বিশ্বকর্মার দুই ছেলে নল আর নীল একসময় পূজিত হতেন বাংলায়

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাঙালির কাছে চিরকাল দুর্গা পুজোর আগমনীবার্তা নিয়ে আসে বিশ্বকর্মা পুজো। সুদর্শন এই বিশ্বকর্মা ঠাকুর চেহারা আর স্টাইলে অনেকটাই কার্তিক ঠাকুরের মতন, তবে বিশ্বকর্মার চার হাত আর সঙ্গে বাহন হাতি। লুকে যাকে বলে একদম ইঞ্জিনিয়র। আইবুড়ো কার্তিকের চেয়ে বিশ্বকর্মা যেন একটু বেশি পুরুষালি। শুধু হাতি সহ বিশ্বকর্মা মূর্তি দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু পু্রোনো কলকাতায় একসময় বিশ্বকর্মার সঙ্গে দেখা মিলত তাঁর দুই পুত্রেরও। আজও লক্ষ্মী পুজোর সময় লক্ষ্মী ঠাকুরের পাশে দেখা মেলে দুই বোন জয়া আর বিজয়ার। তেমনই বিশ্বকর্মার সঙ্গেও থাকতেন দুই পুরুষরূপী দেবতা। পুরোনো কলকাতায় বা গ্রামবাংলায় দেখা মিলত এরকম তিন জনের বিশ্বকর্মা মূর্তি। মাঝে বিশ্বকর্মা আর দুপাশে তাঁর দুই ছেলে। বাংলা পুরাণমতে বিশ্বকর্মার দুই ছেলের নাম ছিল নল ও নীল। কিন্তু কালের স্রোতে আর আর্থিক মন্দার বাজারে এমন মূর্তি বানানোর চল উঠে গেছে অনেকদিন। বছর কিছু আগেও পুরোনো কলকাতায় এমন তিন ফুলবাবুর দেখা মিলত বিশ্বকর্মা পুজোতে।বিশ্বকর্মার মতোই দেখতে দুই বাবু গোছের মূর্তি থাকত বিশ্বকর্মার দুপাশে। প্রচলিত মতে তাঁরা হলেন বিশ্বকর্মার দুই ছেলে নল ও নীল। কিন্তু আদতে বিশ্বকর্মার দুই পুত্র ছিল দুই বানর।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার নাভি থেকে বিশ্বকর্মার জন্ম। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা চতুর্ভুজ। তাঁর এক হাতে দাঁড়িপাল্লা, অন্য হাতে হাতুড়ি, একহাতে ছেনি, আরেক হাতে কুঠার। দাঁড়িপাল্লার পাল্লা দুটো জ্ঞান ও কর্মের প্রতীক।
পৌরাণিক বিশ্বকর্মা দেখতে কিন্তু অনেক বেশি বৃদ্ধ। কোনওভাবেই তাঁর চেহারা বাংলার তরুণ বিশ্বকর্মার সঙ্গে মেলেনা। বৃদ্ধরূপী বিশ্বকর্মা বাংলার বাইরে সর্বজনবিদিত। কিন্তু বাঙালিদের বেশ হোঁচট খেতে হয় এমন সাদা দাড়ির বিশ্বকর্মা দেখলে। ব্রহ্মার নাভি থেকে যেহেতু দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার জন্ম, সেহেতু বিশ্বকর্মার রূপেও ব্রহ্মার একটা ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। বৃদ্ধ বিশ্বকর্মার বাহন হল হাঁস। হাতির অস্তিত্ব তৈরি হয় পরে। মালবাহী প্রাণী হিসেবেই দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার বাহন হাতি হয় বাঙালি পুরাণ মতে।