অনন্ত জীবনের চাবিকাঠি- কীভাবে নাগাল পাবেন তার?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: জীবন এক দুর্লভ বৈদূর্যমণি। এই দুষ্প্রাপ্য মণি এক জীবনে শুধু একবারই পাওয়া যায়। জন্মান্তরবাদ এক অলীক কল্পনা। মানুষের লোভ লালসা আর ভোগবাসনার কোনও অন্ত নেই। অথচ মানুষের আয়ু বড় ক্ষণস্থায়ী। মহাকাব্যের যুগে তারা তপস্যা করেছে অমরত্বের জন্য। কিন্তু অমরাবতীর দেবতারা মানুষের সেই বাসনা কখনও পূরণ করেননি। কারণ এই নশ্বর পৃথিবীতে জীবের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু। শোনা যায়, একমাত্র পিতামহ ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যুর বর। ইচ্ছামৃত্যু অমরত্বেরই এক বিকল্প। কিন্তু ভীষ্ম অনুভব করেছিলেন অস্বাভাবিক দীর্ঘ জীবন এক অভিশাপ। চোখের সামনে অসহায়ভাবে দেখে যেতে হয় প্রিয়জনদের মৃত্যু, অনাচার, ব্যভিচার, অবক্ষয়। তখন মৃত্যুকেই শ্রেয় বলে মনে হয়।তারপরও আবহমান কাল ধরে মানুষ চেয়েছে নীরোগ দেহে বেঁচে থাকতে বছরের পর বছর। তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নায়ক নিতাই কবিয়াল আক্ষেপ করে বলেছিল: ‘ভালোবেসে মিটিল না সাধ, জীবন এত ছোটো কেনে?’ 

কবি বিদ্যাপতি দীর্ঘজীবী ছিলেন। কিন্তু তিনিও জীবনের উপান্তে পৌঁছে গভীর শোচনার সুরে বলেছিলেন-
আধ জনম হম নিদে গোঙায়লুঁ
জরা শিশু কতদিন গেলা।
নিধুবনে রমণী রসরঙ্গে মাতলুঁ
তোহে ভজব কোন বেলা।
অর্থাৎ, অর্ধেক জন্ম ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। কিছুকাল নষ্ট হয়েছে জরা ব্যাধি আর শৈশবে। যৌবন গেছে নারী ও যৌনতার মোহে। হে ঈশ্বর, আমি তোমার উপাসনা করার সময় পাইনি।

জীবজগতে মানবশিশুর শৈশব দীর্ঘতম। তারপর পড়াশোনা শেষ করতেই জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে যায়। এরপর বিবাহ-সংসার-সন্তানপালনের জাঁতাকলে নিমেষে ফুরিয়ে যায় আমাদের মহার্ঘ পরমায়ু। পড়ে থাকে শুধু জরা ব্যাধি অথর্বতা নিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। এই হল আমাদের একমুঠো জীবনের অসার ইতিবৃত্ত। চারপাশে অনন্ত ভোগের ইশারা, অফুরন্ত আনন্দের হাতছানি। অথচ সেসব পেছনে ফেলে রেখেই মানুষকে চলে যেতে হয় এক অজানা অন্ধকার গন্তব্যে।
এরই মধ্যে শতবর্ষ অতিক্রমকারী মানুষেরা আমাদের কাছে এক পরম বিস্ময়। আমরা ভাবি: দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য কি জিনগত? নাকি খাদ্যাভ্যাসে, জীবনাচরণে লুকিয়ে আছে এর চাবিকাঠি? এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণারও অন্ত নেই।উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন বট, অশ্বত্থ, গিঙ্কো বাইলোবা, ক্রিপ্টোমেরিয়া আর বিশেষ প্রজাতির পাইন (ব্রিসেলকোন পাইন) গাছ অত্যন্ত দীর্ঘজীবী হয়। এদের কারও আয়ু ৫০০, ১০০০, ২০০০, এমনকি তারও বেশি।
‘How long animals live?’
‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ ম্যাগাজিনে এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে:
মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭১ বছর। আবার
মে-ফ্লাই নামের পতঙ্গ মাত্র ২৪ ঘণ্টা বাঁচে। যৌনমিলন এবং ডিম প্রসবের পরেই মারা যায় সে।

