সংক্রমণের পরে

অর্পণ চক্রবর্তী

                 ১  

হেমন্তের আজ ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলো। নিউটাউনের ‘কুরুক্ষেত্র’ কমপ্লেক্সের তিরিশতলায় টপ ফ্লোরের ফ্ল্যাটে হেমন্তের ঘুম ভাঙলো উপর্যুপরি কোকিলের ডাকে। বসন্ত যে এসে গেছে মনেই ছিল না। ঋতুর আসাযাওয়া খেয়াল করার মতো সময় ছিল কোথায়! নানা পুজো সংখ্যার জন্যে একগাদা লেখার চাপ। গত বছর পাঁচেক এই হয়ে আসছে। তাই এ সময় হেমন্ত রায় এক একটা উপন্যাস শেষ করার জন্যে সাত থেকে দশদিন সবার মুখ দেখা বন্ধ করে দেয়। তখন ফোন অফ থাকে হেমেনের। হেমেন রায় নামেই লেখে হেমন্ত। রহস্যরোমাঞ্চ লেখক হিসেবে তার বইয়ের কাটতি এখন অনেক বড়ো বড়ো লেখকের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভালোভাবে থ্রিলার লেখার যা ধকল তাতে স্কুলে পড়ানোর চাকরিটা ছেড়ে দেবে কী না ইদানীং সিরিয়াসলি ভাবতে হচ্ছে তাকে।

সাধারণত গল্পের মধ্যে হেমন্ত সবসময় একটা নির্ভেজাল বাঙালি সেট রেখে দেয়।

পুরনো জমিদার বাড়ি, বর্ধিষ্ণু কোনও গঞ্জ ,সেখানে কোন গুজব আর গুপ্তধনের সম্ভাবনা ,একটু অলৌকিক শক্তি, তার সঙ্গে আধুনিক মারণাস্ত্র-  এসবই পাঞ্চ করতে হয়। কিশোরদের জন্যে লেখা বলে একটি দুটি কিশোর, বড়ো জোর তরুণ চরিত্র মাস্ট, যারা বিপদটা উতরে দেবে। তার একটা ছক খুব পপুলার হচ্ছে এখন, হেমন্ত সেটা এবারও ইউজ করেছে। স্থির পুকুরের মতো একটা শান্ত জীবন। পুকুরে ঢিল পড়ার মতো বাইরের কোনও অশুভ শক্তি এসে ঘুলিয়ে দিচ্ছে সব। তখন ঐ ভেতরের মানুষজনদের মধ্যেই কারো ,  বিশেষ করে যে একদম হেলাফেলার তারই মধ্যে কাউন্টার করার সুপ্ত ক্ষমতা জেগে ওঠে। সে-ই আবার আগের মতো করে দেয় সবটা।

দাঁত মাজতে মাজতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় হেমন্ত। অনেক উপর থেকে নিচে দেখার একটা মজা আছে। সবকিছু পুতুলের মতো লাগে। রাস্তা, পার্ক, গাড়ি, মানুষজন,  কুকুর। বেড়াল অবশ্য চোখে পড়ে না। এটা এই মুহূর্তে মনে হল হেমন্তের। মুখের ফেনাটা বেসিনে ফেলে দেখল ঠোঁটে সাদা সাদা বুদ্বুদ লেগে আছে। একদম সদ্য দুগ্ধপান করে আসা গোবৎসের মতো লাগছে তাকে। সবে একটা লেখা শেষ করে মেজাজ ফুরফুরে হয়ে আছে। হেমন্ত হেসে ফেলল।

