কার্শিয়াংয়ের ‘ডাওহিল’, ঘন অরণ্য লুকিয়ে রেখেছে অজস্র গা ছমছমে কাহিনি

Dow Hill of Kurseong, the most haunted hill station in India

0

Dow Hill of Kurseong

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পাহাড়ের রানি যদি হয় দার্জিলিং, তাহলে রাজকন্যা অবশ্যই কার্শিয়াং। সেখানে বাস করে লেপচা উপজাতি। আবহমান কাল ধরেই এলাকাটির পাহাড়ে পাহাড়ে ফোটে শ্বেতশুভ্র অর্কিড। তাই লেপচা উপজাতি স্থানটিকে তাদের ভাষায় বলতো ‘খর্সাং’ (land of white orchid) যা ব্রিটিশ উচ্চারণে হয়ে গিয়েছিল কার্শিয়াং। দার্জিলিংয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নয় কার্শিয়াং, দার্জিলিং আসা যাওয়ার পথে পর্যটকেরা বুড়ি ছোঁয়ার মতো ছুঁয়ে যান কার্শিয়াংকে।

Dowhill, Kurseong
কার্শিয়াং

অথচ শহরের কোলাহল থেকে সামান্য দূরে চলে গেলেই মনে হবে কার্শিয়াংয়ের মতো রমণীয় স্থান বুঝি পৃথিবীতে নেই। নীলাভ সবুজ পাহাড়ের সারি, পাহাড়ি ঢালে বিছিয়ে দেওয়া কার্পেটের মতো চায়ের বাগান, মেঘের আড়াল থেকে উঁকিমারা কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য্য আপনাকে বাকরুদ্ধ করে দেবে।

ডাকছে ডাওহিল

কার্শিয়াং থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার ওপরে আছে একটি রহস্যময় পাহাড় ‘ডাওহিল’, নিজের শিঁরদাঁড়ায় ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যেখানে ছুটে আসেন দেশ বিদেশের রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের দল। কার্শিয়াংয়ের হোটেল থেকে রওনা হওয়ার সময় হোটেলের ম্যানেজার, এদিকে ওদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলবেন, “সাবধানে যাবেন স্যার, আর হ্যাঁ, একা ভুলেও জঙ্গলে ঢুকবেন না। রাস্তা ছেড়ে এদিক ওদিক যাবেন না। গড ব্লেস ইউ।” মুহূর্তের মধ্যে আপনার শরীরে জাগবে শিহরণ।

আপনাকে নিয়ে গাড়ি ছুটে চলবে কার্শিয়াংয়ের ভিড়ে ঠাসা হিলকার্ট রোড দিয়ে। নির্বিষ সাপের মতোই গাড়ির পাশে পাশে চলবে ট্রয়ট্রেনের মরচে পড়া লাইন। কার্শিয়াং স্টেশনের কাছে আসা মাত্রই, হিলকার্ট রোড ছেড়ে একটা রাস্তা ডানদিকে উঠতে শুরু করবে আপনার গাড়িটিকে নিয়ে। আপনি দার্জিলিং যাচ্ছেন না জেনে, বিষণ্ণ নয়নে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে হিলকার্ট রোড। মিলিয়ে যাবে বাঁকের আড়ালে। খাড়া পথে যেতে অনিচ্ছুক গাড়ি ক্রুদ্ধ গর্জন করতে করতে ছুটে চলবে কার্শিয়াংয়ের সবথেকে উঁচু পাহাড় ডাওহিলের দিকে।

ডাওহিল রোড

“স্যার, রিস্ক মত লেনা”

ক্রমশ আপনার গাড়িটিকে ঘিরে ধরতে থাকবে নীলাভ সাদা কুয়াশা। মাঙ্কি ক্যাপের থুতনির অংশ নাক অবধি টেনে দেবেন ড্রাইভার। বৃদ্ধ ধুপি গাছের গায়ে জমা শ্যাওলার গন্ধ এনে দেবে হিমেল বাতাস। পাইন, কনিফার, শাল, ওয়ালনাট, পিপুল, লালিগুরাস (রডোডেনড্রন), লিচেন, ফার্ন ও হাজার চেনা অচেনা গাছের ফাঁক দিয়ে আপনার সঙ্গে লুকোচুরি খেলবে আদুরে কার্শিয়াং ও রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘা। পাহাড়টিকে পাইথনের মতো পেঁচিয়ে ধরা রাস্তা ধরে, পাঁচ কিলোমিটার ওঠার পর এগিয়ে আসবে ক্ষুদ্র এক জনপদ, ডাওহিল ভিলেজ। গাড়ি থেমে যাবে সেখানে।

