথ্বীশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রয় এনি প্রবলেম, ইউ আর সো কোয়াইট!  এনিথিং রং?’

সত্যিই মুখ নীচু করে একটিও কথা না বলে পৃথ্বীশ ভাত মাখছিল, ভারি অন্যমনস্ক, খাওয়ার তেমন কোনও ইচ্ছেই নেই। ঈশ্বরের কথায় ফ্যাকাশে হেসে মুখ তুলে কিছুটা জোর করেই যেন বলল, ‘নো নো, নট অ্যাট অল! আই অ্যাম অ্যাবসোলিউটলি ফাইন!’

পৃথ্বীশের কথা শেষ হওয়ার আগেই উদ্বিগ্ন স্বরে ঋষা জিজ্ঞাসা করল, ‘কিন্তু তখন থেকে কিছুই তো খাচ্ছ না, মাছ মাংস সবই পড়ে রইল, শরীর ঠিক আছে তো?’

–এই তো খাচ্ছি! আমি তো অল্পই খাই, তুমি তো জানো ঋষা!

জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে দু-এক মুহূর্ত পর বালিকার মতো অভিমানী গলায় ঋষা বলল, ‘কী জানি! হয়তো রান্না ভালো হয়নি!’  

পরিস্থিতি কিছুটা আন্দাজ করে প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্যই হয়তো ঈশ্বর ঋষার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘ইউ নো ঋষা, আফটার সো মেনি ডেজ সামওয়ান হেল্পড মি টু ইট! মাই মম ইউজুয়ালি ইউজড টু ডু দিস, ইন মাই চাইল্ডহুড আই ওয়াজ ভেরি নটি, খেতে ঝগড়া করতাম…ভীরাভরম ভিলেজ, বিসাইড গোদাবরী…কতদূর, স্টিল ইউ আন্ড মাই মম…ভেরি ডিফিকাল্ট টু আন্ডারস্ট্যান্ড আ উওম্যান! ইউ পিপল আর রিয়েলি আমেজিং!’

ঈশ্বরের আনমনা কথার মাঝেই তিরতিরে শীত বাতাস অঙ্গে ধুলাসাজ নিয়ে জানলা বেয়ে ছুটে এলো, দূরে মাঠের উপর দিকচক্রবাল রেখার কাছে কেমন আলো ফুরিয়ে যাওয়া অপরাহ্ণের ইশারা লেগে রয়েছে। আর কিছুক্ষণ মাত্র, তারপর ফিনফিনে কুয়াশা শাড়ি পরে দিনান্তে নিজ গৃহপানে ফিরে যাবেন হেমন্তিকা-তিনি যেন এক অভিমানী কিশোরী, হাতে মৃদু সন্ধ্যাদীপ জ্বেলে রুক্ষ এলোচুলে মানুষের ঘর-দালান জমি-জিরাত ভদ্রাসন, দিঘি পার হয়ে একাকী ফিরে যাবেন। তাঁর নওল কিশোর খেলার সঙ্গী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন হয়তো বহুদিন। উঠানে আকাশপ্রদীপে আলো দিয়ে চলে যাবেন কোন দূর ঊর্ধ্বলোকে, সেই আলোর পথ বেয়েই নাকি দেবলোকে চলে যান নশ্বর মানুষের পূর্বপুরুষেরা। দু-একটি জীর্ণ পাতা হয়তো খসে পড়ে তখন। সর পড়া দিঘির ভাঙা পৈঠায় চইচই চইচই করে হাঁসগুলিকে তুলে নিয়ে আসে পালদের ছোটো খোকা। শঙ্খধ্বনি আর তুলসীতলার আলোয় ভরে ওঠে চরাচর। শুধু সেই অভিমানিনীকে সকলে ভুলে যায়, সেও কোথাও জড়িয়ে না পড়ে চলে যায় অস্ত আলোর পথ বেয়ে কোন অচেনা জগতে… অবিকল সেই কিশোরীর কণ্ঠেই মৃদু স্বরে ঋষা ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার মা কি এখনও ওখানেই থাকেন?’

