হাড়ের বাঁশি (পঞ্চম পর্ব)

0

‘তোমার যেন কবে যাওয়া?’, বামদিকে কাচের বন্ধ জানলার ওপারে দিনান্তের মলিন আকাশের দিকে চেয়ে আনমনা স্বরে জিজ্ঞাসা করল বন্যা। কার্তিক মাসেও শিমশিম শব্দে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রখানি বেজে চলেছে, কার্তিকের অপরাহ্ণ বড়ো দরিদ্র, দ্বিপ্রহরের শেষ লগ্নেই তার ভিক্ষার সাপি শূন্য করে বিবাগী মানুষের মতো সন্ধ্যার গর্ভে যেন মিলিয়ে যায়। খড়গপুর মূল শহরের বাইরে জাতীয় সড়কের পাশে এই রেস্তোরাঁয় ওরা দুজন প্রায়ই আসে। শহরের লোকজন তেমন খুব একটা যাতায়াত করে না এদিকে, খদ্দের বলতে ভরসা ওই আইআইটির ছাত্রছাত্রী আর গাড়ি নিয়ে দূর দেশে রওনা হওয়া দীর্ঘপথের যাত্রীর দল। সেদিক থেকে এইটিকে পান্থশালা বলাই সঙ্গত, তবে অমিয়বাবু অন্যান্য পান্থশালার মালিকদের মতো গোমড়ামুখো নন, ভারি সজ্জন মানুষ, মুখে হাসি ছাড়া কথা নাই, বন্যাকে দেখলেই প্রতিবার জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী ম্যাডাম বাড়ির খবর সব ভালো তো?’, বন্যাও স্মিত হেসে উত্তর দেয়,’হ্যাঁ কাকু সবাই ভালো আছে।’

–আগামীকাল, শুধু একটু সকাল সকাল বেরোতে হবে, নাহলে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

–হুঁ, সেই মুর্শিদাবাদ, অনেকটা পথ, বাসে যাবে তো?

–বাসই তো ভালো বলল, এখান থেকে বহরমপুরের স্টেট বাস ধরে কান্দি বলে একটা জায়গায় নামতে হবে।

‘তারপর? তুমি তো আগে যাওনি কখনও!’, ঈষৎ উৎকণ্ঠিত শোনাল বন্যার গলা।

–ওখান থেকে নাকি বেশি দূর নয়, গাড়ি পাঠিয়ে দেবে বলেছে। 

টেবিলের উপর সামনে রাখা নুডলসের প্লেট থেকে কতগুলি সরু সুতোর মতো নুডলস কাঁটা-চামচে জড়াতে জড়াতে সামান্য হেসে বন্যা বলল, ‘তা কষ্ট তো একটু করতেই হবে, প্রেমিকা বলে কথা!’

–তোমাকে যেমন দেখা করতে সেই কলকাতা পার হয়ে হলদিয়া অবধি যেতে হয়! সে-কথাও বলুন মিস রহমান!

নম্রভাষী কাজলে আঁকা চোখদুটি তুলে ম্লান গলায় বন্যা ধীরে ধীরে উত্তর দিল, ‘বড়ো চিমটি কাটা কথা শিখেছ আজকাল।’

–বাহ! নিজে বললে সেটা চিমটি কাটা হয় না কিনা!  শুধু…

কথা শেষ করতে না দিয়ে বামহাতটি তুলে বন্যা নীচু গলায় বলল, ‘পৃথ্বীশ প্লিজ, আই ওয়াজ জোকিং।’,কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় হেমন্ত সন্ধ্যার বিষণ্ন বাতাসের মতো বেজে উঠল, ‘ফিরেই তো সেই নর্মদা ভ্যালী। কতদিন তুমি থাকবে না…দেখাও হবে না আর।’

বাইরে এর মধ্যেই আঁধার ঘনিয়েছে, জাতীয় সড়কের দুপাশে ধানিজমির উপর কে যেন রেশম কুয়াশার নরম শ্বেতবস্ত্র বিছিয়ে দিয়েছে। দিনান্ত উনানের নিভু নিভু আঁচে আকাশপথ বেয়ে বাড়ি ফিরছে দুচারটি বক, ধুলাখেলার ভুবনে শেষ হয়ে আসছে আরও একটি দিন, কাচের ওপারে সেদিকে তাকিয়ে নীচু গলায় পৃথ্বীশ বলল, ‘আজ আর এখানে বসতে একেবারেই ভালো লাগছে না।’

–আমারও। খাবারটা প্যাক করে নিয়ে বেরিয়ে যাই?