পাহাড়টির নাম ডাওহিল হল কেন জানতে চাইলে, ড্রাইভার সাহেব বলবেন, এক ধরণের ঘুঘুপাখি এই পাহাড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বাস করে, পাখিগুলিকে স্থানীয় মানুষেরা বলেন ডাও, সেইজন্যেই পাহাড়টির নাম ডাওহিল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জনপদটির আশেপাশে আছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি দুটি স্কুল। আছে ইকো পার্ক, জলাধার, ডিয়ার পার্ক, ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট স্কুল ও ফরেস্ট স্কুল মিউজিয়াম। ডাওহিল থেকেই এগিয়ে গিয়েছে বাগোরা ও চিমনি যাওয়ার মিলিটারি রুট। ট্রেক করে যাওয়া যায় বড়া শিবখোলা ফরেস্টেও।

ডাওহিলের কুয়াশা মাখা ঝিম ধরানো পথ

এরপর কিছুক্ষণ আপনাকে একা ছেড়ে দেবেন ড্রাইভার। গল্প করবেন অন্য গাড়ির ড্রাইভারদের সঙ্গে। তার আগে গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে সিগারেট টানতে থাকা ড্রাইভার শোনাবেন সতর্কবাণী, “স্যার, রিস্ক মত লেনা।” আপনি হাঁটতে থাকবেন কুয়াশার সমুদ্রে ডুবে থাকা ডাওহিলের রাস্তায়। গাছের পাতা থেকে শরীরে ঝরে পড়বে হিরের দানার মতো শিশির। গা ঘেঁষে থাকা ঘন অরণ্যের ভেতর থেকে ভেসে আসবে নানান শব্দ। হঠাৎই এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করতে থাকবে আপনাকে। আপনার মনে হবে এত ভয়াবহ অথচ এত সুন্দর জায়গাতে আপনি এর আগে আসেননি কখনও।

দিনের বেলাতেই রাতের অন্ধকার

এভাবেই কেটে যাবে একঘন্টা। এরপর হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে আসবে কারও পায়ের শব্দ। জ্যাকেটের পকেটে দুই হাত রেখে মুখ দিয়ে বাষ্প ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে আসবেন ড্রাইভার। আগামী কয়েক ঘন্টায় মায়াবী ডাওহিলকে যিনি করে তুলবেন আতঙ্কের উপত্যকা। তবে প্রথমেই ড্রাইভার সাহেব বলবেন, আমি কিন্তু ভূতে বিশ্বাস করি না, তবে যেটুকু লোকের মুখে শুনেছি সেটা শোনাতে পারি আপনাকে। আপনিও ভূতে বিশ্বাস করেন না। তবে ডাওহিলের গা ছমছমে পরিবেশে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো গল্প শোনার সুযোগ ছাড়তে মন চাইবে না আপনার। তাই রাজি হয়ে যাবেন ড্রাইভারের প্রস্তাবে।

‘ডেথ রোড’

ড্রাইভার সাহেব আপনাকে নিয়ে যাবেন ডাওহিল রোড থেকে ফরেস্ট অফিস যাওয়ার রাস্তাটার কাছে। বড় বড় গাছে ঘেরা, কুয়াশা ঢাকা আলো-আঁধারি রাস্তাটার নাম ‘ডেথ রোড’। এই ডেথ রোড নাকি অনেক ভৌতিক ঘটনা ও অপমৃত্যুর সাক্ষী। বহু বছর আগে এই রাস্তাতেই স্থানীয় কাঠুরেরা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল এক মুণ্ডহীন বালককে। কাঠুরেদের চোখের সামনে, বালকটি এক ছুটে হারিয়ে গিয়েছিল ঘন অরণ্যের জমাট অন্ধকারে। আতঙ্কিত কাঠুরেরা জঙ্গলে না গিয়ে ধরেছিলেন বাড়ি ফেরার পথ। কিন্তু সে পথ বন্ধ করে দিয়েছিল পাইন গাছগুলির নেমে আসা ডাল।

