হাড়ের বাঁশি (অষ্টাদশ পর্ব)

স্বর্ণচাঁপায় সুবাস নাই। সারাদিন ধোঁয়ায় মলিন হয়ে থাকে কুসুম। হাতে নিলে আঙুলে মরা পোড়ার চিমসে গন্ধ লেগে যায়।

এড়োয়ালি থেকে যে পথটি বীরভূমের দিকে চলে গেল সেটি ধরে বাজিতপুর শ্মশানকে বাম হাতে রেখে আরও সামনে এগিয়ে চলেছে দ্বারকা নদ। গা ঘেঁষে উঠে এসেছে ওই চাঁপা গাছ। দ্বারকায় জল কম। এখন চৈত্র মাসে হাঁটু অবধি ডোবে না। রুক্ষ জমি, আকাশ নির্মেঘ সুনীল।
আঁতুড়ে ছেলে কোলে নিয়ে ধুলার ওপর পা ছড়িয়ে বসে বিলাপ করছে লক্ষ্মীমণি। এখনও নাড়ির ফুল শুকোয়নি। কাল রাতে আখায় ভাত নাড়ছিল, সেই ফাঁকে চাঁচের বেড়ার ফাঁক গলে শিশুটির তলতলে চাঁদি খুবলে খেয়ে গেছে শেয়াল। লক্ষ্মী ডাক ছেড়ে কেঁদে কেঁদে বলছে, ওগো কী হবেক গো। ছ্যাঁলা ইনে দে! ছ্যাঁলাটোকে ফিরান দে! ওগো তুঁদের পায়ে পরছি!
কাঁচা ছেলে মরলে পোড়ানোর আস্য নাই। মাটি দিতে হয়। গর্ত একটু বেশি না করলে সূয্যি ডুবলেই নরম মাটি সরিয়ে টাটকা শরীর নিয়ে কামড়াকামড়ি করে শিবাদল। দূরে লকলক করে জ্বলে চিতার আগুন। নশ্বর মানুষের দেহ সেই আঁচে গুঁড়ো গুঁড়ো হয় মিশে যায় বাতাসে।
এই শ্মশানের রাজা হাড়িরাম ডোম। একটা চোখ অন্ধ, সাদা ঢ্যালার মতো বেরিয়ে এসেছে। হাতে ড্যাঙস নিয়ে চিতায় মড়া জেগে উঠলে মেরে শুইয়ে দেয় ফের। মাথা ফাটায়, ফুটন্ত ঘিলু তখন ছিটকে পড়ে চারপাশে।

লক্ষ্মীর দেওর ওদিকে মাটি কাটছে। ইঁটের মতো শক্ত মাটির ওপর টংটং করে বাজছে কোদাল। গোর দেওয়া হলে একটু আলগা মাটি দিয়ে চুড়ো মতো করে দেয় সবাই, তার ওপর কটা তুলসী পাতা। শিশুটির বাবা তাড়ি খেয়ে চোখ লাল করে দ্বারকার পারে বসে আছে। শীর্ণ জলরেখার ওদিকে ধূ ধূ প্রান্তর। শুকনো বাতাস বইছে। একবিন্দুও ছায়া নাই কোথাও।
গলা শুকিয়ে কাঠ, ক্রমাগত হেঁচকি উঠছে। চারদিন হল বিয়েছে, গর্ভদ্বারের কাপড় বদলানোর কথা মনে নাই। পরনের শাড়িখান রক্তে মাখামাখি। শ্মশানের ধুলায় লেগেছে সেই গর্ভরক্ত। শুকনো ধুলায় দাগ বসে না। যেমন বিলাপরতা ওই জননী জানে না, দুদিন বাদেই মুছে যাবে সন্তান শোক! বছর পেরোতে না পেরোতে নতুন কাঁচা ছেলে আবার আসবে কাঁখে। কত সোহাগ, আহ্লাদ আর পিরিত তখন! মাতৃস্নেহের সামনে শেয়ালে খাওয়া আজকের শিশুটির মুখ মিলিয়ে যাবে মহাকালের বাতাসে!

