গণ্ডগ্রাম থেকে সাঁতরে গিনেস বিশ্ব রেকর্ড, শেষ জীবনে রাজনীতির শিকার এই বাঙালি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরুলিয়ার মানভূম অঞ্চলের এক গণ্ডগ্রামে জন্ম হয়েছিল সেই অসম্ভব জেদি ছেলেটির। লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্য যে প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় লন্ডনে গিয়ে রাতের স্টেশনে কুলিগিরি করে ব্যারিস্টারি পড়ার খরচ জোগাড় করত। একই বছরে পাঁচ-পাঁচটি দুর্গম সামুদ্রিক জলপথ অতিক্রম করার জন্য তার নাম অক্ষয় হয়ে আছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে। ডোভারের দিক থেকে যাত্রা করে ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হওয়াটা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। সেই কঠিন সন্তরণে সাফল্যের জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। কিছুকাল পর তার শিরোপায় যোগ হয় পদ্মভূষণ উপাধিও। সেই ছেলে আর কেউ নয়, বিখ্যাত সাঁতারু মিহির সেন১৯৩০ সালের ১৩ নভেম্বর মানভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মিহির সেনের জন্ম। বাবা রমেশচন্দ্র সেনগুপ্ত পেশায় চিকিৎসক হলেও সচ্ছল ছিলেন না। কারণ তাঁর রোগীরা ছিল মূলত দরিদ্র গ্রামীণ মানুষ। মোটা ফি’জ দেবার সামর্থ্য তাদের ছিল না। ফলে বাড়িতে পোষা গরুর দুধ আর হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে সংসার প্রতিপালনে সাহায্য করতে হত মা লীলাবতীকে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় মিহির। তাঁর উচ্চশিক্ষার জন্য মায়ের ইচ্ছায় সেন পরিবার পুরুলিয়া ছেড়ে চলে আসে উড়িষ্যার কটকে। মেধাবী ছাত্র মিহির উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আইন কলেজ থেকে সসম্মানে ল পাশ করেন। মিহিরের প্রবল ইচ্ছে, বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়বেন। কিন্তু বাবার সামর্থ্য নেই ছেলেকে বিলেতে পাঠাবার। অগত্যা মিহির হাজির হন উড়িষ্যার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়কের কাছে। একাধিকবার ফিরিয়ে দেবার পর বিজু পট্টনায়ক মিহিরের হাতে তুলে দেন মাত্র দশ পাউন্ড আর জাহাজের তৃতীয় শ্রেণির একটি টিকিট। সেটা ১৯৫০ সাল। মিহির সেনের বয়স তখন কুড়ি।বিদেশ বিভুঁইয়ে লেখাপড়া আর বেঁচে থাকার জন্য যে কোনও একটা কাজ খুব প্রয়োজন। কিন্তু কাজ পাওয়া সহজ নয়। অগত্যা তিনি রাতের রেলস্টেশনে কুলির কাজে যোগ দিলেন। দিনে পড়ার চাপ, রাতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। বেশিদিন চলল না এভাবে। ইংল্যান্ডে ভারতের রাষ্ট্রদূত তখন কৃষ্ণ মেনন। অনেক চেষ্টায়, অনেক অনুরোধে ভারতীয় দূতাবাসে (ইন্ডিয়া হাউস) একটা কাজ জুটে যায় মিহিরের। দিনে কাজ করতেন আর রাতে পড়াশোনা চলত লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে এসে। সেখানেই পরিচয় হয় এক বিদেশিনী টাইপিস্ট বেলা ওয়েনগার্টেনের সঙ্গে। এই বেলাকেই মিহির সেন পরবর্তীকালে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বরণ করেন।১৯৫৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টারি পাশ করেও দেশে ফিরে আসা হল না তাঁর। সৌভাগ্যের দেবতা তাঁর জন্য অন্য এক অপ্রত্যাশিত দিগন্ত উন্মোচিত করে দেন। একটি ইংরেজি জার্নালে প্রকাশিত একটি ছবি ও সংবাদে তাঁর চোখ আটকে যায়। ফ্লোরেন্স চাদউইক নামে এক আমেরিকান তরুণীর প্রথম ইংলিশ চ্যানেল জয়ের সংবাদ তাঁকে প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত করে। তাঁর মনে হয়, একজন নারী যদি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে পারে তাহলে স্বাধীন ভারতের একজন তরুণ কেন পারবে না?

