ক্লাস থ্রি পাশ কবির কবিতা আজ গবেষণার বিষয়, তাঁকে পদ্মশ্রী দিয়ে গর্বিত হয় দেশ

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ছত্তীসগড় সীমান্তে অবস্থিত পশ্চিম ওড়িশার জেলা বারগড়। চৌহানদের রাজত্বকালে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার উপত্যকায় অবস্থিত এই অঞ্চলটিতে ছিল প্রচুর দুর্গ। এলাকাটির প্রাচীন নাম ছিল ‘বাহগর কোটা’। সম্বলপুরের চৌহান রাজা বলরাম দেব পরবর্তীকালে এলাকাটির নাম দেন ‘বারগড়’। নানা কারণে এই জেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। কিছু সময়ের জন্য বৌদ্ধধর্ম প্রভাব বিস্তার করেছিল অঞ্চলটিতে। গানিয়াপালি ও নৃসিংহনাথে আজও দেখা মেলে কিছু বৌদ্ধবিহারের। যেগুলির উল্লেখ আছে ‘হিউয়েন সাং’-এর লেখাতেও।

এই বারগড় জেলার কোশল এলাকার একটি গ্রাম হল ‘ঘেঁস’। জেলা সদর বারগড় থেকে গ্রামটির দূরত্ব ৪৩ কিলোমিটার। যে গ্রামটির আকাশে বাতাসে আছে বিপ্লবের গন্ধ। একসময় জমিদারদের সঙ্গে আদিবাসীদের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল এই গ্রাম। অন্যদিকে সিপাহী বিদ্রোহের অসীম প্রভাব পড়েছিল এই গ্রামের ওপর। সম্বলপুরের রাজা সুরেন্দ্র সাইয়ের সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন জমিদার মাধো সিং। ১৮৫৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর, বাহাত্তর বছরের জমিদার মাধো সিং ও তাঁর চার সন্তান সহ প্রায় পুরো সিং পরিবারকে হত্যা করেছিল ব্রিটিশরা।

বীর সুরেন্দ্র সাই

ঐতিহাসিক গ্রাম ‘ঘেঁস’, ১৯৯০ সালে হঠাৎই আলোচনায় উঠে এসেছিল একটি কবিতার জন্য। কবিতাটির নাম ‘ঢডো বটগাছ।’ কবিতার প্রথম ছত্রটি হল-

“পিটি পিটি করি কেতে পিটি গলা
মুড ঢেকি আছে ঠিআ
গাঁআ মুডসার ঢডো বরগছ
ধরসার ডেবরিআ।”

সম্বলপুরী-কোশলী ভাষায় লেখা কবিতাটি আসলে একটি বটগাছের আত্মকথা। যেটি নিরব ভাষায় শত শত বছর ধরে বর্ণনা করে চলেছে গ্রাম্যজীবনের ইতিকথা। রাস্তার বাম দিকে দাঁড়িয়ে বুড়ো বটগাছ বলে চলেছে, কীভাবে ময়না হরিয়াল পাখির দল সকাল সন্ধ্যা তার শরীরে মজলিশ বসাত। তার ঝুরি ধরে ঝুলে গ্রামের কত ছেলেপুলে বড় হয়ে যেত। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহ থেকে বাঁচার জন্য কত পথিক তার ছায়াতলে আশ্রয় নিত। নববধূকে গ্রামে বরণ করার জন্য বাজনা বাজানো শুরু হত এই বুড়ো বটতলা থেকে।

ছবি প্রতীকী

শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার আগে মৃতদেহকে বটতলায় শুইয়ে রেখে নাচানাচি করা হত। শ্মশানযাত্রীদের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হত হলুদ ও আমলকি বাটা। বটতলাতে কুলো রেখে বাড়ি ফিরে যেতেন বিধবা পত্নী। গভীর রাতে এই বুড়ো বটগাছের নীচেই লুঠের মাল ভাগ বাটোয়ারা করত তস্করের দল। কনে দেখা রোদ্দু্রে (মাছি-আঁধারি) প্রেমিকা এসে দাঁড়াত বুড়ো বটগাছের নীচে, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার জন্য। সব দেখত, সব শুনত বুড়ো বটগাছ। কিন্ত তা কাউকে বলতে পারত না। কারণ সে মূক। মানুষের মত কথা বলার ক্ষমতা তার নেই।

