হাড়ের বাঁশি (দ্বাদশ পর্ব)

বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে চৌরঙ্গির বড় রাস্তার দিকে আকুল নয়নে চেয়ে আছে মেরি, একটি করে গাড়ি যায় আর ভাবে এই বুঝি সূর্য এল! আজ বোধহয় সে আসতে পারবে না। কিন্তু আসার যে কথা ছিল! গতকাল শেষরাত্রি থেকে ঝড় শুরু হয়েছে। বৈঠকখানায় এসে জানলা খুলে কতক্ষণ যে দেখল, বৃষ্টি আর বাতাসের দাপটে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সমস্ত ঘর, ধুলায় ঢেকে গেল আসবাবপত্র, কতগুলি কাগজ পাখা মেলে উড়ে গিয়ে সোফার পাশে মুখ লুকোল, তবুও ভিখারিণীর মতো বসেই রইল মেরি। পাশের ঘরে তার প্রৌঢ় স্বামী শুয়ে রয়েছে, সংসারে অভাব অভিযোগ কিছুই নাই, তবুও কেন যে মন পড়ে রয় অন্য ঘাটে কে জানে! বাইরে গাঢ় অন্ধকার, ব্যাকুল মেঘে ঢেকে গেছে চৈত্রের আকাশ, বহুযুগ পর কারাগার থেকে যেন মুক্তি পেয়েছে এক উন্মাদ যুবক, প্রেম প্রত্যাশায় তার দুচোখে মাঝে মাঝে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎরেখা। ওই যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে মধ্যরাত্রে মেরির মনে হল, তার সকল যৌবন, রূপ আজ মিথ্যা হয়ে গেছে। কই সূর্যকে এমন করে তো সে ভালবাসতে পারে না, বারবার কেন ঘরে ফেরার কথা মনে পড়ে? হঠাৎ মনে হল সে একটি জনশূন্য চার্চের ভেতর বসে আছে, সামনে প্রভু যিশুর ক্রুশবিদ্ধ দেহ, সমস্ত আলো বাতাসের দাপটে নিভে গেছে, শুধু অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে একটি অপার্থিব ক্ষীণ নীলাভ আলোর রেখা। ওইদিকেই বোধহয় কনফেশন রুম। একজন বৃদ্ধ মানুষ সাদা আলখাল্লার মতো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর মুখে স্মিত হাসি। আলোর বিপরীতে তিনি রয়েছেন কিন্তু তাঁর ছায়া পড়েনি কোথাও, মৃদু স্বরে তিনি বলছেন, মেরি- আমার মা, তুমি দূরে দাঁড়াইয়া রহিয়াছ কেন? তোমার সন্তানের নিকট আসিবে না? আমরা যে তোমার পথ চাহিয়া বসিয়া রহিয়াছি! 

বৃদ্ধের মুখটি খুব চেনা, কিন্তু তাঁর পরিচয় মেরির মনে পড়ছে না কিছুতেই, আচ্ছা উনিই কি সেন্ট ফ্রান্সিস ? আসিসির সেই ধনী ব্যারনের সন্তান? হ্যাঁ, ওই তো বাতাসের দোলায় খুলে গেছে সাদা পোশাকখানি, তাঁর সারা দেহে ক্ষতচিহ্ন, ওই ক্ষতই কি প্রভুর দান? ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় এমনই ক্ষত কি ফুটে উঠেছিল প্রভুর দেহে? একেই কি তবে বলা হয় হোলি স্টিগমার্টা? অদূরে কোথাও বজ্রপাত হল, বিষাদ গম্ভীর ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দে কেঁপে উঠল চরাচর। নিজের ঘরে ফিরে সেজবাতির আলোয় খাতা খুলে মেরি একটি বাক্য লিখল, আমি তোমার মুখে আজ ঈশ্বরের ভালবাসা দেখিয়াছি!

