হিমালয়ের এই পৌরাণিক গ্রামে ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্র, আজ বিখ্যাত চরসের জন্য

ভারতের সংবিধান মেনে চলেনা এই গ্রাম। চলে জমলু দেবতার সংবিধান মেনে।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সপ্তঋষির অন্যতম ঋষি জমদগ্নি তপস্যায় বসেছিলেন হিমালয়ের তুষারাবৃত পর্বতে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলা এই তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দর্শন দিয়েছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব। বর চাইতে বলেছিলেন ভক্ত জমদগ্নিকে। মহাদেবের কাছে ঋষি জমদগ্নি চেয়েছিলেন একটি অদ্ভুত বর। জমদগ্নি বলেছিলেন মহাদেব তাঁকে আশ্রম গড়ার জন্য এমন একটি স্থান উপহার দিন, যে জায়গাটি হবে অত্যন্ত দুর্গম এবং কোলাহলহীন। যেখানে সাধারণ মানুষ সহজে পৌঁছতে পারবে না। ঋষি জমদগ্নি যেখানে নিবিষ্ট মনে মহাদেবের আরাধনা করতে পারবেন। মহাদেব ঋষি জমদগ্নিকে দিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি গ্রামের ঠিকানা।

ঋষি জমদগ্নির কল্পিত চিত্র

হিমালয়ের বুকে লুকিয়ে থাকা গ্রামটির নাম ‘মালানা’

ঋষি জমদগ্নি একদিন এসে পৌঁছেছিলেন হিমাচলের গোপন উপত্যকায় লুকিয়ে থাকা গ্রাম মালানায়। মালানা গ্রাম আগে থেকেই দখল করে রেখেছিলেন মহাবলীর পুত্র অসুররাজ বাণাসুর। হাজারটি হাত তাঁর। তিনি ঋষি জমদগ্নিকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন মালানায় তাঁর আসার কারণ। ঋষি জমদগ্নিকে যুদ্ধে আহবান করেছিলেন বাণাসুর। কয়েকশো বছর ধরে চলেছিল সেই যুদ্ধ।

মালানা গ্রাম

কিন্তু সেই যুদ্ধে কেউ কাউকে হারাতে পারেননি। অগত্যা সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিলেন দু’জনেই। দু’জনের আলোচনায় ঠিক হয়েছিল মালানা গ্রামে ঋষি জমদগ্নি আশ্রম গড়বেন। এবং দু’জনেই শাসন করবেন মালানা গ্রাম। তবে বিচার ব্যবস্থার পুরোটাই থাকবে সর্বশাস্ত্র বিশারদ ঋষি জমদগ্নির হাতে। ঋষি জমদগ্নি গ্রামের সংবিধান রচনা করবেন। দু’জনে মিলে আলোচনা করে গ্রামের পরিচালকমণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করবেন। তাঁরাই হবেন ঋষি জমদগ্নির প্রতিনিধি।

কালক্রমে মালানা গ্রামে বাড়তে শুরু করেছিল ঋষি জমদগ্নির প্রভাব ও প্রতিপত্তি। একসময় ঋষি জমদগ্নির হাতে পুরো মালানার দায়িত্ব তুলে দিয়ে গ্রাম ছেড়েছিলেন বাণাসুর। তবে গ্রাম ছাড়ার আগে অসুরেরা জমদগ্নিকে অনুরোধ করেছিলেন, গ্রামবাসীরা যেন তাঁদের কথ্য ভাষাটা ব্যবহার করেন। এবং গ্রামের যেকোনও পুজো ও উৎসবে বলি দেওয়া প্রথম পশুটিকে যেন বাণাসুরের নামে উৎসর্গ করা হয়।

বাণাসুরের মূর্তি

সেইদিন থেকে হিমাচলের মালানা গ্রামে সর্বোচ্চ দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন ঋষি জমদগ্নি। মালানাবাসীরা বলেন ‘জমলু দেবতা‘। তবে তাঁর সঙ্গেই পুজো পান অসুররাজ বাণাসুরও। আজও ঋষি জমদগ্নি বা জমলু দেবতার শাসন চলে হিমাচলের প্রত্যন্ত এই গ্রামে। যে গ্রামে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্র।