আমেরিকান সাঁতারু ফ্লোরেন্স চাদউইক

কিন্তু গ্রামাঞ্চলের নদী ও দিঘিতে সাঁতার কাটা আর দুর্গম ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার মধ্যে যে হাজার যোজন পার্থক্য আছে তা অনুভব করতে বেশি সময় লাগল না এই বাঙালি তরুণের। ইংলিশ চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ৫৬০ কিলোমিটার, প্রস্থ ২৪০ কিলোমিটার, গড় গভীরতা ২০৭ ফুট, সর্বোচ্চ গভীরতা ৫৭১ ফুট, জলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই পথ সাঁতরে পেরোতে ট্রেনিংয়ের জন্য অনেক টাকার দরকার। সামান্য কেরানির বেতনে তা সম্ভব নয়। কিন্তু মিহির সেন সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। অর্থ-সাহায্য চেয়ে তিনি চিঠি লিখলেন খোদ জওহরলাল নেহেরুকে। অপ্রত্যাশিতভাবে সামান্য হলেও অর্থ সাহায্য পাঠালেন নেহেরু। তাতে ট্রেনিং হল বটে, কিন্তু ভালো ট্রেনার রাখা গেল না।

জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে মিহির সেন

বই পড়ে আর আমেরিকান সাঁতারুদের সাঁতার দেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন মিহির। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ৬ বার নানা দুর্যোগে ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করতে ব্যর্থ হন তিনি। লোকে তাঁকে মজা করে বলত Pluckiest swimmer অর্থাৎ ভয়ংকর জেদি সাঁতারু। অবশেষে ১৯৫৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সপ্তম বারের প্রচেষ্টায় ১৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সাঁতরে ফ্রান্সের তীরে পৌঁছোতে পেরেছিলেন মিহির সেন। সেদিন ভোরবেলা জলে-ভেজা ভারতের জাতীয় পতাকা মাথার উপরে তুলে ধরে মিহির সেন গেয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত। সেই সঙ্গীতের সুর সেদিন ইংলিশ চ্যানেলের তরঙ্গধ্বনিকেও ছাপিয়ে উঠেছিল।পরের বছর ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করেন। স্বয়ং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাঁকে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন জানান। কিন্তু মিহিরের চোখে তখন সপ্ত সিন্ধু জয়ের স্বপ্ন।
তাঁর ‘অপারেশন সেভেন সিজ’ শুরু হয় ১৯৬৬ সালে। এই অতিলৌকিক বছরটিতে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর আর্থিক আনুকূল্যে একের পর জয় করেন
১) শ্রীলঙ্কা ও ভারতের
মধ্যবর্তী জলপ্রণালী যা ‘পক স্ট্রেট’ নামে পরিচিত।
২) ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ‘স্ট্রেট অব জিব্রাল্টার’ অর্থাৎ জিব্রাল্টার প্রণালী।
৩) উত্তর-পশ্চিম তুরস্কের ‘ডারডেনেলস’ জলপ্রণালী।
৪) ইস্তানবুলের ‘মারমারা সাগর’ ও ‘কৃষ্ণসাগরের’ সংযোগকারী ‘বসফোরাস জলপ্রণালী’।
৫) উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবিয়ান সাগরের সংযোগকারী ৫০ মাইল দীর্ঘ পানামা ক্যানাল।