তার স্বার্থপরতার কোটা আপাতত শেষ। গত দশদিন তার মোবাইল বন্ধ ছিল। বন্ধু-বান্ধব,  ভক্তকুল কেউ তাকে বিরক্ত করতে পারে নি। বাবা-মা নেই। দূর-সম্পর্কের কিছু আত্মীয় আছে, তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বললেই হয়। মাত্র একজন, একমাত্র বিন্নির জন্যই হেমন্ত উদগ্রীব থাকে। বিন্নি তার প্রেমিকা, ভালো নাম বৈজয়ন্তী।  হেমন্তের বয়স চল্লিশ হতে চলল। বিন্নি অনেকটাই ছোট, বত্রিশ। হেমন্তের প্রথম বইটা কিনে সই করতে নিয়ে এসেছিল বছর চার আগের বসন্তে। তারপর প্রেম। বিন্নির বাবা অসুস্থ। রিটায়ার্ড। এবছর বিয়ের কথা, বিন্নির বাবা মেয়ের বিয়েটা দেখে যেতে চান।

হেমন্ত ব্রেকফাস্ট করতে গিয়ে দেখল ব্রেড শেষ। এবার বেরোতে হবে।  কাজের মহিলাকে আসতে বারণ করা ছিল। তাই করে থাকে বড়সড় লেখার কাজের সময় হেমন্ত। এ ক’দিন একা থাকবে বলে মোবাইল অফ ছিল। টিভি চালায় নি। চালাতে গিয়ে দেখল সেট টপ বক্স কাজ করছে না। টাকা বাকি। মোবাইলে চার্জ শেষ। মোবাইল চার্জে  দিয়ে হেমন্ত বেরোলো। চাল আছে, কিন্তু আলু ডাল ডিম শেষ। ম্যাগি আর পাউরুটি কিনে এনে বিন্নিকে ফোন করবে। কতদিন কথা হয় না। কষ্ট হল হেমন্তের। সে ঠিক অন্যদের মতো না । মোবাইল খোলা থাকলে কি বা হত?  ফিরে অনেক কথা বলবে বিন্নির সঙ্গে। লিফটে নামতে নামতে ভাবছিল সে। কমপ্লেক্স থেকে বেরোনোর সময় অন্যদিন গেটকিপার বসে থাকে। আজ কেউ নেই। একটু অবাক হল। ফিরে নিজেদের বিল্ডিং এর দিকে তাকালে হয়ত দেখত নানা ফ্লোরের জানালা দিয়ে বেশ কিছু চোখ দেখছে তাকে।

বেরিয়ে এল হেমন্ত। ফাঁকা শুনশান রাস্তা। দূরে একটা কুকুর প্লাস্টিকের প্যাকেট মুখে নিয়ে খোলার চেষ্টা করছে। হেমন্ত একটু বিরক্ত হল। কেন যে লোকে ময়লা প্লাস্টিকে করেই ফেলে রাস্তায়! অশিক্ষিত আনকালচার্ড যত্তসব। হেমন্ত খেয়াল করেনি প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটার পরও একটি লোক, একটি গাড়ি, একটিও সাইকেল সে দেখতে পায় নি। বাঁদিকে বিশাল মল-টির গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়েই প্রথম ধাক্কাটা খেল হেমন্ত। বন্ধ। এই দুপুর বেলা পৃথিবীর অন্যতম জনঘনত্ব-বিশিষ্ট শহরে সে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাশফল্টের মসৃণ রাস্তায়। আর কেউ নেই। রাস্তার ওপারে একটা গাব গাছ বোধহয়। ঝিরঝির হাওয়ায় একটা ফল খসে গড়িয়ে এল তার দিক। চমকে উঠল হেমন্ত । ঠিক দুক্কুরবেলা ভুতে মারে ঢেলা — ছোটবেলার ছড়া কেন ভেসে উঠল? গ্রামের সেই সব দিনদুপুরের মতো লাগছে কেন আজকের এই রাস্তা, শহর?