কাল্পনিক ছবি

অনেক কষ্টে ডালগুলি সরানোর পর, কাঠুরেরা পেয়েছিলেন কারও পদধ্বনি। তাঁরা দেখেছিলেন, তাঁদের দিকে ছুটে আসছে সেই স্কন্ধকাটা বালক। প্রাণ বাঁচানোর জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় শুরু করেছিলেন কাঠুরেরা। জঙ্গলের বাইরে এসে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। স্কন্ধকাটা বালকটির কথা বিশ্বাস করেনি স্থানীয় মানুষ। কিন্তু এই ঘটনাটির পর এই ডেথ রোডে অনেকবার নাকি দেখা গেছে স্কন্ধকাটা বালকটিকে। তাই দুর্বলচিত্ত পর্যটকেদের রাস্তাটি এড়িয়ে চলতে বলেন হোটেলের লোকেরাও। বিকেলের পর এই রাস্তায় লোক চলাচল প্রায় বন্ধই হয়ে যায়।

ওই লাল চোখ দু’টি কার!

ডাওহিলকে আঁকড়ে আছে হাজার হাজার বৃদ্ধ পাইন গাছ। আকাশ ছুঁয়েছে যাদের মাথা। সেগুলির ফাঁকে ফাঁকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে অগণিত কনিফার গাছ। দিনের বেলাতেই দেখা মিলবে লক্ষ লক্ষ জোনাকির। জায়গায় জায়গায় অরণ্য এমনই ঘন, দিনের বেলাতেও ঢুকতে সাহস করেন না স্থানীয় কাঠুরেরা। এছাড়া আছে চিতাবাঘ ও ভাল্লুকের ভয়। মাঝে মাঝেই নাকি তারা হানা দেয় ডাওহিলে। কিন্তু হিংস্র এই পশুগুলির থেকেও বেশি আতঙ্ক জাগায় একজোড়া লাল চোখ।

কাল্পনিক ছবি

সে চোখ কার কেউ জানে না। অরণ্যের জমাট অন্ধকার থেকে লাল চোখ দুটির মালিক নাকি চেয়ে থাকে তার রাজত্বে অনুপ্রবেশকারীর দিকে। এক মৃত্যুশীতল লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। অনুপ্রবেশকারীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি চলে লাল চোখ দুটি। যতক্ষণ না আতঙ্কিত অনুপ্রবেশকারী তার এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

রহস্যময়ী নারী

জাপানের আকিগোহারা অরণ্যের মতোই ডাওহিল অরণ্যের বাতাসে নাকি আছে মৃত্যুর গন্ধ। তাই এখানে এসে নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেন বহু মানুষ। যার জন্য দায়ী এক রহস্যময়ী নারী। ডাওহিলের অরণ্য ও পাকদণ্ডি পথগুলিতে দেখা মেলে ছাই রঙের পোশাক পরা এক নারীর। তার বয়স আজ অবধি বোঝা যায় নি। সেই নারী একা একা ঘুরে বেড়ায় গাছেদের ফাঁকে ফাঁকে। তার চলাফেরা এত দ্রুত, দেখলে মনে হবে সে বুঝি শূন্যে উড়ে চলেছে।

কাল্পনিক ছবি

যে নারীকে দেখে, দলছুট হয়ে যায় এবং সম্মোহিতের মতো নারীটির পিছু নিতে শুরু করে। পিছু নেওয়া মানুষটিকে নারীটি নিয়ে যায় কোনও গভীর খাদের সামনে এবং চোখের পলক ফেলার আগেই ঝাঁপ দেয় খাদের ভেতর। ঘটনার আকস্মিকতায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পিছু নেওয়া মানুষটি। নারীটির মতো সেও ঝাঁপ দেয় খাদে। মানুষটিকে উদ্ধার করা হয় মৃত, আহত বা অচৈতন্য অবস্থায়।

স্কুলের ভেতর ও কীসের আওয়াজ!