কিন্তু বুড়ো বটগাছ জানত না, একজন মানুষ তার শব্দহীন ভাষা শুনতে পান। বুড়ো বটগাছটির অভিজ্ঞতা বেঁধে ফেলেন অক্ষরের সোনালি সুতো দিয়ে। তাঁর নাম হলধর নাগ। ঘেঁস গ্রামের ক্লাস থ্রি পাশ করা এক কবি। যাঁর কাব্য আজ পড়ানো হয় সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরে। যাঁর লেখা কাব্য ও কবিতা নিয়ে গবেষণা করেছেন পাঁচ জন গবেষক। গবেষণা করে চলেছেন আরও ১৪ জন গবেষক। বুড়ো বটগাছ জানে না, প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, প্রথাগত শিক্ষাকে বিদায় জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন এই মানুষটি। পরিবারের ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসায়।

লোককবি হলধর নাগ

দশ বছর বয়সে হলধর হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর বাবাকে। কাজ নিয়েছিলেন মিষ্টির দোকানে। থালা ধুয়ে আসত সামান্য কিছু টাকা। তাতে চলত সংসার। মিষ্টির দোকানের কাজ ছাড়িয়ে স্থানীয় বিদ্যালয়ের রাঁধুনীর কাজে হলধরকে নিযুক্ত করেছিলেন ঘেঁস গ্রামের সরপঞ্চ। সেখানে কেটেছিল এক দশকের বেশি সময়। বিদ্যালয়ের রান্নাঘরেই আলাপ হয়েছিল রান্নার কাজ করতে আসা মালতীর সঙ্গে। মালতীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন মুখচোরা হলধর। কিন্তু মুখে প্রকাশ করতে পারেননি সে কথা। রান্নাঘরের দেওয়ালে লিখতে শুরু করেছিলেন প্রেমের কবিতা। একরাশ বিস্ময় নিয়ে কবিতাগুলি পড়তে শুরু করেছিলেন মালতী। দেওয়ালে কবিতা লিখেই হলধর মালতীকে দিয়েছিলেন প্রেমের প্রস্তাব। দুটি যুবক যুবতীর চলার পথ এক হয়ে গিয়েছিল।

বিয়ের পর হলধর বুঝেছিলেন এই সামান্য অর্থে সংসার চলবে না। স্থানীয় ব্যাঙ্ক থেকে এক হাজার টাকা লোন নিয়ে বিদ্যালয়ের গেটে খুলেছিলেন খাবারের দোকান। দোকানে রেখেছিলেন কিছু মনিহারী দ্রব্যও। কিন্তু কিছুদিন পরে স্কুলের শিক্ষকের কথায় ঘুগনি, চানা মশলা ও মনিহারী দ্রব্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন বই খাতার দোকান। কারণ এলাকাটিতে ক্রমশ বেড়ে চলছিল বিদ্যালয়ের সংখ্যা। বেচাকেনার অবসরে পেতেন প্রচুর সময়। সাদা কাগজের বুকে মিছিলে নামত শব্দের দল।

এভাবেই এসেছিল ‘ঢডো বরগাছ’ কবিতাটি। ছাপা হয়েছিল স্থানীয় পত্রিকায়। অচেনা অখ্যাত এক কবির কল্পনার জালে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন পাঠকরা। বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিল ‘ঢোডো বরগাছ’ কবিতাটি। পাঠকমহলে খোঁজ পড়েছিল কবির। কৃষ্ণবর্ণ, রোগা, লম্বা চুল ও মোটা গোঁফের গ্রাম্য মানুষটিকে দেখে পাঠকরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চাননি, ‘ঢডো বরগাছ’ কবিতাটি এঁরই লেখা।

ধীরে ধীরে কবি হলধরের ডাক পড়তে লাগল এলাকার বিভিন্ন কবি সম্মেলনে। সেখানে তিনি শ্রোতাদের শোনাতে লাগলেন নিজের লেখা কবিতা। ধুতি ও গেঞ্জি পরা মানুষটির লেখা কবিতা শুনে মোহিত হতে লাগলেন কাব্যপ্রেমীরা। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময়। কবি হলধরের কলমে নতুন রূপ নিয়ে উঠে আসছিল পুরাণ। উঠে আসতে শুরু করেছিল প্রান্তিক মানুষদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক। উচ্চবর্গের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। অতীতের নানা গৌরবময় কাহিনি।

