হাড়ের বাঁশি (দ্বিতীয় পর্ব)

‘রাজা মহাশয়, আকস্মিক আপনার জ্যোতিষশাস্ত্রাদি অধ্যয়নের ইচ্ছা হইল কেন?’

বৃদ্ধ পণ্ডিত শ্রী সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়ের প্রশ্ন শুনে স্মিত হেসে শঙ্করনাথ ভট্টাচার্য বললেন, ‘আমি সামান্য ভূস্বামী-আমাকে রাজা বলিয়া সম্বোধন করিয়া লজ্জায় ফেলিবেন না, মহামান্য রামজীবন রায়ের উত্তরাধিকার রায়চৌধুরী বংশই এড়োয়ালি গ্রামের একমাত্র রাজপরিবার।’

‘যথার্থ, গ্রাম-প্রতিষ্ঠাতা রামজীবন রায়ের ইতিহাস প্রাচীন হইলেও আমি বিস্মৃত হই নাই, তথাপি আপনার পিতামহকে আমার পিতা রাজা বলিয়া আজীবন সম্বোধন করিয়া আসিয়াছেন’, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় সেনাপতি বললেন, ‘তাঁহার প্রদত্ত নিষ্কর জমিতে আমাদিগের এই ভদ্রাসন, তদুপরি বহুকাল হইতে আমরা আপনাদিগের মাসিকবৃত্তিভোগী, উক্ত সম্বোধন একপ্রকার সম্মানচিহ্ন কহিতে পারেন!’

–আপনার যুক্তিজাল ছিন্ন করিতে পারে এমন সাধ্য কাহারও নাই! 

শঙ্করনাথের কথা শুনে বৃদ্ধের মুখমণ্ডল কৌতুকহাস্যে ভরে উঠল,’সে না-হয় বুঝিলাম, কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রে আপনার আগ্রহের কারণ সত্যই বুঝিতে পারিতেছি না।’

ফাল্গুন মাসের দ্বিপ্রহর, রাঢ়দেশের বর্ধিষ্ণু এড়োয়ালি গ্রামের একপ্রান্তে সেনাপতি মহাশয়ের দ্বিতল মাঠকোঠার দাওয়ায় একটি আসনের উপর বসে রয়েছেন শঙ্করনাথ, সামনে আদিগন্ত প্রান্তর থেকে ভেসে আসছে মৃদুমন্দ দক্ষিণপথগামী বাতাস, খর রৌদ্রে ক্ষুধায় কাতর সদ্যজাত পক্ষীশাবকের ওষ্ঠের মতো কাঁপছে দিকচক্রবালরেখা, যেন কোনও অলীক মরীচিকা। সুদূর দিগন্ত পানে তাকিয়ে ধীর স্বরে শঙ্করনাথ বললেন, ‘দিন চলিয়া যাইতেছে পণ্ডিত মহাশয়, সংসার বিষয় সন্তান নানাবিধ বাসনায় ডুবিয়া রহিয়াছি, ভোলানাথের চরণে মন সঁপিতে পারিতেছি কই ?’

–ভাবিলেন নূতন শাস্ত্র অধ্যয়ন করিলে মন শান্ত হইবে?

–হাঁ, কতকটা এইরূপ ভাবিয়াছি…অবশ্য ইহা ব্যতীত

–তাহা হইলে ইহা ব্যতীত অন্য কোনও কারণও রহিয়াছে!

–আপনাকে মিথ্যা কহিব না, হাঁ, রহিয়াছে। তাহা একান্ত ব্যক্তিগত, অনুরোধ করিব…

–ব্যক্তিগত বিষয় শুনিতে চাহিব না। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই অবগত রহিয়াছেন জ্যোতিষ অত্যন্ত জটিল শাস্ত্র, গণিতশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তির প্রয়োজন, তদুপরি আমাদিগের বংশে গণনার একটি গুহ্যধারাও রহিয়াছে, সুতরাং শিক্ষালাভের জন্য আপনার বিশেষ মনসংযোগ ও সময়ের প্রয়োজন।  

–আমি বহুকাল পূর্বে পিতার মুখে আপনাদিগের গুহ্যধারার কথা শুনিয়াছিলাম।

–হাঁ, উক্ত জ্ঞান অদ্যাবধি লিখিত হয় নাই, প্রাচীন শ্রুতির ন্যায় গুরু-শিষ্যর মধ্য দিয়া তাহা প্রবাহিত হইতেছে।

 

অদূরে একটি কোকিল সুমধুরস্বরে ডেকে উঠল, উঠানের পলাশ গাছতলায় কতগুলি রুদ্রপলাশ ধুলার উপর পড়ে রয়েছে, মরকত মণির মতো শূন্য আকাশে আপনমনে কতগুলি চিল ভেসে ভেসে কোন দূর দেশে যেন চলেছে, ভারি মনোরম এই মধুমাস, মানুষের মন অকারণে নবীন বাতাসের মতো চঞ্চল হয়ে ওঠে।কয়েক মুহূর্ত পর প্রত্যয়ী গলায় শঙ্করনাথ বলে উঠলেন, ‘মনসংযোগের অভাব দেখিলে সেই মুহূর্তে আপনি শিক্ষাদান বন্ধ করিয়া দিবেন।’ 

