দিনের বেশিরভাগ সময় অদৃশ্য থাকে পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠা করা এই শিবমন্দির

'বে অফ ক্যাম্বে' ও 'গালফ অফ খাম্বাটের' মধ্যে অবস্থিত কোলিয়াক সৈকতে আছে বিরলের মধ্যে বিরলতম এই শিবমন্দির।

0

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মহাভারতের যুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে

ধর্মের কাছে পরাজিত হয়েছে অধর্ম। আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে পাণ্ডব শিবির। তবুও আনন্দের লেশমাত্র নেই পঞ্চপাণ্ডবের মনে। কৌরব শিবির থেকে ভেসে আসছিল হাজার হাজার নারী শিশু বৃদ্ধার কান্নার আওয়াজ। যা বজ্র হয়ে আঘাত করছিল পঞ্চপাণ্ডবের বুকে। কুরুক্ষেত্রের রক্তাক্ত প্রান্তরে পড়েছিল হাজার হাজার মৃতদেহ। আকাশে উড়ছিল শকুনের দল। মৃতের স্তুপের মধ্যে তাদের প্রিয়জনকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছিল মৃতের আত্মীয়স্বজন। পরম আত্মীয় কৌরবদের হত্যা করে এসেছে এই জয় এবং ভাতৃহত্যা ব্রহ্মহত্যার সমান। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ পঞ্চপাণ্ডব শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

পঞ্চপাণ্ডবকে শ্রীকৃষ্ণ দিয়েছিলেন একটি কালো পতাকা ও একটি কালো গরু। শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন, গরুটি যেখানে যেখানে যাবে, পঞ্চপাণ্ডবকেও গরুটিকে অনুসরণ করে  সেখানে যেতে হবে। একদিন পঞ্চপাণ্ডবেরা দেখতে পাবেন গরুটির গায়ের রঙ কালো থেকে সাদা হয়ে গেছে। একই সঙ্গে সাদা হয়ে গেছে কালো পতাকাটিও। সেই মুহূর্তে সেই স্থানে পঞ্চপাণ্ডবকে বসতে হবে তপস্যায়। তুষ্ট করতে হবে দেবাদিদেব মহাদেবকে। তিনি তুষ্ট হলে, সেই স্থানে পঞ্চপাণ্ডবকে পাঁচটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই পাপমুক্ত হতে পারবেন পঞ্চপাণ্ডব।

শ্রীকৃষ্ণের কথামত পঞ্চপাণ্ডব কালো গরুটিকে অনুসরণ করতে শুরু করেছিলেন। অরণ্য নদী পাহাড় পেরিয়ে  এগিয়ে চলেছিল কালো গরুটি। পিছন পিছন চলেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। প্রায় সারা ভারত ঘুরে ফেলার পরও সামান্যতম ফিকে হয়নি পতাকা বা গরুর গায়ের কালো রঙ। তবুও পাণ্ডবেরা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ নিঃসৃত আদেশকে অমর্যাদা না করে কালো গরুটিকে অনুসরণ করে চলেছিলেন।

এক সময় গরুটি এসে পৌঁছেছিল ভারতের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে। আরব সাগরের তীরে থাকা ছোট্ট একটি  গ্রামে। গ্রামটির নাম কোলিয়াক। সমুদ্রের তীর ধরে গরুটি উত্তর দিকে এগিয়ে চলেছিল। হঠাৎই গরুটির গায়ের রঙ সাদা হতে শুরু করেছিল। পাণ্ডবেরা দেখেছিলেন একইভাবে সাদা হতে শুরু করেছে কালো পতাকাটিও। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গরু ও পতাকার রঙ হয়ে গিয়েছিল ধবধবে সাদা।

কোলিয়াক সমুদ্র সৈকত

আর একপাও না এগিয়ে, সেই স্থানেই বসে পড়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। মহাদেবের কৃপা পাওয়ার জন্য শুরু করেছিলেন কঠোর তপস্যা। তখন সমুদ্রে ভাটা চলছিল। এক সময় এগিয়ে এসেছিল জোয়ারের জল। চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল পঞ্চপাণ্ডবকে। তাঁদের শরীরে আছড়ে পড়ছিল আরব সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ। তবুও তপস্যা ভঙ্গ করেননি পঞ্চপাণ্ডব। একসময় পাঁচ ভাই ডুবে গিয়েছিলেন জলে তলায়। সেই অবস্থাতেও  মহাদেবের স্তব করে চলেছিলেন।

ভক্তদের এ হেন কঠোর তপস্যায় উতলা হয়েছিলেন মহাদেব। তাঁর কৃপায় সরে গিয়েছিল সাগরের জল। চোখ খুলেছিলেন পঞ্চপাণ্ডব। তাঁরা দেখেছিলেন ভিজে বালি সরিয়ে তাঁদের সামনে জেগে উঠেছে পাঁচটি শিবলিঙ্গ। পঞ্চপাণ্ডব বুঝেছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব ‘স্বয়ম্ভু লিঙ্গ’ রুপে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁদের সামনে। গরুটিও অদৃশ্য হয়ে গেছে। শিবলিঙ্গগুলির পাশে রাখা আছে শিবের বাহন নন্দীর পাঁচটি প্রস্তরনির্মিত মূর্তি।

