গোদাবরী অরণ্যের সন্ন্যাসীরাজা, গেরিলা যুদ্ধে কাঁপন ধরিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বুকে

বাংলার বিপ্লবীদের দুঃসাহসী লড়াই ছিল যাঁর অনুপ্রেরণা।

Alluri Sitarama Raju

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির পূর্ব গোদাবরী এলাকার অরণ্যের গভীরে, শত শত বছর ধরে চাষ করত কোন্ডাডোরা ও কোয়া আদিবাসীরা। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশেরা ‘মাদ্রাজ ফরেস্ট অ্যাক্ট’- এর মাধ্যমে অন্যায়ভাবে আদিবাসীদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিল অরণ্যের অধিকার। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যের দামী কাঠ বিদেশে পাচার করা। কিন্তু আদিবাসীদের হাত থেকে অরণ্য কেড়ে নেওয়া, মাছকে জল থেকে তুলে নেওয়ার সমান। দিশাহারা আদিবাসীরা খিদের জ্বালায় রাস্তা তৈরির শ্রমিক হিসেবে উপার্জনের চেষ্টা করেছিল। সেখানেও ছিল সীমাহীন আর্থিক ও যৌন শোষণ। ব্রিটিশ সেনা ও অফিসারদের ভোগের বস্তু হয়ে উঠেছিল আদিবাসী নারীরা। ধিকি ধিকি জ্বলতে শুরু করেছিল বিদ্রোহের আগুন। কিন্তু দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল না। কেটে যাচ্ছিল দশকের পর দশক।

পূর্ব গোদাবরী এলাকার একাংশ

হঠাৎই চিন্তাপল্লির অরণ্যে আবির্ভাব হয়েছিল এক সন্ন্যাসীর

সুঠাম চেহারা, মাথায় লম্বা চুল, মুখে দাড়ি, কপালে চাঁদ আঁকা। নবীন সন্ন্যাসীর হাতে তরবারি, পিঠে তির ধনুক। দেখতে অবিকল শ্রীবিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের মত। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের সংঘবদ্ধ করার কাজ শুরু করেছিলেন সন্ন্যাসী। কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁর মনে জমেছিল ব্রিটিশদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। যার বীজ পুঁতে দিয়েছিলেন বাবা ভেঙ্কট রামা রাজু। পাঁচ বছর বয়সে ঘোড়ায় চড়া এক ব্রিটিশকে দেখে স্যালুট করায় সাহেবের সামনেই বাবা তাঁকে চড় মেরেছিলেন। বলেছিলেন, “ওরা চড় পাওয়ার যোগ্য। স্যালুট পাওয়ার নয়।” এরপর বলেছিলেন কিছু মর্মান্তিক কাহিনি। চোখের জল মুছে নিয়েছিল বালক। দু’চোখে জ্বলে উঠেছিল ঘৃণার আগুন।

শিল্পির আঁকা ছবিতে সন্ন্যাসী

নবাগত সন্ন্যাসী আদিবাসীদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে শেখাতে শুরু করেছিলেন পশুপালন ও সংকরায়নের আধুনিক পদ্ধতি। ভেষজ চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তুলতে শুরু করেছিলেন ম্যালেরিয়া ও ‘ব্ল্যাক ওয়াটার’ জ্বরে ভোগা আদিবাসীদের। এসব চলত দিনের আলোয়। রাতের আঁধারে পাহাড়ের গোপন অন্তঃপুরে মার্শাল আর্ট ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন সন্ন্যাসী। কিছুদিনের মধ্যেই রামপা এলাকার ৩০-৪০ টি আদিবাসী গ্রামের অবিসংবাদী নেতা হয়ে গিয়েছিলেন, অরণ্যপথে উল্কাগতিতে ঘোড়া ছোটানো এই সন্ন্যাসী। নাম হয়ে গিয়েছিল সন্ন্যাসী রাজু (রাজা)।

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন। গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন সন্ন্যাসী। গ্রামে গ্রামে ঘুরে খাদি পরার কথা বলতেন। মদ ছাড়ার ও ব্রিটিশ আইন না মানার অনুরোধ করতেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। গান্ধীর অন্ধভক্ত নবীন সন্ন্যাসী ত্যাগ করেছিলেন অহিংসার নীতি। সন্ন্যাসীর ওপর গোপনে নজর রাখতে শুরু করেছিল ব্রিটিশরা। গোয়েন্দাদের চক্রব্যূহ ভেদ করে হঠাৎই উধাও হয়ে গেছিলেন সন্ন্যাসী।