হিমাচল প্রদেশের কুলু উপত্যকার উত্তর-পূর্বে ও পার্বতী উপত্যকার উত্তরে আজও আছে এই পাহাড়ি গ্রাম ‘মালানা’। যে গ্রামের পরতে পরতে রহস্যের কুয়াশা। যে রহস্যভেদের জন্য সভ্যজগতের মানুষ বার বার যেতে চেয়েছে মালানায়। মিশতে চেয়েছে গ্রামবাসীদের সঙ্গে। কিন্তু কোনও এক অজানা কারণে মালানাবাসীরা বংশপরম্পরায় বহির্জগতের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব ক্রমশ বাড়িয়ে গেছে। ইচ্ছে করেই নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে রহস্যের কুয়াশায়। হয়ত তাই ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে মালানা গ্রাম আজও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

রহস্যময় মালানার সন্ধানে

মানালি থেকে কুলু পেরিয়ে ৩ নং জাতীয় সড়ক এগিয়ে গিয়েছে ভুন্টারের দিকে। বিয়াস ও পার্বতী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত মিষ্টি শহর ভুন্টার। এখান থেকে পার্বতী উপত্যকায় চলে গেছে ভুন্টার- মণিকরণ হাইওয়ে। পার্বতী নদী যাত্রাপথে হাইওয়ের সঙ্গী। হাইওয়ে ধরে ২০ কিলোমিটার গেলে আসবে আর একটি জনপদ। যার নাম ‘জারি’।

এই জারি থেকে পথ গিয়েছে পৌরাণিক গ্রাম মালানার দিকে। বাম দিকে খাদ ও ডানদিকে পাহাড়কে রেখে চলা দুর্গম রাস্তার বাঁকে বাঁকে চমক। পার হতে হয় বেশ কিছু সুড়ঙ্গ। যাত্রাপথের সৌন্দর্য ও ভয়াবহতা একইসঙ্গে আচ্ছন্ন করে রাখে পর্যটকদের। জারি থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার এসে থেমে গেছে রাস্তা। রোডহেড থেকে আরও তিন কিলোমিটার ট্রেক করে পৌঁছতে হবে রহস্যের খনি মালানা গ্রামে।

জারি

‘ওয়ে টু মালানা’ লেখা গেট পেরিয়ে রাস্তা নেমে চলে সশব্দে বয়ে চলা মালানা নদীর দিকে। নদীর ওপরে সরু ব্রিজ। ব্রিজ পার হতেই শুরু হয় হাঁফ ধরানো চড়াই। পথের বাঁদিকে কিছুটা সঙ্গ দেবে মালানা নদী। মাঝেমধ্যে দেখা দেবে চায়ের দোকান। ডানদিকে দেখা মিলবে ছোট্ট একটি ঝরনার। একসময় পাশ থেকে হারিয়ে যাবে বুনো ঝোপের দল। বাতাস ক্রমশ ঠান্ডা হতে শুরু করবে। চলতে চলতে দেখা যাবে পার্বতী উপত্যকার বুকে মেঘ আর রোদের খুনসুটি।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ট্রেক করে পৌঁছতে হবে ৮৭০১ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মালানা গ্রামে। ঝিম মেরে থাকা গ্রামটির কাছেই দেওটিব্বা (১৯৬৮৮ ফুট) এবং চন্দ্রখানি (১২০০৭ ফুট) পাস। রামসু ও পুলাগ থেকে এই চন্দ্রখানি পাস পেরিয়েও আসা যায় মালানা গ্রামে। মালানার আবহাওয়া খুবই খামখেয়ালি। বৃষ্টি ও তুষারপাত লেগেই থাকে বছরভর। আশপাশের সবুজ পাহাড়ের মাথায় সাদা বরফের দেখা মিলবে ‘মে’ মাসেও।