এঁর পাঁচ পুত্রের সন্ধানও মেলে। আবার বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞার পরিচয় তো সর্বজনবিদিত। যে সংজ্ঞার স্বামী ছিলেন সূর্যদেব। অর্থাৎ বিশ্বকর্মার জামাই সূর্য।
কিন্ত রামায়ণে মেলে বিশ্বকর্মার আরো দুই বানররূপী পুত্র নল ও নীলের কথা। আবার কারও মতে নীল ছিলেন অগ্নিদেবের পুত্র। নলের গায়ের রং ছিল শ্বেত পদ্মের মতো। আর নামানুসারে নীলের গায়ের রং ছিল নীল।
সীতা উদ্ধারে রামের লঙ্কা যাওয়ার সুবিধার জন্য বানরদের সঙ্গে সমুদ্রের ওপর সেতু নির্মাণ করেছিলেন নল ও নীল দুই বানর। ভারতের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত রামেশ্বরম থেকে লঙ্কার (যা বর্তমানে শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্র) মান্নার অব্দি বিস্তৃত বিশাল একটি সেতু নির্মাণের অন্যতম পরিকল্পক ছিলেন বানর নল। সেতুটি লঙ্কা দ্বীপ ও ভারতীয় ভূখণ্ডকে যুক্ত করে। এটি ‘রাম সেতু’ বা পরিকল্পক নলের নামে ‘নল সেতু’ নামেও পরিচিত। এই ‘রাম সেতু’ নির্মাণে রামের বানর সেনার অপর এক প্রযৌক্তিক বানর ও নলের ভ্রাতা নীলের নামও পাওয়া যায়। নলকে বানরদের স্থপতি বা স্থাপত্যশিল্পী হিসাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। রাক্ষসদের মধ্যে স্থাপত্য নির্মাণে যেন ময়দানবের খ্যাতি ছিল। তেমনি বানরকূলে নল ও নীল বানরেরা ছিলেন নামজাদা বানর স্থাপত্যবিদ। কারণ তাঁরা ছিলেন বিশ্বকর্মার অংশ।বিষ্ণু যেমন রাম অবতারে জন্মগ্রহণ করেন, তেমনি দুষ্টের দমনে রামকে সাহায্য করতে বানররূপে অন্য দেবতারাও জন্মগ্রহণ করেন ব্রহ্মার নির্দেশে। বিশ্বকর্মা, অগ্নি, বায়ু সবাই বানররূপে রামকে লঙ্কাপতি রাবণ বধে সাহায্য করার জন্যই জন্ম নেন।
আবার পৌরাণিক দ্বিমত আছে এই নল ও নীলের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে।
এক বানরীর রূপ যৌবনে একবার মত্ত হয়েছিলেন বিশ্বকর্মা আর সেই ক্ষণিকের বানরী-প্রেমেই বিশ্বকর্মার ঔরসজাত দুই সন্তান হলেন নল ও নীল। তাই তাঁরা বানর হয়ে জন্মালেও স্থাপত্যশিল্পে বিশ্বকর্মার গুণাবলী পেয়েছিলেন।