১৮৭৯ সাল। বাংলার গভর্নর তখন ছিলেন স্যার অ্যাশলে ইডেন। ইংরেজ কর্মচারীদের ছেলেমেয়ের জন্য পাহাড়ে একটি স্কুল স্থাপন করতে চাইছিলেন তিনি। ১৮৭৯ সালেই যাত্রা শুরু করেছিল ডাওহিল স্কুল। প্রথমে ব্যাচে ছিল ষোলজন ইংরেজ ছেলে মেয়ে। ছেলেদের জন্য একটি পৃথক স্কুল তৈরি করা হয়েছিল কিছুদিন পরে। নাম দেওয়া হয়েছিল ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুল। ইংরেজ ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্মিত স্কুলদু’টিতে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের পড়ার অধিকার ছিল না। তবে ১৯২৬ সালে ভারতীয়দের জন্য খুলে গিয়েছিল গার্লস স্কুলটির দরজা, ভর্তি হয়েছিল এক বাঙালি ছাত্রী।

ডাওহিল স্কুল

ডাওহিলের এই শতাব্দী প্রাচীন স্কুলদুটিও এড়াতে পারেনি ডাওহিলের তথাকথিত ভৌতিক ঘটনাগুলির প্রভাব। কার্শিয়াংয়ের অলিতে গলিতে কান পাতলে শোনা যায় স্কুলদু’টি নিয়ে গড়ে ওঠা নানান ভূতুড়ে কাহিনি। প্রতি শীতে, ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বন্ধ থাকে স্কুলদুটি। জনশূন্য স্কুলে শুরু হয় অতৃপ্ত প্রেতাত্মাদের আনাগোনা। রাতে স্কুলদু’টির ভেতর থেকে ভেসে আসে রক্তজল করে দেওয়া নানান আওয়াজ। স্কুলদু’টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডেথ রোডের সেই স্কন্ধকাটা বালকের কাহিনিও। যে কাহিনির নাট্যরূপ ইউটিউবে দেখিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ তুলছে শত শত শিউরে দেওয়া ভিডিও।

আরও পড়ুন: কাশ্মীর উপত্যকার রহস্যময় গুহা ‘কালারুশ’, সুড়ঙ্গ পথে যাওয়া যেত রাশিয়ায়!

বহু বছর আগে, ভিক্টোরিয়া স্কুলের এক ছাত্র সন্ধ্যার সময় স্কুলে গিয়েছিল বই জমা দিতে। কিন্তু তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল স্কুলের লাইব্রেরি। করিডোর দিয়ে একাই ফিরে আসছিল বালকটি। পিছন থেকে ভেসে এসেছিল কারও পায়ের আওয়াজ। বালকটি পিছন ফিরতেই থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছিল কেউ। বন্ধুরা তাকে ভয় দেখাতে এসেছে ভেবে ব্যাগ নিয়ে তেড়ে গিয়েছিল বালকটি। বইয়ের ব্যাগ দিয়ে আঘাত করেছিল থামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বালকটির দেহে। অন্ধকার থেকে আলোয় এসেছিল থামের আড়ালে থাকা এক মুণ্ডহীন বালক। আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে দরজার বাইরে এসে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল ছাত্রটি।

ডাওহিলের ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুল

সব মিথ্যা

কেবলমাত্র ওপরের কাহিনিগুলিই নয়, ডাওহিল চার্চ ও চিমনি ভিউ-পয়েন্ট নিয়েও শোনা যায় নানান ভৌতিক কাহিনি। এই সব কাহিনি এক জোট হয়ে ডাওহিলকে পরিণত করেছে ভূতেদের স্বর্গে। ডাওহিলকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুতুড়ে করে তোলার জন্য ক্ষুব্ধ স্থানীয় গ্রামবাসীরা, ক্ষুব্ধ স্কুল কতৃপক্ষও। তাঁরা বলেন ডাওহিলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আলোচনার বিষয়বস্তু হয় না, পর্যটকেরা ডাওহিলে আসেন ভূত দেখার জন্য। মিথ্যা রটনাকে সত্য ঘটনার রূপ দিয়ে রূপসী ডাওহিলকে কুখ্যাত করে তোলা হয়েছে। গল্পগুলি ক্রমাগত হাওয়া দিয়ে চলেছে কুসংস্কারের পালে। বহু বছর ডাওহিলে কাটানো সত্ত্বেও তাঁদের একজনও কোনওদিন কোনও ভয়াবহ মুহূর্তের সাক্ষী হননি। তাঁদের কাছে ডাওহিল স্বপ্নের থেকেও সুন্দর এক জায়গা। যেখানে শিশিরের সঙ্গে ঝরে পড়ে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি।