ডাইনোসরের থেকেও প্রাচীন প্রাণী মে ফ্লাই। আয়ু মাত্র একদিন

আইসল্যান্ডের সাগরে কিছুকাল আগে একটি কুয়াহগ ঝিনুক পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকেরা জানিয়েছেন সেটির বয়স ৫০৭ বছর। এই প্রজাতির ঝিনুক গড়ে ২২৫ বছর বাঁচে। গভীর সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী Monorhaphis chuni প্রজাতির স্পঞ্জ প্রায় ১১ হাজার বছর বেঁচে থাকে। গভীর সমুদ্রের মাছ অরেঞ্জ রাফি বেঁচে থাকে প্রায় ১৭৫ বছর।
সমুদ্রের আরেক বিস্ময় তিমি। অধিকাংশ তিমি ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকলেও বাউহেড তিমি প্রায় ২০০ বছর বেঁচে থাকতে পারে।

২০০ বছর পরমায়ু এ তিমির

অরেগন চিড়িয়াখানার পরিচালক ডন মুর জানিয়েছেন, গভীর সমুদ্রের নীচে তাপমাত্রা খুব কম থাকে বলে সেখানে বাস করা প্রাণীদের মেটাবলিজমের গতি ধীর, আর সেই কারণেই তাদের টিস্যুর ক্ষয় হয় খুব কম।
জলে ও ডাঙ্গায় বাস করা প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে কচ্ছপ। এই বিশ্বের দীর্ঘতম আয়ুর কচ্ছপটির নাম জোনাথান। অ্যালডেব্রা প্রজাতির এই বিশাল কচ্ছপটির বয়স ১৮৩ বছর।

বহাল তবিয়তে জোনাথন

এসব তো গেল জীবজগতের গল্প। কিন্তু প্রকৃতির সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ? অন্যান্য ইতর প্রাণীদের চাইতে মানুষের ভোগবাসনাই সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। কামনাকে সে প্রেমে রূপান্তরিত করতে পেরেছে। প্রকৃতির অনন্ত রহস্যকে প্রতিদিন অনুসন্ধানের চেষ্টা করে চলেছে সে। সৃষ্টি করেছে কাব্য, সাহিত্য, সঙ্গীত, ললিতকলা আর ভালোবাসার অপরূপ তাজমহল। বিশ্বের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য মানুষের বুকের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি তরঙ্গ সৃষ্টি করে। জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস ক’রে একমাত্র মানুষই সৃষ্টি করতে পেরেছে জাতকের গল্প। সেই মানুষের আয়ুষ্কাল নিয়ে প্রকৃতির এত কার্পণ্য মেনে নেওয়া কি যায়! আরেকটু বেঁচে থাকার হাহাকার তার নিত্যদিনের সম্বল। এই প্রসঙ্গে মনে পরে মহাভারতের পুরু আর যযাতির গল্প।
শুক্রাচার্যের অভিশাপে রাজা যযাতি যৌবনে জরাগ্রস্ত হন। তখনও তাঁর কামনা-বাসনা পূর্ণ হয়নি । শুক্রাচার্য বলেছিলেন, যদি অন্য কেউ তাঁর জরা গ্রহণ করে তা হলে রাজা পুনরায় তাঁর যৌবন ফিরে পাবেন।
স্বদেশে ফিরে
রাজা তাঁর ছেলেদের একে একে ডেকে নিজের কুৎসিত জরার বিনিময়ে তাদের যৌবন দান করতে অনুরোধ করলেন। বিনিময়ে রাজ্যের সিংহাসন এবং যথাসর্বস্ব দান করতে প্রস্তুত তিনি। কিন্তু প্রথম চার ছেলের কেউ-ই বাবার জরার বিনিময়ে নিজেদের মহার্ঘ যৌবন দান করতে সম্মত হল না। কঠিন পিতৃশাপ শিরোধার্য করেও তারা নিজেদের যৌবন হাতছাড়া করতে চাইল না ।
অবশেষে এল ছোটো ছেলে পুরুর পালা।
পুরু-কে কাতর মিনতি করে তার সোনালি যৌবন প্রার্থনা করলেন রাজা। পুরু সেই অথর্ব বৃদ্ধের কাতর মিনতি প্রত্যাখ্যান করতে পারল না। নিজের মহার্ঘ যৌবন পিতাকে সমর্পণ করে পিতার শরীর থেকে ভয়ংকর জরা ডেকে নিল নিজের শরীরে।