প্রথম দর্শনে মালানা গ্রাম আপনার মনে রেখাপাত করবে না

মালানা আর পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের মতই সাধারণ। পাহাড়ের ওপরে থাকা অসমতল জমিতে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাড়িঘর। বাড়িগুলি দোতলা। পাথর ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি। বেশিরভাগ বাড়ির ছাদ টিনের। নীল ও মেরুন রঙের প্রলেপ দেওয়া। বাড়িগুলির একতলায় ডাঁই করা থাকে জ্বালানি কাঠ। এছাড়াও মহিলারা সেখানে ভেড়ার উল দিয়ে পোশাক তৈরি করেন। দোতলায় থাকেন বাড়ির মালিক ও তাঁর পরিবার। গ্রামের ভেতর দিয়ে গিয়েছে সরু রাস্তা।

মালানা গ্রামের রাস্তা দু”পাশে বাড়িঘর

পুরো মালানা গ্রামটি গড়ে উঠেছে জমলু দেবতার মন্দিরকে ঘিরে। গ্রামের মাঝখানে জমলু দেবতার অতিকায় দোতলা মন্দির। কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি। জমলু দেবতার পুরোহিতকে দূর থেকে চেনা যায়। কারণ তিনিই গ্রামের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সাদা পাগড়ি পরার অধিকারী। বর্তমান পুরোহিতের নাম বুয়ারাম। গ্রামে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় তাঁকে।

বুয়ারামের পরিবারই বংশপরাম্পরায় জমলু দেবতার পূজা করেন। জমলু দেবতার আদেশ মনে করিয়ে দেন গ্রামবাসীদের। পুরোহিত বুয়ারাম বাস করেন একটি দোতলা বাড়িতে। বাইরের দেওয়ালে কাঠের কারুকাজ। বাড়িটিতে পুরোহিত একা থাকেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা আলাদা বাড়িতে থাকেন। তবে রোজ খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেন বুয়ারামকে।

মালানা গ্রামে জমলু দেবতার মন্দির

মন্দিরের সামনে মেলার মাঠ। মাঠের পাশে সাইনবোর্ডে লেখা আছে, মন্দির স্পর্শ করলেই সাড়ে তিনহাজার টাকা জরিমানা। মন্দিরের দরজা বহিরাগতদের জন্য বন্ধ থাকে। আসলে মালানা গ্রামে আপনি অনেক কিছুই করতে পারবেন না। কারণ মালানা গ্রাম ভারতের সংবিধান মেনে চলে না। মালানা গ্রাম আজও চলে জমলু ঋষির দিয়ে যাওয়া নির্দেশ অনুসারে।

মালানা গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে বহিরাগতরা অস্পৃশ্য

কারণ মালানাবাসীরা বিশ্বাস করেন তাঁরা ছাড়া পৃথিবীর সবাই নিম্নশ্রেণির। তাই বহিরাগতরা গ্রামের কোনও কিছু স্পর্শ করার অধিকারী নন। গ্রামের মানুষদের করমর্দন করা, আলিঙ্গন করা, বাচ্চাদের কোলে নেওয়া একেবারে নিষিদ্ধ। গ্রামের কোনও সম্পত্তি স্পর্শ করা যাবে না। এমনকি পাইপ থেকে পড়তে থাকা ঝরনার জলও নিতে হবে দূর থেকে। তাই মালানা পৌঁছবার আগেই পর্যটকদের সতর্ক করে দেন গাইড ও দোকানদারেরা। স্পর্শ করলেই এক হাজার টাকা জরিমানা।

গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় রাখা আছে এরকম নোটিশ বোর্ড

জরিমানার টাকায় একটি ভেড়া বলি দেওয়া হয় অপবিত্র হয়ে যাওয়া গ্রামকে পবিত্র করে তোলার জন্য। এছাড়াও গ্রামের ভিডিও তোলা যাবে না। গাছের গায়ে কিছু লেখা ও পেরেক পোঁতা যাবে না। জঙ্গলে আগুন জ্বালানো যাবে না। গ্রাম পরিষদের অনুমতি ছাড়া একটা প্রজাপতিও ধরা যাবে না।