শঙ্করনাথের মুখের দিকে চেয়ে স্মিত হেসে সেনাপতি শান্ত সুমিষ্ট স্বরে বললেন, ‘অন্যান্যশাস্ত্রেষু বিনোদমাত্রং, ন তেষু কিঞ্চিদ্ভুবি দৃষ্টমস্তি। চিকিৎসিত-জ্যোতিষ-তন্ত্রবাদাঃ,পদে পদে প্রত্যুয়মাবহন্তি।।’

কুশাসনে বসে রয়েছেন সেনাপতি, পরনে একখানি রক্তবস্ত্র, উর্দ্ধাঙ্গ অনাবৃত, শ্বেতশুভ্র উপবীতটি অলঙ্কারের মতো অঙ্গের শোভাবৃদ্ধি করেছে। বৃদ্ধ বয়সেও ঘন কৃষ্ণবর্ণ কেশরাজি কাঁধ অবধি নেমে এসেছে, সেগুন বৃক্ষের মতো ঋজু দেহকাণ্ডটি দেখলে যুবক বলে ভ্রম হয়, উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে খড়গ-তীক্ষ্ণ নাসা ও দুটি ভাবগম্ভীর চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায় বৃদ্ধ অত্যন্ত মেধাবী, মৃদু অথচ গম্ভীর অচঞ্চল কণ্ঠে বলে চলেছেন, ‘স্থাবরজঙ্গম, ভাবাভাব, সংসারের সমস্ত পদার্থই কালের অধীন। সেই সর্ব্বসংহারক কালপুরুষের বিরাট মূর্তি এই রাশিচক্রে সংঘটিত, দ্বাদশ রাশি হইতে আকৃতি ও সপ্তগ্রহ হইতে কালপুরুষের প্রকৃতি উৎপন্ন।’

শঙ্করনাথ সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীরূপ আকৃতি?’

–মেষ রাশি কালপুরুষের মস্তক ও মুখ, বৃষ কণ্ঠ ও গ্রীবা, মিথুন রাশি হস্তদ্বয়, কর্কট রাশি হইল বক্ষ ও জঠর, সিংহ রাশি হৃদয় ও পৃষ্ঠ, কন্যা উদর ও কটি রূপে পরিচিত, তুলা রাশি হইল বস্তিভাগ, বৃশ্চিক গুহ্যদেশ, ধনু ঊরু, মকর রাশি হইল জানু, কুম্ভ জঙ্ঘা এবং মীন রাশি কালপুরুষের পদযুগল।

–অহো! কী বিরাট এই রূপ! শ্রবণ করিলেও তাঁহার আভাস মনে ফুটিয়া ওঠে। 

–এক্ষণে তাঁহার প্রকৃতির কথা শ্রবণ করুন, সূর্য কালপুরুষের আত্মা, চন্দ্র মন, মঙ্গল শৌর্য্য বা সত্ত্ব, বুধ বাক্য, বৃহস্পতি জ্ঞান ও সুখ, শুক্র কর্ম এবং শনি হইল তাঁহার দুঃখ।

বিস্মিত হয়ে শঙ্করনাথ বললেন, ‘বিশ্বপতির অপার অচিন্ত্য মহিমা-বিচিত্র লীলা!’

–হাঁ, শুধুমাত্র লীলাই নহে, এই কালপুরুষ এইরূপ বিরাট চক্র হইতেই পর্যায়ভেদে বৎসর-অয়ন-ঋতু-মাস-পক্ষ-বার-তিথি-নক্ষত্র-দণ্ড-মুহূর্ত-হোরা-পল-কলা-কাষ্ঠা-নিমেষ প্রভৃতি অংশরূপ পরিগ্রহ করিয়া বিভিন্ন গ্রহনক্ষত্রাদির যোগাযোগগুণে বিভিন্ন মূর্তিতে প্রতি মুহূর্তে সংসারে অসংখ্য অভিনব বৈষ্যমের উৎপাদন করিতেছেন। জন্ম-মৃত্যু, হ্রাস-বৃদ্ধি,উত্থান-পতন,সংযোগ বিয়োগ প্রভৃতি সংসারচক্রের সমুদয় রহস্য এই বিধাতাচক্রের অধীন।

–ইহাই কি মায়া জগত?