যযাতি ও পুরু

হাজার বছর পুত্রের যৌবন ভোগ করে যযাতি পুরুকে তার যৌবন ফিরিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। আর সেই সঙ্গে দান করলেন একটি আশ্চর্য দর্শন:
‘ভোগ করে কখনও ভোগ-বাসনা নিবৃত্ত
হয় না। বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।’ এই সত্যি উপলব্ধি করতে মূর্খ যযাতির হাজার বছর লেগেছিল ?

দীর্ঘজীবী ওকিনাওয়া- রহস্য লুকিয়ে আছে কোথায়?

হাজার হাজার বছর বাঁচতে চায় না মানুষ। তবে সুস্থ শরীরে ১০০ বছর বেঁচে থাকতে চাওয়াটা খুব বেশি বড় চাহিদা নয়। নীরদ সি চৌধুরী, অমলাশঙ্কর, চিলির কবি নিকানোর পাররা, লীলা মজুমদারের মতো আরও অনেকেই শতায়ু সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। শোনা যায় মহাত্মা লালন ফকিরও বেঁচে ছিলেন ১১৮ বছর।

ওকিনাওয়া। জাপানের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বীপভূমি। প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপে রয়েছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শতায়ু মানুষেরা। প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় এখানে শতায়ু ৬৮ জন।
দ্বীপের দুই তৃতীয়াংশ বাসিন্দার আয়ু ৯৪ বছর। এখানকার অধিবাসীদের হৃদরোগ প্রায় হয় না বললেই চলে। ডায়াবেটিস, ক্যানসার, ডিমেনশিয়ার হারও যথেষ্ট কম। এখানকার মানুষেরা বিশ্বাস করেন ‘ইকিগাই’ মতবাদে।
ইকিগাই মানে হল
আনন্দে বেঁচে থাকো। কোনও কিছুর জন্য বেঁচে থাকো। জাপানের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে সব মানুষেরই কিছু না কিছু ইকিগাই আছে। হয়ত সবার আনন্দের ধারণা এক নয়। কিন্তু ইকিগাই থেকেই আসে আনন্দে পরিপূর্ণ দীর্ঘ একটা জীবন।

সৌন্দর্যের খনি ওকিনাওয়া

বিজ্ঞানীরা কিন্তু বলছেন, এই দীর্ঘ জীবনের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে ওকিনাওয়ার বাসিন্দাদের খাদ্যাভ্যাসে। এখানকার বাসিন্দাদের মূল খাবার ভাত নয়, মিষ্টি আলু। নেদারল্যান্ড থেকে এই আলু ওকিনাওয়ায় এসেছিল প্রায় ৪০০ বছর আগে। তাঁদের খাদ্য তালিকায় থাকে প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি এবং সয়া থেকে তৈরি খাবার। এখানকার মানুষেরা মাছ, শুয়োর সহ নানা ধরনের মাংস খান ঠিকই, তবে তা খুবই কম পরিমাণে।
তাঁদের খাবারের মধ্যে থাকে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। তবে ক্যালরি থাকে কম।