হেমন্ত ভাবছিল আজ কি বনধ আছে কোনও? সে তো গত দশ দিন ধরে বাইরের সব কিছুর সঙ্গে যোগাযোগহীন। অসহায় লাগছিল হেমন্তের। দ্রুত ফিরতে হবে ফ্ল্যাটে। মোবাইলটা এতক্ষণে চার্জড হয়ে থাকবে। বিন্নিকে ফোন করতে হবে; কী ব্যাপার, কী হল শহরটার এই ক’দিনে? প্রায় দৌড়োচ্ছিল হেমন্ত। নিজেকে মনে হচ্ছিল রিপ ভ্যান উইঙ্কল। হঠাৎ বাঁদিকের বড়ো তিনতলা বাড়ির সামনে থমকে গেলো সে। বন্ধ লোহার গেটের ভেতরে দুজন বিশাল চেহারার লোক। মুখে মাস্ক। প্যারাশুট কাপড়ের পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা। চোখে সানগ্লাস। হাতে লম্বা বাঁশের লাঠি। হতভম্ব হয়ে হেমন্ত দাঁড়িয়ে গেল। লোকদুটো কেমন মারমুখী হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বিস্ময়ের ঘোরটা কাটলে সার্ভিস রোড ক্রশ করে গেটের দিকে এগোতে না এগোতেই বাজখাঁই গলায় চিৎকার করল একজন — “খবরদার এদিকে আসবি না। যে চুলোয় যাচ্ছিস যা” ।হেমন্ত এগোলো না। তুই তোকারি শুনেও খুব একটা অবাক হল না। অপমানিত হবারও কোনো অনুভূতি হল না তার। ও বুঝে গেছে এ ক’দিনে এমন কিছু ঘটে গেছে এত অল্পে অবাক হলে চলবে না, আরো অনেক কিছু অপেক্ষা করছে তার জন্য ।

সে শুধু জিজ্ঞেস করল– ” রাস্তাঘাট এত ফাঁকা কেন? মল বন্ধ কেন? আপনারা এসব অদ্ভুত পোশাক পরে আছেন কেন? গাবের ফলটা মাটিতে পড়ার শব্দে ছোটবেলার ছড়াটা মনে পড়ল কেন?”  শেষ প্রশ্নটা অবশ্য করে নি ও । উত্তরটা এলো আকাশ থেকে। দোতলার বারান্দায় সাদা পাঞ্জাবী পরা একজন পুরুষ, তারও  মুখে মাস্ক, গম্ভীর গলায় বললেন-” আপনি কি মঙ্গল গ্রহ থেকে এলেন মশায়? না কি পাগল?”
—“কোনওটাই  না। আমি ঐ কুরুক্ষেত্র অ্যাপার্টমেন্টে থাকি।“
—-” ঢপ মারছেন?  এখানে থাকেন আর জানেন না গত মাত্র সাতটা দিনে সারা দেশের কি অবস্থা ভাইরাসের অ্যাটাকে? লাখ লাখ লোকে আক্রান্ত। রোজ মানুষ মারা যাচ্ছে। আজই তো গেছে কয়েক হাজার। ইউরোপ আমেরিকায় তো মুড়িমুড়কির মতো মরছে মশাই। টিভিতে তো সবই দেখাচ্ছে।“
ভ্রু কুঁচকে লোকটি বললেন- ” আপনি কি মশাই টিভিও দেখেন না”?
— “দেখি, কিন্তু গত দশ দিন দেখি নি।“
— “কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল মশাই না দেখতে? ইয়ার্কি মারছেন? আমার সাথে? জানেন এ অঞ্চলের সব বড়ো প্রোজেক্টগুলোর ডেভেলপার আমি ! আপনার ঐ কুরুক্ষেত্রও আমারই হাতে হয়েছিল।“
নিচের একটা সিকিউরিটি বলল – “স্যার,  শুদুমুদু টাইম ওয়েস্ট করে লাভ নেই। এটাকে ফুটিয়ে দি। এরও ইনফেকশন আছে কি না কে জানে?”
—- “হেমেন স্যার আপনি? বাপি,  উনি হেমেন রায়। বিখ্যাত লেখক। ওনার সব বই আমার পড়া। আমি ওনার অটোগ্রাফ নেব। আপনি আসুন না ভিতরে!”

