ঘর ছাড়তে হয়েছিল বর্ণবিদ্বেষে, আজ সেই বাড়ির পথই ‘মাদার ইন্ডিয়া’র নামে, জানেন কি কে এই সাহসিনী

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে অঞ্চলে একটি রাস্তার নাম কালা বাগাই রোড। নামটার মধ্যেই একটা দক্ষিণ এশিয় প্রভাব রয়েছে,যা চট করে কানে বাজবে যে কারও। কিন্তু জানেন কি, কে এই কালা বাগাই? খোদ আমেরিকার বুকের উপর একটা গোটা রাস্তা যার নামে নামাঙ্কিত।

 আজ থেকে একশ বছর আগের কথা, তখনও ব্রিটিশদের পদানত হয়ে আছে আমাদের দেশ। ১৯১৫ সালে সেই অবিভক্ত ভারতবর্ষ থেকে একটি পরিবার পাড়ি জমায় সুদূর আমেরিকা মহাদেশে। এটা সেই সময়ের কথা, যখন চামড়ার রঙ নিয়ে উন্নাসিকতা মার্কিনি নাগরিকদের প্রায় চরিত্রধর্ম ছিল। এই উন্নাসিক বর্ণবিদ্বেষের শিকার হয়েছেন কালো আর বাদামি চামড়ার কত মানুষ। তেমনই এক লাঞ্ছিত ভারতীয় পরিবারের বধূ ছিলেন কালা বাগাই। কালো চামড়ার মানুষ হওয়ার অপরাধে প্রতিবেশীদের মিলিত আক্রমণে যাকে একদিন বার্কলে শহরের নতুন সংসার ফেলে সন্তানদের বুকে জড়িয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল প্রাণভয়ে। যে শহর একদিন বর্ণবিদ্বেষী ঘৃণা আর অপমান ছুঁড়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল কালা বাগাই ও তাঁর পরিবারকে, আজ সে শহরেরই একটা গোটা রাস্তা উৎসর্গ করা হয়েছে এই ভারতীয় বীরাঙ্গনার স্মৃতিতে। 

অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরে ১৮৯২ সালে জন্মান কালা বাগাই। আর পাঁচটা সাধারণ ভারতীয় মেয়েদের থেকে কোনও অংশে আলাদা ছিল না তাঁর জীবন। খুব অল্প বয়সেই বাবা-মা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন পেশোয়ারের এক ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান বৈষ্ণোদাস বাগাইয়ের সঙ্গে। বিয়ের পর বর্তমান পাকিস্থানের পেশোয়ারেই বেশ কয়েক বছর কাটে নবদম্পতির। সন্তানাদি হয়। তারপর ১৯১৫ সাল নাগাদ পেশোয়ার থেকে স্ত্রী সন্তানদের হাত ধরে বৈষ্ণোদাস পাড়ি জমান পশ্চিমে, সুদূর আমেরিকায়। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশে এত বড় পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে সেখানকাল সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় নিজেদের একটা ছোটো ব্যবসা শুরু করেন বাগাই দম্পতি। পাশাপাশি আমেরিকার বার্কলে অঞ্চলে মাথা গোঁজবার জন্য ছোটো একটি ঘরও কেনেন তাঁরা। আর সেখানেই বিপত্তির সূচনা।

নিজেদের মালপত্র নিয়ে বাচ্চাদের হাত ধরে যখন তাঁরা তাঁদের নতুন বাড়িতে আসেন, একজোট হয়ে পথ আটকে দাঁড়ান প্রতিবেশীরা। এই বাড়িটি,  এর আগে এক শ্বেতাঙ্গ ইংলিশ পরিবারের সম্পত্তি ছিল। এলাকাটিও শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত। সাদা চামড়ার এলাকায় বাদামি চামড়ার সো কল্ড ‘কালা মানুষ’দের প্রবেশাধিকার দিতে রাজি ছিলেন না বার্কলের প্রতিবেশীরা।  নতুন বাড়িতে ঢোকা তো দুরস্ত, প্রতিবেশীদের হাতে সেদিন রীতিমতো শারীরিক হেনস্থার শিকার হতে হয় বাগাই পরিবারকে। একরকম প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসেন তাঁরা। এই অবিশ্বাস্য, হিংস্র অভিজ্ঞতাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছি কালা বাগাইয়ের।