–তাই কর। বরং ওই বিলের ধারে চলো একটু বসি, অনেকদিন এমন সন্ধ্যা দেখিনি।

 

যে ছেলেটি খাবার দেয় তাকে হাতের ইশারায় ডেকে নুডলস দুটো প্যাক করতে বলে বন্যা সামান্য আদুরে গলায় পৃথ্বীশকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আমাদের সঙ্গীটিকে এনেছ তো আজ?’

সঙ্গীর কথা শুনে ঈদ সন্ধ্যার চাঁদের মতো একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে পৃথ্বীশের মুখে, ‘এনেছি। ও বাঁশি তুমি ছাড়া আর কে শোনে বলো!’

গাঢ় চোখ তুলে তাকায় বন্যা, কার্তিকের সন্ধ্যাতারার মতো সেখানে ফুটে ওঠে মাঠকুসুম, ‘কেন সেই যে বলেছিলে আমি ছাড়া অন্য কেউ না শুনলেও তোমার কিছু যায় আসে না।’

আশ্চর্য, রিং হচ্ছে, ফোনটা ধরবে তো! দু-এক মুহূর্ত পর ওপারে ফোন রিসিভ হতেই চঞ্চল গলায় ঋষা অভিযোগের সুরে বলে ওঠে, ‘কী করো কী তুমি! ফোনটা ধরতে পার না?’

–আরে পকেটে ছিল, শুনতে পাইনি!

–শুনতে পাইনি! এক্সকিউজ মুখের গোড়ায় লেগে থাকে সবসময়। দুপুরে ফোন করলাম ধরল না, বিকেলে করলাম বেজে গেল, এদিকে কী এক ছাতার মাথা প্রোজেক্ট, চিন্তা করার তো আমি কেউ নই!

–কী মুশকিল, হঠাৎ কী হল তোর?

–কিচ্ছু না। রাখো তুমি ফোন, কাজ করো।

–শোন শোন, কী ছেলেমানুষি!

এসব কথা শেষ হওয়ার নয়। পৃথ্বীশের গলার স্বর আর মুখের ভাব দেখে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় বন্যা, প্রায় ফিসফিস করে শুধু ঠোঁট দুটি আলতো খুলে বলে, ‘তুমি কথা শেষ করে নাও, আমি বাইরে আছি।’

ফোনে হাত চাপা দিয়ে পৃথ্বীশ কিছু বলার আগেই ওদিকে থেকে ভেসে আসে ঋষার গলা, ‘ছেলেমানুষি হবে কেন! যা সত্যি তাই বললাম। বাই দ্য ওয়ে হোয়ার আর ইউ? এত শব্দ কেন চারপাশে?’

‘এই তো একটু খেতে বেরিয়েছি!’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কথা বদলের জন্য পৃথ্বীশ বলে ওঠে, ‘শোন আমি কাল ফার্স্টবাসে যাচ্ছি। তোদের ওই কান্দি পৌঁছাতে ক’টা বাজবে?’

আসার কথা শুনে বালিকার মতো উচ্ছল আনন্দে ভেসে যায় ঋষার কণ্ঠস্বর, ‘ধন্য করেছ আমায়!’ পরমুহূর্তেই বলে, ‘এগারোটা, সাড়ে এগারোটা বাজবে মনে হয়, আমি নিরুপম কাকাকে বলে রেখেছি কান্দি বাসস্ট্যান্ডেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর শোনো, তুমি কিন্তু খালিপেটে বাসে উঠবে না, আমি বারবার করে নিষেধ করছি।’