একটা জলে ডোবা যুবতিকে নিয়ে এসেছে বাড়ির লোকজন। এর মধ্যেই শরীর ফুলে ঢোল। আইবুড়ো মেয়ে জলে ডুবে মরেছে! বুড়ো বাপ হাড়িরামকে বলছে, সন্‌ঝে ঘাট গেল, কতুবার মানা করছি, কে শোনে! আসছে বোশেখে সব পাকা কথা, লগনসা ঠিক! পত্র বিলি সারা। কী বলব তাদের!
নিজেই গলায় কলসি বেঁধে ডুবেছে কিনা কে জানে! এসব দিকে ও নিয়ে অত হইচই হয় না। হাড়িরামের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলেই হল! চিতায় উঠে বসবে লাশ। তাছাড়া আইবুড়ো মেয়ের ও কথা জানাজানি হলে কলঙ্ক রটবে গাঁয়ে। পাঁচজনের পাঁচকথা, ঘরে আরও দুটো মেয়ে বৃদ্ধ পিতার, পার করতে হবে তো!

শ্মশান ভৈরবের মন্দিরে কদিন হল জুটেছিল এক গেঁজেল সাধু। সারাদিন ধেনো আর গাঁজার ধোঁয়ায় অন্ধকার ভাঙা দালান। হাড়িরামও গিয়ে জুটেছিল। গাঁয়ের লোক মড়া নিয়ে এলে কটা পয়সা দিয়ে যেত সাধুর পায়ে। চিমসে চেহারা, রাতের দিকে ধুনি জ্বালিয়ে কত গল্প! বেতাল নাকি তার হাতের পুতুল, বেতাল নাচিয়ে ছারখার করে দিতে পারে সংসার।
একরাতে আঁতুড়ে ছেলের লাশ তুলে মরা খেলিয়েছিল। ধুনোর গন্ধে শকুনের বাচ্চাগুলো অবিকল মানব শিশুর মতো গলায় চিৎকার জুড়েছিল। আগুন আর ধোঁয়ায় বড় ভয় পাখিদের।
তা কাল রাত থেকে সাধুর পাত্তা নাই। আজ ভোরে দ্বারকার পারে পাওয়া গেছে। চোখ উল্টানো, মুখে গ্যাঁজলা। শরীর ছেড়ে দীপশিখা বেড়াতে বেরিয়ে গেছে মহাশূন্যে।

বাজিতপুর শ্মশান আজ সরগরম। তিন তিনখানা লাশ। হাড়িরামের দুটো পয়সা আসবে। ডোমনির একখান লাল পাড় শাড়ির অনেককালের বাসনা। মানুষ মরলে পয়সা আসে, আহ্লাদ হয় তার।
শ্মশান কালীর থানে সকাল সকাল ভোগ চেপেছে। একটা মড়া না গেলে ভোগের হাঁড়ি চড়ে না। মৃতদেহের সুবাস ছাড়া মুখে অন্ন রোচে না দেবীর। একেকদিন উপবাসী থাকেন তিনি, সেদিন কারোর লাশ আসে না!
আজ আনন্দ। আজ তিন তিনটে দেহ, নবীন দেহটির বয়স মাত্র চারদিন!

বৃদ্ধ পণ্ডিত সেনাপতি চট্টোপাধ্যায় অদূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। খর দৃষ্টি স্থির হয়ে রয়েছে শ্মশানে। কেন যে তিনি মাঝে মাঝে এই শ্মশানে আসেন তাও কেউ জানে না। স্থির করেছেন আজ ফেরার পথে বাজিতপুরে বিশুর সঙ্গে একবার দেখা করে যাবেন। বালক বিশুকে বড়ো প্রয়োজন সেনাপতির। 