–হাঁ, যথার্থ কহিয়াছেন, তিনিই মায়াধীশ এবং আমরা জীবকুল মায়াধীন।

 

সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়ের গৃহের পিছনে একখানি শান্ত কাকচক্ষু দিঘি রয়েছে, চারপাশে কতগুলি তালগাছ পটচিত্রের মতো কে যেন সাজিয়ে রেখেছেন। থিরিথিরি নূপুরবাতাসে ছায়াচ্ছন্ন স্থানটি রাঢ়দেশের খরদ্বিপ্রহরেও মায়ের স্নেহ আঁচলের মতো মনোরম হয়ে উঠেছে। চারপাশে রুক্ষ রক্তবর্ণ প্রান্তরের মাঝে যেন একটি অশ্রুসজল মুখ দূর দেশ থেকে আগত প্রিয়জনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। দিঘির পুরাতন পৈঠায় রেশম বস্ত্ররূপ সবুজ শৈবালদল মলমল জাজিমের মতো বিছানো, কে এক অচেনা যুবতি একবারে শেষ পৈঠায় জলতলের কাছে বসে রয়েছেন,টলোমলো দীঘির মৃদু ঢেউয়ে তাঁর মুখছায়া আপনমনে খেলা করছে। যুবতির পরনে একখানি শিউলি ফুলের মতো সাদা আটপৌরে শাড়ি-ওমনই কমলা রঙের পাড়, গাঢ় অভিমানের মতো একঢাল কেশরাজি পিঠের উপর হাতখোঁপা ভেঙে এলিয়ে পড়েছে, আলতা সাজানো পা দুখানি আলতো ভাবে জলস্পর্শ করে রয়েছে, একদৃষ্টে দিঘিপানে চেয়ে রয়েছেন, ভারি আনমনা দুটি চোখ-যেন পৌষের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, কপালে জোনাকপোকার আলোর মতো মৃদু টিপ-যুবতির পানে একপলক চাইলেই মনে হয় তিনি যেন খুব চেনা, কোথায় যেন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই নামটি স্মরণে আসে না! সর্বাঙ্গে অলঙ্কারের লেশমাত্র নাই, শুধু সুবর্ণ নির্মিত অপরূপ একটি নূপুর তাঁর বাম পায়ে প্রেমহারের মতো উজ্জ্বল, নিরাভরণ হাতদুখানি কোলের উপর নিদ্রামগ্ন।

 

গ্রামের প্রান্তে নির্জন দিঘিটি বহু প্রাচীন, প্রায় তিনশত বৎসর পূর্বে রাজা রামজীবন রায় প্রজাদের জলকষ্ট দূর করার জন্য এই সুবিশাল জলাশয়টি খনন করিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দিরে দেবীর ভোগের জন্য এই দিঘির জলই ব্যবহার করা হত। আজও রাজবংশের ‘ছ-আনি’ তরফের দেবী ‘বড়ো-মা’র জন্য এখান থেকেই সেবাইতরা জল নিয়ে যায়। এখানে গ্রামের কেউ স্নান-প্রাতঃকৃত্যাদিও করে না, শুধু বেলা প্রথম অথবা দ্বিতীয় প্রহরে গৃহস্থ রমণীরা দলবেঁধে কলসি নিয়ে পানীয় জল নিতে আসে। কিন্তু এমন নিথর দ্বিপ্রহরে ওই যুবতির মতো ঘাটে কাউকে দেখতে পাওয়া সত্যিই একটি আশ্চর্য বিষয়। কতগুলি মাছ যুবতির পদতলে নির্ভয়ে ক্রীড়ারত, বৃহৎ তাদের আকৃতি, বহুদিন ধরে দীঘির নিরাপদ জলগুহায় ওই মীনদলের বসবাস, সহসা যুবতি জলতলে তাঁর বামপায়ের মধ্যমার কাছে চঞ্চল রোহিত মৎস্যটিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘শ্বেতকেতু, আমাকে চিনিতে পারিতেছ?’ নারী কণ্ঠের শব্দে মৎস্যটি সহসা আরও গভীর জলরাশি মধ্যে মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। যুবতি মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালেন, একটি একটি করে ঘাটের পৈঠা বেয়ে উপরে উঠে এসে সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়ের গৃহের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন, ধুলাপথের উপর তাঁর কুসুম পদচিহ্ন ফুটে উঠছে, পথটি ছায়াচ্ছন্ন-সারি সারি বাবলা গাছ পরস্পরকে স্পর্শ করে যেন বনবীথি রচনা করেছে,দুপাশে কালকাসুন্দে ফণীমনসা আর বনকুসুমের ঝোপ, একটি বেনেবৌ পাখি সুর করে ডেকেই চলেছে, কতগুলি মৌটুসি আর বিচিত্রবর্ণ প্রজাপতি দলবেঁধে যুবতির পেছনে নিশিডাকের মতো উড়ছে। একটি প্রকাণ্ড তমাল গাছের নিচে এসে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়ালেন যুবতি, মাত্র কয়েক পা দূরে সেনাপতির গৃহ, মুখ ফিরিয়ে অস্ফূট স্বরে কারোর উদ্দেশ্যে যেন বললেন,’আজ আসিতেছি,কাল আবার আসিব, তোমাদের সহিত দেখা হইবে।’