ওকিনওয়ার শতায়ু বাসিন্দা

ওকিনাওয়াবাসীর খাদ্য তালিকায় থাকে:
শাকসবজি (৫০/৬০ শতাংশ)— মিষ্টি আলু, সামুদ্রিক গাছগাছড়া, বাঁশের কোঁড়, মুলো, তরমুজ, বাঁধাকপি, গাজর, কুমড়ো, কাঁচা পেঁপে আর ঝিঙে।
দানা শস্য (৩৩ শতাংশ)— বাজরা, গম, চাল ও নুডল।
সয়া ফুড (৫ শতাংশ)— তোফু, মিসো, নাত্তো ও সেদ্ধ করা নোনতা সবুজ সয়াবীন।
মাংস ও সামুদ্রিক খাবার (১ থেকে ২ শতাংশ)— সাদা রঙের মাছ, সামুদ্রিক মাছ, শুয়োরের মাংস
অন্যান্য খাবার (১ শতাংশ)— অ্যালকোহল , চা, হলুদ, মশলা, যত খুশি জেসমিন টি।গার্সিয়ার লেখা বই ‘ইকিগাই’ পৃথিবীর ৫৭টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। জাপানের শতায়ু মানুষেরর সুদীর্ঘ জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যের চাবিকাঠি রয়েছে ‘ইকিগাই’-এর প্রত্যেক পৃষ্ঠায়।

থাকতে চান অমরত্বের ব্লু-জোনে?

জ্যাম বুয়েটনার নামের এক লেখক তাঁর ‘ব্লু জোন’ নামের বইতে পৃথিবীর পাঁচটি অঞ্চলের দীর্ঘায়ু ও নীরোগ মানুষদের জীবনযাপন লক্ষ করেছেন। ব্লু জোনের বহু মানুষ ৯০ বছরের বেশি বাঁচেন, অনেকে শতায়ু হন। এর পেছনে হয়তো জিনগত উপাদানের ভূমিকা থাকতে পারে, তবে তা সামান্যই। দীর্ঘ জীবনের এই ৫ জোন:
১. একারিয়া, গ্রিস
২. ওকিনাওয়া, জাপান
৩. ওগলিযাস, সাবডিনিয়া, ইতালি
৪. লোমা লিন্ডা, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
আর   ৫. নিকোয়াপোনিনসুলা, কোস্টারিয়া

উদ্ভিজ্জ খাবারের উপরে বেশি জোর দেয় এরা। ব্লু জোনের মানুষেরা বছরে মাত্র ১১-১৫ পাউন্ড মাংস খায়। এর ফলে ওবেসিটি বা স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক আর কিছু কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায় অনেক। উদ্ভিজ্জ খাবার ওজন কমায়, দীর্ঘায়ু হওয়ার পথ কিছুটা মসৃণ করে।
ব্লু জোনের লোকেরা উদ্ভিজ্জ খাবার খায় বেশি আর প্রতি মাসে গড়ে মাংস খায় ১ পাউন্ডের কম। উদ্ভিজ্জ খাবারে ক্যালরি অনেক কম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম, বেশি হল ফাইবার আর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট।

হাই ফাইবার ফল আর শাকসবজি

তারা বলে, পেট যখন ৮০ শতাংশ ভরাট মনে হবে, তখনই খাওয়া বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ গলা অবধি খেলে চলবে না। এছাড়া-
১. টেবিলে বসে খাওয়ার সময় বন্ধ রাখতে হবে টিভি, মোবাইল ফোন, ট্যাবের মতো বৈদ্যুতিন ডিভাইস।
২. খেতে হবে সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে।
৩. পেট ৮০ শতাংশ ভরেছে কি না নিশ্চিত না হলে, খেতে খেতে কিছুক্ষণ বিরতি নিতে হবে। খিদে থাকলে তবেই আবার খাওয়া।
৪. দিনের শেষ দিকে সবচেয়ে কম পরিমাণ খাবার:
‘প্রাতরাশ হবে রাজার মতো। দুপুরের খাবার যুবরাজের মতো আর রাতের খাবার হতদরিদ্রের মতো’।
৫. শুধু খাবার নিয়ম নয়, সক্রিয় আর সচল রাখতে হবে শরীরকে। পরিমিত মাত্রায় শরীরচর্চা, হাঁটাহাঁটি অথবা সাইকেল চালানো। সঙ্গে অবশ্যই করতে হবে ঘর-গেরস্থালি আর বাগানের কাজ।
সার্ডিনিয়ান মানুষেরা পাহাড়ে ওঠে হেঁটে। সেখানে তারা চাষবাস করে, ফলত তারা দীর্ঘায়ু। দেখা গেছে, যারা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন করে, তারা অন্যদের চাইতে অনেক কম দিন বাঁচে।