গেলাস থেকে একচুমুক জল খেয়ে কয়েক মুহূর্ত পর ঈশ্বর বললেন, ‘নো, সি ইজ নো মোর।’

ভাতের থালায় পৃথ্বীশের আঙুলগুলি চুপ করে বসে রয়েছে। তার বারংবার মনে পড়ছে বন্যার কথা, একটিও মেসেজ করল না মেয়েটি এখনও! ফোনও বেজে চলেছে, চোখের আড়াল হলেই বোধহয় মানুষ ভুলে যায় সবকিছু, কিন্তু কই সে তো নিজে ভুলতে পারে না! এত সুস্বাদু অন্ন কেমন বিস্বাদ লাগছে আজ। আসলে বন্যা তাকে ভালোবাসেনা। ভালোবাসা থাকলে উৎকণ্ঠাও থাকে, এতদূর পথ পৌঁছোল কিনা একবারও জানতে ইচ্ছা করল না! থাক, আর যোগাযোগ করবে না। সবকিছু কি একতরফা হয়! পরক্ষণেই বন্যারই একটি কথা মনে ভেসে উঠল, কাউকে ভালোবাসলে পৃথ্বী কিছু প্রত্যাশা কোরো না, তুমি ভালোবাসো মানে সেও যে তোমাকেই ভালোবাসবে এমন তো নাও হতে পারে। হয় না, আর জেনো সেটিই স্বাভাবিক।

নীরবতা ভেঙে ঈশ্বরই কথা বলে উঠলেন, ‘ঋষা, আই ডোন্ট হ্যাভ এনি ফ্যামিলি, গার্লফ্রেন্ড অর ওয়াইফ, আই অ্যাম এলোন! নেনু মিলো অকাডেনি কাদু, আই অ্যাম পার্ট অব ইয়োর ওয়ার্ল্ড! একা পথ চলি, বাট আই লাভ অল অব ইউ!’

ঈশ্বরের কথাগুলি প্রাচীন প্রহেলিকার মতোই বেজে উঠল ঋষার কানে, ধারালো চোখের উজ্জ্বল মানুষটির দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘নো বডি লাভস ইউ?’

সামান্য হাসলেন রাও, তারপর দৃঢ় অথচ নরম স্বরে বললেন, ‘নাকু এলান্টি আনঞ্চনালু লেভু! আই ডোন্ট হ্যাভ এনি এক্সপেক্টেশনস!’

–বাট হাউ কাম ইট ইজ পসিবল? সাপোজ আই লাভ সামওয়ান আন্ড আই শ্যুড নট এক্সপেক্ট লাভ ফ্রম হিম, ইজ ইট রিয়েলি পসিবল?

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ঈশ্বর, সকলের অগোচরে বাগান থেকে খসে পড়ল থলকমলের জীর্ণ পাতা। এই ভদ্রাসনের পুরাতন বেজি হেমন্তের মরা আলোয় নারকেল গাছের নীচে মুখ তুলে দাঁড়াল, কয়েক মুহূর্ত মাত্র, হয়তো মনে পড়ল তার সখা বাস্তুসাপের মুখখানি, পুটুস ঝোপের মধ্যে দৌড়ে মিশে গেল। নিজের বাম হাতখানি উল্টে কী যেন দেখলেন রাও তারপর ঋষার দিকে চোখ তুলে বললেন, ‘ইয়েস পসিবল! বিকজ লাভ ইজ নট শপকিপিং! ইফ ইউ রিয়েলি লাভ সামওয়ান দ্যাট মিনস ইউ আর স্যাক্রিফাইসিং!’

–স্যাক্রিফাইসিং হোয়াট?

–স্যাক্রিফাইসিং ইওর লাইফ!

এমন আশ্চর্য কথা কখনও শোনেনি ঋষা, একমুহূর্ত পর অসহায় গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘তখন কষ্ট হবে না?’

–নো, ওলওয়েজ রিমেমবার অনলি ওয়ান পারসন লাভস ইউ! 

— অনলি ওয়ান? কে তিনি?

নূতন কুসুমবনের মতো স্মিত হাসি ছড়িয়ে পড়ল ঈশ্বরের মুখে, ‘হি ইজ ইওর লর্ড!’

‘সো ইন ইওর কেস’, ঋষার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই ভেসে এল ঈশ্বরের দৃঢ় কণ্ঠস্বর, ‘ইয়েস ইন মাই কেস, মাই লর্ড ইজ মাই ওনলি লাভার!’

–এন্ড হু ইজ হি?

–কালভৈরব!

গাঁয়ের পুরাতন অশ্বত্থ গাছতলায় শিশুটিকে মাটি দেওয়া হবে। বন্যার কোল থেকে শিশুর নিথর দেহ তুলে চাটাইয়ের উপর রেখে ওরা নিয়ে চলে গেল, তখনও একভাবে দাওয়ায় বসে রয়েছে, পরনের শাড়ির একদিক জলে ভেজা, কালবৈশাখীর মতো কেশরাজি এলিয়ে পড়েছে পিঠের উপর, আঁচলখানি লাল ধুলায় অনাদরে ফুটে ওঠা কুসুমরূপ যেন ধারণ করেছে, কাজল ভেঙে চোখদুটি টলোমলো। এক মুহূর্তের জন্য নির্মলানন্দের মনে হল, এই যুবতিই বোধহয় আজ সন্তান হারিয়েছে! কাছে এসে খুব নরম গলায় বললেন, ‘মা, উঠুন, ঘরে বসবেন চলুন!’