গ্রামের ভেতরে দোকান আছে। সেখানে প্রায় সব কিছুই পাওয়া যায়। কিন্তু দোকানদারের ব্যবহার আপনাকে বিচলিত করবে। দোকান থেকে কিছু কেনার পর দোকানদার জিনিসটিকে মাটিতে রেখে দেবেন। সেখান থেকে আপনাকে তুলে নিতে হবে। ধুলো লাগলেও কিছু করার নেই। দোকানদারের হাতে টাকাও দেওয়া যাবে না। আপনাকে সেই টাকাও রাখতে হবে মাটিতে। এটাই মালানার দস্তুর। যদি ভূলবশত কোনও গ্রামবাসীর গায়ে হাত লেগে যায়, তৎক্ষনাৎ সেই গ্রামবাসী স্নান করে পবিত্র হয়ে নেন। নয়ত জমলু ঋষি সাপ দেবেন। আসলে মালানা গ্রামের বাসিন্দারা জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে জমলু দেবতার নির্দেশ মেনে চলেন।

গ্রাম শাসন করেন জমলু দেবতার প্রতিনিধিরা

মালানা গ্রামের অধীশ্বর জমলু দেবতা। তাঁর প্রতিনিধি হয়ে গ্রামের প্রশাসন চালান এগারো সদস্য নিয়ে গড়া গ্রাম পরিষদ। জমলু দেবতার মন্দির থেকে কিছু দূরে পরিষদের অফিস। প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে সরপঞ্চেরা গ্রামবাসীদের অভাব অভিযোগ শোনেন। কোনও ক্ষেত্রেই পুলিশের বা আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয় না। যেকোনও গ্রাম্য বিবাদের মীমাংসা করে গ্রাম পরিষদ। সমস্যা জটিল হলে অদ্ভুত এক পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। বিবাদমান দু’টি পক্ষকে দু’টি ভেড়া নিয়ে আসতে বলা হয়। তারপর দুটি ভেড়ার শরীরে সমপরিমাণ বিষ প্রয়োগ করা হয়। যে পক্ষের ভেড়া আগে মারা যাবে, বিচারের রায় তার বিরুদ্ধে গেছে বলে মেনে নিতে হবে।

এছাড়া মালানার গ্রামবাসীদের মধ্যে থেকে গ্রামপরিষদ বেছে নেয় কিছু মানুষকে। যাঁদের বলা হয় ভান্ডারি। তাঁরা গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জমির কর আদায় করেন। অন্যান্য গ্রাম থেকে যাঁরা মালানা গ্রামে গবাদিপশু চরাতে আসেন, তাঁদের কাছ থেকেও আদায় করা হয় কর। করের অর্থ জমা হয় জমলু দেবতার কোষাগারে। সেই কোষাগারেই জমা হয় জমলু দেবতার মন্দিরে দান করা সমস্ত অর্থ এবং সোনা রূপার গয়না। কাঠ ও পাথর দিয়ে তৈরি করা সুদৃশ্য কোষাগারটি জমলু দেবতার মন্দিরের পাশেই অবস্থিত। একতলা এই বাড়িটির দেওয়ালে টাঙানো আছে জমলু দেবতাকে উৎসর্গ করা  পশুর করোটি। করবাবদ সংগৃহীত অর্থ ব্যবহৃত হয় মন্দির ও গ্রামের উন্নয়নে। ব্যবহৃত হয় গ্রামের বিভিন্ন উৎসবে। কঠোরভাবে রাখা হয় আয় ও ব্যয়ের হিসাব।

জমলু দেবতার কোষাগার

মালানা গ্রামে এসেছিলেন সম্রাট আকবর!

সম্রাট আকবরকে নিয়ে একটি অদ্ভুত ও প্রায় অবিশ্বাস্য কাহিনি জড়িয়ে আছে মালানা গ্রামের সঙ্গে। বৃদ্ধ গ্রামবাসীরা যে কাহিনি আজও শোনান পর্যটকদের। সম্রাট আকবর একবার মালানার গরীব গ্রামবাসীদের ওপর বিপুল করের বোঝা চাপিয়েছিলেন। গ্রামবাসীরা দূত মারফত সম্রাটকে জানিয়েছিলেন তাঁদের পক্ষে কোনওভাবেই কর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আকবর কোনও কথা শুনতে চাননি। ফলে জমলু দেবতার কোষাগার থেকে সোনা দেওয়া হয়েছিল আকবরকে।

এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই জমলু দেবতার অভিশাপে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন আকবর। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আকবর দিল্লি থেকে স্বয়ং এসেছিলেন মালানা গ্রামে। গ্রামবাসীদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জমলু দেবতার সোনা। প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন জমলু দেবতার মন্দিরের কোষাগারে। তুষ্ট হয়েছিলেন জমলু দেবতা। সম্পূর্ণ রোগমুক্ত হয়েছিলেন সম্রাট আকবর। এরপর থেকে আর কোনওদিন গ্রামবাসীদের কর দিতে হয়নি। আকবরের শাসন থেকে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল মালানা গ্রাম।

মালানাবাসীরা কি আলেকজান্ডারের সৈন্যদের বংশধর!