এতক্ষণ পরে পৃথিবীটা, কলকাতা শহরটা একটু চেনা মনে হল হেমন্তের । সে শুধু দোতলার বারান্দায় ভদ্রলোকের পাশে এখুনি এসে দাঁড়ানো কিশোরীর দিকে তাকিয়ে হাসল –“ না। যা শুনছি তাতে কারও বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। পরে অন্য কোনও সময় হবে । তুমি ভালো থেকো”
ভদ্রলোক হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন
— “আপনি হেমেন বাবু!  আরে মশাই এদ্দিন করছিলেন কী?”
— “পুজোর লেখা শেষ করবো বলে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তার আগে একটা কানাকানিতে শুনেছিলাম বটে এই মারণ ভাইরাসের কথা, গুরুত্ব দিই নি। যাক, চলি। একটু শুধু বলে দিন ডাল, ডিম, ব্রেড এসব কোথায় কিনতে পাব?”
—  “পাবেন না। সব বন্ধ। কে থাকবে দাদা আপনার জন্যে?  ঐ মলের বেশ কয়েকজন কর্মচারী তো …”, চুকচুক করে বিচিত্র আওয়াজ করলেন ভদ্রলোক ।
ঐ শব্দটার মানে মৃত্যু। এমনিতে এই অর্থহীন ধ্বনিতে, বডি ল্যাঙ্গোয়েজে,  স্ল্যাংএ হেমেনের খুব ইন্টারেস্ট। কিন্তু আজ বিরক্ত হল। বলল  –“আপনারা কী করছেন তবে?”
—- “আমার সব স্টক করা আছে । এক মাস কেন, ছ’মাসও চলে যাবে।“
কিশোরীটি ফিসফিস করে কী বলল তা বুঝল হেমন্ত। ভদ্রলোকের পরের কথায়, — “দাঁড়ান মশাই। এই, তোরা এক কাজ কর,  একটা ব্যাগে করে ওনাকে চাল ডাল আনাজপাতি দিয়ে দে তো । শুনুন, আপনার মোটামুটি এক সপ্তা চলে যাবে। এর মধ্যে শুনছি থিতিয়ে যাবে সব। তদ্দিন এই দিয়ে চালিয়ে দিন। একদম বেরুবেন না বাড়ি থেকে । আরে, মাস্কও তো নেই মশাই আপনার!  একটা মাস্কও দিয়ে দে ওনাকে।”

হেমন্তের কানে এসব কিছু ঢুকছিল না। সে ভাবছিল বিন্নির কথা। কেমন আছে ও!  কী করে জানবে? মোবাইলে চার্জ হয়ে গেছে নিশ্চয়। গিয়েই ফোন করবে একটা। বিন্নির কাছে কী  করে যাবে? কোন গাড়িও তো পাবে না। তবে সেই গড়িয়া পর্যন্ত যাবে কী করে?
মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করল হেমন্ত – “ওসব থাক। একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন?  টাকা যা লাগবে দেবোখন।“
ভদ্রলোকের মুখে মুখোশ না থাকলে হাঁ’টা স্পষ্ট দেখা যেত — আপনি তো সত্যিই পাগল! কোথায় যাবেন এর মধ্যে?

 

   ২

 একটা মোটর বাইক স্পিডে পেরিয়ে যাচ্ছিল ডি এল এফ ওয়ান,  কলেজ মোড়,  নিকো পার্ক, জি এস টি ভবন । খাঁ খাঁ করছে রাস্তা। এখন তিনটে বাজে। সোমবার। নিকো পার্কের ওপরে আকাশে বেশ কয়েকটি শকুন চক্রাকারে উড়ছে। ওদিকে গেটের মাথায় কী  এগুলো?  হাড়গিলে না!  হেমন্ত চমকে উঠল। বাইকটা কেঁপে গেলো একটু।  হাড়গিলেগুলো কোথা থেকে এল?  ওরা তো এনডেন্জার্ড। শুধু গৌহাটিতে এদের প্রজননের ব্যবস্থা আছে। একটা গল্প লিখতে গিয়ে জেনেছিল হেমন্ত। কলকাতা করপোরেশনের লোগোতে ওদের ছবি আছে। মহামারীতে ওরাই মানুষ পশু সবকিছুর ডেডবডি খেয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো শহরটাকে। তবে কি আবার …আবার!