‘রাশিগণের বিশেষ সংজ্ঞা রহিয়াছে, উহা প্রথমে অধ্যয়ন করিতে হইবে। হে রাজন, অনুগ্রহপূর্বক এক্ষণে যাহা কহিতেছি তাহা অতিশয় মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করুন, মেষ মিথুন সিংহ তুলা ধনু এবং কুম্ভ হইল ক্রূররাশি এবং বিপরীতক্রমে বৃষ কর্কট কন্যা বৃশ্চিক মকর এবং মীন সৌম্যরাশি রূপে জ্যোতিষশাস্ত্রে সুপরিচিত। ইহা ব্যতীত পুরুষাদি সংজ্ঞানুযায়ী ক্রূররাশি হইল পুরুষ এবং সৌম্য স্ত্রীরূপে পরিগণিত হইয়া থাকে। আরও একপ্রকার সংজ্ঞা রহিয়াছে, তাহা হইল যুগ্মাদি’

সেনাপতির কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই বিস্মিত গলায় শঙ্করনাথ উঠানের দিকে তর্জনীর ইশারায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পণ্ডিত মহাশয়, আপনার অঙ্গনে ও কাহার পদচিহ্ন?’

হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে এক মুহূর্তের জন্য সেনাপতি যেন চমকে উঠলেন, পরক্ষণেই উঠানে সিক্ত বামা পদচিহ্ন দেখে মৃদু হাসি তাঁর ওষ্ঠে ফুটে উঠল। অতি স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বললেন, ‘উহা কিছু নহে, কোনও গ্রাম্য রমণী হয়তো এই পথে গৃহাভিমুখে যাইয়া থাকিবে, আপনি পাঠে মনোনিবেশ করুন।’

–কখন যাইল? কয়েক দণ্ডের মধ্যে কাহাকেও তো দেখি নাই, আশ্চর্য!

–মনোযোগ সহকারে আমার ব্যাখ্যা শুনিবার কারণে আপনি নিশ্চয় তাহাকে লক্ষ্য করেন নাই।

‘কী আশ্চর্য, পদচিহ্ন দেখিয়া নারী বলিয়াই মনে হইতেছে, যেন দিঘি হইতে স্নান করিয়া কেহ হাঁটিয়া’, বলতে বলতে হঠাৎ শঙ্করনাথের খেয়াল হয় পণ্ডিত মহাশয়ের গৃহ সংলগ্ন দিঘিতে গ্রামের কেউ স্নান করে না, অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে তিনি পুনরায় বলেন, ‘তাহা ব্যতীত এই দিঘিতে এড়োয়ালি গ্রামের কেহ স্নান করিতে আসে না, তাহা হইলে কে আসিল? আর পদচিহ্নও যেন আপনার গৃহে আসিয়াই মিলাইয়া গিয়াছে! তদুপরি আমার চক্ষের সামনে দিয়া এক রমণী চলিয়া যাইবে অথচ তাহাকে দেখিব না! ইহা অতীব আশ্চর্য ঘটনা পণ্ডিত মহাশয়, আপনি বিস্মিত হইতেছেন না?’

–রাজা মহাশয়, আপনি অতিরিক্ত কল্পনা করিতেছেন। কেহ আসে নাই, আসিলেও সে-বিষয় আমাদিগের আলোচনার উপযুক্ত নহে। জগতে যাহা ঘটে সব লইয়া আলোচনা করিবার প্রয়োজন নাই, এক্ষণে পুনর্বার কহিতেছি অনুগ্রহ করিয়া পাঠে মনোনিবেশ করুন।

–কিন্তু পণ্ডিত মহাশয়, ইহা আমার নিকট

–কী? অভাবনীয় মনে হইতেছে?

–তাহাই কি স্বাভাবিক নহে?

মৃদু হেসে সেনাপতি বললেন,’আপনি যৌবনে কলিকাতায় বিদেশি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়াছেন, জগতের সকল ঘটনার পশ্চাতে যুক্তি অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আপনার মন সদা উৎসুক, তথাপি আমি কহিতেছি এইস্থলে বিষয়টি লইয়া আলোচনা অনাবশ্যক।’

সেনাপতির কথা শুনে সামান্য অধৈর্য হয়ে উঠলেন শঙ্করনাথ, স্থির চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন,’মার্জনা করিবেন পণ্ডিত মহাশয়, আপনার কথা শুনিয়া মনে হইতেছে আপনি কোনও বস্তু গোপন করিতেছেন।’

 