বাজিতপুর গ্রামে দ্বারকা নদীর এপারে খাঁ খাঁ বালির চর। তরমুজ ফলিয়েছে চাষারা খুব এবচ্ছর। একটু এগিয়ে আসলে ইদিকপানে কচি পটলের খেত। সরু আল ধরে ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে বিশু। নামেই ইস্কুল, পাড়াগাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল, চার কেলাস অবধি পড়ালেখা। মাস্টারও সাকুল্যে তিন জন। শদুয়েক ছেলেপিলে। সিমেন্টের দেওয়াল, মাথায় খড়ের চাল। সরকার থেকে নিয়ম করেছে আবার ইদানীং দুপুরের খাবার দিতে হবে সব কেলাসে। ওই খেসাড়ির ডাল আর মোটা চালের খিচুড়ি। তাই খাওয়ার লোভে পিলপিল করে আসে ছেলের দল। বিশু তিন কেলাসে উঠেছে এবছর। বিশ্বনাথ বাগদি। হাতে চটের থলেয় বই খাতা, শেলেট। গতবারের তিন কেলাসের ছেলের পুরনো বই। ছেঁড়াখোড়া নব গণিত মুকুল। প্রকৃতি বিজ্ঞান। শুধু কিশলয়টা নতুন। বাস গুমটির কাছে কাবাডির দোকান থেকে পুরনো খবরের একখান কাগজ চেয়ে এনে মলাট দিয়ে নিয়েছে। আকাশে মেঘ জমছে আজ। বেলা আন্দাজ তিনটে, কালো হয়ে আসছে চারধার। 
বিশুর মা নাই। মনে পড়ে না তেমন। শুধু রাতের বেলাকার কিছু শব্দ আবছা মনে পড়ে। ওদের ঘরের পাশে মস্ত পেয়ারগাছে ডানা ঝাপটায় সারারাত কলাবাদুড়ের দল। খরখর করে চলে যায় বেজি। ধুপধুপ কীসের যেন আওয়াজ। খোড়ো চালের গা বেয়ে টুপটুপ করে জল ঝরে আষাঢ়ের রাতে। মেঘ ডাকে গুড়ুম গুড়ুম। মাকে জড়িয়ে ধরত তখন বিশু। পুরনো শাড়ির তেলচিটে গন্ধটুকু নাকে লেগে আছে এখনও। ব্যাস, মা বলতে বিশু এটুকুই বোঝে। 

আজ দশদিন হল শহরে গেছে বাবা। কলের মিস্ত্রির কাজ করে। এই কদিন বাড়িতে বিশু একা। অল্প চাল ছিল সরায়। হারাণের মা কদিন রাতে রেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তিনদিন চারদিন হয়ে গেল আর এমুখো হয় না। দুপুরে ইস্কুলে খিচুড়ি খেয়ে নেয় বিশু। আর রাতে একদিন আখা ধরাতে গিয়ে শুধু ধুঁয়ো। আগুন আর জ্বলে না। আরেকদিন অনেক কষ্টে আগুন জ্বালিয়ে ভাত বসিয়েছিল। সে ভাত তলা ধরে পুড়ে একাকার। পোড়া ভাতই খেয়েছিল লবণ দিয়ে মেখে। বেশ ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ। বাবা ঘরে থাকলে রাতে ফিরে রান্না বসায়। বিশু সব জোগাড় করে দেয়। সে আর কদিন! প্রায়ই এখান সেখান কাজে যায় বাপ। তখন বিশু একাই থাকে। 
এখন একা আর অতটা ভয় করে না। লম্ফটা নিভু নিভু করে জ্বেলে রাখে ঘরের একপাশে। কোনও কোনওদিন দাওয়ায় এসে বসে। উঠোন আকন্দের ঝোপে ভর্তি। ধুতরো ফুলের গাছটা কী ঝাঁকামুকো হয়েছে! থোকা থোকা জোনাক ঘুরে বেড়ায় চারপাশে। আকাশে জ্বলজ্বল করে কত তারার দল। চাঁদ ওঠে যেদিন, সাদা আলোয় ভাসতে থাকে ওদের খোড়ো চালের বাড়িটা অবধি। কেন জানে না ভারী খুশি লাগে বিশুর তখন। মনে হয় কে যেন ডাকছে ওকে। আগে বাবার কাছে বায়না করত, জিলিপি কিনে দেবা আমাকে! পালেদের বাড়ির ছেলের মতো পুজোর চকরাবকরা জামা! কাঠি লঞ্জেস! ইস্কুলের বাইরে শোলার বাক্সে বিক্রি হওয়া দুধ-বরফ! কত ছেলে কিনে খায়! তাদের জিজ্ঞেস করলে বলে, মা আটআনা পয়সা দিয়েছে, তাই দিয়ে কিনলাম রে! বুড়ির মাথার গোলাপি চুল! বাবাকে বলত রাতে। বিড়ি খেতে খেতে তাকিয়ে থাকত বাবা উঠোনের ওপারে আঁধারের দিকে। একদিন লুঙ্গির খোঁটায় চোখ মুছতেও দেখেছিল। তারপর থেকে আর বলে না। চায়ও না কিছু। বাবা শুধু বলে, ভালো করি নেকাপড়া করতি হবি তুকে। বড় হতি হবি। 
কতদিন হয়েছে, বাবা তাড়ি খেয়ে ফিরেছে মাঝরাতে। না খেয়ে বিশু বসে থেকেছে দাওয়ায়। সরসর করে হাওয়া দিচ্ছে। কলাবাদুড়ের দল হুটোপুটি শুরু করেছে পাকা পেয়ারার লোভে। পেয়ারাগাছটা নাকি মা লাগিয়েছিল। জলভরা মেঘের ছায়ায় তারা নাই একটাও আকাশে। মাঝে মাঝে বাজ পড়ছে। শাঁকচুন্নির ভয় তেমন লাগে না আজকাল বিশুর। শুধু মনে হয় কে যেন ডাকছে ওকে। আদর করবে ওকে। কতদিন কেউ আদর করে না বিশুকে।