 

আজ সকালে বাড়ির বাগানে কদমগাছের তলা ফুলে ঢেকে ছিল, কিছুক্ষণ আগে বেয়ারাকে দিয়ে ফুলগুলি নিয়ে আসিয়েছে মেরি, তারপর একটি একটি করে প্রতিটি কদম পরিষ্কার করে একটি চিনামাটির পাত্রে রেখে যত্ন করে সাজিয়ে রাখল। যদি আজ সে আসে তাহলে একটি কদম তাকে দেবে। কিন্তু সে কি আসবে? গত সপ্তাহে ওই ফুল নিয়ে ভারী সুন্দর একটি গল্প বলেছিল সূর্য। কোন দূর দেশে নাকি একজন প্রেমিক ছিল, আর ভালবাসতো যে মেয়েটিকে সে ছিল অন্য একজনের বউ, ছেলেটি খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারত, বাঁশি বাজলেই মেয়েটি নাকি ঘর-সংসারের সব কাজ ফেলে ছুটে চলে আসত, বাঁশির পাশে একটি নদী ছিল, আর ছিল কদম ফুলের গাছ, সেই গাছের তলায় বসেই নাকি বাঁশি বাজাতো ছেলেটি! 

গল্পটি শুনে মেরি বলেছিল, আমার গৃহেও কদমগাছ রহিয়াছে! 

সূর্য হেসে জিজ্ঞাসা করেছিল,

-তুমি কি বাঁশি বাজাইতে পারো?

-পারি না, তবে তুমি শিখাইয়া দিলে নিশ্চয়ই বাজাইতে পারিব।

-আমি শিখাইব?! আমি যে বাঁশি ধরিতেই পারি না! 

-তাহা হইলে কী হইবে?

মেরির কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠেছিল সূর্য। সেদিন তারা চাঁদপাল ঘাট থেকে একটি পানসি ভাড়া করে গঙ্গা বেয়ে অনেকদূর অবধি ভেসে গিয়েছিল। কলিকাতার সীমা অতিক্রম করতেই দুপাশে কুসুমের মতো ফুটে উঠেছিল গ্রামদেশ। অল্প রৌদ্র আর মেঘ আকাশে। আদিগন্ত প্রান্তর শস্যভারে গর্ভিণী হয়ে উঠেছে, কে যেন গাঢ় সবুজ রঙের মলমলের গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। তার উপর মেঘের ছায়া দীপের আলোর মতো তার নরম হাতখানি রেখেছে। মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে চঞ্চলা সুরধুনি, আষাঢ় বাতাস বইছে আপনমনে। তিরতির করে বয়ে চলেছে পানসি। ছইয়ের ভেতরে বসে রয়েছে সূর্য, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রয়েছে মেরি। সাদা ফরাসডাঙার নরুণ পাড় ধুতি আর কালো রঙের বেনিয়ান পরেছে আজ সূর্য, কাঁধের উপর একখানি কাশ্মীরি শাল পাট করে রাখা। মাথার বড় বড় চুলগুলি কাঁধ অবধি নেমে এসেছে, মুখে নদীপারের নরম ঘাসের মতো দাড়ি আর গোঁফ, দিঘল চোখদুটি মেঘাবৃত আকাশের আলোয় যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাকে দেখে মেরির মনে হচ্ছে এমন দেবশিশু সে দেখেছে লান্ডনের ওয়েস্টমিন্সটারের সেন্ট পিটার চার্চের দেওয়ালে। আহা, অবিকল এইরকম নির্ভার করুণ দুটি চোখ মেলে কতদিন ধরে তারা মানুষের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। 

 