তরুণ সন্ন্যাসীর গৈরিক বস্ত্রের মতো রাঢ় দেশের জনহীন প্রান্তর থেকে ধুলাবাতাস বয়ে এল, একাকী মাঠকোঠাখানির অন্তরে ঝমঝম শব্দে বেজে উঠল যেন সকলকে সে মৃদু স্বরে বলে চলেছে-বাসনাশূন্য হও, বাসনাশূন্য হও। ধীরে ধীরে উঠানে পড়ে থাকা পদচিহ্ন ওই বাতাসের স্পর্শে শুকিয়ে আসছে, আর কয়েক মুহূর্ত মাত্র, তারপর অনন্ত কালস্রোত তাকে মুছে দেবে।অস্পষ্ট পদচিহ্নগুলি উঠান পার হয়ে বৃদ্ধ পণ্ডিতের দাওয়ার বিপরীতে একখানি ক্ষুদ্র কক্ষের দিকে ক্রমশ এগিয়ে গেছে। মূল গৃহের বাইরে অবস্থিত ওই কক্ষখানি চট্টোপাধ্যায় পরিবারের উপাস্য ইষ্টদেবী অতি বিরল শ্বেতকালী মা আনন্দময়ীর মন্দির, এই গুহ্যপূজা বহুকাল পূর্বে প্রচলন করেন সেনাপতির বৃদ্ধপ্রপিতামহ ভবানী চট্টোপাধ্যায়। পূর্ণিমা নিশীথে আকাশ যখন চন্দ্রপ্রভার রূপ- লাবণ্যে অপরূপ হয়ে ওঠে তখন এই শ্বেতবর্ণা সালঙ্কারা দেবীর বিশেষ পূজা সম্পন্ন হয়। আনন্দময়ী মায়ের বন্ধ মন্দিরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সেনাপতি। কয়েক মুহূর্ত পর ধীর স্বরে বললেন, ‘সকল কথা জানিতে হইলে তাহার পূর্বে অধিকারী হইতে হয় মহারাজ! অদ্য পাঠদান এইক্ষণেই সমাপ্ত করিতেছি, কল্য পুনরায় আমরা বসিব।’ 

কথাক’টি বলেই উঠে দাঁড়ালেন সেনাপতি, তাঁর শীতল ও স্থির কণ্ঠস্বর শুনে সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে শঙ্করনাথও উঠে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলেন, ‘সম্ভবত আমার কৌতুহল প্রকাশে আপনি রুষ্ট হইয়াছেন, আমাকে মার্জনা করিবেন পণ্ডিত মহাশয়।’

–আপনার আশঙ্কা অমূলক মহারাজ, আমি কদাপি রুষ্ট হই নাই।

কথার মাঝেই উঠানে একদল কাক এসে বসেছে। ঠিক সাধারণ কাক বলে তাদের মনে হয় না, গাঢ় কৃষ্ণবর্ণের দেহ, বৃহদাকার তীক্ষ্ণ চঞ্চু, একদৃষ্টে তারা সকলে সেনাপতির দিকেই চেয়ে রয়েছে। বায়সদলকে ইশারায় দেখিয়ে সেনাপতি বলে উঠলেন, ‘আমার কিছু পোষ্য আসিয়াছে, উহাদের আহারাদির ব্যবস্থা করিতে হইবে বলিয়াই পাঠদান সাঙ্গ করিলাম! আপনি ভুল বুঝিবেন না মহারাজ।’

 