পৌরাণিক ‘নীল’

নল আর নীল বানর হওয়াতে ছোটোবেলাতে খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। দেবতাসহ মুনি ঋষিদের জিনিসপত্র ওঁরা খেলার ছলে দুই ভাই ছুঁড়ে ফেলে দিতেন সাগরে। বালক বলে তাঁদের বারবার ক্ষমা করে দিতেন দেবঋষিরা। কিন্তু নল-নীলের এই দুষ্টুমি স্বভাব বেড়েই চলল। একদিন এক ঋষির পুজোর সামগ্রী নল-নীল ফেলে দিয়েছিলেন সাগরে। তখন সেই ঋষি দুই বালককে অভিশাপ দেন তাঁরা কোনও জিনিস সাগরে ফেললেও সেটা ডুববে না, ভেসে উঠবে। যাতে মুনি-ঋষিরা হারানো সামগ্রী খুঁজে পান সহজে তাই এমন অভিশাপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সে অভিশাপ শাপে বর হল দুই ভাইয়ের। যৌবনে বানর বাহিনীতে যোগ দেন দুই ভাই।

বানরবাহিনী

এই নল ও নীল কিন্তু বানর বাহিনীতে হনুমান, সুগ্রীব বা জাম্বুমানের থেকে বয়সে ছিল অনেক ছোটো ছিল।দক্ষিণ সাগরতীরে এসে বিশাল সাগর পেরোনো রাম লক্ষ্মণের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করলেন তখন সুগ্রীব হনুমানরা। কিন্তু তাঁরা যত পাথরই জলে সাজান সব পাথর সাগরের জলে ডুবে যায়। তাহলে উপায়? কিষ্কিন্ধ্যার যাবতীয় ঘর-বাড়ির কারিগর ছিলেন নল। তখন রাম গেলেন নলের কাছে। নল ও নীল দুজনেই কারিগরী বিদ্যায় চৌখশ। রাম বললেন যে তোমাদের মতো দুই ভাইয়ের নির্মাণবিদ্যায় এমন গুণ আছে অথচ আমায় সাহায্য করছনা কেন?
নল বললেন রামকে, “দেখুন আমাদের দলে সকলেই প্রায় আমার চেয়ে বড়। হনুমান, সুগ্রীব, অঙ্গদ, জাম্বুবান, এদের মধ্য থেকে এগিয়ে ‘আমি পারি’ বলে অহংকার করলে সেটা খারাপ দেখাত। তাই আমি আপনার আদেশের অপেক্ষায় ছিলাম। আমি দেবতা বিশ্বকর্মার ছেলে, জহ্নুমুনির কাছে মানুষ হয়েছি। কারিগরী আমাকে শিখিয়েছেন স্বয়ং ব্রহ্মা- কাজেই কৌশল আমি জানি।”রাম সশরীরে নলের কাছে যাওয়াতে হনুমানের আঁতে ঘা লাগল। কারণ রামের কাছে সীতার খবর এনে দিয়ে রামভক্ত হিসেবে হনুমান বেশ নাম কিনেছিল সেটা এসে খর্ব করে দিল নল। হিংসায় বড় বড় পাথর এনে হনুমান সাহায্যর অছিলায় ফেলতে লাগলেন নলের উপরে। রামকে নল নালিশ করায় রাম হনুমানকে তলব করলেন তার ঘরে। রামের ধমক খেয়ে হনুমানের রোশ আরও বাড়ল। হনু ভাবলেন কালকের ছোঁড়া নল আমার উপর খবরদারি করবে! আজ দেখব তার কত সাহস! বড়দের সঙ্গে এই আচরণ!

যাই হোক হনু-নলের বিবাদ বেড়ে চলতে থাকলে তাঁর সমাধান করলেন রামই। কারণ পাথর ভাসিয়ে রাখার বরপুত্র ছিল শুধু নল নীল দুই ভাই। বানরবাহিনীর অংশ হিসেবে তাঁরা থাকায় হনুমানের রাগ কমল।
যে সেতু নল ও নীল বানিয়েছিল ভারত আর অধুনা শ্রীলঙ্কার মধ্যে তা রাম সেতু বা নল সেতু নামেই পরিচিত হল। ‘রাম সেতু’ হাজার হাজার বছর আগে ছিল এমন লোকমুখে প্রবাদ আছে। সাইক্লোনে নাকি ধ্বংস হয়ে গেছিল সেই সেতু। যার উপর দিয়ে লঙ্কায় সীতা উদ্ধারে পৌঁছোন রাম। নল আর নীল যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি কৃত্তিবাসী রামায়ণে উল্লেখ আছে নীল রাবণের মাথার ওপর উঠে প্রস্রাব করে রাবণকে অশুচি করেন ও তার যজ্ঞ পণ্ড করেন। মহাভারতে বর্ণিত আছে যে নীল প্রমথি নামে এক রাক্ষসকেও যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত করেন।রামায়ণে রাম রাবণের যুদ্ধে নল ও নীল মারা যান রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদের হাতে। আবার জৈন গ্রন্থ অনুসারে নল জৈনধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং বর্তমান মহারাষ্ট্রে অবস্থিত মাঙ্গী-তুঙ্গীর নিকট মোক্ষলাভ করেন।
যুগে যুগে ঘটনার প্রবাহে বদলে বদলে গেছে নল ও নীল উপাখ্যান। লোকমতেও তাঁদের গল্পের ছড়াছড়ি। তবে রামকে সাহায্য করতেই বানর সেনাদলে নল ও নীলের অস্তিত্ব পাওয়া যায় মূলত।কিন্তু বাংলায় আবার এই নল আর নীল মানুষরূপেই পুজো পেতে লাগলেন। আদতে তাঁরা বানর। কিন্তু বিশ্বকর্মার দুই পুত্র দুদিকে নল আর নীল মানুষরূপেই বাংলার লোকাচারে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। এমন মূর্তি খুব বিরল কিন্তু এক সময় অস্তিত্ব ছিল বাবুবেশে বিশ্বকর্মার দুই পুত্র নল ও নীলের।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More