আজ ঐ বাচ্চা মেয়েটার জন্যেই বাইকটা পেল হেমন্ত। ভাগ্যিস মাস্ক ছিল না তার। না হলে তাকে চিনতেও পারত না মেয়েটা। বাইকটা একবার থামিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে আরও একবার রিং করলো বিন্নিকে। সেই একই যান্ত্রিক স্বর- সুইচড অফ। কী হল বিন্নির?  মোবাইল অন করতেই একগাদা মেসেজ ঢুকে গিয়েছিল ফোনে। কিছুতেই বিন্নিরগুলো আলাদা করা যাচ্ছিলো না। সবগুলোতেই  ভয় আর আতঙ্ক ছাড়া কিছু নেই। শুধু বিন্নি কিছু জানায় নি। জানতে চেয়েছে, সে কেমন আছে?  বলেছে, বাড়ি থেকে একদম যেন না বেরোয় হেমন্ত। তাহলে কথা বলবে না আর। শুধু তিনদিন আগের শেষ মেসেজে  জানিয়েছে—“ বাবার বুকে খুব ব্যথা। হয়তো আজই শেষ। জানি না কী করব! তুমি কিন্তু আসবে না। এসে কিছু করার নেই তোমার। প্লিজ ।”

হেমন্ত ঠোঁট কামড়ালো। স্টার্ট দিলো। আর ফাঁকা রাস্তায় থার্ড গিয়ারে উড়তে থাকল বাইক। পিছনে পড়ে থাকলো সুশ্রুত হসপিটাল। হেমন্ত  দেখল হসপিটালের গেটের ভেতরে মাস্ক আর ঐ স্পেসশিপের অ্যাস্ট্রোনটের মতো পোশাক পরে গুটিকয় লোক। বন্ধ গেটের বাইরে মুখোশ পরা কয়েকটি পুরুষ আর মহিলা কাকুতি মিনতি করছে। হেমন্ত উড়ে চলেছে কলকাতা শহরের উপর দিয়ে। রাস্তায় মাঝে মাঝেই পড়ে আছে মানুষের দেহ। কোথাও মিলিটারি গাড়ি করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে বডিগুলো।

হেমন্ত ভাবছিল, সত্যিই কি ওরা সবাই ডেডবডি? সবারই নাক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে রক্ত? ঐ ভদ্রলোক সাবধান করে দিয়েছিলেন — “বডি কন্ট্যাক্ট ছাড়া এ ভাইরাস ধরবে না আপনাকে। আর অন্যের হাঁচি কাশির থেকে দূরে থাকবেন। যাদের নাকের থেকে দেখবেন রক্ত বেরুচ্ছে তারা ইনফেক্টেড । ইন্টারনাল বিল্ডিং হয় মশাই , সাবধান।“  বিল্ডিং! তাই বটে। মৃত শরীর দিয়ে তৈরি আরেকটা শহর এই  শহরের পেটের মধ্যে বাড়ছে বেড়েই চলছে ।