মাঝিকে একটি নির্জন ঘাটে পানসি বাঁধতে বলল সূর্য, পৈঠা বেয়ে কয়েকটি ধাপ উপরে উঠে এসে মেরির দিকে নিজের হাতটি বাড়িয়ে দিল। আঙুলগুলি স্পর্শ করতেই কুমারী যুবতির মতো লজ্জায় মেরির সারা শরীরে যেন পদ্মকাঁটা ফুটে উঠল। ভরা দ্বিপ্রহরে ঘাটে লোকজন কেউ নাই। আকাশও রৌদ্র মুছে ফেলে ঘন মেঘের গহনায় সেজে উঠেছে, বেতঝোপে ভরে আছে চারপাশ, তার পাশ দিয়ে একটি সুঁড়িপথ চলে গেছে সামনে, বনতুলসীর মুঠি মুঠি মঞ্জরী পড়ে রয়েছে পথের ধুলায়। বামদিকে একটু দূরে একখণ্ড জমিতে ঝিঙে চাষ করেছে চাষারা, মাঠ আলো করে ঝিঙেফুল ফুটেছে। সামনেই দুটি কেয়া গাছ সজল বাতাসের স্পর্শে যেন উতলা হয়ে উঠেছে, কতগুলি কেয়াফুল আনমনে গাছের তলায় পড়ে রয়েছে, স্থলপদ্মের গাছটি কুসুমভারে ভুঁইয়ের কাছে বুঝি নেমে এসেছে, অবাক চোখে এই রূপোজগত দেখছে মেরি। বঙ্গদেশ তাহলে সত্যিই এমন অপরূপা! যেন এক কিশোরী কন্যা দ্বিপ্রহরে সংসারের সব কাজ ফেলে ধুলাখেলায় মেতে উঠেছে। তার আলুলায়িত কেশরাজিই বোধহয় আজ আকাশে মেঘ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সূর্যর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে মেরি বলে উঠল, আমি কখনও এইরূপ দেখি নাই!

-মেরি!

-উঁ

-আমার দেশের কথা তোমার মনে থাকিবে?

সূর্যের কথা শুনে মুখ তুলে একবার তাকাল মেরি, নীল দুটি চোখে যেন সমুদ্র কল্লোল শোনা যাচ্ছে, মৃদু স্বরে বলল,

-তোমার মুখখানি আমার আজীবন মনে থাকিবে!

 

ঘাটের অদূরে একটি জীর্ণ দেবদেউল রয়েছে, অনেক কাল আগে হয়তো এখানে বিগ্রহ ছিল, এখন শূন্য গর্ভগৃহে কেউ আর আসে না, পুরাতন অশ্বত্থ গাছ মন্দিরটিকে দুহাতে যেন আগলে রেখেছে, মোটা মোটা ঝুড়ি নেমে এসেছে চারপাশে, মায়াভুবনের দুয়ারের মতোই ছায়াচ্ছন্ন শান্ত জায়গাটি। জীর্ণ মন্দিরের চাতালে ওরা বসে রইল অনেকক্ষণ, একটি শুকনো পাতা দিয়ে দেউলের মেঝেয় ধুলার উপর নিজের নাম লিখল মেরি, বাতাসের দোলায় কয়েক মুহূর্ত পরেই মুছে গেল নাম, আবার লিখল, পুনরায় চঞ্চল বাতাস মুছে দিল। সৌন্দর্যের মুখের পাশে নশ্বর মানুষের নাম লিখে রাখার চিরকালীন বাসনা কখনও পূর্ণ হয় না, তবুও সে বারবার করে সেই চেষ্টাই করে। বাসনা ক্ষয় না পেলে রূপের মোহ থেকে যায়, একথা কেউ বোঝে না! সূর্য আর মেরিও বুঝল না, দেউলের পাশে যুবতির কাজল পরার কামনার মতো যে দিঘিটি রয়েছে তার ভাঙা পৈঠায় গিয়ে বসল। দিঘির চারপাশে ঘন আশশ্যাওড়ার জঙ্গল, মেঘ আরও ঘন হয়ে এসেছে, কী একটা বুনো ফুল ফুটেছে এখানে, দিঘির জল শাপলা ফুলে ঢেকে গেছে। একটি বনকুসুম তুলে সূর্যর হাতে দিয়ে মেরি জিজ্ঞাসা করল, ইহার কী নাম?

-জানি না!

-আমিও জানি না!

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মেরি বলল,

-আমি ইহার নাম রাখিলাম মেরি!