সন্ন্যাসীরাজার পরিচয় জানতে হন্যে হয়ে ঘুরেছিল গোয়েন্দারা

বহু চেষ্টার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জানতে পেরেছিল, নবীন সন্ন্যাসীর নাম আল্লুরি সীতারাম রাজু। ১৯১৬ সালে আঠেরো বছরের সীতারাম সন্ন্যাস নেওয়ার জন্য চলে গিয়েছিলেন বারাণসীতে। সেখানেই শিখেছিলেন সংস্কৃত, আয়ুর্বেদ, পশুপালন ও পশুদের সংকরায়নের আধুনিক পদ্ধতি। বারাণসীতেই যুবক সীতারামের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির। ১৯১৬ সালে জাতীয় কংগ্রেসের লক্ষ্ণৌ অধিবেশনেও যোগ দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রবল অনুরাগী সীতারাম।

সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির মুখে সীতারাম শুনেছিলেন, বাংলার বিপ্লবীদের সামনে কীভাবে নতজানু হয়ে পড়েছে ব্রিটিশ সিংহ। পূর্ব গোদাবরী এলাকা থেকে ব্রিটিশদের হঠানোর শপথ নিয়েছিলেন সীতারাম। বারাণসী ছেড়েছিলেন ১৯১৮ সালে। সারা ভারত ঘুরে নিপুণভাবে রপ্ত করে নিয়েছিলেন বিভিন্ন ঘরানার ভারতীয় মার্শাল আর্ট ও গেরিলা যুদ্ধের কৌশল। তারপর ফিরে এসেছিলেন পূর্ব গোদাবরী এলাকায়।

সন্ন্যাস নেওয়ার আগের ছবি

১৯২২ সালের আগস্ট মাস 

সন্ধ্যা নেমেছিল পূর্ব গোদাবরী এলাকার সবথেকে দুর্গম অঞ্চলে। পাতায় ছাওয়া কুঁড়ের ভেতর পদ্মাসনে বসেছিলেন সন্ন্যাসী রাজু। টিপটিপ করে জ্বলছিল মাটির প্রদীপ। পাশে রাখা ছিল তির ধনুক এবং গুলিভর্তি বন্দুক। সন্ন্যাসীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সামনের পাকদণ্ডী পথের ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকদণ্ডী বেয়ে উঠে এসেছিল কিছু ছায়ামূর্তি। কারও হাতে বন্দুক, কারও হাতে তরবারি, কারও পিঠে ঝুলছিল তির ধনুক।

পঁচিশ বছরের সন্ন্যাসীকে ঘিরে বসে পড়েছিলেন আদিবাসী যুবক গান্তাম ডোরা, মাল্লু ডোরা, কাঙ্কিপাটি পাডালু, আগগিরাজুরা। তাঁরা খবর পেয়েছিলেন, অরণ্যে আবার ফিরে এসেছেন তাঁদের সন্ন্যাসীরাজা। যিনি ৭০০ বর্গ মাইল পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী ২৮ হাজার আদিবাসীকে ব্রিটিশদের নৃশংস অত্যাচার থেকে মুক্তি দেবেন। উধাও হওয়ার আগে সন্ন্যাসী রাজু যা আদেশ দিয়ে গেছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন তাঁর সেনাপতিরা। গ্রামগুলি থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে প্রায় তিনশো যুবককে। দেওয়া হয়েছে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ।

আল্লুরি সীতারাম রাজু

তাঁকে ঘিরে বসে থাকা সেনাপতিদের সন্ন্যাসী বলেছিলেন, “ব্রিটিশদের অত্যাচার সহ্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। আমি নয়, এখন থেকে তোমাদের হয়ে কথা বলবে বন্দুকের নল। তাই প্রয়োজন আগ্নেয়াস্ত্রের। তির ধনুক দিয়ে ব্রিটিশদের এলাকা-ছাড়া করা যাবে না। কারণ ব্রিটিশেরা কেবল বন্দুকের হুকুম শোনে।” এরপর আদিবাসী যুবকদের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বলেছিলেন, “তোমরা বলিদান দিতে প্রস্তুত?” বীর আদিবাসী যুবকেরা মাটিতে রাখা অস্ত্র উঠিয়ে নিয়েছিলেন। নিচু গলায় সন্ন্যাসী বলেছিলেন, “আমাদের প্রথম লক্ষ্য চিন্তাপল্লি থানা।”