সায়েন্স সিটির মোড়ে আচমকা গাড়ি থামাতে হল হেমন্তকে। কোথা থেকে এল এতো হনুমান!  সমস্ত রাস্তা জুড়ে খেলায় মেতে আছে তারা। অনেকবার হর্ণ দিয়েও কাজ হলো না যখন, হেমন্ত বাইকটা ঠেলতে ঠেলতে পার হয়ে গেল হনুমানের দঙ্গল। ওরা কেউ ফিরেও দেখল না তাকে। আরো কিছুটা যাওয়ার পর খেয়াল করল হেমন্ত আজ আকাশ ভীষণ নীল। হালকা সাদা মেঘ। বাতাসে কোনও ধোঁয়া নেই। হালকা লাগছে শরীর। বুকভরে নিঃশ্বাস নিল সে। পিওর অক্সিজেন। পুরো রাস্তাটা ফাঁকা। মাঝেমাঝে চকিতে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে দু-একটা বেজি।  লক ডাউন চলছে সাতদিন ধরে। ফেসবুক হোয়াটস অ্যাপ টুইটারের একের পর এক পেন্ডিং পোস্টে গত কয়েকদিনের সব কিছু জেনে ফেলেছে হেমন্ত।

গড়িয়া কানেক্টর থেকে ডান দিকে টার্ন নেওয়ার সময় একটা পুলিশ ভ্যান সামনে এসে দাঁড়ালো। হুড়মুড় করে কয়েকজন পুলিশ লম্বা বেতের লাঠি হাতে ঘিরে ধরলো হেমন্তকে। মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস। বাইকের সামনের চাকায় লাঠি চালাল একজন। একটা ভোঁতা শব্দ হল। যেন নিশ্বাস বন্ধ হবার আগে খাবি খেলো কেউ।  হেমন্ত খেয়াল করল কিছু কিছু শব্দের কোনো ইকো হয় না। একটু এগিয়ে এসে একজন বলল “কোথায় যাচ্ছেন?  লকডাউন চলছে জানেন না?”

তার লেখার ভক্ত, পুলিশের এক বড়কর্তার সঙ্গে কথা বলেই বেরিয়েছিল হেমন্ত , বলেছিল তাকে যেতেই হবে বৃদ্ধা আত্মীয়কে ওষুধ পৌঁছে দিতে। নাছোড়বান্দা হেমন্তকে তিনি বলেছিলেন রাস্তায় সমস্যা হলে ফোন করতে। তাঁরই কৃপায় এ যাত্রা উতরে গেল হেমন্ত। পুলিশ ভ্যানটা সরিয়ে নিতে নিতে চেতাবনি দিয়েছিল ” তাড়াতাড়ি ব্যাক করবেন। যেখানে যাচ্ছেন সেখানে কিছু ছোঁবেন না ।

ছোঁয়নি কিছুই।  ফিরছে এখন হেমন্ত। ওদের পাড়ায় ঢোকার সময় ছ্যাৎ করে উঠেছিল বুক। থমথম করছে পুরো এলাকা। বাড়িগুলোর দরজা জানালা বন্ধ। অন্যদিন রোয়াকগুলো , চায়ের দোকান ভর্তি থাকে ছেলে-ছোকরা বুড়ো আধবুড়োদের ভিড়ে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে তাকে আর বিন্নিকে–  তারা কোথ্থাও নেই। তারা কোথায় গেল? সবাই মরে গেল?

হেমন্তের শেভিং লোশন একটু বেশি খরচ হয়। হাতে আফটার শেভ লোশান নিয়ে সেটা উবে-যাওয়া দেখার একটা গোপন অভ্যেস  আছে হেমন্তের। ঠিক তেমনি সেই ভিড়টা একদম উবে গেছে। হাতের রেখার মতো পথটা একদম এক আছে। শুধু লোশন উবে যাওয়ার পর হাত যেমন ঠান্ডা হয়ে যায় তেমন একটা শিরশির ঠান্ডা অনুভব করেছিল হেমন্ত।  তার কি ঘাম হচ্ছে? লীন তাপ বেরিয়ে যাচ্ছে?  শীত শীত করছে কেন?