হঠাৎ ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হল। দিঘির জলে শাপলা ফুলের উপর বনকুসুমের ঝোপে কোন অচিন দেশের সুরের মতো বেজে উঠল বঙ্গদেশের আষাঢ় ঋতু। কী একটা পাখি ডাকছে! নির্জন পুকুর ঘাট, ওই জীর্ণ দেবদেউল ক্রমশ যেন ভিন্ন কোনও জগতের গর্ভে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই দ্বিপ্রহর আসলে অলীক কোনও পান্থর বসতবাড়ি, কখনও এখানে তার অস্তিত্ব ছিল না, শুধু মেরি আর সূর্য কল্পনা করেছিল বলে অল্প সময়ের জন্য সৃষ্ট হয়েছিল, তার প্রয়োজন হয়তো এখন ফুরিয়েছে। অস্পষ্ট চরাচরের মধ্যে উঠে দাঁড়াল দুজন, নিজের শালখানি মেরির দিকে এগিয়ে দিয়ে সূর্য বলল,

-জড়াইয়া লও, বর্ষার জল মাথায় লাগিলে শরীর খারাপ হইবে।

সূর্যের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে রহস্যময়ীর মতো বেজে উঠল মেরি,

-তোমার বস্ত্র আমি লইব কেন ?!

 

সেইদিন বাড়ি ফিরে রাত্রে নিজের খাতায় একটি পঙক্তি লিখে রেখেছিল মেরি, আমাকে আজ সে জগত চিনাইল, ইহাকে কি ঋণ কহিব?

কিন্তু আজ তো সূর্য এল না এখনও! এই কদমগুলি কি তাহলে বৃথাই শুকিয়ে যাবে? ধীরে ধীরে সকাল ফুরিয়ে গেল, আষাঢ় মাসের দ্বিপ্রহর মেঘে মলিন বসনের মতো হয়ে উঠল, আবার বাতাস বইল, বৃষ্টি এল নিজের ছন্দে। ঘর থেকে বারান্দা- বারান্দা থেকে ঘরে বারবার করে যাওয়া আসাই সার হল মেরির, কত ব্রুহাম গাড়ি চলে গেল পথ দিয়ে, কিন্তু সূর্যকান্ত সরকারের গাড়িটি আর এল না। ভুবনডাঙায় মায়াদীপ হাতে পুনরায় আরেকবার সন্ধ্যা ফিরে এলেন, ঘরে সেজবাতির আলো জ্বলে উঠল, পথে গ্যাসবাতির আলো ঘিরে কত বাদুলে পোকা নেচে নেচে নিজেদের গৃহে ফিরে গেল, কদম কুসুমের ম্লান সুবাসে ভরে উঠল মেরির অন্তরমহল। কাগজ টেনে কয়েকটি শব্দ লিখল, পছন্দ হল না, ফেলে দিল তাদের, কয়েকবার এমন চেষ্টার শেষে কালো কালিতে লিখল একটি মাত্র শব্দ, সূর্য!

 

পরদিন অর্থাৎ আঠারোশো ষাট খ্রিষ্টাব্দের বাইশে জুন সম্বাদ ভাস্কর সংবাদপত্রে একটি খবর প্রকাশিত হয় সংবাদদাতা জানিয়েছেন,

সংবাদ। ২২ জুন, ১৮৬০। ৯৬ সংখ্যা

গতকাল প্রবল ঝড় এবং বৃষ্টিতে কলিকাতা শহরে অকাল দুর্যোগ আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। বহু স্থানে কাঁচা বাটি ভাঙিয়া পড়িয়াছে, পথিমধ্যে বৃক্ষ পড়িয়া যান চলাচল এখনও অবধি বন্ধ হইয়া রহিয়াছে। চিৎপুর অঞ্চলে অকস্মাৎ পুরাতন অশ্বত্থ বৃক্ষ চাপা পড়িয়া একটি ব্রুহাম গাড়ি সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। উক্ত গাড়ির কোচোয়ান এবং যাত্রী-দুই জনেরই মৃত্যু হইয়াছে। মৃত যাত্রী কুমোরটুলির ঁবনমালী সরকারের পৌত্র, তাঁহার নাম শ্রী সূর্যকান্ত সরকার। হিন্দু কলেজে পাঠরত ওই যুবকের মৃত্যুতে শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়, শ্রী রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ কলিকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ গভীর শোক প্রকাশ করিয়া কহিয়াছেন, শ্রীমান সূর্যকান্ত সরকারের ন্যায় উজ্জ্বল মেধাবী যুবকের এইরূপ দুর্ঘটনায় মৃত্যু অতীব দুঃখজনক একটি ঘটনা।