ডাওহিলের তথাকথিত হানাবাড়িগুলির একটি

ভূতের সন্ধানে ডাওহিলে বহুবার গিয়েছেন দেশ বিদেশের যুক্তিবাদীরা। দিনের পর দিন ডাওহিলে কাটিয়েও দেখতে পাননি স্কন্ধকাটা বালক, লাল চোখ কিংবা সেই ভূতুড়ে নারীকে। যুক্তিবাদীরা বলেছেন, ডাওহিলের কুয়াশা ঘেরা নির্জন পরিবেশ সত্যিই গা ছমছমে। আলো-আঁধারি অরণ্যপথে হাঁটার সময় নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে একলা মানুষ মনে হতে পারে। ডাওহিলের ঝিম ধরানো পরিবেশ আরও বিষাদগ্রস্ত করে তুলতে পারে আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে। সেই কারণেই হয়ত ঘটে গিয়েছে বিচ্ছিন্ন কিছু দুঃখজনক ঘটনা। সেগুলিকেই ভূতেদের কারসাজি বলে চালিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ। কার্শিয়াংয়ের গায়ের কাছে থাকা দার্জিলিং সব পর্যটক টেনে নেয়, তাই হয়তো এটা পর্যটক টানার এক কৌশল।

যুক্তিবাদীরা বলেছিলেন, ডাওহিল স্কুলদু’টির বহু ইমারতের বয়স একশো বছরেরও বেশি। পরিত্যক্ত ইমারতগুলিকে সংস্কার না করার ফলে, সেগুলি সিনেমায় দেখানো হানাবাড়ির রূপ নিয়েছে। ইমারতগুলিতে বাস করে পেঁচা, বাদুড় ও অন্যান্য ছোটখাটো বন্য প্রাণী। জরাজীর্ণ ইমারতগুলির ভেতর দিয়ে পাহাড়ি ঝোড়ো হাওয়া বইবার সময় বিভিন্ন শব্দ সৃষ্টি হয়। ডাওহিলের নির্জন পরিবেশে সেই শব্দগুলিকে ভৌতিক লাগে, ভূতের প্রেমে আচ্ছন্ন থাকা মানুষদের।

ডাওহিল চার্চ

ডাওহিলে আসার পর, ড্রাইভারের জন্য প্রথমদিকে কিছুটা ভয় লাগলেও সময় যত গড়াবে, আপনাকে সম্মোহিত করবে ডাওহিলের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। দূরে সরে যাবে ভূতের ভয়, ডাওহিলের প্রেমে পড়ে যাবেন আপনি। মনে হবে এতবার দার্জিলিংয়ে এসেও, মাত্র বত্রিশ কিলোমিটার দূরে থাকা স্বপ্নসুন্দরী ডাওহিলে কেন আসিনি।

দিন শেষে ডাওহিলের সর্পিল ভিজে পথ ধরে ফিরতে থাকবে আপনার গাড়ি। আপনার ওপর ভূতের গল্পের প্রভাব পড়েনি দেখে, স্টিয়ারিংয়ে মন দেবেন গুম মেরে যাওয়া ড্রাইভার সাহেব। পিছনের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে মন ক্যামেরায় মায়াবী ডাওহিলের শেষ ছবি ধরে রাখায় ব্যস্ত থাকবেন আপনি। সামনের উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকবে, নক্ষত্রখচিত আকাশের মতো সন্ধ্যার আলো ঝলমলে কার্শিয়াং।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.