মহিষাসুর কুলগুরু, তাই দুর্গাপুজোয় শোকপালন করে ঝাড়খণ্ডের ‘অসুর’ উপজাতি

0

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ডেস্ক: প্রতি আশ্বিনে, যখন নীল আকাশে ভাসতে থাকে সাদা মেঘের ভেলা, যখন দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর (Asur killer) পদধ্বনি শোনা যায় বাংলার মাঠে ঘাটে, যখন শারদীয়া দুর্গোৎসবে আবাহনে মেতে ওঠে বাঙালি, ঠিক তখনই বিষাদের মেঘ জমতে শুরু করে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের কয়েকটি জেলার আকাশে। ম্লান হয়ে আসে ঘন অরণ্যের ভেতরে বাস করা মানুষগুলির মুখ।

অস্ট্রো-এশিয়াটিক উপজাতিটির নাম ‘অসুর’ (Asur)

জনগণনা (২০১১) অনুযায়ী প্রাচীন এই উপজাতিটির জনসংখ্যা মাত্র তেত্রিশ হাজার। এঁদের সিংহভাগই বাস করেন ঝাড়খণ্ডে। বাকিরা ছড়িয়েছিটিয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে। ঝাড়খণ্ডের গুমলা, লোহারদাগা, লাতেহার, পালামৌ জেলাগুলির পাহাড় ও অরণ্যের প্রান্তে বা গভীরে থাকা সমতল জমিতে অসুরদের গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলি আয়তাকার। মাটি ও শালবল্লা দিয়ে তৈরি। প্রতিটি বাড়ির সামনে বারান্দা। বাড়িগুলি মাথায় খড় কিংবা মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা খোলার ছাউনি।

প্রতিটি বাড়িতে একটি বা দু’টি জানলাহীন ঘর থাকে। থাকে গোয়াল ও মুরগির খাঁচা। এছাড়াও থাকে পুর্বপুরুষদের পূজা করার ‘থান’। ঘরে আসবাবপত্র বলতে খাটিয়া ও কাঠের চেয়ার। মাটির তাকে রাখা থাকে মাটি, লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র। ঘরের একদিকে রাখা থাকে সাংসারিক জীবন ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। অসুর উপজাতির গ্রামগুলির মানুষেরা আজও কুয়ো ও নদীর জলের ওপর নির্ভরশীল। মাটির উনুনে কাঠ ও শুকনো পাতা জ্বালিয়ে তাঁরা রান্না করেন ভাত, শাকসবজি ও বিভিন্ন পশুপাখির মাংস।অসুর উপজাতিটির পুরুষেরা গ্রামের মধ্যে থাকলে, শুধু ধুতিই পরে থাকেন। গ্রামের বাইরে যাওয়ার দরকার হলে, পরেন তার উপরে গেঞ্জি ও কুর্তা। মাথায় পাগড়ির মতো করে বেঁধে নেন গামছা। কখনও রাখেন কাঁধে। নারীরা শুধু শাড়িই পরেন। গ্রামের বাইরে কোথাও গেলে শাড়ির সঙ্গে পরেন সায়া ও ব্লাউজ। একসময় অসুর নারীরা সারা শরীরে গয়নার মতো উল্কি করাতেন। এখন তাঁরা পাথর, পুঁতি, কাচ, ব্রোঞ্জ ও অন্য সস্তা ধাতুর গয়না পরেন। শরীর খারাপ হলে আজও তাঁরা ভরসা রাখেন পূর্বপুরুষদের দিয়ে যাওয়া উদ্ভিজ্জ ওষুধগুলির ওপর। তাঁদের আছে নিজস্ব আইনকানুন, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি। সেগুলির বিষয়ে তাঁরা ভীষণ স্পর্শকাতর। এই বিষয়গুলিতে কারও অনুপ্রবেশ তাঁরা বরদাস্ত করেন না। যেকোনও গ্রাম্য বিবাদ মিটে যায় গ্রামের প্রবীনদের নিয়ে গড়া পরিষদে।

অসুর উপজাতির মানুষজন ভীষণ পরিশ্রমী। প্রাচীনকালে শিকারই ছিল এঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কালক্রমে উপজাতিটি প্রবেশ করেছিল ভ্রাম্যমান কৃষি ব্যবস্থায়। উপজাতির মানুষেরা ঘুরে ঘুরে চাষ করতেন অরণ্যের কিনারায় থাকা পতিত জমিগুলিতে। মানুষগুলির শ্রম, ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে উর্বর হয়ে উঠেছিল বন্ধ্যা জমিগুলি। পরবর্তীকালে এলাকায় আকরিক লোহার সন্ধান মেলার পর, আকরিক লোহা গলিয়ে উচ্চমানের লোহা নিষ্কাশনের কাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা, নিজেদেরই আবিষ্কৃত পদ্ধতির সাহায্যে। এ বিষয়ে তাঁরা ছিলেন ভারতসেরা। ইতিহাস বলে, প্রাচীন ভারতের অনেক সাম্রাজ্যই অসুর উপজাতির কাছ থেকে উচ্চমানের লোহা কিনে, তা দিয়ে অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি বানিয়ে, সব দিক থেকে উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছেছিল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এলাকায় লোহার কারখানা স্থাপন করেছিল টাটা কোম্পানি। অত্যাধুনিক ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে সমৃদ্ধ কোম্পানিটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়েছিল অসুরেরা। একে একে নিভতে শুরু করেছিল অসুর গ্রামের লোহা নিষ্কাশন চুল্লিগুলি। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে অসুর উপজাতির মানুষেরা ফিরে গিয়েছিলেন কৃষিকাজে। কিন্তু সেখানেও ঘনিয়ে এসেছিল বিপদের মেঘ। একের পর এক বক্সাইট খনি গড়ে উঠেছিল এলাকায়। বন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল প্রচুর কৃষিজমি। বাঁচার তাগিদে অসুর উপজাতির মানুষেরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলিতে, শ্রমিকের কাজ নিয়ে।