প্রিয় সঙ্গী বৃদ্ধ অশ্বটির পিঠে চড়ে নিজগৃহে ফেরার পথে আজকের ঘটনাগুলির কথাই চিন্তা করছেন শঙ্করনাথ। বেলা দ্বিপ্রহর অতিক্রম করে অপরাহ্ণের দিকে ঢলে পড়েছে, আলোনদীর স্রোতে চরাচর রূপবতীর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, মলয় বাতাসের দোলায় সে-রূপ কোনও মধুর সঙ্গীত বলে মনে হয়। অশ্বের নাম শ্যামাপদ, যথেষ্ট বয়স হয়েছে, দুলকিচালে অনেকটা ভারবাহী গর্দভের মতো সে ধীর গতিতে এখন পথ চলে। তবুও জীর্ণ অশ্বটির উপর ভারি মায়া শঙ্করনাথের,প্রতিদিন সকালে নিজ হাতে তাকে জল, আধসের ছোলা আর ঘাস খাওয়ান। শ্যামাপদও তার মনিবকে সম্ভবত ভালোবাসে। মধুমাসের পথে লাল ধুলা উড়ছে বাতাসে। চারপাশ জনশূন্য নিথর, যুবতির সিঁথির মতো গ্রাম্য পথটি চলে গেছে এড়োয়ালি জনপদের অন্তরে, ছন্দে দুলে দুলে চলেছেন শঙ্করনাথ, কান পাতলে শোনা যায় গুনগুন করে তিনি গাইছেন-মজল আমার মন-ভ্রমরা শ্যামাপদ নীলকমলে! তেমন সুরচর্চিত না হলেও গলাটি বেশ মিঠে, কত পুরাতন দিনের কথা মনে পড়ছে তাঁর-ওই যে সেনাপতি বললেন আজ কলিকাতার কলেজের কথা, রিপন কলেজ, আজ দশবছর প্রায় হল কলেজদিন শেষ হয়েছে, ইদানিং একেক সময় মনে হয় কলিকাতায় থাকতে পারলে বেশ হত। প্রায় দুই বছর আগে বাঙলাদেশ ভাগ করার প্রস্তাব প্রথম দেওয়া হয়, এখনকার ভাইসরয় লর্ড কার্জনই এর প্রধান কাণ্ডারী, মূলত তিনটি কারণ তিনি দেখিয়েছিলেন। প্রথমত এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্ব হ্রাস, দ্বিতীয়ত অনগ্রসর আসামকে যাতে সাগরে নির্গমপথ প্রদান করা যায় এবং তার উন্নতিবিধান করা, তৃতীয়ত ইতস্তত বিক্ষিপ্ত উড়িয়া-ভাষাভাষী জনগণকে একক প্রশাসনের অধীনে একত্রিত করা। উপরন্তু ভাইসরয় চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাগুলিকে বাংলা থেকে পৃথক করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করতে, আবার এদিকে ছোটনাগপুরকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করার কথাও প্রস্তাবে বলা হয়েছিল। তবে যেকোনও বুদ্ধিমান মানুষই বুঝতে পারবেন এই কুনাট্যের অন্তরালে মূল উদ্দেশ্য হল বঙ্গবিভাগ-বাঙ্গলার মানুষের জাতীয় সচেতনতা ও সংহতির যেন নষ্ট করে দেওয়া যায়। এই নিয়ে ইতিমধ্যেই কলিকাতার মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও বুদ্ধিমান মানুষের অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠেছে, শঙ্করনাথের খুব ইচ্ছা তিনি নিজেও এই আন্দোলনে যোগদান করেন, মাঝে মাঝে তার রিপন কলেজের বন্ধু শশীভূষণের পত্র আসে, পত্রে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত লেখেন শশী। রাঢ়বঙ্গের এই দূর গ্রামদেশে বসে সেই পত্র পড়তে পড়তে শঙ্করনাথের চোখের সামনে তার যৌবনের দিন-কলিকাতার রাজপথ-মানুষের মিছিল পটচিত্রের মতো ভেসে ওঠে। গতমাসের পত্রে শশী লিখেছিলেন, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র আপত্তির কথা জানিয়েছেন। কোন দুর্দশার দিন যে আসতে চলেছে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না তবে পরিস্থিতি যে ক্রমেই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছ সে-কথা এই নির্জন এড়োয়ালি গ্রামে বসেও বুঝতে পারেন শঙ্করনাথ। দেশের এই জটিল অবস্থা চিন্তার মধ্যেই তাঁর মনে পুনরায় জেগে উঠল আজকের বিচিত্র ঘটনা, কে ওই রমণী? একটি মুহূর্তের জন্যও তাঁকে দেখা গেল না অথচ উঠানে স্পষ্ট জলসিক্ত পদচিহ্ন যেন স্নান শেষে উঠে এসেছেন- পণ্ডিত মশাই বা কোন কথা গোপন করলেন আজ ? আর অতিকায় ওই বায়সদল, এই দেশে এর পূর্বে ওরকম পক্ষী কখনও দেখননি শঙ্করনাথ, তারা নাকি সেনাপতি চট্টোপাধ্যায়ের পোষ্য! আশ্চর্য, কাকের মতো কদাকার পক্ষী কারোর পোষ্য হতে পারে এ-কথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না।

 

গৃহে ফিরে দোতলায় নিজের কক্ষে এসে শঙ্করনাথ দেখলেন কাশ্মিরি কাজ করা আখরোট কাঠের রাইটিং ডেস্কের উপর একখানি মুখবন্ধ সাদা খাম রাখা আছে, এমন সময় তো সাধারণত ডাক আসে না, কৌতুহলে হাতে তুলে নিতেই বুঝতে পারলেন শশীভূষণের পত্র, অল্পক্ষণ পূর্বেই তো তাঁর কথা ভাবছিলেন, আশ্চর্য! কলেজের থিওসফি চর্চা করা সহপাঠী কমলা থাকলে একে নিশ্চিত বলতো ‘টেলিপ্যাথি’! প্রশস্ত কক্ষের দক্ষিণে দরজার ওপারে টানা বারান্দা আর এদিকে উত্তরে দুটি প্রকাণ্ড খড়খড়ি দেওয়া জানলা খোলাই রয়েছে, মৃদু বাতাস আর আলোয় টলোমলো করছে ঘরখানি, পত্রটি খাম থেকে বের করে জানলার দিকে এগিয়ে গেলেন শঙ্করনাথ, কালো কালির স্পষ্ট হস্তাক্ষরে শশীভূষণ লিখেছেন,

