রিমি মুৎসুদ্দি’র কবিতা

দ্রোহকাল

কখনও কোনো বিশাল পুরুষের হাতে সে ভীমপলাশ দেখিনি,
অসমাপ্ত নায়কের হাতে পায়নি আনন্দবুকুল
তবুও ওর হাতে শিউলি ফুলের গন্ধ

আর বাতাসে প্রব্রজ্যা

কোথাও থিতু হতে পারে না ফেরারি হাওয়া
কোনো দল, গোষ্ঠী, সঙ্ঘ পারে না জুড়ে রাখতে
কোনও বন্ধুতা পারে না দিতে সাম্রাজ্যের ভাগ

সারথি বিহীন রথের চাকা অজানা ঢেউ এর স্রোতে এগোয়
সমুদ্র ফেনায় অনাহূত স্তুতি –
“তুমি নও সে কন্যে, তুমি ছিলে না সে,
যার মুখে দেখেছিলাম নীল পদ্ম!”

সিংহল শিখিনীর বিরহে তখন মেঘের গায়ে সুললিত ছন্দে লেখা শ্লোক

অপরাজিতার বাগানে একাকী মালিনীর দ্রোহকাল মনে পড়ে যায়।

 

ফিগান যুবক ও সিংহের দেবী

বরফের ওপর পায়ের ছাপই পথ,
বরফই সেই নিষ্ঠুরতম কঠিন
যার ভেতর ঘুমিয়ে আছে সিংহের দেবী।

অন্ধকার রাতে আজও মশাল হাতে ফিগান যুবক
তার ছবি এঁকে যায়
আর তুষারের শিরোস্ত্রাণ পরে শাদা পাহাড়
তার আদিম প্রহরী।

দীর্ঘ এক লাঠি হাতে যেদিন বৃদ্ধ দলপতি
নদী পেরিয়ে গেল
রূপমুগ্ধতায় ক্লান্ত তার পা দুটিকে
শীতল জলের রাশি
স্নিগ্ধ স্তব্ধতায় প্রাণ ফিরিয়ে দিল

বরফে ঢাকা শফেদকুহর মাথায় সূর্য
সেদিকে দুহাত তুলে প্রণাম জানাল

অথচ সে জানল না নদী কত সুন্দর!

ফিগান যুবকের শোকে দলপতির কান্না
সিংহের দেবীকে অভিসম্পাত
বনের রৌদ্দুরে শরীর পুড়ে যেতে যেতেও
ঘরের ফেরার অপেক্ষা

সিংহের দেবী জানে হিংসা বাঁচিয়ে রাখে তার সন্তানদের
আর প্রেম জ্বালিয়ে রাখে নিভে যেতে যেতেও একটু আগুন।

 

অগভীর খাদ ও মৃত পাথর

পৃথিবীর প্রতিটা গর্তই এক একটা গভীর খাদ
নীচে নামলেই রহস্য আর নতুনত্বের স্বাদ!
মাটির মায়ায় জলের গভীরে অদ্ভুত এক আঁধার,
সেখানে ঘুমিয়ে সুপ্ত নিশ্চেষ্ট এক ভ্রূণ।
কিছুটা সূর্যের আলো আর কিছুটা নিস্তব্ধতায়
জলের চাদর থেকে যেদিন জন্ম নেবে স্বাস্থ্যবান এক মেঘ
আর তার ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে মাটির বুকে জেগে উঠবে পাথরের শরীর।

পাথর জমে গড়ে ওঠা ইমারতের ছাল উঠে গেলে
পড়ে থাকবে সজীব লালচে এক দগদগে ঘা,
ঠিক যেন পৃথিবীর প্রতিটা নগ্নতা।
পাথরের পরত যাকে এতদিন মাতৃজঠরের মতো ভিজে মায়ায় ঢেকেছিল।
তবুও ধূপের গন্ধ শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর ধ্বনি অথবা আজান
পৃথিবীর সব প্রার্থনাই আসলে লিখে রাখা পাথরের ইতিহাস
যেখানে অস্তসূর্যকে ধরার প্রয়াস আবহমান।
অথচ ছায়া আর অন্ধকারের নিঃশ্বাসে
পড়ে থাকে অগভীর খাদ আর মৃত পাথর…

 

ঘুম আর সমুদ্রের গল্প

কত সহস্রাব্দ ঘুম আটকে আছে আমার ভেতর
যেমন তিমিমাছের হাঁমুখে সেঁধিয়ে আছে জলজ উদ্ভিদ,
ছোটো ছোটো মাছ, নাম না জানা স্কুয়িড
হয়তবা হারিয়ে যাওয়া কোরাল,
একটা আস্ত সমুদ্র।

লাল কাঁকড়ার গর্তে লুকনো ডিমের মধ্যে
একটা বাড়তি স্বপ্নের মতো
জেগে থাকা বালির কণা,
সমুদ্রের বুকে ছড়ানো খোলামকুচি
সমুদ্রবালিকা হবে না জেনেও
লাইটহাউসের আলোয় দেখা ট্যুরিস্টের ট্যুইস্ট নাচ
সূর্যাস্তে স্বপ্ন ভাঙার শব্দে মিলিয়ে যেতে যেতেও
মাঝসাগরে ভাসা ডিঙি নৌকার মতো দেখা দিয়ে যায়।

ঘুম আর সমুদ্রের কোন যৌথ গল্প হবে না জেনেও
ঘুমের স্মৃতিরা সব সমুদ্র বন্ধনেই ঋণ রেখে যায়।

 