সন্ধ্যাদেবীর মতো এলোচুলে রেস্তোরাঁর বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে বন্যা, সামনে অনেকখানি সুড়কি ঢালা লাল পথ পার হয়ে বড়ো রাস্তা, কত বাস গাড়ি ট্রাক হু হু ছুটে চলেছে, ওপারে ধানি মাঠের উপর জোনাকির মতো দু-একখানি আলো দেখা যায়। দূরে দিকচক্রবালরেখা এখন নিথর কুয়াশায় রহস্যময়ী। বামদিকে রেস্তোরাঁর পাঁচিলের বাইরে একটি খোড়ো চাল ছাওয়া গৃহস্থ ঘরের উঠানে লম্বা বাঁশের মাথায় আকাশপ্রদীপ তোলা হয়েছে- ঘরে ফেরা পাখির মতোই মলিন দীপের আলোখানি আকাশের গায়ে স্রোত কেটে কোন দূর অলীক ভুবনের দিকে যেন ভেসে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে বন্যার মন হঠাৎ আনন্দে ভরে উঠল। চকিতে মনে পড়ে গেল বাড়ির কথা, সেই মূর্তি নদী পার হয়ে চালসায় তাদের পটচিত্রের মতো একখানি ছোট্ট দোতলা বাড়ি, বেড়ার গেটে আদুরে শীতরৌদ্র হয়ে কেমন দোলা খায় কাগজফুলের ঝাড়, বাগানে সার দিয়ে বাবার হাতে লাগানো চন্দ্রমল্লিকা চারায় এতদিনে নিশ্চয়ই নরম ফুল এসেছে, পেছনে শিমুল গাছটির রূপ সঙ্গে নিয়ে সব পাতা বোধহয় এখন ভুঁইয়ের ধুলায় ঝরে পড়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় বন্যার ঘরের সামনে নিমগাছের কোটর থেকে লক্ষ্মী প্যাঁচা তীক্ষ্ণ গলায় ডেকে রাত্রিপানে উড়ে যেত সে কি এখনও আছে?

অনেকদিন পর আজ এই আসন্ন কার্তিক সন্ধ্যার মুখে বন্যার মনে হল কতদিন সে বাড়ি যায়নি। ফোনের ওপার থেকে পৃথ্বীশকে বলা ঋষার দু-একটি উদ্বেগ আর মায়া ভরা কথা তার কানে এসে পৌঁছেছিল তখন। তাকে তো অমন নরম শব্দে আদর করার স্নেহ করার কেউ নেই। বিচিত্র মানুষের মন, কোন কথা যে কখন কী ঢেউ তোলে, হয়তো ওই স্নেহ বাক্যের ভালোবাসার সুতা ধরেই বন্যার নিজের বাড়িটির কথা মনে পড়ল আজ। তবে সেখানেও তো ফিরে যাওয়ার উপায় নেই আর। কত বাঁক দোলাচল, কত জ্যোৎস্নালোকিত অভিমানের চর যে নিজের অজান্তেই সে পার হয়ে এসেছে, হয়তো বা নষ্টও করেছে ফিরে যাওয়ার পথ…সামনে আদিগন্ত মাঠ থেকে ভেসে আসা নূতন ধানের সুবাসে হঠাৎ বন্যার কাজলে সাজানো চোখ দুটি জলে উথলে উঠল! বহুকষ্টে জলধারার গতি সংবরণ করল সে, কেউ দেখে ফেললে ভারি লজ্জার বিষয় হবে। বন্যা রহমান কাঁদে না কখনও।

‘চলো, চলো, অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলাম তো!’

পৃথ্বীশের গলা শুনে পেছন ফিরে শান্ত গলায় বন্যা জিজ্ঞাসা করল, ‘হল কথা?’

–হ্যাঁ ওই আর কী! ছেলেমানুষ একেবারে!

অন্ধকারে মুখ টিপে সামান্য হেসে বন্যা বলে উঠল, ‘ছেলেমানুষি ভালো পৃথ্বীশ। ঋষার জন্য দেখো তুমি অনেকদিন পর্যন্ত বুড়ো হবে না!’

–শুধু ঋষা কেন, তোমার সঙ্গে কথা বললেও বুড়ো হব না!