পাক অধিকৃত কাশ্মীরের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের কালাশদের মত মালানাবাসীরাও দাবী করেন তাঁরা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সৈন্যদলের বংশধর। সোনালি চুল, সবুজ চোখ ও টিকোলো নাকের মালানাবাসীরা বলেন, দেশে ফেরার পথে আলেকজান্ডারের কিছু সেনা থেকে গিয়েছিলেন মালানা গ্রামে। আর দেশে ফিরে যাননি। নয়নাভিরাম উপত্যকাকেই নিজের দেশ ভেবে আপন করে নিয়েছিলেন। মালানাবাসীরা তাঁদেরই বংশধর।

আজও গ্রামের কয়েকটি প্রাচীন বাড়ির দেওয়ালে খোদাই করা সেনামূর্তি বিস্ময় জাগায়। সেনাদের পোশাক, অস্ত্র এবং শিরোস্ত্রাণ দেখে ভারতীয় বলে মনে হয় না। এছাড়াও মালানাবাসীদের জীবনযাত্রার অনেক কিছুই প্রাচীন গ্রিসের অধিবাসীদের সঙ্গে মেলে। তাই বিদেশি ইতিহাসবিদেরা মালানা গ্রামকে বলেন “the Athens of Himalayas।” স্যার আর্নল্ড টোয়েনবি ১৯৪৬ সালে লেখা Convergence of Indus and Greek Civilizations বইটিতেও মালানাবাসীদের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

মালানার নারী

মালানার বর্ণময় জীবন

মালানা গ্রামের মহিলারা অসামান্য সুন্দরী। চোদ্দ বছর বয়সেই মালানাদের বিয়ে হয়ে যায়। বিবাহ হয় দুটি গ্রামের মধ্যে। এই বিয়ের নাম ‘রাক্ষস বিবাহ’। মন দেওয়া নেওয়ার পর যুবকের পিছন পিছন যুবতী শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করলেই বিবাহ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হিসেবে ধরা হয়। বিবাহবিচ্ছেদও হয় মালানা সমাজে। এক্ষেত্রে স্বামীকে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীর জন্য আলাদা বাড়ি ও খোরপোষের ব্যবস্থা করে দিতে হয়। তবে বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলারা পুনরায় বিবাহ করতে পারেন। পুরুষরাও বহুবিবাহ করতে পারেন।

মালানা গ্রামের প্রধান দুটি উৎসব হল ‘ফাগলি’ ও ‘শাউন’। ফাগলি অনুষ্ঠিত হয় ফেব্রুয়ারি মাসে এবং শাউন আগষ্ট মাসে। এর মধ্যে ফাগলি উৎসবের ‘হরলালা’ নৃত্যটি রোমাঞ্চকর। কাকভোরে স্নান করে নিয়ে গ্রামবাসীরা অসুরের মুখোশ পরে সারা গ্রাম ঘুরে নাচেন। নৃত্যশিল্পীদের শরীর শুকনো গাঁজা গাছের পাতা দিয়ে ঢাকা থাকে। নৃত্যরত অবস্থায় তাঁরা সারা মালানা গ্রামে গোবর ছড়িয়ে দেন। অত্যধিক ঠান্ডা ও খারাপ আবহাওয়ার হাত থেকে গ্রামকে বাঁচাবার বিশ্বাস নিয়ে। চড়া আওয়াজে বাজতে থাকে শিঙা ও ঢোল।