২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৫

কলিকাতা

অভিন্নহৃদয়েষু শঙ্কর,

কলিকাতা ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে-বঙ্গভাগ লইয়া সাধারণ মানুষ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী হইতে ছাত্রছাত্রী সকলেই অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছে। শুনিতেছি জাতীয় কংগ্রেসও এ বিষয় লইয়া প্রতিরোধের কথা ভাবিতেছে অবশ্য বারাসাতের নিকটস্থ হৃদয়পুর গ্রামে আমার মাইনর ইস্কুলে ইহার প্রভাব তেমন পড়ে নাই-শান্ত পল্লীগ্রামে ছাত্র পড়াইয়া জীবন একপ্রকার কাটিয়া যাইতেছে। মাঝে ২ বৈকালে বাঁওড়ের পারে আসিয়া বসিয়া থাকি, দু-একজন জেলে মাছ ধরিতে আসে, কোনও কোনওদিন তাহাদের সহিত কথা কই-দেশের অবস্থা লইয়া তাহাদের চিন্তা নাই, কী করিয়া দুটি অন্ন সংস্থান হইবে তাহা চিন্তা করিয়াই উহাদের দিন কাটিয়া যায়। আমিও যদি উহাদের ন্যায় হইতে পারিতাম তাহা হইলে শান্তি পাইতাম। গতকাল একজন পরিচিত মানুষের সহিত গঙ্গা পার হইয়া বেলুড় গ্রামে যাইয়াছিলাম। ওইস্থলে ভুবনবিজয়ী সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসীসঙ্ঘ রহিয়াছে-গঙ্গা তীরে উহা অতীব মনোরম স্থান। মঠাধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দের সহিত পরিচয় হইল-ভারি মধুর তাঁহার ব্যবহার। আমার পরিচিত মানুষটি তাঁহাকে ‘রাজা মহারাজ’ বলিয়া সম্বোধন করিতেছিল। কতগুলি কথা তিনি আমাকে কহিয়াছেন-তাঁহার মুখ হইতে কথাগুলি শুনিয়া মনে কত ভাবনা আসিয়াই না জড়ো হইল। তোমাকে বিস্তারিত উহা লিখিব, ভাবিয়া দেখিলে বুঝিতে পারিবে জীবন সম্পর্কে আমাদিগের সমুদয় ধারণা কেমন ভ্রান্ত। যাহা হউক, বৌঠানকে আমার নমস্কার জানাইবে ও তুমি আমার ভালোবাসা লইবে। অধিক আর কী! 

ইতি

শশী।

 

কাঠের নিচু সিঁড়ি দেওয়া ইংলিশ স্টাইল খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে চিঠির মতো দেখতে একখানি বিগতযৌবনা কাগজের টুকরো মন দিয়ে পড়ছিল ঋষা, কার্তিক মাসের দ্বিপ্রহর-বেলা চঞ্চলা পাখির মতো এর মধ্যেই পশ্চিমাকাশে ডানা মেলেছে, চারপাশে হলুদ কুসুমবনের আলো কেমন যেন পুরাতন দিনের কথা ফিসফিস করে কানের কাছে আনমনে বলে চলেছে। আজ সকালে প্রপিতামহের ভারী লোহার সিন্দুক দেখতে গিয়ে কাগজটি পেয়েছে ঋষা, খুদে খুদে অক্ষরে লেখা রয়েছে-রমণীবিলাস বাক্স, এস সি ঘোষ এণ্ড ব্রাদারস, প্রথমাবিষ্কারক, ১৩০৭ সনে স্থাপিত, মূল্য ১||০! 

তার নিচে একখানি অস্পষ্ট কালো বাক্সের ছবি, তারপর আবার একটানা লেখা-ইহা বঙ্গললনার আদরের, সোহাগের ও বিলাসের চূড়ান্ত সামগ্রী। ইহা হিন্দু রমণীর কবরী-বন্ধনের একমাত্র প্রধান উপাদান। ইহা দেখিতে অবিকল ১খানি বিলাতী পুস্তকের ন্যায়। এই পুস্তকরূপ বাক্সের ডালা (পাতা) খুলিবামাত্র নিম্ন লিখিত দ্রব্যসমূহ দেখিতে পাইবেন। ১। একখানি কবরী বাঁধিবার দর্পণ। ২। এক শিশি কঙ্কাবতী তৈল। ৩। এক শিশি সুবাসিত তরল আলতা।

 