কোশলী ভাষাকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কোশলী কবি তাঁর আন্দোলন শুরু করেছিলেন কোশলী ভাষায় লেখা কবিতা দিয়েই। তাঁর লেখা কবিতাগুলির সংকলন ‘কাব্যাঞ্জলী’ আজ তিনটি খণ্ডে প্রকাশিত। পশ্চিম ওড়িশার প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের নিয়ে কবি হলধর লিখেছেন বেশ কিছু বই। সেরকম কিছু বই হল ‘বীর সুরেন্দ্র সাই’, ‘শান্ত কবি ভিম ভয়ী’, ‘রসি কবি গঙ্গাধর’, রসিয়া কবি (তুলসীদাসের জীবনী)। লোকগান নিয়েও বই আছে তাঁর।

এসবের পাশাপাশি কবি হলধর লিখে ফেলেছেন কুড়িটি মহাকাব্য। তাঁর রচনা করা মহাকাব্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত মহাকাব্যটি হল ‘সতী উর্মিলা’। রামায়ণের সব থেকে উপেক্ষিত চরিত্রটি হল উর্মিলার। মিথিলার রাজা জনক ও রানি সুনয়নার সন্তান, রামানুজ লক্ষ্মণের স্ত্রী উর্মিলা। যিনি চিরকাল সতী সীতার ছায়ার আড়ালে থেকে গেছেন। যাঁর অতুলনীয় আত্মত্যাগ কোনও দিন কোনও কবির চোখে ধরা পড়েনি।

শিল্পীর তুলিতে লক্ষ্ণণ ও উর্মিলা

শ্রীরাম যখন লক্ষ্মণ ও সীতাকে নিয়ে বনবাসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। নিজে থেকেই লক্ষ্মণের সঙ্গে বনবাসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন উর্মিলা। উর্মিলাকে বিরত করেছিলেন লক্ষ্ণণ। রাজা দশরথ ও তাঁর স্ত্রীদের সেবা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বুকে পাথর চাপিয়ে লক্ষ্মণের নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন উর্মিলা। বনবাসের প্রথম রাতে, যখন রাম ও সীতা গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। দরজার পাশে অতন্দ্র প্রহরায় ছিলেন লক্ষ্ণণ। তাঁকে দেখা দিয়েছিলেন নিদ্রাদেবী। লক্ষ্ণণ দেবীর কাছে বর প্রার্থনা করেছিলেন। যাতে চোদ্দ বছর তাঁর চোখে ঘুম না আসে। নিদ্রাদেবী লক্ষ্ণণকে বলেছিলেন, কাউকে রাজি করাতে। যিনি লক্ষ্মণের হয়ে এই চোদ্দ বছর ঘুমোবেন।

লক্ষ্ণণ নিদ্রাদেবীকে বলেছিলেন স্ত্রী উর্মিলার কথা। নিদ্রাদেবী গিয়েছিলেন উর্মিলার কাছে। উর্মিলাকে দিয়েছিলেন লক্ষ্মণের প্রস্তাব। বিনা বাক্যব্যয়ে সেই প্রস্তাবেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন উর্মিলা। বনবাসকালে রাম ও সীতাকে পাহারা দেওয়ার জন্য চোদ্দ বছর ঘুমোননি লক্ষ্মণ তাঁর হয়ে টানা চোদ্দ বছর ঘুমিয়ে ছিলেন উর্মিলা। হয়ত লক্ষ্মণকে ছেড়ে থাকার দুঃখ ভোলার জন্য উর্মিলা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলেন লক্ষ্মণের প্রস্তাব। তাঁর এই অসামান্য আত্মত্যাগ কিন্তু ব্রাত্য থেকে গেছিল মহাকাব্য ও বিভিন্ন কবিদের লেখায়।