মালানাবাসীরা আজও অদ্ভুত এক সাংকেতিক ভাষায় কথা বলেন। যে ভাষার কোনও লিপি নেই। ভাষাটির নাম ‘কানাশি’। আপার ও লোয়ার মালানা গ্রাম মিলিয়ে মাত্র এক হাজার জন এই ‘কানাশি’ ভাষা জানেন। এই ভাষাটি মালানাবাসী ছাড়া কাউকে শেখানো হয় না। গ্রামের শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বলে দেওয়া হয় কাউকে এই ভাষা না শেখাতে। ভাষাতত্ত্ববিদদের অনুমান সংস্কৃত ও তিব্বতের ভাষা মিশে তৈরি হয়েছে ‘কানাশি’ ভাষা। গ্রামবাসীরা বলেন কানাশি ভাষা আসলে বাণাসুরের ভাষা। জমলু দেবতা বাণাসুরকে দেওয়া কথা রেখেছিলেন। তাই মালানাবাসীরাও বাণাসুরকে সম্মান জানিয়ে আজও বাণাসুরের ভাষাতেই কথা বলেন।

মালানার অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপ

মালানা গ্রামের মহিলারাই বেশিরভাগ কাজ করেন। বাড়ির কাজ থেকে পশুপালন। এমনকি জ্বালানী কাঠও কেটে আনেন জঙ্গল থেকে। মালানা গ্রামে চাষবাসের প্রথা নেই। তাস খেলেই সময় কাটান পুরুষেরা। পর্যটকদের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে গ্রামবাসীদের চলে কীভাবে! এখানেই উঠে আসে বর্তমান মালানার অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপ। যে রূপ বেশিরভাগ ভারতীয়র কাছে আজও অজানা। পৌরাণিক গ্রাম মালানা আজ বিশ্বে তার পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক গরিমার জন্য বিখ্যাত নয়। আজ মালানা সারা বিশ্বে বিখ্যাত ‘মালানা ক্রিম’-এর জন্য।

মালানাকে ঘিরে আছে গাঁজা গাছের জঙ্গল

মালানাবাসীদের মূল আয় আসে চোরাপথে চরস ও গাঁজা বিক্রি করে। এই মালানা গ্রামেই বিশ্বের সব থেকে উচ্চমানের ও উচ্চদামের চরস পাওয়া যায়। যার নাম ‘মালানা ক্রিম’। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে যার আকাশছোঁয়া চাহিদা। মালানা ক্রিমের জন্য গ্রাহকেরা যেকোনও মূল্য দিতে রাজি। আসলে মালানা গ্রামে উৎপাদিত চরস বিশ্ববিখ্যাত তার সুগন্ধ ও সেবনকারীর মস্তিষ্কে অবর্ণনীয় সাইকোডেলিক প্রভাব ফেলার জন্য। এই কারণেই ‘মালানা ক্রিম’ দু’বার বিশ্বের সেরা চরসের খেতাব পেয়েছে। ১৯৯৪ ও ৯৬ সালে গুণগত মানের জন্য হাইটাইম ম্যাগাজিনের ‘ক্যানাবিস কাপ’ জিতেছে ‘মালানা ক্রিম’।

মালানা ক্রিম

প্রাকৃতিকভাবেই মালানা গ্রামের আশেপাশের পতিত জমিতে গজিয়ে ওঠে উন্নতমানের গাঁজা গাছ। গ্রামবাসীরা চাষ করেন না, কারণ সরকারিভাবে গাঁজা চাষ করা বারণ। তবুও মাঝে মাঝে গ্রামে হানা দেন আবগারি দফতরের কর্মীরা। পুড়িয়ে দেন গ্রাম সংলগ্ন সমস্ত গাঁজা গাছ। কিন্তু আশেপাশের দুর্গম পর্বতের অন্দরমহলে লুকিয়ে বেড়ে ওঠে লক্ষ লক্ষ গাঁজা গাছ। যেগুলির খোঁজ রাখেন গ্রামবাসীরা। সময়মত ও প্রয়োজনমত সংগ্রহ করেন।

