হাড়ের বাঁশি (তৃতীয় পর্ব)

 

বারোশো সাতাত্তর বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাস, একটি গস্তি নৌকো ভাগীরথীর উপর ভেসে পশ্চিমদিকে চলেছে। আষাঢ় অপরাহ্ণ, কিছুক্ষণ পূর্বে বৃষ্টিস্নান শেষে প্রসাধনরতা জগৎ অষ্টাদশী যুবতির মতো উজ্জ্বল, বন্ধনহীন কেশরাজি মেঘরূপ ধারণ করে ছড়িয়ে রয়েছে পূর্ব দিগন্তে, তার পশ্চিমাকাশের মতো কপালে অস্তগামী সবিতা সিন্দুরের টিপ, গৃহমুখী পাখির দল যেন তরুণী কণ্ঠের অলঙ্কার। নৌকোর পাটাতনে দাঁড়িয়ে জগতের এই রূপসজ্জার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রয়েছেন বনোয়ারি কিশোর বাহাদুর। বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ হবে। সোনারুন্দি গ্রামের জমিদার বাড়ির কনিষ্ঠ সন্তান,পরনে একখানি নূতন গরদের পাঞ্জাবি আর শান্তিপুরি ধুতি, গলায় সোনার হার, অনামিকায় নক্ষত্রের মতো হিরের আংটি, চোখদুটি সদ্য উদিত দিবাকরের মতো রক্তিম। খেয়াল করলে বোঝা যায় নীরব অশ্রুধারা দুটি গাল বেয়ে অবিরল নেমে আসছে। আজ বাইশে আষাঢ়,মধ্য রাত্রির শুভলগ্নে কিশোরের বিবাহ। বরনগর গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ দীনবন্ধু চক্রবর্তীর একমাত্র কন্যা দ্বাদশ বর্ষীয়া হেমলতার সঙ্গে তাঁর বিবাহ স্থির হয়েছে। আরও একটি নৌকো আসছে পেছনে,অল্প আত্মীয়স্বজন ও কয়েকজন অভিভাবক রয়েছেন। কিশোর পিতৃহীন যুবক, মাতুল গৌরাঙ্গদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বরকর্তা, তিনিও রয়েছেন ওই নৌকোয়। কিশোরের বন্ধুবান্ধব তেমন কেউ নেই। জমিদার বংশের সন্তান হলেও তাঁর আচরণ কিঞ্চিৎ ভিন্ন। মদ্যপান করেন না,বাইজি কি মেয়েমানুষের সম্পর্কেও উদাসীন। কী যেন সর্বক্ষণ ভাবেন! শোনা যায় অদূরে মাণিক্যহার গ্রামের একজন বৃদ্ধ বৈষ্ণব সাধকের কাছে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে, তাঁর নাম কৃষ্ণমোহন আচার্য ঠাকুর। এখনও পত্র বিনিময় হয়। কৃষ্ণমোহনের পরামর্শেই কিশোর বিবাহ করতে রাজি হয়েছেন। কেন যে বৃদ্ধ তাঁকে সংসারধর্ম পালনের কথা বললেন স্পষ্ট বুঝতে পারেননি,বিবাহ নিয়ে সংশয় এখনও মনে রয়েছে।

 