–আমি? আমার কি আর সে বয়স আছে পৃথ্বীশ!

এমন কথা সচরাচর বন্যা বলে না, একটু অবাক হয়েই পৃথ্বীশ বলল, ‘বাজে কথা বলো না তো! বয়স নাকি নেই, আশ্চর্য যত চিন্তা তোমার মাথাতেই আসে!’

পৃথ্বীশের কথা শুনে ভারি নরম চোখে তার দিকে তাকাল বন্যা, দু’পা কাছে এগিয়ে মাথার চুলে হাত ছুঁয়ে একটু সমান করে দিয়ে স্নেহের গলায় বলে উঠল, ‘মাথাটা পাখির বাসা করে রেখেছ একেবারে! কোনও দিকে খেয়াল নেই!’

বন্যার আচরণে সামান্য যেন অস্বস্তি হল পৃথ্বীশের, কথা বদলের জন্যই একটু জোর দিয়ে বলল, ‘চলো, এবার আমরা যাই, এখানেই সন্ধে নেমে গেল।’

–আজ থাক জানো, বিলের ধারে আর যেতে হবে না।

–সে কী! কেন? তুমি কি রাগ করলে আমার উপর?

বড়ো রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বন্যা হেসে উঠে বলল, ‘রাগ করব কেন! এই কার্তিকের ঠাণ্ডায় জলের ধারে বসে আর শরীর খারাপ করতে হবে না! বিকেল করে আসব একদিন, বিল পালিয়ে যাচ্ছে ন্‌ আর আমিও এখানেই রইলাম। তোমার সামনে এখন অনেক কাজ পৃথ্বীশ, সুস্থ থাকতে হবে।’

কয়েক মুহূর্ত আগের মানুষটিকে এই মুহূর্তে মেলাতে পারল না পৃথ্বীশ, দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে চঞ্চলমতি কিশোরের মতো জিজ্ঞাসা করল, ‘আর বাঁশি? শুনবে না?’

‘শুনব তো! পাগল একটা! শুনব, আজ রাত্রে মনে মনে বাজিও, আমি ঠিক শুনতে পাব।’ কয়েক মুহূর্ত পর পৃথ্বীশের ডান হাতের তর্জনীটি নিজের বাম মুঠিতে নিয়ে আলতো স্বরে বলে উঠল, ‘ও বাঁশি আমি ছাড়া আর কেউ কখনও শুনতে পাবে না।’

 

এড়োয়ালি গ্রামে ভট্টাচার্যদের পুরাতন ভিটার মন্দির দালানে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে মেঝের উপরেই বসল ঋষা, সামনে গর্ভগৃহে বাণেশ্বর লিঙ্গ ভোলানাথের গৌরীপট্টটি রূপা দিয়ে বাঁধানো। পাশে রাখা আরও একখানি দীপের থিরিথিরি আলোয় সমস্ত গর্ভগৃহটি কোনও প্রাচীন আখ্যানের মতো থমথম করছে। দেবী দহের দিক থেকে ভেসে আসা উত্তরপথগামী বাতাসের তাড়নায় সেই আলোকশিখার ছায়া মন্দির গাত্রে বিচিত্র দৃশ্যপট তৈরি করেছে। কখনও মনে হয় একজন অনাম্নী যুবতী অপরূপ ভঙ্গিমায় নৃত্যরতা, আবার কখনও যেন একজন নগ্নদেহী পুরুষ নতজানু হয়ে প্রণাম করছে। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে ছায়াচিত্র-সেদিকে তাকিয়ে অকারণে গা শিরশির করে উঠল ঋষার। পরনের শ্লেটরঙা তসরের শাড়ির উপর অতিসূক্ষ্ম কাজ করা কাশ্মীরি শালটি ভালো করে একবার জড়িয়ে নিল। এই সন্ধ্যার সময় এদিকে কেউ তেমন আসে না, এই গৃহের কুলদেবতা ভোলানাথ দিনে একবার পূজা গ্রহণ করেন। সন্ধ্যারতির আস্য নাই পরিবারে। বহু বৎসর পূর্বে এই বিচিত্র নিয়মটি চালু করেছিলেন শঙ্করনাথ, সে-প্রথা আজও অটুট রয়েছে। সন্ধ্যায় পৃথ্বীশের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর থেকেই ঋষার মন আষাঢ় মেঘের মতো ভার হয়ে রয়েছে। নিজ মনের আচরণে সে যথেষ্ট অবাকই হয়েছে, এমন তো হওয়ার কথা নয়! কতদিন পর আগামীকাল পৃথ্বীশ আসছে অথচ মন হঠাৎ যেন নিভে গেল। বারবার কেউ যেন তাকে বলে চলেছে, পৃথ্বীশ কিছু কথা গোপন করছে তোমাকে, তুমি কি জানো তার অর্থ? এই দোলাচলের মধ্যেই উঠে সাজতে বসেছিল ঋষা, এই তসরের শাড়িটি তাকে উপহার দিয়েছিল অনিমেষ। কতদিন আগের কথা, সেই কলেজের প্রথম বর্ষ। বহু বছর অনিমেষের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগও নাই, শাড়িটি পরতে পরতে নিজের মনেই ভাবল কী বিচিত্র জগত! উপহার যে দিয়েছিল তার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও উপহারটি রয়ে যায়! চুলে একটি হাত খোঁপা করেও কী মনে হওয়ায় উন্মুক্ত করল বন্ধন। দলঘাসের মতো কেশরাজি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল পিঠের উপর। সেদিকে তাকিয়ে আপনমনেই ঋষা বলে উঠল, ‘কেউ আমার জন্য কখনও গন্ধতেল, রমণীবিলাস বাক্স নিয়ে আসেনি।’

ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে একবার প্রণাম করল ঋষা। অথচ কী আশ্চর্য, মনোবৃত্তি স্রোতে কোনও প্রার্থনা উঠে এল না, অপলক চেয়েই রইল। এই মন্দিরটিও ভারি অদ্ভুত, মূল ভদ্রাসনের বাইরে কেন যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শঙ্করনাথ, তা আর আজ অনুমান করা যায় না। ঋষার হঠাৎ মনে হল ভোলানাথ যেন গৃহবন্ধন করে ত্রিশূল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি সেই গ্রামদেশের চড়কের বুড়া শিব, পরনে মলিন বাঘছাল, কানে বন-ধুতরার ফুল, মাথায় পিঙ্গল জটাভার, হাতে ফাটা ডম্বরু, উদাসী রুক্ষ চৈত্র বাতাসস্রোতে ধুলাপথের বাঁকে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে ঋষাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘আমাকে আকন্দ কুসুমহার পরাইবে না তুমি? তোমার হাতের মালাখানি পরিব বলিয়া কত চৈত্র অপেক্ষা করিয়া রহিয়াছি, তুমি ভুলিয়া গিয়াছ?’

মৃদু হাসিকুসুমে ভরে উঠল ঋষার মুখখানি, আহা! কী মায়া ভোলানাথের! মনে মনে স্থির করল আগামীকাল বুড়া শিবের জন্য একখানি আকন্দ মালা গাঁথবে। পরক্ষণেই আশঙ্কা হল এই কার্তিকে তো আকন্দ পাওয়া যাবে না, তাহলে কি ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে যাবে?

সেই মুহূর্তেই ঝিরঝির বাতাস বয়ে এল, অবিশ্রান্ত ঝিল্লিরবে মুখর সন্ধ্যায় বাগানে নিমগাছের ডাল থেকে গলা তুলে আচমকা ডেকে উঠল একটি প্যাঁচা। ভিটার উত্তরে বাজপড়া নারিকেল গাছের পেছনে গহিন বাঁশবনের দিকে ত্রস্ত পায়ে ছুটে গেল অতিকায় বেজি। সে এই ভদ্রাসনের পুরাতন বাসিন্দা, গ্রামের বৃদ্ধ মানুষেরা বলেন বেজিটির বয়স নাকি দুশো কি তারও বেশি, শঙ্করনাথ আদর করে তাকে কৃষ্ণকান্ত বলে ডাকতেন! আজও কোনও নির্জন চৈত্র অপরাহ্ণে রাঙা আলোর মাঝে কৃষ্ণকান্ত আর ভোলানাথের সঙ্গী বাস্তু গোখরো নাকি পরস্পরের সঙ্গে খেলা করে, যদিও সে-দৃশ্য কদাচিৎ মর জগতের মানুষ দেখতে পায়!