অদ্ভুত জীবনীশক্তি ছিল কালা বাগাইয়ের৷ আর ছিল অন্যকে বিশ্বাস করার, কাছে টেনে নেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা। বিদেশে এসে আর পাঁচজন ভারতীয় মেয়ের মতো জবুথবু হয়ে বসে থাকার মেয়েই ছিলেন না তিনি। সে দেশের রীতিনীতি, আদবকায়দায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য সবার আগে তিনি নিজের বাচ্চাদের তুলে দিলেন এক জার্মান পরিবারের হাতে। আধচেনা বিদেশি এক পরিবারে ভারতীয় শিশুদের লালন-পালনের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া, এটা তখনকার দিনে ভাবাই যেত না। কালা বাগাই করে দেখালেন সেই কাজ। পাশাপাশি নিজেও তালিম নিতে শুরু করলেন ইংরাজি ভাষায়। তাঁর রান্নার হাতটি ছিল বেশ ভালো। নানান নিরামিষ পদ রান্না করে প্রতিবেশীদের খাওয়াতে ভালোবাসতেন। আর সেই সূত্রেই আশেপাশের ভারতীয় ও অন্যান্য এশিয় পরিবারগুলির সঙ্গে দ্রুত সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। শ্বেতাঙ্গ শাসিত আমেরিকার বুকে গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন এশিয় কমিউনিটি।

ভারতীয় স্বাধীনতার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ ছিল বৈষ্ণোদাস বাগাইয়ের। ছিলেন স্বাধীনচেতা আর এক্টিভিস্ট। গদর পার্টির সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু বার্কলের ঘটনা এতটাই অপ্রত্যাশিত যে তার জেরে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বৈষ্ণোদাস। কিন্তু ভয় পাননি কালা বাগাই। এত সম্ভ্রান্ত দেশেও বর্ণবিদ্বেষের এই নগ্ন চেহারা দেখার পর ভেঙে পড়া স্বামীর পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি। সাহসে বুক বেঁধে বার্কলের ওই বাড়ির বদলে উপকূলবর্তী এলাকাতে বাড়ি খুঁজে নতুন করে সংসার পাতলেন। যেচে আলাপ করলেন আশেপাশের সাদা চামড়ার মানুষজনের সঙ্গেও।

এভাবেই একটু একটু করে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছিল বাগাই পরিবার। ছেলেরা বড় হচ্ছিল। আমেরিকার স্কুলে পড়াশোনাও শিখছিল। সংসার প্রতিপালনের পাশাপাশি স্বামীর বৈপ্লবিক কাজকর্মেও যথার্থ অর্ধাঙ্গিনীর মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন স্ত্রী কালা বাগাই।

নিজেদেরকে আর পাঁচজন আমেরিকানের চেয়ে কিছুমাত্র আলাদা ভাবতেন না তাঁরা। বার্কলের সেই হিংস্র অভিজ্ঞতাতেও হয়তো সময়ের প্রলেপ পড়ছিল। কিন্তু সুখ জিনিসটা বরাবরই ক্ষণস্থায়ী। বছর দুয়েক পর আচমকা আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট এবং ফেডারেল অভিবাসন দফতর যৌথভাবে এক রায় ঘোষণা করে আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত ভারতীয়দের নাগরিকত্ব বাতিল বলে ঘোষণা করেন। কালো ও বাদামি চামড়ার প্রতি একটা গোটা রাষ্ট্রের ঘৃণাই যেন আইনি শিলমোহর পেয়েছিল সেদিন। এ ঘটনায় তখনকার প্রবাসী ভারতীয়রা ঠিক কতখানি অস্তিস্বসংকটে পড়েছিল, সেটা বোধহয় এই বিংশ শতাব্দিতে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা যায় না। প্রকৃত অর্থেই বাগাই পরিবার তখন আশ্রয়হীন, রাষ্ট্রহীন। এই দোটানায়, পরিচয়ের সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে লড়াই করার সাহস সবার থাকে না। হারার আগেই হেরে যায় মানুষ। ঠিক এমনটাই হয়েছিল কালা বাগাইয়ের স্বামীর সঙ্গেও। প্রতিদিনের এই দোলাচলতা, যন্ত্রণা মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথই বেছে নেন বৈষ্ণোদাস বাগাই।