 

এর ঠিক দশদিন পর জর্জ হলওয়েলের স্ত্রী মেরি হলওয়েল বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।   

 

এই ঘটনার প্রায় সাত বৎসর পর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন জর্জ। কলিকাতায় তাঁর কোনও আকর্ষণ আর অবশিষ্ট ছিল না। তাছাড়া বৃদ্ধ বয়সে এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশের জলবায়ুও সহ্য করতে পারছিলেন না। স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে আঠারোশো সাতষট্টি সালের ভাদ্র মাসে ভারতবর্ষের মায়া ত্যাগ করে নিজের দেশ ইংল্যান্ডে ফিরে যান জর্জ। মেরির খাতাটি তিনি পরম যত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই রাত্রে শোওয়ার আগে একবার করে পড়তেন সেই তরুণীর নিজের হাতে লেখা হৃদয়ের কল্পকথা। কী আশ্চর্য, লেখাগুলি পড়ে মেরির প্রতি কোনও অভিযোগ, বিতৃষ্ণা বা রাগ তাঁর মনে ভেসে উঠতো না, সেই চৌরঙ্গির গৃহটির কথা তাঁর খুব মনে পড়তো। প্রশস্ত বারান্দায় কি বৈঠকখানার জানলার পাশে মেরি দাঁড়িয়ে রয়েছে, এক টুকরো জ্যোৎস্না এসে পড়েছে তার মুখে, সোনালি চুলগুলি পিঠের উপর জলপ্রপাতের মতো ভেঙে পড়েছে, কী বেদনাঘন দুটি চোখ! কতদিন অফিস থেকে ফিরে ধ্যানমগ্না স্ত্রীকে দেখে আর ডাকেন নি জর্জ। বড় মায়া হত তাঁর, মনে হত, আহা থাক, হয়তো সূর্যকান্তর কথা ভাবছে! থাক, নিদ্রিত মানুষের স্বপ্ন কখনও ভেঙে দিতে নাই। ওই স্বপ্নটুকু নিয়েই তো নশ্বর মানুষের এই মায়াভুবন তৈরি হয়।

দেশে ফিরে জর্জ মেরির খাতা থেকে সমস্ত লেখাগুলি নিয়ে ইংলন্ডের বিখ্যাত প্রকাশক উইলিয়ম হেইনমান-এর দফতরে জমা দেন এবং মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকাশক চিঠি দিয়ে জানান এই অখ্যাত লেখিকার কবিতাগুলি নিয়ে তাঁরা বই প্রকাশ করতে আগ্রহী। পরের বছর, আঠারোশো আটষট্টি সালের জুলাই মাসে মেরি হলওয়েলের প্রথম এবং শেষ কবিতার বইটি প্রকাশিত হয়। সেই দিনটি ছিল মেরির মৃত্যুদিন, পয়লা জুলাই। প্রকাশক বইয়ের একটি মুখবন্ধ লিখতে জর্জকে অনুরোধ করেন, কিন্তু জর্জ বিনীতভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানান, তিনি অতি সাধারণ একজন মানুষ, সাহিত্য বিষয়ে তাঁর সামান্যতম জ্ঞানও নাই, অতএব তিনি মুখবন্ধ লিখলে এই বইয়ের পাঠকের প্রতি সুবিচার করা হবে না।

শেষ পর্যন্ত কোনও ভূমিকা বা মুখবন্ধ ছাড়াই কৃশকায় গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশকের সনির্বন্ধ অনুরোধে বিখ্যাত সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স কাব্যগ্রন্থটির নাম রাখেন, লাভ লেটারস ফ্রম ক্যালকাটা

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (একাদশ পর্ব)

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More