আজও মেঘ করেছে। লকলক করছে সবুজ ধান। হলুদ ঝিঙে ফুলে ঢাকা দূরের খেত। একা একাই ফেরে বিশু। গরীব বলে সবাই দুচ্ছাই করে। করুক গে! কোন এক ঠাকুরের লেখা সেদিন বদ্যি মাস্টার বলছিল, এপারেতে বৃষ্টি এলো ঝাপসা গাছপালা, ওপারেতে মেঘের মাথায় একশ মানিক জ্বালা! বিশু হাত তুলে বলেছিল সে জানে। সত্যিই তো! কতদিন কত আষাঢ়ের দীর্ঘ অপরাহ্ণে, কত নিশ্চুপ দ্বিপ্রহরে ওই বালক দেখেছে সেই অপার্থিব রূপ। ঘন চারকোল রঙের বিপরীতে রুপোলি আলোর রেখা। 

রাস্তার একপাশে তেলাকুচোর ঝোপ। কটা পাতা ছিঁড়ে চটের থলির মধ্যে রাখল। ওকে বলেছিল কেলাসের শম্ভু, ওর মা নাকি তেলাকুচো পাতা সেদ্ধ দেয় ভাতে। নুন দিয়ে বেশ লাগে খেতে। শম্ভুরাও ওদের মতোই গরীব। বেশ ভাব ছিল। একবার আখ চুরি করে খেতে গিয়ে কী মারই না খেয়েছিল দুজনে। গতবছর পুজোর আগে জ্বর হল শম্ভুর, সঙ্গে খুব কাশি। আর বাঁচল না। 
হাওয়া ছেড়েছে শনশন করে কে যেন। কটা ঝিঙে নেবে তুলে? তারপর ভাবল কী দরকার, কেউ যদি দ্যাখে! কতদিন মাছ খায়নি। আরেকটু বড় হলে বাঁওড়ের জলে ছিপ ফেলবে। মেঘ ছুটে আসছে মাথার ওপর। দূরে মাথা দোলাচ্ছে গাছের দল। ঝাপসা হয়ে এসেছে চারধার। ভারী আনন্দ হল হঠাৎ বিশুর। যেন বাবা পুজোর জামা কিনে এনেছে। মরা মা আদর করছে খুব। ছুট লাগাল বিশু। তাকে ধাওয়া করে ছুটে এল দামাল বৃষ্টির ফোঁটা। যেন আপনমনে খেলা করছে দুই অবোধ বালক বালিকা।

মা মরা ছেলেটার জন্য পরম আদরে কে যেন রচনা করলেন এই দৃশ্য। মৃদু হাসি তাঁর ওষ্ঠে। এমন সামান্য আয়োজনেই তো তিনি বারবার সৃষ্টি করেন অলৌকিক জাদু, এই মায়াজগৎ! 

 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

 

হাড়ের বাঁশি (সপ্তদশ পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More