স্বামীর মৃত্যু ভিতরে ভিতরে একা করে দিলেও হেরে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না কালা বাগাই। অন্য এক ধাতুতে গড়া ছিল তাঁর মেরুদন্ড।শুরু হয় বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে একটা গোটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, এক বিরাটসংখ্যক মানুষের গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক একা নারীর অসম লড়াই। স্কুলের পড়া শেষ হলে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি তার তিন ছেলেকেই ভর্তি করলেন আমেরিকার কলেজে। নিজেও দ্বিতীয়বার বসলেন বিয়ের পিঁড়িতে। বিয়ে করেন আরেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত সমাজকর্মী মহেশ চন্দ্র’কে। এর মাঝখানে নিজেকে একেবারে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন কালা বাগাই। সংসার চালানোর পাশাপাশি নিয়মিত নাইট স্কুলে পড়েছেন। ইংরাজি শিখেছেন। আধুনিক পোশাক পরেছেন। এমনকি টেনিস খেলাও শিখেছেন। ততদিনে এই স্বভাব মিশুকে মানুষটার আমেরিকান বন্ধুবান্ধব আর গুণগ্রাহীর সংখ্যাও বেড়েছে হু হু করে।

এরপরই এল সেই বহুপ্রার্থিত দিন। ১৯৪৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান স্বাক্ষরিত লুস-সেলার অ্যাক্টের মাধ্যমে অবশেষে মার্কিন নাগরিকত্ব প্রদান করা হল কালা বাগাই। দীর্ঘ বঞ্চনার পর সেদিন এক একক নারীর লড়াইয়ের সামনে নতিস্বীকার করল একটা গোটা রাষ্ট্র।

আপাতভাবে একার লড়াই মনে হলেও, আসলে এই লড়াই ছিল সমস্ত কালো চামড়ার মানুষের অস্তিত্বের লড়াই, পুরোভাগে দাঁড়িয়ে যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কালা বাগাই। ততদিনে তাঁর ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল ‘মাদার অফ ইন্ডিয়া’। আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার উদবাস্তুদের নিয়ে আজীবন কাজ করে গেছেন কালা বাগাই। লড়েছেন তাদের সম্মান আর অধিকারের জন্য। আমেরিকা আর ভারতের দুই সম্পূর্ণ আলাদা দুরকম সংস্কৃতির মধ্যে সেতু রচনাই যেন তাঁর জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

এই মুহূর্তে বার্কলের জনসংখ্যার ২০℅ ই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। সেইসব অধিবাসীদের আবেগের কথা মাথায় রেখেই সিটি কাউন্সিল শহরের একটি রাস্তার নাম ‘কালা বাগাই রোড’ রাখার পক্ষে সওয়াল করেন। এক শতাব্দি আগে এই শহরের বুকেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাকে যে অমর্যাদা সহ্য করতে হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তে সেই অপমানের গায়ে যেন কিছুটা মানবিকতা আর সহনশীলতার প্রলেপ দেওয়া হল। এ প্রসঙ্গে জর্জ ফ্লয়েডের কথা মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। মাত্র ছমাস আগে এই আমেরিকার বুকেই কেবলমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার অপরাধে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় জর্জ ফ্লয়েডকে। এ সেই আমেরিকা, যেখানে এখনও কালো চামড়ার মানুষকে ‘মানুষ’ ভাবা হয় না। যেকোনও মুহূর্তে দমবন্ধ করে তাঁদের মেরে ফেলা যেখানে আজও সহজ।

দুই শ্বেতাঙ্গ ঘাতকের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড

পুঞ্জিভূত ঘৃণা আর বর্বরতার এই ছবিই হয়তো এখনও আমেরিকার আসল সত্য। তবু তার মধ্যেই একঝলক খোলা হাওয়া খেলে যায় যখন সেই দেশেরই একটি রাস্তার নাম বদলে ফেলা হয় ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক কালো মহিলার সম্মানে। এই বার্কলে শহর থেকেই অপমান আর লাঞ্ছনা নিয়ে শূন্যহাতে একদিন ফিরে আসতে হয়েছিল আমেরিকার ‘মাদার অফ ইন্ডিয়া’কে। আজও আক্রমণ নিপীড়ণের মুখে দাঁড়িয়ে স্থৈর্য আর একতার অদ্ভুত উদাহরণস্থল এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাহসিনী কালা বাগাই।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.