শুরু হয়ে গেছিল সশস্ত্র রামপা বিদ্রোহ

১৯২২ সালের ২২ আগস্ট। গভীর রাতে দুর্গম নাদিম্পালেম গ্রামের মন্দিরটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সন্ন্যাসী রাজু। হাতে বন্দুক, পিঠে তির ধনুক। মিনিট খানেকের মধ্যেই সন্ন্যাসীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল অন্ধকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় তিনশো গেরিলা। এরপর দলটি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল অরণ্যপথে।

সেই রাতে চিন্তাপল্লি থানার ব্রিটিশ অফিসারেরা ছিলেন ব্যারাকে। ডিউটিতে থাকা দেশি পুলিশেরা ছিলেন তন্দ্রাচ্ছন্ন। ক্ষুধার্ত হায়নার মতোই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গেরিলাবাহিনী। পুলিশেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই থানাকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে ১১ টি বন্দুক, ৫ টি তরবারি ও ১৩৯০ রাউন্ড গুলি নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন এক সুদর্শন সন্ন্যাসী।

পরদিন সকালেই উড়ো চিঠি গিয়েছিল কৃষ্ণাদেবীপেটা থানায়। চিঠিতে বলা হয়েছিল, প্রস্তুত হয়ে থাকার জন্য। সেই রাতে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন কৃষ্ণাদেবীপেটা থানার পুলিশেরা। নির্বিঘ্নে কেটেছিল ২৩ আগস্টের রাত। তাই ভোরের দিকে সামান্য অসতর্ক হয়ে পড়েছিলেন পুলিশেরা। ব্রাহ্মমুহূর্তে আঘাত হেনেছিল সন্ন্যাসীর গেরিলা বাহিনী। লুঠ করে নিয়ে গেছিল প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। পরদিন, অর্থাৎ ২৪ আগস্ট, একইভাবে রাজাভম্মাঙ্গি থানায় আক্রমণ চালিয়ে নবীন সন্ন্যাসী লুঠ করেছিলেন বিপুল অস্ত্রশস্ত্র। থানার হাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বন্দি থাকা সেনাপতি ভিরাইয়া ডোরাকে।

ব্রিটিশ পুলিশের খতম তালিকায় উঠে গিয়েছিল সন্নাসীরাজার নাম

সন্ন্যাসীরাজুকে হত্যা করার জন্য ব্রিটিশ গভর্নর পাঠিয়েছিলেন দুই কুখ্যাত ব্রিটিশ অফিসার কাবার্ড ও হেইটারকে। কিন্তু তাঁরা জানতেন না সন্নাসীর তৈরি করা খতম তালিকাতে ছিল তাঁদেরও নাম। বিশাল বাহিনী নিয়ে কাবার্ড ও হেইটার চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছিলেন পূর্ব গোদাবরীর অরণ্য ও পাহাড়ে। কিন্তু পূর্ব গোদাবরীর অরণ্য লড়াইয়ের খোলা ময়দান নয়। ঈগলের মত ক্ষিপ্র গেরিলা সন্ন্যাসী ও তাঁর বাহিনীর সঙ্গে দুর্গম অরণ্যের বুকে লড়াই করা সহজ ছিল নাা। তবুও নিজেদের বীরত্ব দেখানোর জন্য দুই ব্রিটিশ অফিসার পুলিশ বাহিনীর একেবারে সামনে দামী রাইফেল নিয়ে হেঁটে চলেছিলেন।

পূর্ব গোদাবরীর অরণ্য

সেদিন অরণ্য ছিল আশ্চর্য রকমের শান্ত। পাখি ও ঝরনার কলতান ছাড়া অন্য কিছু কানে আসছিল না। মাইলের পর মাইল এলাকা মনের আনন্দে দখল করতে করতে এগিয়ে চলেছিলেন কাবার্ড ও হেইটার সাহেব।  ঘুণাক্ষরেও টের পাননি, অনেক আগেই তাঁরা গেরিলা সন্ন্যাসীর পাতা ফাঁদে প্রবেশ করেছেন। একসময় তিনদিক থেকে ব্রিটিশ বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছিল সন্ন্যাসীরাজুর আদিবাসী গেরিলারা। অরণ্যের বুক চিরে ছুটে এসেছিল ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। ছিন্নভিন্ন হয়ে সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়েছিল দুই সাহেবের নিষ্প্রাণ দেহ।