সরস্বতী

ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা ক্রমশ চোখে মুখে এসে পড়লে বীণার তারে আনমনা হাত চলে যায়। মোনাস্ট্রি থেকে টুংটাং চাকা ঘোরানোর শব্দ ভেসে আসে।

পাহাড় বেয়ে উঠছি। ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপট, বারবার কেঁপে উঠছি।

কিন্নরী বৃদ্ধও পাহাড়ের আরও উপরে উঠছেন। হাতে তাঁর চিলগোজা। দূরে বরফের চূড়া। কিন্নরকৈলাস। অতিপ্রাচীন বৃদ্ধ তুষারের প্রতি মুগ্ধতা! নতজানু তার শুভ্রতায়।

সাদা ধবধবে মেঘের মধ্যে বীণা। শ্বেতশুভ্র কমল আসনে দেবী। ঈষৎ ঝুঁকে কিছুটা বিমর্ষ

বিষণ্ণতা পাহাড়ে। দৈব আলোর অনুপস্থিতি।

দেবীর পাদপদ্মে পাহাড়ি চিলগোজা। এক বৃদ্ধ যুবকের মুগ্ধতা।

বিদ্যার দেবী। বেদ, পুরাণ কল্পনায় নদী তার নাম। সরস্বতী নদী।

দেবী মাহাত্ম্য বর্ণন-

বহুযুগ আগে ছিল করজোড়ে কৃপাভিক্ষা। এরপর বশীকরণ ও ইচ্ছাপূরণ। দেব ও মানবের নতুন এক বন্ধন।

পাহাড়ি বৃদ্ধ শিখতে চেয়েছিল। নদীর কথা। জানতে চেয়েছিল দেবীর কথা।

বহুদূরের দিকে দেবীর দৃষ্টি। বলে চলেছেন,

-পাহাড়ের বুক বেয়ে ওই নামে দুধশাদা জলের ধারা। বস্পা নদী। নদীও ছিল দেবতা। বহুযুগ আগে হতো পূজা অর্চনা। দেবতা আজ মানুষের আয়ত্তে।

নদীতে বাঁধ। শতদ্রু, বস্পা সব পাহাড়ি নদী

বেচাকেনাই ভবিতব্য। সমস্ত অর্জন আসলে অধিকার। অধিকার বদলে যায় সওদায়। বিক্রি হয়ে যায় একে একে ভালবাসা বিশ্বাস নিরাপত্তা।

শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে ১২০০ মেগাওয়াট, ৩০০ মেগাওয়াট। পাহাড়ি গ্রাম জেগে থাকে সারারাত।

বাসন্তী পূর্ণিমায় ফুলের উৎসব। ইয়ালুচ ফুলের মালায় অর্ঘ্য, প্রেম, বন্ধুতা। তবুও মেঘেদের নাও, রাজহাঁসের মতো উড়ে চলে যায়। সরস্বতী নদীর কথা আজও জানা হল না?

দেবী কি শুনতে পেলেন?

 

স্বপ্ন আর শব্দের উপকথা

স্বপ্নের ভেতরে আরও অনেক স্বপ্ন এসে বসে পড়ল

শব্দকে ক্রমে আমার তরল মনে হতে থাকে।
প্রতিটা শব্দের সাথে আঠালো কিছু একটা পায়ে জড়িয়ে যায়,
আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে আসি
আমার সামনে একটা দীর্ঘ পেঁচানো সরু রাস্তা
দূর থেকে অস্পষ্ট আর ঝাপসা দেখছি
কিছু মানুষের মিছিল।
ওদের হাতে কোনও ম্যানুফ্যাস্টো নেই, কোনও স্লোগান নেই,
আছে শুধু আকাশ বাতাস ভেদী হাততালি।
চারদিক থেকে শুধু হাততালি।
ওরা কি বহুদিন সমবেত করতালি দেয়নি?
বন্দুকের নলের মতো এইসব প্রশ্ন আমার মাথার কাছে উঁচিয়ে আছে
ফায়ার-
গুলিবদ্ধ হতে হতে আমি ক্রমশ শব্দহীন হয়ে পড়ছি।
আর কালো মাথার সারিগুলো সব এক একটা সরীসৃপ
তারা আমার ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে।
অথচ শীতভাব নেই বাতাসে। নরম একটা সূর্যের আলো

প্রশ্নেরা সব সর্পবশীকরণ মন্ত্রে বদলে গেছে।
এবার আর চোখ বন্ধ করে নেই আমি।
তীব্র একটা আনন্দে জেগে উঠেছি
যেন বাঁশি সেতার আর ভায়োলিনের নরম আলিঙ্গনে
এইমাত্র ঘুম ভাঙল আমার।
চারিদিকে সুন্দর সব রঙিন ফুল আর নরম বাতাস
একটা নতুন পাহাড়, নতুন উপত্যকা
সূর্যের ভার্জিন আদর গায়ে মাখছিল।
সমস্ত হারিয়ে যাওয়া নদী একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে
সাগরের পথে বেগবতী

 

রিমি মুৎসুদ্দি দিল্লির ভারতীয় বিদ্যাভারতী ইন্সটিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট কলেজে অর্থনীতি ও প্রবন্ধন বিষয়ের শিক্ষিকা। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুই। ‘মিথ্যে ছিল না সবটা’, প্রকাশক কলিকাতা লেটারপ্রেস, ‘দময়ন্তীর জার্ণাল’, সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী।
ভালবাসা এয়ারোপ্লেনের ডানায় ভেসে থাকা মেঘ আর সেই উথালপাতাল ঢেউ ও চাপচাপ কুয়াশায় খুঁজে পাওয়া নতুন কোনও ক্যানভাস।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More