বিকেলের দিকে মালানা গ্রামে গেলে দেখা যাবে, গ্রামের মহিলারা গাঁজা গাছের ফুল হাতের তালুতে রেখে ডলছেন। ডলতে ডলতে তালুতে লেগে যায় গাঁজা ফুলের নির্যাস। বাতাসে শুকিয়ে হয়ে ওঠে পিচের মত কালো এবং আঠালো। এই বস্তুটিই বিশ্বের নেশাড়ুদের কাছে পরম মহার্ঘ্য বস্তু। যার নাম ‘মালানা ক্রিম’।

মহিলারা তৈরি করছেন মালানা ক্রিম

মালানা গ্রামের নারী, পুরুষ, এমনকি বালক বালিকারাও পর্যটকদের কাছে লুকিয়ে বিক্রি করে ‘মালানা ক্রিম’ ও গাঁজা। কেন তাঁরা চাষবাস করেন না! কেন এই অনৈতিক পেশা বেছে নিয়েছেন! এর উত্তরে গ্রামবাসীরা বলেন, চাষ করে ফসল বেচতে হলে নীচে নামতে হবে। ফসল শুকিয়ে যাবে। দাম পাওয়া যাবে না। অন্যদিকে সারাবিশ্বের নেশাখোরেরা নেশার সন্ধানেই মালানা গ্রামে উঠে আসেন। গ্রাম থেকেই বিক্রি হয়ে যায় ‘মালানা ক্রিম’ ও গাঁজা।

লোয়ার মালানা গ্রামে পর্যটকদের রাত্রিবাস নিষিদ্ধ। আপার মালানা গ্রামে কিছু হোটেল আছে। সেখানে খাওয়া থাকার সঙ্গে মেলে ‘মালানা ক্রিম’। জারির আশেপাশে থাকা হোটেলগুলিতেও মেলে। যদি কেউ প্রাকৃতিক পরিবেশে মালানা ক্রিম সেবনের তুরীয়ানন্দ উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা হল মালানা গ্রামের বাইরে থাকা ‘বেলা মুন’ এলাকার ‘মঙ্ক হাট’ নামের ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। সেখানে পাতা টেন্টে খাওয়া থাকা মেলে। এর জন্য দিতে হয় জনপ্রতি আটশো টাকা। তবে গাঁজা বা মালানা ক্রিমের খরচ আলাদা।

‘মঙ্ক হাট’ ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড

ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে মালানার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য

মালানা গ্রামের নীচে মালানা নদীর ওপর তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। মালানা গ্রামে আজ পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে আধুনিকতার দূষণ। গ্রামে দেখা মিলবে ডিশ টিভির। গ্রামে হাজির মোবাইল নেটওয়ার্ক। মালানা গ্রামকে ক্রমশ ঘিরে ফেলছে মাদক নির্ভর পর্যটন শিল্প। ধীরে ধীরে জমলু ঋষির শাসনের রাশ আলগা হতে শুরু করেছে। গ্রাম্যবিবাদের মীমাংসার জন্য আজ অনেক গ্রামবাসী জমলু ঋষির তৈরি করে যাওয়া বিচারব্যবস্থা না মেনে কুলু পুলিশের দ্বারস্থ হন।

মালানা গ্রামকে ক্রমশ ঘিরে ফেলছে মাদক নির্ভর পর্যটন শিল্প

২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে হওয়া এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল মালানা গ্রাম। পুড়ে গিয়েছিল জমলু দেবতার মন্দির। প্রাণ হারিয়েছিল গ্রামের বেশিরভাগ গবাদিপশু। অনেকে বলেন আবগারি দফতরের লোকেরা গাঁজাগাছে আগুন ধরাতে গিয়ে ইচ্ছে করেই গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল।

মালানা গ্রামবাসীরা কিন্তু এই অগ্নিকাণ্ডকেও জমলু দেবতার অভিশাপ বলে মেনে নিয়েছিলেন। পোড়া ছাইয়ের স্তুপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতই নতুন করে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন মালানা গ্রামকে। কিন্তু বর্তমান সভ্যতার বিষক্রিয়া থেকে কীভাবে তাঁরা মালানাকে রক্ষা করবেন তা ভেবে দিশাহারা গ্রামের প্রবীনেরা। তাই তাঁরা গ্রামের ভাগ্য ছেড়ে দিয়েছেন জমলু দেবতার ওপর। গ্রামের রক্ষাকবচ যে তাঁরই হাতে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More