কিশোরের বারংবার দাদা জগদীন্দ্রের বিবাহের দিনটির কথা মনে পড়ছে। এমনই আষাঢ় মাস। সৌদামিনী তারই বয়সী ছিল, রাত্রে বিবাহ বাসরে কিশোরের দিকে দু-একবার তাকিয়েছিল। সেসব কবেকার কথা, কত আষাঢ় তারপর চলে গেল! সৌদামিনী গত চৈত্রে মারা গেছে। অপঘাতে মৃত্যু। সোনারুন্দির বনোয়ারিলালজীর মন্দির সংলগ্ন যে মরা দিঘি, সেখানে নাইতে গিয়ে জলে ডুবে মরেছে। চৈত্র মাস খরার সময়, দিঘিতে খুব বেশি জলও ছিল না। তাছাড়া গাঁয়ের মেয়ে সৌদামিনী ভালো সাঁতারও জানত। মরার তো কথা নয়, তবুও মরল। কথায় বলে জন্ম মৃত্যুর দিন নাকি ললাটে স্বয়ং বিধাতা লিখে রাখেন, হবেও বা সত্য। তখন সন্ধ্যাদেবী গা ধুয়ে তাঁর নূতন বসনখানি পরে রাত্রির উঠানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। লম্ফ হাতে নিয়ে মরা দিঘির ঘাটে সৌদামিনী স্নান করতে গিয়েছিল। তবে তাকে স্নান করতে যেতে কেউ দেখেনি। এদিকে চক্রবর্তী বাড়ি থেকে ঘাটে যাওয়ার পথ বলতে তো ওই একটিই, বাউড়ি পাড়ার ভেতর দিয়ে পথটি চলে গেছে ঠাকুরবাড়ির দিকে। জিতেন বাউড়ির বুড়ি মা রাত অবধি তো দাওয়ায় বসে থাকে, খুনখুনে বুড়ির চোখ দুটি গেলেও কান খুব সজাগ, রাতবিরেতে পথে লোকের পায়ের শব্দ শুনলেই গলা তুলে শুধোয়, ক্যা রে, জীতু এলি নাকি ? তা সেও নাকি কিছু দেখেনি! গাঁয়ের লোকে আড়ালে বলাবলি করে, নাইতে গিয়ে মরেনি সদু, ও হল গিয়ে খুন, গলা টিপে মেরে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে মরা দিঘির জলে। হতেও পারে, পাঁচ বচ্ছরের বিয়ে, তারপরেও একটি ছেলে বিয়োতে পারেনি সৌদামিনী। বাঁজা অলক্ষ্মী মাগী সংসারে কোন কাজে লাগে? পালা-পাব্বনে শুভকাজে বাঁজা মেয়েছেলের মুখ দেখলেও গেরস্তের অকল্যাণ। তা মরেছে বেশ হয়েছে! কাছেই শক্তিপুরে বাপের বাড়ি ছিল সৌদামিনীর, বাপের অবস্থা তো তেমন ভালো ছিল না। রামজীবন ঘোষাল নামেই বামুন, এদিকে কোয়াক ডাক্তার। আজকাল কোয়াকদের ভালোই পশার কিন্তু রামজীবন চিরকালের হাভাতে, ঘোড়া নাই, কালো ব্যাগ নাই, খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে রুগি দেখে বেড়ায়। কে পোঁছে ওসব ডাক্তার! হ্যাঁ ডাক্তার বলতে হয় তো রাঙামাটির সতু পাল, যেমন রাশভারী চেহারা, তেমন পশার। আরবি ঘোড়াটিরই বা কী রূপ, টকটক করে গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়ান। লোকে বলে সতু ডাক্তারের একদাগ ওষুধ পড়লে মরা মানুষও নাকি উঠে বসে কথা কয়। কোথায় সতু পাল আর কোথায় রামজীবন, কীসে আর কীসে, কুঁজোরও সাধ হয় গো চিৎ হয়ে শুতে! নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসার, বড় ঘরে সাধ করে মা-মরা মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিল সোনারুন্দির জমিদার ঘরে। বনেদি বংশ, বনোয়ারিলালজীর সেবাইত বলে কথা! তা কপালে বংশীধারী ঠাকুর কী সুখ লিখেছেন, সইল না, বৃদ্ধ বয়সে মেয়ের মরা মুখ দেখতে হল। ঢলোঢলো মুখটিতে চন্দন দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল ওরা। পরনে সেই গঞ্জের সাহার দোকান থেকে কেনা বিয়ের লাল বেনারসী শাড়ি। আষাঢ়ের মেঘাবৃত অপরাহ্ণের মতো একঢাল চুল চালচিত্রের মতো ছড়িয়ে রয়েছে, চোখদুটি বন্ধ করে যেন কামিনী কুসুমের মতো হাসছে, মাথায় এক কৌটো সিঁদুর উপুড় করে দিয়েছে, পায়ে টকটকে আলতা, গৌরবর্ণ দেহখানি, আহা, বড় ভাগ্যি গো, এক মাথা সিঁদুর নিয়ে সধবা হয়ে মরল।