ব্রিটিশদের কাছে আতঙ্কের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন সন্নাসীরাজা

রামপা এলাকার সব থেকে সুরক্ষিত থানা ও প্রধান অস্ত্রাগারটি ছিল আড্ডাটিগালায়। রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে অস্ত্রাগারটি লুঠ করেছিলেন সন্ন্যাসী। পূর্ব গোদাবরীর পাহাড়ি গুহায় গড়ে তুলেছিলেন বিপ্লবীদের বিশাল অস্ত্রাগার। অন্যদিকে প্রায় সব অস্ত্র ও গোলাবারুদ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। সেই সুযোগে সন্ন্যাসী একের পর এক আঘাত হেনেছিলেন রাম্পাঞ্চোডাভরম, নারসিপত্তনম, আন্নাভরম ও দমনপল্লি থানায়। আক্রমণগুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রচুর ব্রিটিশ অফিসার।

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিস্মৃত নায়ক, ফাঁসির দড়ি যাঁর কাছে ছিল জয়ের মালা

সন্ন্যাসীরাজুকে খতম করার জন্য আনা হয়েছিল কুখ্যাত পুলিশ অফিসার স্যান্ডার্সকে। বিভিন্ন পাহাড়ে চলেছিল দফায় দফায় লড়াই। একসময় মাথা নিচু করে এলাকা ছেড়েছিলেন স্যান্ডার্স সাহেব। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ব্রিটিশ বাহিনীর। গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন সন্ন্যাসীর কিছু বিশ্বস্ত সঙ্গী। আহত হয়েছিলেন সন্ন্যাসীরাজুও। বহুদিন তাঁর কোনও খোঁজ মেলেনি। ব্রিটিশ পুলিশ ভেবেছিল অরণ্যের গভীরেই প্রাণ হারিয়েছেন গেরিলা সন্ন্যাসী। ১৯২৩ সালের ১৭ এপ্রিল, আন্নাভরমের আদিবাসী গ্রামে আবার দেখা গিয়েছিল নবীন সন্ন্যাসীকে। সেদিন সন্ন্যাসীকে এক বিশাল সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন আদিবাসীরা। লোকদেবতার আসনে বসিয়েছিলেন। উল্লেরি সীতারাম রাজুর নাম হয়ে গেছিল মানিয়াম ভিরুডু বা অরণ্যের বীর।

খবর পেয়ে চমকে উঠেছিল ব্রিটিশরা। সন্ন্যাসীকে খতম করার জন্য পাঠানো হয়েছিল আন্ডারউডকে। ১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছিল পাহাড়ে। ধরা পড়েছিলেন সন্ন্যাসীর প্রধান সেনাপতি মাল্লু ডোরা। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আন্দামানে। ক্ষ্যাপা হায়নার মত সন্ন্যাসীরাজুকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশ। কিন্তু সন্ন্যাসী যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছিলেন। পুরো মানিয়াম (অরণ্য) এলাকাকে বহির্জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। বিশাখাপত্তনম, রাজামুন্দ্রী, পার্বতীপুরম ও কোরাপুট থেকে আসা বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছিল এলাকা। সীমিত শক্তি নিয়ে সন্ন্যাসী এরমধ্যেও সফলভাবে আক্রমণ চালিয়েছিলেন পাডেরু থানা ও গুডেমের সেনা ছাউনিতে।

সবশেষে ব্রিটিশেরা এনেছিল তাদের সেরা অস্ত্র

মানিয়াম এলাকার স্পেশাল কমিশনার হয়ে এসেছিলেন রাদারফোর্ড। বিভিন্ন দেশে বিপ্লব দমনে যাঁর ছিল প্রচুর অভিজ্ঞতা। সন্ন্যাসীর ওপর নজর না দিয়ে, তাঁর সেনাপতিদের সরিয়ে দেওয়ার নীল নকশা করেছিলেন রাদারফোর্ড। তাঁর রণকৌশলে প্রাণ হারিয়েছিলেন সন্ন্যাসীর বেশিরভাগ সেনাপতি। ব্রিটিশের হাতে ধরা পড়ে গেছিলেন সন্ন্যাসীর সবথেকে দুঃসাহসী সেনাপতি আগগিরাজু। তাঁকেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আন্দামানে। সুচতুর রাদারফোর্ড ঘোষণা করেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে আল্লুরি সীতারাম রাজুকে ধরিয়ে দিতে হবে বা রাজুকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় মানিয়ামের আদিবাসীদের সহ্য করতে হবে ভয়াবহ অত্যাচার।