উপগ্রহ চিত্রে ইংলিশ চ্যানেল

এইসব অভিযান ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। তীব্র জলস্রোত, বরফের মতো হিম তরঙ্গ, হাঙর, সরীসৃপ, অক্টোপাসের ভয় অক্লেশে অগ্রাহ্য করে এই বাঙালি তরুণ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে রাখেন। ১৯৬৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করেন।
মিহির সেন নিজের এইসব কীর্তি প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘আমি এইসব বিপজ্জনক সাঁতার অভিযান করেছিলাম খ্যাতি বা পুরস্কারের আশায় নয়। আমি কেবল পৃথিবীর মানুষকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা ভারতীয়রা আর ভীত নই, আমরাও পারি।’
সেকালের বিখ্যাত ব্লিৎস পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছিল: “হোয়াট ফিয়ার হ্যাজ় মাদার ইন্ডিয়া, হোয়েন/শি ব্রিডস সনস লাইক মিহির সেন!”
সারা দেশে ও বিদেশে মিহির সেন তখন এক বিস্ময়কর নক্ষত্র-প্রতিম ব্যক্তিত্ব।কলকাতায় ফিরে এসে মিহির সেন আইনব্যবসার পাশাপাশি রেশম রফতানির ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। মেয়ে সুপ্রিয়ার নামে কলকাতার রাসেল স্ট্রিটে একটি সিল্ক-বস্ত্রের শোরুমও তৈরি করেন তিনি। থাকতেন আলিপুরের জাজেস কোর্টের আবাসনে। কিন্তু এর ১০/১১ বছর পরেই বামপন্থীদের সঙ্গে মতানৈক্যের ফলে মিহির সেনের সুন্দর সচ্ছল জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তৎকালীন বামপন্থী নেতারা তাঁকে শ্রেণিশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার অবধারিত ফল হিসেবে জঙ্গি শ্রমিক ইউনিয়নের টানা আন্দোলনে মিহির সেনের পল্লবিত হয়ে ওঠা সিল্কের ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে।১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জ্যোতি বসু মিহির সেনকে তাঁর পক্ষে প্রচারকার্যের জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে সরকারি আমলা পদের লোভও দেখান। কিন্তু মিহির সেন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্দল প্রার্থী হিসেবে পরদিনই নিজের কাগজপত্র দাখিল করেন।বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হবার পর অপমানের বদলা নিতে উঠে পড়ে লাগলেন জ্যোতি বসু। খিদিরপুরে মিহির সেনের প্রতিষ্ঠানে গঠিত হল বামফ্রন্ট পরিচালিত CITU. ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হল সেখানে। শুরু হল নিত্য অশান্তি ও ধর্মঘট। রাসেল স্ট্রিটের ‘সুপ্রিয়া’ নামের দোকানটিও মাঝেমাঝেই চরম অশান্তিতে জড়িয়ে প​ড়ত​। দোকান অবরোধ করে প্রায় প্রতিদিন চলত সিটুর ধর্মঘট। খিদিরপুরের পোশাকের কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে প​ড়ে মিহির সেনের আরও দুটি কারখানা​। রফতানির জন্য প্রস্তুত জামাকাপড় ভর্তি ট্রাক পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ প্রায় নির্বাক দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে সেই অগ্নিকাণ্ড। তারপর একটার পর একটা সাজানো কেসে ফাঁসিয়ে দেওয়া হল মিহির সেনকে। পুলিশ এসে ঘন ঘন হানা দিত তাঁর বাড়িতে, অফিসে, কারখানায়। নগদ টাকা, সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়।
শোনা যায়, কোর্টে হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে বামপন্থী উকিলরা টিটকারি মারত এই সর্বহারা দম্পতিকে।
ভয়ংকর হতাশায় আর প্রবল চাপের মুখে ক্রমশ দুরারোগ্য অ্যালজ়াইমার্স আর পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। স্ত্রী ও কন্যারা চরম অসহায় বোধ করেন। কেন্দ্রীয় সরকার মিহিরের জন্য সামান্য এক হাজার টাকা মাসোহারার ব্যবস্থা করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এককালীন কিছু অর্থ সাহায্য করেন। সেও তেমন কিছু না। এক প্রখ্যাত সমাজসেবী মিহিরের রোগশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে লিখেছেন:
‘দেখি তিনি বিছানায় পড়ে আছেন। সেবাযত্ন করার কেউ নেই। পাড়াতেও কেউ তাঁর খবরই রাখে না! মিহিরের স্ত্রী ও আপনজনেরা তাঁকে ফেলে রেখেছিলেন আর্থিক ও মানসিক চাপ সামাল দিতে না পারার কারণে। এ ছাড়া তাঁদের করারও কিছু ছিল না।’

অবশেষে ৬৬ বছর বয়সে (১১ জুন ১৯৯৭), হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই কিংবদন্তি সাঁতারু, এই সামুদ্রিক আলবাট্রস মিহির সেন। শ্মশানে তাঁর শেষযাত্রায় কোনও ভারতীয় সাঁতারু কিংবা সরকারপক্ষের কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

১৯৮৮ সালে জ্যোতি বসু না কি ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিধ্বস্ত ও রিক্ত মিহির সেনকে। বলেছিলেন বামফ্রন্টে যোগদান করতে। তাহলেই তাঁর সব দুঃখের অবসান হবে। কিন্তু মিহির সেন সেদিন একবাক্যে উড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই প্রস্তাব। ফলত অবধারিতভাবেই তাঁর জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল​। মিহির সেনের মৃত্যুর পর মেয়ে সুপ্রিয়া লন্ডন থেকে এসে আলিপুরের ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখেন, কে বা কারা সবকিছু লন্ডভন্ড​ করে চলে গেছে। তাঁর বাবার পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ মেডেল দুটিসহ আরও কিছু স্মারক চুরি হয়ে গেছে। ফোনে কারা যেন হুমকি দিচ্ছে ফ্ল্যাট খালি করে দেবার জন্য। এভাবেই শেষ হয়ে যায় কিংবদন্তি সাঁতারু মিহির সেনের ট্রাজিক জীবন।
আজকের দিনে প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেছিলেন। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More