সুরধুনির দুপাশে যতদূর চোখ যায় আষাঢ়ের খেত নূতন ধানের রূপে বিভোর। পুবালি বাতাসে শিশুর মতো চঞ্চল হয়ে উঠেছে অন্নখেত, খণ্ড খণ্ড মেঘের মধ্য দিয়ে দিনান্তের অপরূপ আলো তার মায়া আঁচলখানি বিছিয়ে দিয়েছে ভুবনডাঙায়। আলপথ বেয়ে এক কৃষক কতগুলি গোরু নিয়ে গৃহের পথে চলেছে। দূরে দিকচক্রবাল রেখার উপর মেঘের নীচে নীলকান্ত মণির মতো জ্বলজ্বল করছে মাটির ঘরবাড়ি-মানুষের সংসার। এমন অপরাহ্ণ কিশোরের মন দুয়ার যেন খুলে দিয়েছে, বিরহ অশ্রু নয়,এই ভুবনমোহিনী জগতের দিকে চেয়ে তাঁর বারবার মনে হচ্ছে, কেন এমন মোহিনী রূপে নশ্বর মানুষের হৃদয় নিয়ে ধুলাখেলায় মেতে ওঠেন পরমা প্রকৃতি! এই রূপ তো সত্য নয়, তবে কেন এই ছলনা? নাকি সত্য এই রূপজগৎ ?হেমলতাও কি আজ এমনই সাজবে, তাকে দেখে কি সব সংযম বন্যার মতো ভেসে যাবে? 


ওদিকে বরনগর গ্রামের দরিদ্র গৃহের একটিমাত্র কক্ষে সাজতে বসেছে হেমলতা। মাতৃহারা বালিকার কপালে একটি একটি করে শ্বেত চন্দনের বিন্দু আঁকছে বিশ্বাস পাড়ার সারদা দিদি, তার আগে পদ্মকুসুমের মতো চোখে কাজল পরিয়ে দিয়েছে। আহা,নূতন বরষা মেঘের মতো সজল হয়ে উঠেছে চোখদুটি। পাশে রাখা জরি বসানো রক্তসন্ধ্যার মতো শাড়ি। মাথার চুলগুলি গোছা করে সদ্য প্রস্ফুটিত যূথিকার মতো খোঁপা বেঁধে দিয়েছে সারদা। মুখখানি কী গম্ভীর,যেন কোনও দিঘির জল। সারদা দিদি বলছে, ‘এমন পারা রূপ আর কার আচে লো! বল দিকি!’
লজ্জায় চোখ নামিয়ে রেখেছে হেমলতা। একফালি খোলা জানলা দিয়ে অপরাহ্ণের আলো তার মুখে এসে পড়েছে। এই রূপজগত হেমলতার পানে চেয়ে রয়েছে,কে যে কার মায়া তা আর স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। পাড়ার কতগুলি চপলা বালিকা কী একটি আদিরসের কথা বলে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছে,নূতন কুসুমের মতো তাদের হাসির রেণু ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে,কে আবার কতগুলি কদম ফুল তুলে এনে হেমলতার হাতে দিয়ে বলছে, ‘ও লো সই,চুমু খাতি আলি,অগ্গে ঠোঁট পাতি দিবিন না! এই ফুলগুলান দিবিন!’
ওষ্ঠে কাঠির ডগায় কাপড় জড়িয়ে আলতা পরিয়ে দিতে দিতে সারদা বলছে, ‘ও কি কতা লো মুকপুড়ি!’
ক্যানো গো দিদি! মুদের হেমির বর চুমু কাবে না হেমিরে ?
সে খাবে বেশ করবে! তুর কী লো হতচ্চাড়ি!
বলতে বলতে নিজেই হেসে ফেলছে। সারদার পরনে সাদা থান, গত চৈত্রে বিধবা হয়েছে কিনা!