রাদারফোর্ডের প্রস্তাবে রাজি হননি আদিবাসীরা। তাঁরা নিজেরা মরতে রাজি, কিন্তু সন্ন্যাসীরাজুকে ব্রিটিশের হাতে তুলে দিতে পারবেন না। ব্রিটিশ সেনা ও পুলিশ মানিয়াম এলাকায় শুরু করেছিল নৃশংস অত্যাচার, গুপ্তহত্যা ও ধর্ষণ। তাঁর জন্য আদিবাসীদের এই মর্মান্তিক পরিণতিকে মেনে নিতে পারেননি সন্ন্যাসী। ১৯২৪ সালের ৭ মে দূত মারফত খবর পাঠিয়েছিলেন, ব্রিটিশ পুলিশদের জন্য তিনি অপেক্ষা করবেন কৈয়ুরু গ্রামে। পুলিশের কাছে একটিই শর্ত রেখেছিলেন বার্তাবাহক। আদিবাসীদের মানিয়াম ভিরুডুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া চলবে না। শর্তে রাজি হয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ।

সেদিন বিকেলেই পুলিশের বিশাল বাহিনী পৌঁছে গিয়েছিল কৈয়ুরু গ্রামে। মানিয়াম অরণ্যের সন্ন্যাসীরাজা তখন ঝরনার জলে গুলির ক্ষত পরিষ্কার করছিলেন। ব্রিটিশ পুলিশ ঘিরে ফেলেছিল সন্ন্যাসীকে। বেঁধে ফেলেছিল একটি গাছের সঙ্গে। রাইফেল হাতে এগিয়ে এসেছিলেন ইন্সপেক্টর গুডাল। কোনও কথা না বলে গুলি চালিয়েছিলেন সন্ন্যাসীর বুকে। প্রথম গুলিটি খেয়ে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সন্ন্যাসী। যন্ত্রণাকাতর মুখে দেখা দিয়েছিল হাসি। দ্বিতীয় গুলিটি খাওয়ার আগে সন্ন্যাসীরাজা বলেছিলেন, “তোমাদের কিন্তু এ দেশ ছাড়তেই হবে।” তারপর ২৭ বছরের বীর বিপ্লবী ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। সেই মুহুর্তেও সন্ন্যাসীর মুখাবয়বে বিরাজ করছিল এক গভীর প্রশান্তি। ভাবতে অবাক লাগে এই মানুষটিকে মারার জন্য সে যুগে ব্রিটিশরা খরচ করেছিল ৪০ লক্ষ টাকা।

মৃত্যুর কোলে সন্ন্যাসীরাজা

সবাই ভুললেও ভোলেননি নেতাজি সুভাষ

সন্ন্যাসীরাজার মৃত্যুতে স্তিমিত হয়ে গেছিল রামপা বিদ্রোহ। কিন্তু ব্রিটিশদের অলক্ষ্যেই জেগে উঠেছিলেন হাজার হাজার আল্লুরি সীতারাম রাজু। হাতে নিয়েছিলেন সন্ন্যাসীরাজার রেখে যাওয়া মশাল। আল্লুরি সীতারাম রাজু্র এই অমর বলিদান দেশনেতারা ভুললেও, ভোলেননি নেতাজি সুভাষ। তিনি বলেছিলেন,”সীতারাম রাজু্র অবদানের প্রশংসা করাটাও আমার কাছে গর্বের। ভারতের নবীন বিপ্লবীদের কাছে তিনি চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থেকে যাবেন।” আসলে বীরের মর্যাদা একমাত্র দিতে পারেন নেতাজির মত বীরেরাই।

মূর্তির সাহায্যে ধরে রাখা হয়েছে সন্ন্যাসীরাজার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত (আল্লুরি সীতারাম রাজু মেমোরিয়াল ট্রাইবাল মিউজিয়াম )

তাছাড়া নেতাজির অনুপ্রেরণার উৎস ছিল শ্রীমদ্ভাগবতগীতা। নিজের কাছেও গীতা রাখতেন সবসময় ( সুত্র- বিখ্যাত নেতাজি গবেষক অনুজ ধর)। নেতাজি বিশ্বাস করতেন গীতার সেই বিখ্যাত শ্লোকটি, “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥” সন্ন্যাসী আল্লুরি সীতারাম রাজুর মধ্যে হয়ত নেতাজি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অবতারকে। দেশের চরম বিপদের দিনে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More