ভাদ্রের সেই অমাবস্যা রাতে পাপমুক্ত পাণ্ডব সেই স্থানে তৈরি করেছিলেন এক শিবমন্দির। মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পঞ্চলিঙ্গ। প্রতিটি লিঙ্গের সামনে স্থাপন করেছিলেন নন্দীকেও। তারপর সেই মন্দির প্রাঙ্গনে একটি কুয়ো খুঁড়ে, সেই কুয়োর জলে স্নান করে মহাদেবের পুজো করেছিলেন। এই স্থানে পাপমুক্ত বা নিষ্কলঙ্ক হওয়ায় পঞ্চপাণ্ডব শিবলিঙ্গগুলির নাম দিয়েছিলেন নিষ্কলঙ্ক মহাদেব

নিষ্কলঙ্ক মহাদেব

সাগরের বুকে আজও আছে সেই মন্দির

গুজরাটের সৌরাষ্ট্র এলাকার জেলা হল ভাবনগর। স্থানটি সনাতন ধর্মের অনুসারী ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। ভাবনগরে এসে তাঁরা দেখেন মলনাথ মহাদেব মন্দির, তখতেশ্বর মন্দির, গোপনাথ মহাদেব মন্দির, উঞ্চা কোটডা চামুন্ডা মাতা মন্দির, খোদিয়ার মাতা মন্দির, মঙ্গল সিংজি প্যালেস, ভাববিলাস প্যালেস, গৌরিশঙ্কর লেক, গঙ্গা ডেরি প্যালেস, ভিক্টোরিয়া পার্ক ও আরও অনেক কিছু। এত দর্শনীয় স্থান থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সবাইকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করেন আরব সাগরের নিষ্কলঙ্ক মহাদেব।

‘বে অফ ক্যাম্বে’ ও ‘গালফ অফ খাম্বাটের’ মধ্যে অবস্থিত কোলিয়াক সৈকতের পশ্চিম দিকে, আরব সাগরের দুই কিমি ভেতরে আছে বিরলের মধ্যে বিরলতম এই শিবমন্দির। যা ভারত কেন সারা পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের অত্যাশ্চর্য এই মন্দির দিনের বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকে আরব সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের নীচে। নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের মন্দির দর্শন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সাগরে জোয়ার ভাটা আসার সময়ের ওপর। কারণ যখন আরব সাগরে জোয়ার আসে তখন মন্দিরটি ডুবে যায়, জেগে ওঠে ভাটার সময়।

সমুদ্রের বুকে জেগে উঠেছে নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের মন্দির

একদিন সকাল কোলিয়াক সৈকতে

নিষ্কলঙ্ক মহাদেবকে দেখতে সকাল সকাল ভক্ত ও পর্যটকদের দল পৌঁছে যান ভাবনগরের ২৩ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত কোলিয়াক সমুদ্র সৈকতে। যদি তখন জোয়ারের সময় হয়। সমুদ্রের বুকে দৃষ্টি ভাসিয়েও নজরে পড়বে না কোনও মন্দির। ডালায় পূজোর উপকরণ নিয়ে সমুদ্রের ধারে বসে থাকা ডালাওয়ালা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন সমুদ্রের বুকে থাকা মন্দিরের অবস্থান। অনেক খোঁজার পর চোখে পড়বে সমুদ্রের জলস্তরের ওপরে উড়তে থাকা একটি পতাকা। বেলা যত বাড়তে থাকবে পিছোতে থাকবে সমুদ্র। দেখা যাবে, একটি নয়, সমুদ্রের বুকে উড়ছে দুটি পতাকা। একটি পতাকা বড় ও অন্যটি ছোট।

একসময় মাথায় ডালা নিয়ে ঢেউহীন সমুদ্রে নেমে পড়েন ডালাওয়ালারা। একই সঙ্গে সমুদ্রে নামেন গেরুয়া পোশাল পরা পুরোহিতের দল। হাঁটুডোবা জল ভেঙে তাঁরা এগিয়ে যান পতাকা দু’টির দিকে। তাঁদের সঙ্গে চলেন ভক্ত ও পর্যটকের দল। সাগরের জল তখনও পিছিয়ে চলে। একসময় দেখা দেয় সৈকত। পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথে সন্তর্পণে এগিয়ে চলেন সবাই। হাঁটতে হবে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ।

একসময় ভক্ত ও পর্যটকেরা এসে দাঁড়ান বিস্ময় জাগানো মন্দিরটির সামনে। মন্দিরের কোনও ছাদ নেই, নেই দেওয়াল। মন্দিরটি আসলে সমুদ্রের মধ্যে থাকা বিশাল একটি বর্গক্ষেত্রাকার বেদী। যা তৈরি করা হয়েছে পাথর দিয়ে। বেদীর ওপর বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছে পাঁচটি বিভিন্ন উচ্চতার শিবলিঙ্গ।