বাইরে বড় বড় দুটি উনানে কড়া চেপেছে। এদিকে মেয়ের বিয়ের রাত্রে অন্ন খাওয়ানোর আস্য নাই, লুচি হবে, সঙ্গে বোঁটা সুদ্ধ বেগুন ভাজা, কুমড়া আলুর ছক্কা, ছোলার ডাল আর শেষপাতে মণ্ডা, লাল চিনি ছড়ানো জোলো দই। রান্নার জায়গার উপরে ত্রিপল আর কাপড়ের ছাদ করা হয়েছে। আষাঢ় মাস, বৃষ্টিদেবী যেকোনও সময় পায়ের মল বাজিয়ে এসে উপস্থিত হবেন। হেমলতার জন্ম ভাদ্র মাসে- কী বৃষ্টি সেদিন! বাদুলে মেয়ের বিয়ের দিনও বৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখছেন দীনবন্ধু চক্রবর্তী, দরিদ্র ব্রাহ্মণ তিনি, ধারদেনা করে সাধ্যমতো ব্যবস্থা করেছেন- কন্যাদায় বলে কথা!

ছাদনাতলায় আলপনাটি ভারী সুন্দর দেওয়া হয়েছে। সকাল থেকে সারদা করেছে সব একা হাতে। লগ্ন সেই কোন রাত্রে! বৃদ্ধ পুরোহিত হরিমোহন আসবেন সন্ধ্যায়, এদিকে সামান্য দান সামগ্রী এনে রাখছে পাড়ার ছেলেরা। দান আর কী,ওই কটি কাঁসার বাসন, কভরি সোনা আর নূতন বস্ত্র। তবে ছেলের বাড়ির তেমন দাবি নাই। কপাল করে এসেছিল হেমলতা, নাহলে ওমন পাত্র আজকালকার দিনে পাওয়া কি সোজা কথা! হেমলতার মুখটি মনে পড়লেই ধুতির খুঁট দিয়ে সবার আড়ালে চোখ মুছছেন দীনবন্ধু,মা-মরা মেয়ে,সংসার বলতে তো ওইটুকুই ছিল, সে বন্ধনও আজ ছিন্ন হবে! ওই যে কদম গাছটি, ওর তলায় পুতুল খেলত সে। আজ সকল খেলা ভেঙে চলে যাবে। যেতে তো হয়। তেমনই যে নিয়ম। বাপের কাছে মেয়ে আর কদিন।

বিবাহবাসর থেকে অনেকদূরে তখন মাণিক্যহারে কৃষ্ণমোহন আচার্য ঠাকুরের ভদ্রাসনে অন্য এক পালা মধুর সঙ্গীতের মতো বেজে উঠেছে।

আজ মাণিক্যহারে সারাদিন মেঘ। মাঝে মাঝেই ঝরঝর করে জল পড়ছে। ওইদিকে আউশের খেতের উপর যুবতির অভিমানের মতো আকাশখানি যেন নেমে এসেছে, দূর থেকে মনে হচ্ছে কৃষ্ণবর্ণের পটে কে যেন সবুজ আলপনা দিয়েছে। আলপনা চোখে নিয়ে বাউড়ি পাড়ার মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে সামনে। তার আগে মরা দিঘির ঘাট,চৌধুরীদের মাছপুকুর,সরকার বাড়ির পুরাতন দালান মন্দির। পথটি গেঁয়ো যোগীর মতো, মান অপমান বোধ নাই তেমন। জলে জলে কাদা,এসব অঞ্চলে এঁটেল মাটির কাদা পা চেপে ধরে। পথ শেষ হয় মাঠের একপাশে একটি খোড়ো চালের দাওয়ায়,ওইটিই কৃষ্ণা বোষ্টুমির ঘর। অবশ্য এখনও সে বোষ্টুমি হয় নাই, সে নাম তো গিরিধারীজিউ দেবেন আরও পরে, যখন শ্রীদামের সঙ্গে কৃষ্ণার দেখা হবে আমবারুণীর মেলায়। আজ এই বরষাঘন দিনে তার নাম রামি,রতন বাগদির বিটি রামি বাগদি।