চোখ তুলে কয়েক মুহূর্ত প্রৌঢ় সন্ন্যাসীর মুখের দিকে চেয়ে রইল বন্যা, তারপর শাড়ির আঁচলটি গায়ে তুলে নিয়ে আপনমনেই বলল, ‘আমি আজ আসি।’

–যাবেন, নিশ্চয় যাবেন, তার আগে একটু কিছু মুখে দিন। বেলাও হয়েছে, না খেয়ে থাকলে শরীর খারাপ করবে মা।

–আমার যে কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না এখন।

–আচ্ছা, কিছু খেতে হবে না, চা খান এককাপ। আসুন, ঘরে বসি আমরা।

সন্ন্যাসীর আন্তরিক সুর এড়াতে না পেরে পায়ে পায়ে ঘরে উঠে এল বন্যা, কাঠের বেঞ্চির উপর বসে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ, ঝুমঝুম শব্দ তুলে বাতাস বইছে, কুসুম সুবাসের মতো রৌদ্রে ভর করে যেন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে এই জগত, নাকি আরও কোনও গভীর স্বপ্নদৃশ্য রচনা করে চলেছে সকলের অগোচরে তা ভালো বুঝতে পারল না। চোখে কীরকম নেশা লেগেছে, আগুনের উপরিতলের বাতাসের মতো থিরথির করে কাঁপছে চরাচর, মনে হচ্ছে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলেই আলোর রেণু হয়ে ভেঙে পড়বে এখনই। ওই যে দূরে কয়েকটি শাল গাছ, তাদের পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওগুলি কী গাছ? এমন রুক্ষ জমি অরণ্যের মতো সবুজ হয়ে উঠল কী ভাবে! নিবিড় লতাগুল্ম পথরোধ করে যেন দাঁড়িয়েছে, চড়াই উৎরাই পথ, কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর, অসংখ্য তীক্ষ্ণ শিলাখণ্ড পথটিকে অধিক দুর্গম করে তুলেছে। দুপাশে নিথর অরণ্য, একটি ক্ষীণ স্রোতধারার কলকল শব্দ ভেসে আসছে আবার পরমুহূর্তেই চঞ্চলা বালিকার মতো সে যেন অরণ্যের অন্তঃপুরে আত্মগোপন করে কী এক বিচিত্র কৌতুকক্রীড়ায় মেতে উঠছে। সহসা পথের বামদিকে এক বিশাল নগ্নদেহী পুরুষ-মূর্তি দৃষ্টিপথ আচ্ছন্ন করে সামনে এসে দাঁড়ালেন, বন্যা সবিস্ময়ে দেখল, তাঁর মুখখানি কী কোমল! যেন কোনও অবোধ বালক, মুখমণ্ডল শ্মশ্রুগুম্ফে পরিপূর্ণ, দীর্ঘ জটাভার সুগঠিত কাঁধ অবধি নেমে এসেছে, ভুজঙ্গ কণ্ঠে কুন্দমালিকা হয়ে বিরাজমান, শিরোদেশ চন্দ্রকলার অলঙ্কারে উজ্জ্বল, অস্ফুট কুসুমের মতো চোখদুটি মেলে জলধরের মতো ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘ভিক্ষাং দেহি মে।’

বন্যা অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘আমার কাছে যে কিছুই নেই!’

পুরুষটি স্মিত হেসে কণ্টকাবৃত পথের একপাশে প্রস্ফুটিত আকন্দ কুসুমের দিকে বন্যার দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বন্যা নীচু হয়ে কতগুলি কুসুম তুলে করতলে রেখে অঞ্জলির মতো তাঁর দিকে দুই বাহু প্রসারিত করল, তিনি একটি আকন্দ নিজ হাতে গ্রহণ করে বললেন, ‘সদৈব বাসনাত্যাগঃ শমোয়মিতি শব্দিতঃ।’

 

‘মা, চা নিন!’, নির্মলানন্দের গলার স্বরে সহসা চমকে উঠল বন্যা, যেন কোনও স্বপ্ন ভেঙে গেল এইমাত্র। শূন্য দৃষ্টিতে কোনও কথা না বলে সন্ন্যাসীর দিকে চেয়েই রইল বন্যা।

কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরে চায়ের কাপটি টেবিলের উপর রেখে কয়েক মুহূর্ত বন্যার দুটি প্রায় বাহ্যজ্ঞানশূন্য নয়নের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন নির্মলানন্দ, তারপর খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি কিছু দেখলেন?’