পড়ছে আর মনে মনে হাসছে ঋষা, এই বাক্সখানি নিশ্চয় প্রপিতামহ শঙ্করনাথ তাঁর স্ত্রী’র জন্য কিনেছিলেন! বাব্বা, বেশ প্রেম ছিল তো দুজনার-কী যেন নাম ছিল প্রপিতামহীর, হ্যাঁ চন্দ্রপ্রভা, চন্দ্রপ্রভা আর শঙ্করনাথ! কী বলে ডাকতেন স্ত্রীকে? নিশ্চয় প্রভা! আর প্রভা কী বলে ডাকতেন ? ও গো! একে স্বামী তায় আবার শিবের নাম! পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে ভাবল, তা এতই যদি পীরিত তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে কচি শিশুপুত্র আর স্ত্রীকে ফেলে গৃহত্যাগই বা করা কেন! আচ্ছা কেমন দেখতে ছিলেন প্রভা ? ঋষার মতোই একরাশ চুল ছিল ? নিশ্চয় ছিল, এমনই কোনও হলদে দুপুরে ওই বারান্দায় বসে হয়তো চুল বাঁধছেন, পাশে মেঝের উপর রাখা বাক্সখানি, ওই যে কঙ্কাবতী তৈল, তা দিয়েই হয়তো টান করে বাঁধছেন বিনোদ-বেণী। তারপর সিঁথিজুড়ে সিঁদুর দিয়ে বাক্স থেকে আয়না বের করে মুখখানি দেখছেন, পড়ন্ত আলো এসে পড়েছে মুখের উপর…পরনে কি সুতির শাড়ি? নাকি বিলাতি রেশমী কাপড়? কত সাল যেন তখন ? এই যে হ্যান্ডবিলে লেখা রয়েছে ১৩০৭ মানে ১৯০০ সাল! আর পাঁচ বছর পর বঙ্গভঙ্গের আগুন জ্বলবে, তখন তো বিলাতি কাপড়-স্নো-পমেটম-পাউডার-গন্ধ তেল সব বর্জনের যুগ, শঙ্করনাথ কি খুব জাতীয়তাবাদী ছিলেন? কে জানে! শুনেছে তো রিপন কলেজ থেকে নাকি পাশ করেছিলেন, হতেও পারে, হয়তো কংগ্রেসের মেম্বার ছিলেন। কবেকার সব কথা! তবে মানুষটি বেশ রোমান্টিক ছিলেন তো! স্ত্রী’র জন্য দ্যাখো কেমন কলকাতা থেকে ‘রমণীবিলাস বাক্স’ আনিয়েছেন! নাকি চন্দ্রপ্রভা নয় অন্য কেউ হৃদয়বতী ছিল ? যাহ! এই অজ পাড়াগাঁয়ে কে আবার গুপ্ত প্রণয়িনী থাকবে! হয়তো কলেজ জীবনের কেউ, তার কথা মনে করেই হ্যান্ডবিলটি সযত্নে সিন্দুকে রেখে দিয়েছিলেন, তারও হয়তো বরষা মেঘের অভিমানের মতো একরাশ চুল ছিল, হয়তো আর কখনও দেখা হয়নি…দূর কোনও দেশে বিয়ে হয়ে গেছিল…হয়তো মুখ ফুটে সেই যুবতিকে হৃদয়ের কথা কখনও বলতেও পারেননি শঙ্করনাথ…শুধু মনে পড়তো তার কথা…হতেও তো পারে! তেমন হলেই বা মন্দ কী, অপ্রকাশিত প্রেম সত্যিই বড়ো মধুর। 

 

হঠাৎ কী মনে হওয়ায় মোবাইল খুলে মেসেজ সেকশনে ঢুকে পৃথ্বীশকে লিখল, আসিবার সময় আমার জন্য একখানি রমণীবিলাস বাক্স আনিও! 

তারপর কেন জানে না আবার মুছেও দিল। বাগানের দিক থেকে গলা তুলে ‘চোখ গেল, চোখ গেল’ করে ডেকে উঠল একটি পাখি, রৌদ্রে তখন পুরাতন কালের জীর্ণ পাতা আপনমনে খসে পড়ছে।

 

আগামীকাল এখানে আসছে পৃথ্বীশ, কাল এসে আবার পরশু চলে যাবে,তেমনই অন্তত জানিয়েছে। আচ্ছা সেদিন বলল এত গোপন প্রজেক্ট আবার বলছে এ-এস-আই নাকি হ্যান্ডল করছে, এ আবার হয় নাকি? অত গোপন কিছু হলে এ-এস-আই কখনও দায়িত্ব পেত না। তাকে মিথ্যা বলছে না তো পৃথ্বীশ ?

 

একটি ক্ষীণ সন্দেহ বিষাক্ত কীটের মতো সহসা ঋষার হৃদয়গহ্বরে প্রবেশ করল। 

             চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                       পরের পর্ব  আগামী মাসের দ্বিতীয় শনিবার

 

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

হাড়ের বাঁশি (প্রথম পর্ব)

 

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More