দুদিন তিনদিন হল রতন বাড়ি নাই। গঞ্জে পালা বসেছে,সেইখানে গেছে। রতনের ওই এক নেশা, কালীয় দমন পালায় কংস সাজে কিনা! কংস তো যে সে পাট নয়, লোকে কংসের হাসি শোনার জন্যই বসে থাকে। মহীন বাবুর দল,হাটে মাঠে পালা করে বেড়ায়,আষাঢ়ের রথযাত্রায় কাশীপুরে বড় বায়না ধরা আছে। তার আগে কদিন এইদিকে বাজিতপুরের পালবাবু নেমতন্ন করেছেন, নাতির অন্নপ্রাশনে বিশাল ধূম,জ্ঞাতিগুষ্টি তো কম নয়,তা পালাগান নাহলে কী জমে! আশপাশের গাঁ উজাড় করে লোক এসেছে,হ্যাজাকের আলোয় সার সার কালো মাথা দেখলে রতনের রক্ত চলকে ওঠে, মনে হয় তাকে দেখতে পিলপিল করে এত লোক এসেছে! আশ্চর্য কথা বটে।! সারা বচ্ছর লোকের জমিতে মুনিষ খাটা কি কারোর পুকুরে জাল ফেলা রতন বাগদির নিজের ভুবন ওই পাড়াগাঁয়ের উঠান, কেমন চারধার অন্ধকার, ভস ভস করে হ্যাজাক জ্বলছে, ওই যে হারমোনিয়াম বেজে উঠল। কাঠের তক্তার মঞ্চ ঘিরে কত মানুষ বসে আছে। আঁধারে তাদের মুখ দেখা যায় না। কারাগারে অষ্টম গর্ভের সন্তান জন্ম নিল, রতন হা হা করে হাসছে। সে ভুলে গেছে মা-মরা বিটির কথা, কটি পয়সা হাতে দিয়ে এসেছে,তাতে আর কদিন চলে! ভুলে গেছে এবারের বর্ষায় খড় না বদল করলে বৃষ্টির জলে ভেসে যাবে ঘর। সব বিস্মৃত হয়েছে সে। হতদরিদ্র এক চাষা রাজা কংস হয়ে জেগে উঠেছে। কী বিচিত্র মানুষের আত্মপ্রকাশের বেদনা,তার মহিমাও অপার… স্বয়ং মহামায়া যে ওইরূপেই কোনও কোনও মানুষের অন্তরে প্রকাশিত হতে চান। সেসব মানুষেরা এই সংসারে আর কোনও কাজে লাগে না। কে যেন তাদের অন্তরমহলে বসে দিবারাত্র সেই নিশিডাকের মায়া বাঁশি বাজিয়ে চলে, ছারখার হয়ে যায় জীবন। বেদনার মতো দুটি আঁখির তলায় লেগে থাকে শতেক অপমান আর লাঞ্ছনা,গাঁয়ের লোকে রতনকে কি সাধে আউলা বলে! সে বলে বলুক,রতনের কিছু গায়ে লাগে না। মহীন বাবুর পায়ে ধরে একবার বলেছিল,টাহা পইসা কিচু লাগবি না গ,সুদু পালাটুকুন করতি দিয়েন,ওটুকুন কাড়ি লিয়েন না!

জলের ঝাপটে আজ আখার আঁচ ওঠে নাই ভালো। ভিজে ন্যাতা কাঠ, তাই দিয়ে কোনওমতে উনান ধরিয়েছে রামি। ঘরে গোপাল আছে, দুটি অন্নসেবা নাহলে ওই বালক যে উপোসী থাকবে! বড় আব্দার তার, বড়লোকের ঘরে কত কী খেতে পায়, ছানা মিছরি সন্দেশ ক্ষীর। আর এখানে দুটি ভাত আর নুন, সঙ্গে শাকপাতার ঝোল নাহলে সেদ্ধপোড়া। তা কী করবে রামি,যেমন কপাল করে এসেছে সে! কী করবে,রামির হাতে তো কিছু নাই।