 

প্যাঁচার ডাকের সঙ্গেই গর্ভগৃহের গাত্রে এক বিচিত্র ছায়াচিত্র অকস্মাৎ চলমান হয়ে উঠল। ঋষা অবাক চোখে তাকিয়ে দেখল সাজি ও শালাই বৃক্ষ দ্বারা পরিপূর্ণ গহিন অরণ্য দিনান্তের আলোয় রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি সুঠাম সাজি বৃক্ষের তলদেশে শ্বেতভষ্মে আবৃত নগ্নদেহী কাষ্ঠকৌপীন পরিহিত জটাধারী এক পুরুষ তাঁর সম্মুখের গেরুয়াবসনধারী একজন তরুণ সন্ন্যাসীকে বলছেন, ‘শ্যামানন্দ চাহিয়া দেখ, এই স্থান মহর্ষি ব্যাসদেবের চরণধুলা স্পর্শে কীরূপ পবিত্র হইয়া উঠিয়াছে। ইহাই আমাদিগের আরাধ্য পশুপতিনাথের লীলাভূমি। তাঁহার কন্যা নর্মদা মা কৃপা করিয়া আজও বহিয়া যাইতেছেন, নয়ন সার্থক করিয়া লও শ্যামানন্দ।’, দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুনরায় বলে উঠলেন, ‘জয় জগদানন্দী হো মাঈয়া, জয় জগদানন্দী হো রেবা, জয় জগদানন্দী!’ 

তরুণ সন্ন্যাসী বিনম্র কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহারাজ কয়েকদিন পূর্বে কপিলাশ্রমে কালভৈরবের যে বিগ্রহ দর্শন করিয়াছিলাম তাহা নিরন্তর মানসপটে ভাসিয়া উঠিতেছে, ইহার কী তাৎপর্য? নর্মদা মাঈয়ের এইরূপ বিচিত্র লীলার কী অর্থ? ইহার পূর্বে আমি কদাপি কালভৈরবকে স্মরণ করি নাই।’

শ্যামানন্দের কথা শুনে স্মিত হাস্যে জটাধারীর মুখমণ্ডল অপরূপ আলোয় ভরে উঠল। বৃক্ষ হতে নেমে আসা ঘন লতাগুল্মের মধ্য দিয়ে তিনি একবার নিঃসীম আকাশের দিকে চাইলেন, দিনশেষে দু-একটি নক্ষত্র ক্ষুদ্র হীরকখণ্ডের ন্যায় সেখানে প্রস্ফূটিত হয়ে উঠেছে, নর্মদা উপত্যকার সন্ধ্যা বড়ো মনোরম। শ্রদ্ধাবান অধিকারী মানুষের মনে সহসা হব্যবাহরূপে বৈরাগ্য উদিত হয়, মৃদুস্বরে সুললিত কণ্ঠে জটাধারী বললেন, ‘এইরূপ জিজ্ঞাসা তোমার মনে পূর্বজন্মের সুসংস্কারের ফলে উদিত হইয়াছে, তথাপি কালভৈরবের মাহাত্ম্য বর্ণনা আমার সাধ্যাতীত। এই নর্মদা পরিক্রমণকালে নিশ্চয় কোনও উচ্চকোটির মহাত্মা তাঁর লীলা বর্ণনা করিয়া তোমার জীবন সার্থক করিবেন। নর্মদা মাঈয়া ও শিবশম্ভুর নিকট কায়মনোবাক্যে সেই প্রার্থনা জানাইলাম।’, কয়েক মুহূর্ত পর নিস্তব্ধ অরণ্যে পুনরায় শোনা গেল জটাধারীর ধীর কণ্ঠস্বর, নিজ মনেই তিনি বলে চলেছেন,