একটি বাক্যও শোনা গেল না বন্যার মুখে। সম্পূর্ণ উন্মাদের মতো শূন্য দৃষ্টি, যেন কাউকেই সে দেখতে পাচ্ছে না, অথবা সকল কিছু অতিক্রম করে দূর জগতের অলীক কোনও দৃশ্য সে নিজের চোখের সামনে অনুষ্ঠিত হতে দেখছে! কী মনে হওয়ায় বন্যার হাত আলতো স্পর্শ করলেন নির্মলানন্দ। স্পর্শ করামাত্রই প্রৌঢ় সন্ন্যাসীর বুকের উপর এসে পড়ল বন্যার প্রায় নিস্পন্দ দেহখানি, পরনের শাড়িখানি এলোমেলো, একরাশ চুল মুখের উপর এসে পড়েছে, কোনওক্রমে বেঞ্চির উপর শুইয়ে দ্রুত হাতে নাড়ি দেখলেন নির্মলানন্দ, দেখেই চমকে উঠলেন, এত ক্ষীণ নাড়ির গতি! টেবিল থেকে প্রেসার মাপার যন্ত্র নিয়ে প্রেসার দেখলেন, পরপর দুবার, যথেষ্ট কম, এ কি নার্ভাস ব্রেকডাউন? চোখ বন্ধ করে দু-এক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন প্রৌঢ়, তারপর নীচু হয়ে বন্যার কানের কাছে নিজের মুখ রেখে তিনবার রেবামন্ত্র উচ্চারণ করে খুব মৃদু স্বরে জয়ধ্বনি দিলেন, ‘জয় জগদানন্দী হো মাঈয়া, জয় জগদানন্দী হো রেবা, জয় জগদানন্দী!’

 

কালস্রোতে বয়ে গেল কিছু সময়, রৌদ্র কখনও উজ্জ্বল হয়ে উঠল কখনও বা ছায়াচ্ছন্ন হল জগত উঠান। হেমন্ত বাতাসে কার যেন অভিমান জেগে উঠল সহসা আবার মুছেও গেল নিমেষে, বাইরে রুদ্রপলাশ গাছের উপর নিজের শক্ত ঠোঁট দিয়ে আঘাত করছে একটি কাঠঠোকরা, ঠক ঠক ঠক, নিথর দ্বিপ্রহরে ভেসে আসছে একটানা ক্লান্তিকর শব্দ। বন্যার বাম হাতখানি নিয়ে নাড়ি দেখলেন নির্মলানন্দ, নাড়ির গতি স্বাভাবিক দেখে তাঁর মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল, দু-এক মুহূর্ত পর বহুযুগ ধরে সঞ্চিত নিদ্রা ভেঙে আধো চোখ মেলে তাকাল বন্যা, অদূরে প্রৌঢ় সন্ন্যাসীকে দেখে উঠে বসতে যাওয়ার উপক্রম করতেই নির্মলানন্দ শান্ত স্বরে বলে উঠলেন, ‘এখন উঠবেন না মা, একটু শুয়ে থাকুন, দুধ গরম করে নিয়ে আসছে জগবন্ধু, খাওয়ার সময় উঠে বসবেন!’

সন্ন্যাসীর কথা শুনে আবার নিজের মাথাটি বেঞ্চির উপর এলিয়ে দিল বন্যা, সারা জগতের সকল ক্লান্তি এসে যেন জমা হয়েছে শরীরে। ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছিল আমার?’

–তেমন কিছু নয়, সম্ভবত স্ট্রেস থেকে নার্ভাস ব্রেকডাউন, এখন কেমন লাগছে বলুন দেখি?

ঘেঁটুফুলের জোসনার মতো ম্লান হেসে বন্যা বলল, ‘ভালো। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কী যেন একটা দেখলাম, হঠাৎ, কথার মাঝেই নির্মলানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হঠাৎ কী?’