শনশন বাতাস বইছে,ওই পুবদিকে গাঙের ধার থেকে দামাল শিশুর মতো ছুটে আসছে সে। পুকুরে নেয়ে বসন্তবৌরি পাখির মতো একখানি সুতির শাড়ি অঙ্গে চাপিয়েছে রামি,ভেজা চুলগুলি থেকে টপটপ করে জল খসে পড়ছে দাওয়ায়,গরম ভাত ফুটছে বুগবুগ করে। দূর দেশ থেকে মেঘগুলি দাওয়ার দিকে অবহেলার অতিথির মতো ভেসে ভেসে আসছে,কত কী মনে পড়ে রামির। সেই যে একবার এক রাজা আংটি দিয়েছিল তাকে, তারপর ভুলে গেল। তারপর একবার এমনই মাটির দাওয়ায় বৈশাখের খর দ্বিপ্রহরে সেই একজন তার ভ্রমরচঞ্চল চোখদুটির পানে চেয়ে খাগের কলমে লিখেছিল,’যৌবন-বনের পাখি পিয়াসে মরয়ে গো / উহারই পরশরস মাগে!’
সেই দিনটির কথা খুব মনে পড়ে, আঁচলে হাত মুছে মাটির হাঁড়ি থেকে কুনকে করে চাল বের করে রাখছে রামি। একরাশ চুল হাতখোঁপা করে বাঁধা। উনোনের আঁচে চকচক করছে মুখ। যেন গর্জন তেল মাখিয়েছে কেউ যত্ন করে। পুরনো তেঁতুল রাখা আছে মাটির সরায়। আনাজ সেদ্ধ হলেই তেঁতুল গোলা জল আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে ফোটাবে। তারপর ভাত বসাবে। ঝাল ঝাল টক আর ভাত। সব শেষ করে বাসন নিয়ে ঘাটে যাবে। বাসন মেজে চান করে ফিরবে যখন তখন সূয্যি মাঝ আকাশ পেরিয়ে যাবে। বাঁশবনের পাশের সরু রাস্তা ঢেকে দেবে ছায়া। শুকনো বাঁশপাতা তিরতিরে হাওয়ায় উড়ে বেড়াবে আপনমনে। কার্তিকের মাঠে ঝলমলে ধান। আরও দূরে নতুন আলুর ক্ষেত। গা হাত পা খসখস করে তোলা বাতাস। দু একটা চিল অনেক উঁচু আকাশের শরীরে ভেসে বেড়ায়।

রান্নাঘর বাইরে মাটির দাওয়া। খড়ের আসনে বসে আছে সেই মানুষটি, খালি গা,কাঁধ অবধি নেমে এসেছে চুলের রাশি। গিরিমাটি ছোপানো ধুতি একফেরতা করে পরা। সামনে নীচু কাঠের জলচৌকি। খাগের কলম, সমান করে কাটা তালপাতা। দোয়াতে চাল পোড়া কালি। একমনে মানুষটি লিখছে মুখ নীচু করে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে সামনে চেয়ে থাকছে। হলুদ আভা চোখেমুখে। হঠাৎ গলা তুলে রামির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, জানিস রামি, ইদানি আমার শ্রীদাম বোষ্টুম হতে বড় সাধ হয়!

ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি এলো আবার,উঠানে কামিনী ফুলগুলি ভিজে সার। হঠাৎ আড় ভাঙল রামির,চোখ তুলে দেখে ভাতও হয়ে এসেছে। কলাপাতায় গরম ফেনা ভাত আর লবণ বেড়ে রামি ঘরের গোপালের দিকে তাকিয়ে নরম করে বলল, ও ছ্যালা খাতি আসবা না ?