নিদ্রারত মহাসতী উর্মিলা

ব্রাত্য উর্মিলাই কিন্তু লোককবি হলধরের ‘মহাসতী উর্মিলা’ মহাকাব্যে হয়ে উঠেছিলেন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ‘মহাসতী উর্মিলা’ মহাকাব্যে উর্মিলার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে রামায়ণকে। কবি হলধরের মহাকাব্যের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে, মহাসতী উর্মিলার সীমাহীন বেদনার কথা। উর্মিলার আত্মত্যাগের কথা এভাবে কোনও কবি কোনও দিন তুলে ধরেননি। ব্রাত্য উর্মিলাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছেন কবি হলধর। মহাসতী আখ্যা দিয়ে সীতার সঙ্গে একই আসনে বসিয়েছেন। ‘মহাসতী উর্মিলা’ মহাকাব্যের মাধ্যমে এক নতুন উর্মিলাকে উপস্থাপন করেছেন হলধর। ঠিক যেভাবে মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে এক অচেনা রাবণকে উপস্থাপিত করেছিলেন মধুকবি।

মহাকাব্যের রচয়িতা হিসেবে কালের ইতিহাসে সুগভীর দাগ কাটলেও। হলধর নাগ আজও নিজের পরিচয় দিতে চান কবি হিসেবে। প্রথম দিকে কবিতা রচনা করে, গ্রামে গ্রামে ঘুরে কবিতা শোনাতেন। সহজ সরল ভাষায় লেখা কবিতাগুলি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনত গ্রামবাসীরা। কারণ কবিতাগুলি তাঁদের জীবন নিয়েই লেখা। তাঁরাই কবি হলধর নাগের নাম দিয়েছিলেন ‘লোককবিরত্ন‘।

লোককবি হলধর কবিতা লেখার প্রথম অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন কবি বিনোদ নায়কের লেখা ‘গ্রাম পাঠ’ কবিতাটি থেকে। কীভাবে নিজের ভাবনাকে কবিতার আকার দিতে হয়, তার শিক্ষা নিয়েছিলেন। এছাড়া তাঁর মনে ও লেখায় প্রভাব ফেলেছিল ‘প্রকৃতি কবি’ গঙ্গাধর মেহেরের কবিতা। প্রভাব ফেলেছিল ভীম ভয়ী, রাধানাথ রায়ের কবিতা। লোককবি হলধরের কবিতায় উঠে আসে গ্রাম্যবধূর নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণার কথা। ‘কোকিল’ কবিতার একটি অংশে কবি লিখছেন,

“বছরে একবার আজ যে দশমী
পথে উল্টো রথের ঢল
শ্বশুর ভিটেতে খেটে মরা বধুর
সে খবরটাই সম্বল।।” (অনুবাদ- কবি কৌশিক ভাদুড়ি)

তেমনই ‘টিকরপাড়ার গণিকা’ কবিতাটিতে উঠে এসেছে এক বারবধূর দুঃখের বারমাস্যা। এক গণিকাকে একজন ব্যক্তি উপদেশ দিয়েছিলেন, ঘৃণ্য পেশা ত্যাগ করে সংসারী হওয়ার জন্য। এর উত্তরে সমাজকে নগ্ন করে দিয়ে গণিকা বলেছিলেন, “যদি আমি পণ দেওয়ার মত টাকা জোগাড় করতে পারি, তবেই আমি স্বামী পাব।”

প্রান্তিক মানুষদের কবি হলধর

লোককবি হলধর সমাজকে তীব্র আক্রমণ করেছেন ‘কাহি এ বাহিরচি ঘরু’ কবিতাটির মাধ্যমে। কবিতাটিতে বলা হচ্ছে, গ্রামে মন্ত্রী এসেছেন। গ্রামবাসীরা মন্ত্রীর কাছে যাচ্ছেন নানান অভাব অভিযোগ নিয়ে। গ্রামে ছিলেন একজন দৃষ্টিহীন মানুষ। তিনিও তাঁর অভাবের কথা বলতে গিয়েছিলেন মন্ত্রীকে। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে দৃষ্টিহীন মানুষটি প্রাণ হারিয়েছিলেন, মন্ত্রীরই গাড়ির নীচে চাপা পড়ে।