গেটের সামনে বাইক থামিয়ে পা দিয়ে খুলেছিল বাউন্ডারির গেটটা। একতলা বাড়ির কোলাপসিবল গেটের তালা ভেতর থেকে আটকানো দেখে একটু আশ্বস্ত হয়েছিল। জোরে জোরে, খুব জোরে ডেকেছিল বৈজয়ন্তী বলে। এতো জোরে সে কখনও কাউকে ডাকে নি। কিন্তু বিন্নি না বলে বৈজয়ন্তী বলে ডাকল কেন? ভাবছিল হেমন্ত । আশ্চর্য! ওকি চায়নি ওর ব্যক্তিগত ডাক অন্যরা জানুক!  কেউ তো ছিল না। তবে!  তবে কি ঐ ভিড়ভাট্টা, পড়শি,  আশপাশের লোকগুলো—  এরা না থাকলেও থেকে যায়! তখন তো বিন্নি কেমন আছে! বেঁচে কিনা!  এসবই ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়। বৈজয়ন্তী বলে তো ভাবে নি । তবে চিৎকার করে ডাকার সময় কেন? বাইকে স্পিড তুলল হেমন্ত । ওকে দেখে চমকে গেছিল মেয়েটা, দ্রুত দরজা খুলে ঘরে ঢুকিয়ে নিয়েছিল।

বরাবর দেখেছে বিন্নি নাটক একদম পছন্দ করে না। আজও কিচ্ছু বলেনি। একটা চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল, কাচের শার্সির বাইরে দিয়ে যেমন বৃষ্টির জল গড়িয়ে নামতে থাকে এলোমেলো, দিশেহারাভাবে, তেমনি বিন্নির গাল বেয়ে নেমে যাচ্ছিল এতগুলো দিনরাত, লকডাউন, বাবার হার্ট অ্যাটাক। হেমন্ত শুনছিল ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার কোন গাড়ি নেই কোথাও। কোনো ড্রাইভার নেই। শুধুমাত্র গড়িয়ার শ্মশান কাছে বলে আর পাড়ার চায়ের দোকানের ঐ ছেলেগুলো ছিল বলে বাবার সৎকারটা করা গেছিল। বিন্নির চোখের জল মুখের মাস্কে এসে হারিয়ে যাচ্ছিল। মাস্কের কালো রঙটা আরও ঘন গাঢ়  হয়ে উঠছিল।

হেমন্ত হাত বাড়িয়েছিল, বিন্নি সরে গিয়েছিল—“ শ্মশান থেকে ফেরার পর আজ পর্যন্ত মা-কেও ছুঁই নি। বাড়িতেও মাস্ক পড়ে থাকছি।  অবশ্য আমি মরে গেলে মা-ও এমনিই মরে যাবে।“ হেমন্ত নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলেছিল—“ আমিও মরে যাবো তো!” বিন্নি হাসল বোধহয়, মাস্কের নিচে কী হচ্ছে তা বোঝা যায় নাকি? তবু মনে হল হেমন্তর। বিন্নি বলল—“ তুমি ফিরে যাও। সাবধানে থাকো। আর বেরিয়ো না। যদি বেঁচে থাকি তোমার মোটরবাইকে চাপিও।“

অসাবধানে চাপা উত্তেজনায় একটু নিচে ঠোঁটের ওপর নেমে এসেছিল বিন্নির মাস্ক। হেমন্ত কেন দেখছিল তখন বিন্নির নাসারন্ধ্র? কেন মনে হচ্ছিল একটু লালচে আভা দেখল কি? তবে কি বিন্নি পজিটিভ?  নাকি ফরসা এই মেয়েটা ইমোশনাল হলেই লাল হয়ে যায় গাল, নাকের পাটা, আগেও দেখেছে যেমন – এ-ও তা-ই? কিন্তু আগে কখনও নাসারন্ধ্র মনোযোগ দিয়ে দেখেনি তো! কী করবে? কী করলে এই একটা যুক্তিহীন অর্থহীন চূড়ান্ত অ্যাবসার্ড সিচুয়েশানে মানানসই হবে? বিন্নিকে জড়িয়ে ধরবে? চুমু খাবে প্রবল দীর্ঘ? এখানেই থেকে যাবে? তারপর কনটামিনেশান ছাড়া কিছুদিন পার করে দিতে পারলে সারা জীবন এই মুহূর্তের হিরোইজম নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে! কয়েক প্রজন্ম ধরে বংশের উত্তরপুরুষদের কাছে গল্প হয়ে থাকবে। প্রাচীন অরণ্য প্রবাদের মতো! ছোটবেলায় পড়া ইন্দ্রজাল কমিক্সের বেতালের মতো, চলমান অশরীরীর মতো!  লোভ হচ্ছিল হেমন্তর। পাশের ঘর থেকে বিন্নির মা তখন বললেন—“ তাড়াতাড়ি ফিরে যাও।সন্ধে হয়ে এসেছে। এদিকে বড্ড ছড়িয়েছে। সাবধানে যেও বাবা।“