 

তা সেই শ্রীদাম বাবাজি গুবগুবিটা নিয়ে আজ এসেছে মাণিক্যহারে গিরিধারীজিউর পাটে। খর রৌদ্রেও নাটমন্দিরটি বেশ শীতল,পায়রাগুলি গলায় মটর তুলে বক বক বক করছে,ওদিকে মাটির উঠান পার হয়ে ভোগশালায় রান্না বসিয়েছে হরিরাম ঠাকুর। গঙ্গাজলে ভোগ রান্নার আস্য এখানে,তেরোটা থালায় একসের চালের অন্ন নিবেদন করতে হয়। সঙ্গে ভাজাভুজি রসার ঝোল ডিঙলে কি খেড়োর ঝাল টক পায়েস সেসব তো থাকেই। যার যেমন সাধ্যি বংশীধারীকে তেমনই নিবেদন করা হয়। কোনও কোনওদিন গাঁয়ের লোক ফল পাকুড় কি নূতন সবজি প্রথম ক্ষেতে উঠলে হাতে করে নিয়ে আসে,এই যেমন আজ শ্রীদাম একখান কচি লাউ এনেছে। গাঁ-ঘরের আপন মানুষের মতো গিরিধারী মৃদু মৃদু হাসেন,খুশিও হন,তিনি তো আর সেই কুরুক্ষেত্রের শ্রীকৃষ্ণ নন,তিনি হলেন গে শ্রীদামের বাঁকা ঠাকুর। এই খরার দিনে দুপুর বেলায় লাউয়ের তরকারি দিয়ে ভাত মেখে খেয়ে একটু শরীর জুড়োবেন। তারপর বেলা পড়লে গান বাজনা হবে খানিক, শ্রীদামের বড় সাধ একদিন বাঁকা ঠাকুরের আড়বাঁশি শুনবে। তা সেসব কি আর মনে আছে গো, সেই কবে নিধুবনে শুনিয়েছিলেন, এখন বাঁশিটিতে ধুলা জমেছে, তবে শ্রীদাম বোষ্টুমের গলাখানি বড় মিঠে, সেখানে ফুঁ দিলেই সুর খেলে বেড়ায়,বাঁশি কি আর হাতে থাকে শুধু,নশ্বর মানুষের হৃদিপদ্মাসনে বসেই তো বাঁকা ঠাকুরের যত কারবার!

গোবিন্দভোগ আতপ পেতলের হাঁড়িতে বসিয়ে একফাঁকে নাটমন্দিরের দিকে এসে হরিরাম দেখে শ্রীদাম বসে আছে,পরনে মলিন ধুতি আর ফতুয়া,রসকলি রৌদ্রে শুকিয়ে চড়চড় করছে,চুলগুলি তামার তারের মতো পাকিয়ে পাকিয়ে কাঁধ অবধি নেমে এসেছে,হরিরামকে দেখেই একগাল হাসি ফুটে উঠল মুখে।
‘ও বাবাজি এইচ দেকি!’
এলাম বাবা! বাঁকা ঠাকুরকে না দেকলি ক্যামন তনছিট লাগে যি গো!
ব্যাশ করচো,ব্যাশ করচো! তা দুফুরে দুটি অন্নসেবা করি যাবা তো ?
সলজ্জ হেসে দু হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে শ্রীদাম বলে, ‘ঠাকুরের পেসাদ মুকে না তুলি যেলে তার আবার গোঁসা হবে যি!’
হরিরামও হাসে,মেঝেতে লাউয়ের দিকে আঙুল তুলে বলে, ‘এ লাউ আবার কে এনচে গো ?’
আজ্ঞা,মু নিয়ে এলাম বাবা!
পেলা কোতায়?
ওই চৌধুরী আচে না,উদির দাওয়ায় সকালে খানিক নামগান হল, তা চৌধুরীদের বড় বিটি বললে, কাকা এসচো যকন এই মাচার লাউটো নিয়ে যাও! মু বললাম, তা দ্যাও! বাঁকা ঠাকুরের চরণে দিয়া যাই!
চৌধুরীরদের বিটি? কে পদ্মা ? বাপের ঘর এসচে নাকি ? খপর পাই নাই তো!
তরশু শুনলাম এসচে! তা বললে,কাকা শরীল খারাপ,গিরধারীকে দরসন যাতি পারি নাই, তা তুমি আসি মাজেমাজে নাম শুনাবা! মু বলি, আর নাম মা,সে গলা কি আর আচে গো! তা বলে,কাকা তোমার যা আচে ওতেই ম্যালা! ক্ষেপি বিটি মুর! কী কব কোনকানে থুব,কও দেকি!
পদ্মার শরীর খারাপের কথা শুনে কপালে একটু ভাঁজ পড়ে হরিরামের, চিন্তিত স্বরে শুধোয়, ‘শরীল খারাপ? ক্যানে গো কী হল আবার? এই তো গেল কাত্তিকে ডাগরডোগর বিটির আমার বিয়া হল!’
আষাঢ়ের নূতন মেঘের মতো হেসে শ্রীদাম বলে, ‘আহা,বুজচো না গো, মুর বিটির কোল আলা করি ছেলা হবি গো!’
ও হরি,তা আগে বলবা তো! আমি ভাবি কী না কী!
দুজনেই হেসে ওঠে এবার। বংশীধারী মন্দিরের ভেতর থেকে একদৃষ্ঠে চেয়ে থাকেন সেদিকে,তাঁর ওষ্ঠদুটি অলক্তকে রাঙা,চন্দন আর কস্তুরী সুবাসে আমোদিত শ্যাম তনুখানি। দুপাশে দুইজন রাধিকা। গলায় একটি শ্বেতপুস্পহার পরেছেন,সোনারুন্দির রাজা সেই কবে সোনার মুকুটখানি গড়িয়ে দিয়েছেন,বেশ সেজেগুজে চেয়ে আছেন শ্রীদাম-হরিরামের দিকে, এইসব যাওয়া আসার খেলা তাঁর ভারী প্রিয়,কোনকালে পার্থকে বলেছিলেন, ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্। মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি!