দুর্ঘটনার পর গ্রামবাসীরা একে অপরকে বলেছিলেন, কেন এ ঘর থেকে বেরিয়েছে(কাহি এ বাহিরচি ঘরু?), তাই তো প্রাণ হারাল। অর্থাৎ সব দোষ গিয়ে পড়েছিল মৃত দৃষ্টিহীন ব্যক্তিটির ওপর। এই ঘটনায় মন্ত্রীর কোনও দোষ খুঁজে পাননি গ্রামবাসীরা। এই কবিতাটির মাধ্যমে লোককবি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আসল দৃষ্টিহীন কারা। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে সমাজের প্রান্তিক ও দুর্বল মানুষদের চিরকাল দোষের হলাহল পান করতে হয়। তাই বুঝি তিনি লিখেছিলেন,

“বিজয় কখনও গরীব মানুষদের জন্য নয়,
জল সর্বদা নীচের দিকে বয়ে চলে।
দোষ সর্বদা যায় বঞ্চিতদের দিকে।”(অনুবাদ- কবি কৌশিক ভাদুড়ি)

ঠিক এরকমই একটি কবিতা হল ‘মন্ত্রী ও ভিক্ষুক’। যে কবিতার মাধ্যমে নীতিহীন রাজনীতির প্রতি লোককবি তাঁর তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। এই কবিতায় বলা হয়েছে, এক মন্ত্রী এক ভিক্ষুককে উপদেশ দিয়েছিলেন ভিক্ষা না করে কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে। এর উত্তরে ভিক্ষুক মন্ত্রীকে উপদেশ দিয়েছিলেন, মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জন আত্মসাৎ না করে সেই অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত। সাধারণ মানুষ যা প্রকাশ্যে বলতে পারে না, কবিতায় তা অক্লেশে বলে দেন হলধর নাগ। ‘পঞ্চ আম্রুতা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, যেভাবে ‘সাত সমুদ্র’ থেকে অমৃত ঝরে, যেভাবে মাতৃস্তন্য থেকে দুগ্ধ ঝরে, ঠিক তেমনই ‘মহৎ নীতির ধারা’ থেকে কবির কলম চলে।

তাই আজ তিনি লোককবি। তাঁর কবিতাই তাঁর রণতুর্য। কবিতা দিয়েই তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কবিতাই তাঁর শ্বাসবায়ু। লোককবি হলধর বলেন, “প্রত্যেকেই কবি। কিন্তু মুষ্টিমেয় কয়েকজনই কেবলমাত্র ভাবনাকে কবিতার আকার দেওয়ার কৌশল জানেন।” আজ দিনে প্রায় তিনটে কবি সম্মেলনে যেতে হয় তাঁকে। হাজার হাজার মানুষ শুনতে আসেন তাঁর কবিতা। বই দেখে কবিতা পাঠ করেন না কবি। কারণ তাঁর আছে ঈর্ষণীয় স্মৃতিশক্তি। তাঁর লেখা সবকটি কবিতা বই না দেখেই শোনাতে পারেন। তাই শ্রোতারা আসনে বসে থাকেন মন্ত্রাবিষ্ট হয়ে।

ঈর্ষণীয় স্মৃতিশক্তির মতই ঈর্ষণীয় লোককবি হলধরকে ঘিরে হয়ে চলা ঘটনাবলী। ২০১৪ সালে ‘লোককবিরত্ন’ হলধর নাগ পেয়েছিলেন ‘ওড়িশা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’। ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ পেয়েছিলেন ‘পদ্মশ্রী’ পুরষ্কার। ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, অতিসাধারণ পোশাক পরা ও নগ্নপদে থাকা মানুষটির হাতে তুলে দিয়েছিলেন পুরস্কার। বারোমাস নগ্নপদেই থাকেন লোককবি, মাটির সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হতে চান না বলে। রাষ্ট্রপতি ভবনের চা চক্রে দেখা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। তিনি লোককবিকে বলেছিলেন, “আপনে তো ওড়িশাকা স্বাভিমান বাড়হা দিয়া”।

পদ্মশ্রী হলধর নাগ

২০১৬ সালে সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছিল সাম্মানিক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি। লোককবির কাব্যগুলি ‘হলধর গ্রন্থাবলী’ নাম দিয়ে প্রকাশিত। যার দ্বিতীয় খণ্ডটি ২০১৭ সালে প্রকাশ করেছে সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘হলধর গ্রন্থাবলী’। তাঁর জীবন ও লেখা নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে বিবিসি এবং ভারতবালা প্রোডাকশন।