ন্যূনতম স্বীকৃতি পাননি সুলেখিকা নটী বিনোদিনী, চার দশক সাহিত্য সাধনা করেও

তবে আজও গুমলা জেলার কিছু গ্রামে লোহা নিষ্কাশনের কাজ করেন অসুর উপজাতির মানুষেরা। গ্রামগুলিতে গেলে দেখা যাবে বড় বড় চুল্লি। সেই চুল্লিগুলিতে লোহা গলানোর কাজ করতে করতে গান গাইছেন উপজাতিটির নারীরা। চুল্লিগুলি তাঁদের কাছে গর্ভবতী নারী। গানের মাধ্যমে তাঁরা চুল্লিগুলিকে আবেদন করেন স্বাস্থ্যবান সন্তান বা উচ্চমানের লোহা দেওয়ার জন্য। চুল্লিগুলি তাঁদের কাছে পূর্বপুরুষের মতোই পবিত্র। তাই তাঁরা শপথ নিয়েছেন, অবশিষ্ট চুল্লিগুলির আগুন নিভতে দেবেন না।

কুলগুরু হুদুড় দুর্গা

বর্তমানে অসুর জনজাতি তিনটি প্রধান গোষ্ঠীতে বিভক্ত। সেগুলি হল বীর অসুর, বীরজিয়া অসুর, ও আগারিয়া অসুর। সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী অসুর উপজাতির মানুষেরা প্রকৃতি পুজোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পূর্বপুরুষদেরও আরাধনা করেন। তাঁদের লৌকিক দেবদেবীরা হলেন তুরি হুসিদ, পাতদারাহা, দুয়ারী ও ধরতী মাতা। তবে প্রধান দেবতা হলেন সিংবোঙ্গা বা সূর্য। সারা বছর ধরে অসুর উপজাতির মানুষেরা পালন করেন নানান পরব। সেগুলির মধ্যে আছে খালিথানি পূজা, গোরাইয়া পূজা, খারোচ পূজা, দেওথান পূজা, ফাগু, পিতর পুজা, সরহুল, করম, ধানবুনি, কাদেলতা, রাজকরম সহ আরও অনেক উৎসব। উৎসবগুলিতে দেবতাদের প্রতি উৎসর্গ করা হয় হাঁস, মুরগি, ছাগল ও ডিম। উৎসবগুলিতে পৌরোহিত্য করেন যে মানুষটি, তাঁকে বলা হয় বাইগা। অসুর সমাজে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করা হয় এই মানুষটিকে।

পার্শ্ববর্তী রাজ্য বাংলা যখন মেতে ওঠে শারদীয় দুর্গোৎসবে, তখন এই অসুর উপজাতির মানুষেরা শোকপালন করেন। কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন মহিষাসুর তাঁদের পূর্বপুরুষ ও কূলগুরু। তিনি ছিলেন ভারতের সমস্ত আদিবাসীদের সম্রাট ও রক্ষক। তাই দুর্গাপুজো অসুর উপজাতির মানুষদের কাছে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে না, বরং এই সময় শোকের সাগরে ডুবে যায় অসুর উপজাতির গ্রামগুলি। অসুর উপজাতির মানুষেরা মহিষাসুরকে বলেন হুদুড় দুর্গা। হুদুড় শব্দটির অর্থ বজ্র-বিদ্যুৎ এবং দুর্গা শব্দটির অর্থ এখানে দুর্গের রক্ষক। বজ্রের মতো মহাপরাক্রমী মহিষাসুর, তাঁর শৌর্য ও বীর্য দিয়ে রক্ষা করতেন আদিবাসী সমাজ ও অরণ্য পাহাড় ঘেরা দুর্গসদৃশ সাম্রাজ্যকে।

পুরাণমতে দেবী দুর্গা ন’দিন ধরে যুদ্ধ করে অশুভশক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। কিন্তু অসুর উপজাতির মানুষদের লোকগাথা শোনায় সম্পুর্ণ ভিন্ন একটি কাহিনি। যেখানে সত্যের জয় হয়নি, জয় হয়েছিল এক অশুভ ষড়যন্ত্রের। রম্ভাসুর ও মহিষরূপী রাজকন্যা শ্যামলার পুত্র মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গাকে যুদ্ধে পরাজিত না করতে পেরে আর্যরা এক ঘৃণ্য কৌশল অবলম্বন করেছিল। তারা সম্রাট মহিষাসুরের কাছে পাঠিয়েছিল এক পরমাসুন্দরী নারীকে। যিনি ছিলেন গুপ্তঘাতক।