পঞ্চপাণ্ডব প্রতিষ্ঠিত এই শিবলিঙ্গগুলির পাশে ধাতব ত্রিশুল। পাঁচটি শিবলিঙ্গের সামনে স্থাপন করা আছে পাঁচটি নন্দী। বেদীর ওপরে স্থাপন করা বিশাল পিলারটির মাথা থেকে উড়ছে সাদা সবুজ গেরুয়ার ডোরাকাটা বড় পতাকাটি। একটু দূরে পোঁতা আছে একটি ধাতব পিলার। সেটির মাথা থেকে উড়ছে ছোট একটি গেরুয়া পতাকা।

শিবলিঙ্গগুলির সামনে আসন বিছিয়ে বসে পড়েন পুরোহিতেরা। ডালা সাজিয়ে নেন ডালাওয়ালারা। ডালায় থাকে ফুল, বেলপাতা, নারকেল, দুধ ,দই ও পুজোর অনান্য উপকরণ। বেদীর ওপর আছে পাণ্ডব কুণ্ড। কুণ্ডটি পাহারা দেন পাথর দিয়ে তৈরি নাগরাজ। কুণ্ডের জলে শুদ্ধ হয়ে ভক্তরা নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের পুজো দেন।

পর্যটকেরা মোহিত হয়ে দেখেন চারপাশের দৃশ্য। বেদীটির তিন দিকেই জল, এক দিকে অনেক দূরে দেখা যায় কোলিয়াক সৈকতের দোকানগুলি। নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের বেদীতে বিশ্রাম নেয় শয়ে শয়ে সিগাল। তাদের ওড়াউড়ি ক্যামেরাবন্দি করেন পর্যটকেরা। অনুভব করেন, এত ভয়ঙ্কর এত সুন্দর ধর্মস্থান বুঝি পৃথিবীতে নেই।

পুরোহিত বা ডালাওয়ালাদের কাছ থেকে পর্যটকেরা জানতে পারেন, এখানে স্নান করে পূজো দিলে নিষ্কলঙ্ক হওয়া যায়। প্রিয়জনের চিতাভস্ম বিসর্জন দিলে, স্বর্গ লাভ করেন প্রয়াত মানু্ষটি। এই মন্দিরে মহাশিবরাত্রি পালিত হলেও মন্দিরের মূল উৎসবের নাম ‘ভাদ্রভি’। পালিত হয় শ্রাবণের অমাবস্যায়। কয়েক লক্ষ মানুষ যোগ দেন উৎসবে।

পুরোনো পতাকাটি সরিয়ে নতুন পতাকা তোলেন ভাবনগরের মহারাজার বর্তমান বংশধরেরা। পতাকাটি উড়তে থাকে ৩৬৪ দিন। জনশ্রুতি আছে, নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের ধ্বজাটি ঝড়ে ছেঁড়েনা, ঢেউয়ে ডোবে না। সুনামির সময়েও অক্ষত ছিল নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের মন্দির ও পতাকা। অক্ষত ছিল ভুজে হওয়া ভয়ানক ভূমিকম্পের পরেও।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় আরব সাগরে

চারপাশের সৃষ্টি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। আকাশে চলে সূর্য ও মেঘেদের আবীর খেলা। ঠাণ্ডা হাওয়া ভেসে আসতে থাকে আগর সাগরের বুক থেকে। ক্রমশ বাড়তে থাকে সমুদ্রের জলস্তর। চঞ্চল হতে থাকেন পুরোহিত ও ডালাওয়ালারা। দ্রুত তীরে ফেরার জন্য তাড়া দেন ভক্ত ও পর্যটকদের। ধীরে ধীরে বেদীকে ঘিরে ফেলতে থাকে আরব সাগরে ঢেউ। সবাই বেদী ছেড়ে দ্রুত হাঁটু জল ভেঙে ফিরে আসেন তীরে। ধেয়ে আসতে থাকে উত্তাল জোয়ার। সাগরের জলে অদৃশ্য হয়ে যায় নিষ্কলঙ্ক মহাদেবের মন্দির। ঢেউয়ের ওপর তখনও উড়তে থাকে পতাকা দুটি।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ আরব সাগরে ডুবে যায় ক্লান্ত সূর্য। হোটেলে ফিরতে থাকা পর্যটকদের মনে প্রশ্ন জাগে, কী প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির! যা রুখে দেয় সুনামীর মত ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়কেও। একই অটোয় ভাবনগরে ফিরতে থাকা ভক্তেরা সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন, “যে মন্দির পঞ্চপাণ্ডবের তৈরি, যে মন্দিরে বিরাজ করেন স্বয়ং মহাদেব। সে মন্দির ভাঙার সাধ্য কার!”

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.