সার্ডিনিয়ার পাহাড়ি মানুষ

৬. ডেস্কে বসে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় একবার উঠে পাঁচ মিনিট হাঁটতে হবে।
৭. ঘরের দরজা থেকে কিছু দূরে গাড়ি পার্ক করতে হবে। বাজারে হোক বা কাছাকাছি বন্ধুর বাড়ি- হেঁটে যাওয়াআসা করাই মঙ্গলের।
৮. দীর্ঘজীবনের আসল কথাই হল মানসিক চাপ থেকে মুক্তি। প্রত্যেক মানুষেরই মানসিক চাপ থাকে। ব্লু জোনের মানুষেরা স্ট্রেসকে মোকাবিলা করে ঈশ্বর প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে। তারা ধ্যান করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমোয়। ফলে এদের প্রদাহ, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কম।

যেসব কাজকর্ম মনে আনন্দ ও সুখ আনে, সেগুলোর একটা তালিকা করুন মনে মনে। যেমন দীর্ঘপথ হাঁটা, বেড়ানো, বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলা, যোগাসন ধ্যান এসব। বন্ধুবান্ধব ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটান।৩৪ বছর দীর্ঘ এক গবেষণায় দেখা গেছে একাকিত্ব ও সমাজবিচ্ছিন্নতা মানুষকে অবসাদগ্রস্ত করে, এগিয়ে আনে মৃত্যুকে। তাই চাপ দুরতিক্রম্য মনে হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

ইতিহাস বলছে, বিশ্বের প্রবীণতম ব্যক্তি ১৫২ বছর বেঁচে ছিলেন। তার নাম টমাস ‘ওল্ড টম’ পার। তার জন্ম ১৪৮২ সালে, মৃত্যু ১৬৩৫ সালে। তিনি ছিলেন একজন ইংরেজ।
ইংল্যান্ডের শ্রিউসবারি জাদুঘর এবং আর্ট গ্যালারিতে টমাসের একটি প্রতিকৃতি আজও রয়েছে। সেখানকার শিলালিপিতে লেখা আছে: ‘টমাস ১৫২ বছর ৯ মাস বয়সে মারা যান।’

টমাস ওল্ড টম

খুবই হতদরিদ্র এক মানুষ ছিলেন টমাস। খামারে কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রথম স্ত্রী জন টেইলরের মৃত্যুর পর ১০০ বছরেরও বেশি বয়সে টমাস পুনরায় প্রেমে পড়েন। বিয়েও করেন। এই বয়সে তিনি এক সন্তানের পিতাও হন। টমাসের যখন ১১০ বছর বয়স তখন তিনি জেন লয়েড নামে এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করেন। তাঁরা ১২ বছর একসঙ্গে সংসার করেছিলেন।রাজা প্রথম চার্লস একবার বিশ্বের এই প্রবীণতম ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেন লন্ডনে। চার্লস তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, অন্য মানুষের চেয়ে তাঁর দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য কী? টমাস জানান, তিনি ১০০ বছর বয়স থেকেই তপস্যা করছিলেন।

টমাসের সঠিক বয়স জানতে শবব্যবচ্ছেদ

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্রম উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গড় আয়ু অনেক এখন বেড়ে গেছে।  বর্তমান তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তির নাম জিন ক্যালমেন্ট। তিনি ১২২ বছর বয়সে মারা যান। অন্যদিকে বিশ্বের জীবিত প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কেন তানাকা, যার বয়স ১১৮ বছর। দ্বিতীয় ব্যক্তি সুর অ্যান্ড্রে। তার বয়স ১১৭ বছর এবং তৃতীয় ব্যক্তির নাম ফ্রান্সিসকা সেলসো ডস সান্টোস, তার বয়স ১১৬ বছর।

কী বলছেন বিজ্ঞানীরা ?