‘শূলটংকপাশদণ্ডপাণিমাদিকারণং শ্যামকায়মাদিদেবমক্ষরং নিরাময়ম।
ভীমবিক্রমং প্রভুং বিচিত্রতাণ্ডবপ্রিয়ং কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে।।’

সুললিত কণ্ঠে মন্ত্রধ্বনি শেষ হওয়ার পূর্বেই মন্দির গাত্রে চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যপটটি অস্পষ্ট হয়ে উঠল, কোন সুদূর মায়ালোকে মিলিয়ে গেলেন দুইজন সন্ন্যাসী, গহিন অরণ্য, নর্মদা তীরভূমি অস্তমিত আলোকরাশি সকল চালচিত্র বিসর্জনের স্রোতে যেন ভেসে গেল নিমেষে, ঋষা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে দেখল নিজের অজান্তেই তার কণ্ঠ থেকে চঞ্চলা সুরধুনীর মতো ভেসে আসছে কতগুলি শব্দ, সে নিজে উচ্চারণ করছে না কিন্তু তবুও অবিরল ঝর্ণাধ্বনিরূপে তারা উচ্চারিত হয়ে চলেছে, শব্দগুলির অর্থ জানে না তবুও বুঝতে পারল ভাষাটি সংস্কৃত…ঋষা বলে চলেছে-

‘অট্টহাসভিন্নপদ্মজাণ্ডকোশসংততিং দৃষ্টিপাতনষ্টপাপজালমুগ্রশাসনম।
অষ্টসিদ্ধিদায়কং কপালমালিকাধরং কাশিকাপুরাধিনাথকালভৈরবং ভজে।।’

শব্দস্রোত শেষ হতেই ঋষা আরও খেয়াল করল তার সমস্ত শরীর অপূর্ব চন্দন সুবাসে ভরে উঠেছে। অস্পষ্ট দীপের আলোয় চোখে পড়ল হাতের পাতা দুখানি রক্তকুসুমের মতো উজ্জ্বল। পরনের শাড়ির আঁচল শিথিল হয়ে মন্দিরের বাঁধানো মেঝের উপর খসে পড়েছে। কেউ কোথাও নাই, পুরাতন ভদ্রাসনের দিক থেকে হঠাৎ একটি রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। ধীর পায়ে ঋষা উঠে দাঁড়িয়ে গর্ভগৃহের ভেতর প্রবেশ করল, সামনে মহাকালের মতো বিরাজমান বাণেশ্বর লিঙ্গটিকে দুহাতে জড়িয়ে মুখটি নামিয়ে বিগ্রহ স্পর্শ করতেই হিমশীতল স্রোতে ভেসে গেল ঋষার সমস্ত শরীর, বর্ষাজলস্রোতের মতো কেশরাজি ছড়িয়ে পড়েছে গৌরীপট্টের উপর, অকস্মাৎ দমকা বাতাসের দোলায় গর্ভগৃহের প্রদীপশিখাটি নিভে গেল, সমস্ত মন্দিরে সহসা নেমে এল কালরাত্রির গভীর দুটি নয়নমণির মতো অন্ধকার।

 

‘হ্যালো পৃথ্বীশ প্লিজ মিট মি. রাও, রাভাল্লা ঈশ্বর রাও, হি ইজ দ্য প্রোজেক্ট চিফ’, আইআইটির মেটালার্জি ডিপার্মেন্টের এইচ-ও-ডি মি. সর্বেশ্বর গুপ্ত পৃথ্বীশকে কথাগুলি বলেই রাওয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এন্ড মি. রাও, হি ইজ পৃথ্বীশ রায়, ভেরি ব্রাইট স্কলার, হি হ্যাজ বিন চুসেন ফর দ্য প্রোজেক্ট।’