সম্রাট মহিষাসুর নবাগতা আর্য নারীর রূপে ও গুণে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিবাহ করেছিলেন নারীটিকে। মধুচন্দ্রিমার নবম দিনে নিরস্ত্র মহিষাসুরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন সেই নারী। আজও সেই দুঃখ ভুলতে পারেননি অসুর উপজাতির মানুষেরা। কারণ তাঁদের কাছে মহিষাসুর কোনও অশুভশক্তির প্রতীক নন, তিনি অসুর উপজাতির আত্মার আত্মীয়। তিনি বীরত্ব ও আত্মত্যাগের শ্রেষ্ঠ প্রতীক, যাঁকে ছলনার সাহায্য নিয়ে হত্যা করেছিল আর্যরা।

দুর্গাপুজোয় অসুর উপজাতির ঘরে ঘরে চলে শোকপালন

এই মাসটি অসুর উপজাতির মানুষদের কাছে দুঃখের মাস। নবরাত্রির ন’দিন তাঁরা বাড়ির বাইরে বের হন না। জানলাহীন বাড়িগুলির দরজাও বন্ধ থাকে। কোনও কোনও গোষ্ঠীর মানুষেরা অরন্ধন পালন করেন এই দিনগুলিতে। শুকনো খাবার খেয়ে কাটান। নারীরা তাঁদের প্রিয় অলঙ্কারগুলিতে হাত দেন না। প্রিয়জন প্রয়াত হলে যেভাবে অশৌচ পালন করা হয়, একই রীতিতে অশৌচ পালন করেন অসুর উপজাতির কোনও কোনও গোষ্ঠীর মানুষেরা। বুকে, নাকে ও নাভিতে লাগান করঞ্জার তেল, কারণ মৃত্যুর পূর্বে এই স্থানগুলি থেকেই রক্তপাত হয়েছিল মহিষাসুরের।

নবমীর চাঁদনি রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন অসুর উপজাতির মানুষেরা। গ্রামের উন্মুক্ত স্থানে সমবেত হন। অশ্রুসজল চোখে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন কূলগুরু মহিষাসুরের বিদেহী আত্মার প্রতি। একই সঙ্গে পূর্বপুরুষদের কাছে প্রার্থনা করেন গ্রাম ও গ্রামবাসীদের সুরক্ষিত রাখার জন্য।

শুধু অসুর উপজাতি নয়, সাঁওতাল, মুণ্ডা, এমনকি মধ্যপ্রদেশের ‘কোরকু’ উপজাতির মানুষদের কাছেও  আপনজন ও আরাধ্য দেবতা হলেন মহিষাসুর। তিনি আদিবাসীদের সংগ্রামের প্রতীক। তাই দেবী দুর্গার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা মহিষাসুরকে দেখে তাঁরা দুঃখ পান। তাঁদের মনে হয়, ইচ্ছাকৃতভাবে পরমপ্রিয় মানুষটির অবমাননা করা হয়েছে। তাই তাঁরা পারতপক্ষে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রবেশ করেন না।

এই জনগোষ্ঠীগুলির মানুষেরা মনে করেন, দেবী দুর্গার মূর্তি কল্পনাতেও বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন সম্রাট মহিষাসুর। মূর্তিতে দেবী দুর্গার গায়ের রঙ সবসময়েই ফর্সা এবং মহিষাসুরের গায়ের রঙ বাধ্যতামূলকভাবে কালো। দেবী দুর্গার শারীরিক গঠন আর্যদের মতো, তাঁকে পরমাসুন্দরী হিসেবে গড়া হয়। অপরদিকে মহাপরাক্রমী, প্রজাবৎসল আদিবাসী সম্রাট মহিষাসুরের শারীরিক গঠন যথাসম্ভব ভয়াবহ করে তোলা হয় তাঁকে অত্যাচারী প্রমাণ করার জন্য। কারণ তিনি অনার্য ও ভারতের মূলনিবাসী।

এই জনগোষ্ঠীগুলির মানুষেরা এর জন্য দায়ী করেন বহিরাগত হানাদার আর্যদের, যাঁরা সম্মুখসমরে না পেরে ছলের সাহায্যে হত্যা করেছিল তাঁদের সম্রাট হুদুড় দুর্গাকে। এতেও ক্ষান্ত হয়নি, শাস্ত্রের মাধ্যমে সম্রাট মহিষাসুরকে হীনমতি ও অত্যাচারী মানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে গিয়েছে। তবে এই জনজাতিগুলি বিশ্বাস করে, যতদিন পৃথিবীর বুকে তাদের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন অরণ্যপুত্রদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন সিংবোঙ্গার আলোকে আলোকিত মহিষাসুর। তাঁকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা কোনওদিনই সম্ভব নয়। বজ্রকে কখনও প্রকৃতি থেকে আলাদা করা যায় নাকি!

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.