আপনি যদি চা ভালোবাসেন তবে দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কারণ চায়ে রয়েছে ক্যাটাচিন নামের একধরনের রাসায়নিক, যা রক্তনালি প্রসারিত করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। তবে চায়ের সঙ্গে দুধ ও চিনি মেশালে এর গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।
যদি দ্রুত গতিতে হাঁটার অভ্যাস থাকে, তবে আপনার দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনা প্রবল। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দৈনিক ৩০ মিনিট হাঁটেন তাঁরা তুলনায় কম হাঁটা লোকজনের চেয়ে চার গুণ বেশি বাঁচেন। সম্প্রতি প্রায় আড়াই হাজার নারী-পুরুষের ওপর করা এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।বার্গার ও কোমলপানীয় বাদ দিন। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সোডাজাতীয় কোমলপানীয় খেলে মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকি থাকে। এর ফলে শরীরে বিপাকক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। মেদ জমে। উচ্চরক্তচাপও দেখা দেয়। হৃদরোগ আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের গবেষণায় জানা গেছে, লাল মাংস বা রেড মিট (গরু, ছাগল ও ভেড়ার মাংস) দিয়ে তৈরি বার্গার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দৈনিক ১৮ আউন্সের বেশি লাল মাংস খেলে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।আপনার পা সুগঠিত করুন।। আপনার শরীরের নীচের অংশ অর্থাৎ কোমর থেকে পা পর্যন্ত সুগঠিত হলে দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। একথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ইন্টারন্যাশনাল লঞ্জিভিটি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট রবার্ট বাটলার।
লাল বা কালো আঙুর খান। নিয়মিত লাল বা বেগুনি রঙের ফল, বিশেষ করে কালো বা লাল আঙুর খেলে দীর্ঘ জীবনের সম্ভাবনা থাকে। এই জাতীয় ফলে প্রচুর পরিমাণে পলিফেনল থাকে, যা রক্তনালি সুস্থ রাখে। স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও কমে।

শতায়ু হওয়ার রহস্য নিয়ে মানুষের আগ্রহের অন্ত নেই। শতায়ুদের জীবনযাপন কেমন? সুস্থতার জন্য কী কী করা উচিত? শতায়ুদের জীবন জরিপ করে উঠে এসেছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য:

১. এঁরা কখনও রাগ করেন না। জীবনযাপনের বেশিরভাগ সময় এঁরা থাকেন শান্ত। হতাশাকে প্রশ্রয় দেন না এঁরা। তাই আশাবাদী হোন, আবার চেষ্টা করুন।
৩. নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে শরীরের গঠন ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিন। এর ফলে মাথাসহ সারা দেহেই বাড়তি অক্সিজেন পৌঁছে যায়। মস্তিষ্কের কোষগুলো নতুন করে জীবনলাভ করে। ফলে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে, আর শরীরও সঠিকভাবে কাজ করে।
৪. খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ আনুন।
গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য প্রচুর সবজি, ফলমূল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, বীজ ও মটরশুটির মতো খাবার নিয়মিত খেতে হবে। এ ছাড়াও খাবেন দানাদার ও অপরিশোধিত খাবার, মাছের তেল ও অলিভ অয়েল।
৫. দুগ্ধজাত খাবার, মাংস ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে আপনি সুস্থ হৃৎপিণ্ড ও দীর্ঘ জীবন পাবেন।
৬. প্রাণ খুলে হাসুন।
চিনের এক প্রবাদে আছে: যারা বেশি হাসেন, তাদের বয়স অন্তত দশ বছর কমে যায়। আসলে হাসি আমাদের শরীর ও মনকে প্রসন্ন করে; মানসিক উত্তেজনা কমায়; শরীরের রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে; রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতাও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই, নিয়মিত হাসুন।৭. সময়মত ঘুমোন। অযথা রাত জাগবেন না।
তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে খুব ভোরে জেগে ওঠার অভ্যাস একজন মানুষকে স্বাস্থ্যবান রাখে।
৮. গান শুনুন। যন্ত্রসংগীত শুনুন।সুরের মায়ায় সারাদিনে কিছুক্ষণ অন্তত ডুবে থাকুন।
৯. প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে থাকুন।
অপ্রিয় মানুষ, অপছন্দের ঘটনা, নিরানন্দ পরিবেশ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকুন।
১০. দীর্ঘ আয়ু
 লাভের পেছনে বংশধারার ভূমিকা রয়েছে। অনেকেরই জিনে দীর্ঘজীবনের রহস্য লুকোনো থাকে। তবে সুস্থ জীবনযাপন-রীতি জিনগত সীমাবদ্ধতাকেও অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। সুতরাং ক্ষীণায়ুর বংশেও শতায়ুর দেখা মিলতে পারে।