হেমন্ত স্পিড বাড়াল। বিন্নিকে বলে এসেছে, কালকেই ফিরবে আবার। চালডাল খাবার যা আছে সব নিয়ে। কোন আপত্তি শুনবে না। কিছু জামাকাপড় নিতে হবে। ট্র্যাভেলিং ব্যাগটা নিলেই হবে। সবকিছু গোছানো থাকে ওতে। হাসি পেল হেমন্তর, বেড়ানোই বটে।

সায়েন্স সিটির মুখটাতে এসে বাইক থামাতে বাধ্য হয়েছিল হেমন্ত। সন্ধের অন্ধকার এখন গাঢ়। কেউ কোত্থাও নেই। কোনও পুলিশের গাড়িও টহল দিচ্ছেনা। শুধু এই চার মাথার মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল জ্বলে আছে লাল। কিওস্কে কোনও পুলিশ নেই। এদিকে ওদিকে রাস্তার ধারে কয়েকটা কুকুর, হনুমানের জটলা। কয়েকটা পায়রা ঘুঘুও বোধহয় রয়েছে, রাস্তার ওপর কারো ব্যাগ ছিঁড়ে পড়ে যাওয়া চালের দানা খুঁটে খুঁটে খেতে ব্যস্ত। একটা মোহনচূড়া পাখিও দেখল মনে হল হেমন্তর। একেই তো হুদহুদ বলে— মাটির গভীরে সব কিছু দেখতে পায় অথচ বেচারি মাটির ওপরে পাতা জাল দেখতে পায় না, ধরা পড়ে। কোথায় যেন পড়েছিল হেমন্ত।  উঁচু একটা বাতিস্তম্ভর মাথায় একটা বিশাল বড় পাখি এসে বসলো, ধারালো বাঁকানো ঠোঁট আর শক্তপোক্ত ডানা দেখে মনে হল বাজপাখি।  এরা সব ছিল কোথায়?  ট্রাফিক রুল ব্রেক করে শুনশান রাস্তা পেরিয়ে গেলেও এরা ছাড়া কেউ সাক্ষী থাকবে না। কোন ফাইন করবে না কেউ। তবু হেমন্ত স্টার্ট বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকলো। লাল আলো নিভে কখন সবুজ হবে সে জন্যে নয়। কলকাতার রাস্তায় এখন সব সম্ভব। তাই সে অপেক্ষা করতে লাগলো মজ বুড়োর জন্যে। ডেনকালির জঙ্গল থেকে এই বাইপাসে যদি চলে আসে সবজান্তা মজ বুড়ো! মজ বুড়োই বলতে পারবে কী করবে সে? কী করেছিল তার আগের মানুষেরা? বিস্মৃত সব পূর্ব পুরুষেরা? ততক্ষণ  ঐ লাল আলো বারবার  বিন্নির নাসারন্ধ্রের লালচে ভাবটা মনে করিয়ে দিতে থাকল হেমন্তকে। হেমন্ত খেয়াল করল না হুদহুদ পাখিটা কখন তার বাইকের পিছনে এসে বসেছে।

চিত্রকর শুভ্রনীল ঘোষ  

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More