দু-এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবল বন্যা, তারপর চোখ খুলে দুপাশে ঘাড় নেড়ে বিষণ্ন স্বরে বলল, ‘নাহ! কিছুতেই মনে পড়ছে না।’

 

অপরাহ্ণ সন্ধ্যাদেবীর ক্রোড়ে প্রায় বিসর্জিত, নিবিড় মুণ্ড মহারণ্যে তাঁর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, সুউচ্চ বৃক্ষরাজির শিরোদেশে দিনান্তের মলিন আলো মুছে নেমে আসছে গহিন আঁধার, শৈবাল মালিকাগুলি আসন্ন সন্ধ্যা বাতাসে যুবতির অপরূপ বেণীর মতো বন্ধুর পথ আচ্ছন্ন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে-যেন তারা এই প্রাচীন মহারণ্যের দ্বাররক্ষী। গতকাল পথ হারিয়ে একাকী চলেছেন শ্যামানন্দ। একমাত্র সম্বল রেবা মাঈয়ার কৃপা, এমন দুর্গম অরণ্যে কী ভাবে যাবেন রাত্রিবাস কোথায় হবে সকলই অজানা। নগ্ন পদযুগল শিলাখণ্ডের আঘাতে রক্তাক্ত, অবসন্ন ক্লান্ত দেহ ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় জর্জর। প্রায় শূন্য হাতের কমন্ডলু হতে একবিন্দু পবিত্র নর্মদাবারি ওষ্ঠে দিলেন, অতি সামান্য জলস্পর্শে জিহ্বা অধিক তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠল, সহসা প্রায়ান্ধকার অরণ্য মাঝে একটি জীর্ণ মন্দির যেন চোখে ভেসে উঠল, সকল ক্লান্তি পরিত্যাগ করে দ্রুত পায়ে মন্দিরের দিকে অগ্রসর হলেন শ্যামানন্দ।

 

সত্যই প্রাচীন মন্দির। প্রস্তর নির্মিত জীর্ণ মন্দিরের সর্বাঙ্গে কালচিহ্ন যেন লেগে রয়েছে। দুপাশ কণ্টকগুল্ম ও ঝোপে পরিপূর্ণ, কী এক বনকুসুম সন্ধ্যাকাল আলো করে সদ্য প্রস্ফূটিত হয়েছে, কয়েকটি ভগ্ন সোপান অতিক্রম করে মূল গর্ভগৃহের দিকে উঠে এলেন শ্যামানন্দ, দ্বারবিহীন গর্ভগৃহের সম্মুখে বৃষভ-নন্দী উপবিষ্ট, দ্বারশীর্ষে পুরাতন অলঙ্কারের মতো শোভা পাচ্ছে একখানি প্রায়-ভগ্ন ঘণ্টা, স্থানটি যথেষ্ট উচ্চ, সম্ভবত কোনও গিরিচূড়ার শীর্ষদেশ, শ্যামানন্দ বিস্মিত নয়নে চেয়ে দেখলেন, দূরে শৈলরাজি প্রহর শেষের ম্লান আলোয় অলৌকিক দৃশ্য রচনা করেছে, তার পাদদেশে যতদূর দৃষ্টি যায় গহিন জনশূন্য অরণ্য সমুদ্র স্রোতের মতো বয়ে গেছে, অনেক নীচ থেকে ভেসে আসছে শংকর-সূতা নর্মদার কলকল ধ্বনি। সহসা শ্যামানন্দের মন বিষণ্ন হয়ে উঠল, এই জনশূন্য শিবশম্ভুর প্রাচীন মন্দির নর্মদা মাঈয়ের কৃপায় যদিও বা চোখে পড়ল তথাপি কমন্ডলু শূন্য, শূলপাণির মস্তকে সামান্য বারিসিঞ্চনেরও সুযোগ নাই, এমনই হতভাগ্য সে, অশ্রুধারায় ভরে উঠল শ্যামানন্দের দুটি নয়ন।

 

‘পানি লিজিয়ে বাবুজি! শিউজিকা শির পর চঁড়াইয়ে!’ সহসা অচেনা বামা কণ্ঠের ডাকে সংবিৎ ফিরল তাঁর। মুখ ফিরিয়ে বিস্মিত হয়ে দেখলেন, এক অপরূপা কিশোরী এমন অতিদুর্গম শ্বাপদসঙ্কুল মুণ্ড মহারণ্যে সন্ধ্যার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুক্ষ গিরিমাটির মতো ত্বক, একরাশ কেশরাজি বেণী বন্ধনে অবরুদ্ধ, পরনে ঘাঘরা ও চোলি। গোধূলি লগ্নের নিবিড় প্রশান্তি দুটি সজল নয়নে লেগে রয়েছে, উচ্ছল হাসি যেন নর্মদা ধারা, মুখ তুলে উত্তরের প্রত্যাশায় শ্যামানন্দের দিকে চেয়ে রয়েছে কিশোরী।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  মাসের দ্বিতীয় শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

 

হাড়ের বাঁশি ( নবম পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More