হুইস্কি দিতে পারে দীর্ঘজীবন?

তেমন দাবিই জানিয়েছিলেন ব্রিটেনের গ্রেস জোনস নামের ১১২ বছরের এক মহিলা। তিনি নিজের মুখেই জানিয়েছিলেন তাঁর সুস্থ জীবনের রহস্য।
নিজের এই সুস্থ ও দীর্ঘ আয়ুর যাবতীয় কৃতিত্ব হুইস্কিকেই দিয়েছেন তিনি।
ব্রিটেনের ওয়র্কসের বাসিন্দা এই বৃদ্ধা তাঁর ৫০ বছর বয়স থেকে প্রত্যেকদিন রাতে ১ পেগ করে হুইস্কি খান। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন জীবনে। ২৬ জন প্রধানমন্ত্রীর আমলে বেঁচেছেন এই মহিলা। তাঁর বন্ধুরা তাঁকে ‘অ্যামেজিং গ্রেস’ নামে ডাকতেন। বিগত ৬০ বছর ধরে বিখ্যাত গ্রাউস সিঙ্গল মল্ট হুইস্কি খেতেন তিনি।
রাতে এক পেগ হুইস্কি কোনওদিন মিস করতেন না
এই বিস্ময়কর মহিলা। ২০০৯ সালে ১১২ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে অব্দি দিব্যি সুস্থই ছিলেন। নিয়মিত শপিং করতেও যেতেন নাতিপুতিদের সঙ্গে।

এক পেগ হুইস্কিই না কি তাঁর দীর্ঘজীবনের চাবি

অন্য এক বিস্ময়-মানবী লুইজ সিগনোর। জন্ম ১৯১২ সালে ম্যানহাটনে। তাঁর শৈশব কেটেছে সেখানেই৷ চোদ্দ বছর বয়স থেকে পাকাপাকিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হয়ে যান তিনি৷ ছোটবেলায় ঘুম থেকে উঠে শরীরচর্চা করতেন লুইজ৷ নাচের ক্লাসে যাওয়াও তাঁর বরাবরের অভ্যাস৷ কখনও কোনওদিন নিজের কাজ করতে অন্য কারও সাহায্য নেননি৷ এভাবেই জীবনের ১০৭টি বসন্ত পার করেছেন লুইজ৷ আজও বদলায়নি তা৷
১০৭ বছরের জন্মদিনে নিজেই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ওই বৃদ্ধা৷ এক রেস্তরাঁয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বৃদ্ধার আত্মীয়, বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন৷ গোলাপি রংয়ের পোশাক এবং মুক্তোর হারে সেজে দিব্যি হাসি হাসি মুখে কেক কাটেন৷ বৃদ্ধার বয়স শুনেই চোখ কপালে উঠছে প্রায় সকলের৷ কীভাবে এমন দীর্ঘায়ু হলেন ওই বৃদ্ধা? উত্তরে তিনি বলেন : ‘‘আমি বিয়ে করিনি৷ আমি মনে করি এটাই আমার ১০৭ বছর বয়সের গোপন চাবিকাঠি৷”

সত্যি সত্যি দীর্ঘজীবনের রহস্য তাহলে কী? জিন? খাদ্যাভ্যাস? হাসিখুশি থাকা? জীবনচর্যা? না কি অন্য কিছু? প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর…

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More