বিখ্যাত কবি, চিত্রপরিচালক ও গীতিকার গুলজারের ‘A Poem A Day’ নামের বইটিতে আছে লোককবি হলধরের কবিতা। কবিতা সংকলনটিতে থাকা কবিতাগুলির নির্বাচন ও অনুবাদ করেছেন গুলজার। বইটিতে ৩৪টি ভাষার ২৭৯ জন কবির ৩৬৫টি কবিতা স্থান পেয়েছে। বইটির প্রথম দুটি কবিতাই লোককবি হলধর নাগের লেখা। কবিতা দু’টি হল ‘পঞ্চ আম্রুতা’ ও “চিঠঠি দেউচেন রে হলধর।”

লোককবি হলধর নাগের হাতে গুলজারের সেই বই

এভাবেই লোককবি হলধর নাগ প্রায় বিলুপ্ত হতে থাকা সম্বলপুরী-কোশলী ভাষা ও সাহিত্যের নবজাগরণ ঘটিয়েছেন। আজ পশ্চিম ওড়িশার মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ সম্বলপুরী-কোশলী ভাষায় কথা বলেন। লোককবি হলধর পণ করেছেন কিছুতেই ভাষাকে মরতে দেবেন না। সরকারি ভাষা হিসেবে সম্বলপুরী-কোশলীকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলন আজও অব্যাহত। ভাষার প্রতি তাঁর সুগভীর ভালবাসা কবি তুলে ধরেছেন তাঁর ‘উজ্জ্বল সলিতা’ কবিতায়।

“আঁধারের ঝাড়ে যোগ্য ছেলেটি
দিয়েছে প্রদীপ জ্বালি
জ্বলা সলিতার মতো উজ্জ্বল
পশ্চিম উড়িষ্যার বুলি।” (অনুবাদ: কবি কৌশিক ভাদুড়ি)

লিখন শৈলীর জন্য লোককবি হলধরকে তুলনা করা হয় সম্বলপু্রী ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি গঙ্গাধর মেহেরের সঙ্গে। ওড়িয়া সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য যিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। কিন্তু লোককবি হলধর নিজেই একটি নতুন ধারার লিখন শৈলীর জন্ম দিয়েছেন। যে শৈলী আজ ‘হলধর ধারা’ নামে সুবিদিত। নবীন প্রজন্মের অসংখ্য কবি যে ধারা অনুসরণ করে কাব্য কবিতা রচনা করে চলেছেন।

এত সম্মানের অধিকারী হয়েও লোককবির জীবনযাপন অতিসাধারণ। মাটির পা মাটিতেই রাখেন। প্রতিবছর গ্রামের রথযাত্রার সময় ঘুগনি ও রাগচানা বিক্রি করেন ‘পদ্মশ্রী‘ কবি। চার পাঁচ হাজার টাকা উপার্জন হয়। আজও লোককবি ভরসা রাখেন কষ্টার্জিত উপার্জনের ওপর। হয়ত এই কারণেই তাঁর বইখাতার দোকানটি আজ পাঠককুলের কাছে মা সরস্বতীর মন্দির হয়ে উঠেছে। যে দোকানটিকে সংরক্ষণের আওতায় এনেছে ওড়িশা সরকার।

লোককবি যখন ঘুগনি বিক্রেতা

যে গ্রামে হলধরের ভিটে, সেই ঘেঁস গ্রামে লোককবি হলধর নাগের নামেই গড়ে উঠছে সম্বলপুরী ভাষা ও সাহিত্য গবেষণাকেন্দ্র। লোককবি হলধরকে ঘিরে থাকা পৃথিবী হয়ত বদলে গেছে। কিন্তু বদলাননি একাত্তর বছরের লোককবি হলধর। প্রচারের আলোর উত্তাপকে দূরে রেখে, সহজ সরল ভাষায় আজও লিখে চলেন মানুষের কথা। নিস্তরঙ্গ নদীর মত বয়ে চলেন স্লথগতিতে। নিশ্চিত লক্ষ্যের দিকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More