শ্রীদামের বোষ্টুমির কথা তাঁর মনে পড়ছে,আমবারুণীর মেলায় দেখা হয়েছিল শ্রীদামের সঙ্গে, বোষ্টুমি তখন ডাগর ডোগর কিশোরী,মনে মনে নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণা! তা সেই বোষ্টুমী একদিন জলে ডুবে মরল, দোষের মধ্যে শ্রীদাম বলেছিল,তুর সভাব ভালা ঠ্যাকে না ইদানি,ওই পালার অদিকারীর সাতে পীরিত জুটাইচিস বুজি! লাগর,লতুন লাগর হইচে!

শুক্লা দ্বাদশী তিথি ছিল সেদিন,ঘন হিমবর্ণের সুরধুনি বয়ে চলেছে। দু’তীর নির্জন,জনমানবশূন্য, ঘাটে একটিও নৌকো নাই,নির্মেঘ আকাশ চন্দ্রালোকে বিষাদ ঋতুর মতো উজ্জ্বল, চন্দ্রদেবকে ঘিরে নিকটসভা বসেছে। গিরিধারী দেখছেন কৃষ্ণা ক্রমশ একটি একটি করে ঘাটের পৈঠা ভেঙে কলকলনাদিনীর দিকে এগিয়ে চলেছে। মায়ের মতো কোল পেতে বসে আছেন স্বয়ং গঙ্গা। কৃষ্ণার পরনে একটি সাদা শাড়ি,অলঙ্কারের মতো কেশরাজি পিঠের উপর পড়ে রয়েছে…

বংশীধারী বসে বসে দেখলেন সব। তাঁর মুখে ফুটে উঠল জ্যোৎস্নার মতো মৃদু হাসির রেখা। চরাচর আকুল করা নিশিকাল,দূরে কোথাও একটি রাতচরা পাখি ডেকে উঠল,কৃষ্ণা বোষ্টুমী ভেসে গেল কালস্রোতে। সাক্ষী রইলেন গিরিধারীজিউ।

 

               চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                       পরের পর্ব : আগামী মাসের  চতুর্থ শনিবার

 

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।  

 

 

 

হাড়ের বাঁশি (দ্বিতীয় পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More