পৃথ্বীশের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলেন রাও, বছর পঞ্চাশেক মতো বয়স হবে, পেটানো লম্বা চেহারা, সাদা-কাঁচায় মেশানো একমাথা চুল, পরনে একখানি সাদা হাফহাতা জামা আর নীল জিন্স, বাঁহাতের মণিবন্ধে জ্বলজ্বল করছে হলুদ সুতার তাগা, প্রথমবার দেখেই মানুষটিকে পৃথ্বীশের ভারি আন্তরিক বলে মনে হল। সর্বেশ্বর গুপ্তর অফিসরুমের বিশাল অর্ধচন্দ্রাকার টেবিলের সামনে বসেছে পৃথ্বীশ আর রাও, উল্টোদিকে গদি মোড়া ভারী চেয়ারে বসে রয়েছেন গুপ্তা, বামদিকের দেয়ালে প্রোজেক্টর থেকে নর্মদা ভ্যালীর একটি আর্মি ম্যাপ ডিসপ্লে করা হয়েছে, ঘরে আর কেউ নাই, রাত্রি প্রায় দশটা বাজে, টেবিলের উপর চার পাঁচটি ফাইল রাখা-প্রত্যেকটির ফ্ল্যাপের উপরেই লাল কালি দিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে টপ সিক্রেট এন্ড কনফেডেনসিয়াল।

পরিচয় পর্ব শেষে দু-এক মুহূর্ত পর রাও বিনীত স্বরে সর্বেশ্বর গুপ্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি যদি কিছু মোনে করবেন না তো আমি রয়কে নিয়ে আলাদা করে বসতে চাইছি।’

রাওয়ের কথা শুনে একটু বিস্মিত হয়ে গুপ্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি বাঙলাও বলতে পারেন?’

–কলকাত্তায় দশ বছোর, হাঁ, দশ বছোর হবে, আমি ছিলাম মি. গুপ্ত!

–ওহ! সিওর, প্লিজ আপনারা বসুন, কিছু প্রয়োজন হলে ডোন্ট হেসিটেট টু কল মি।

গুপ্ত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই পৃথ্বীশের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন রাও, তারপর চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রয় তোমার কোনও আইডিয়া আছে এই প্রোজেক্টে? আইডিয়া মিনস হোয়াট উই আর গোয়িং টু ডু।’

–নো স্যার।

–রয়, প্লিজ ডোন্ট কল মি স্যার, কল মি ঈশ্বর অর রাও, যেটা তোমার পছোন্দ!

–সিওর স্যার।

আবার পৃথ্বীশের মুখে স্যার শুনে হো হো করে হেসে উঠে রাও বললেন, ‘বুঝেছি,রাইট নাউ ইউ আর বিট নার্ভাস! ওকে মাই বয় লেটস ডু ওয়ান থিং, চোলো আজ আমরা গল্পো করি, কাজ কাল থেকে হবে।’

কাল থেকে কাজের কথা শুনে মনে মনে একটু আশঙ্কিত হল পৃথ্বীশ, কাল সকালেই ঋষার কাছে যাওয়ার কথা, সে বোধহয় আর হল না। আজ হঠাৎ করেই রাত্রি নটা নাগাদ গুপ্ত স্যারের ফোন পেয়েই বুঝতে পেরেছিল কাজ শুরু হয়ে গেছে আর অবকাশের সময় নাই। পৃথ্বীশকে চুপ করে থাকতে দেখে সামান্য ভ্রু কুঁচকে রাও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হলো? এনিথিং রং?’

–না না, প্লিজ বলুন!

–ওক্কে, তোমাদের এখানে কফি পাওয়া যাবে এখন?

সামান্য অবাক হয়েই পৃথ্বীশ বলল, ‘নিশ্চয় যাবে, আপনি বসুন একটু আমি কফির কথা ক্যান্টিন বয়কে বলে আসছি।’

–নো নো, নট হিয়ার, লেটস গো ফর আ ওয়াক, হাঁটতে হাঁটতে গল্পো করি!

 

বেশ রাত্রি হয়েছে, হেমন্ত কুয়াশায় আজ যেন চরাচর ডুবে রয়েছে, একপলক দেখলে মনে হয় কোনও অপরূপা যুবতী তার পরনের রেশম বস্ত্রটি শরীর থেকে খুলে ভুবনডাঙায় বিছিয়ে দিয়েছে, মোরাম বিছানো পথ বেয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে রাও মৃদু স্বরে বললেন, ‘ইউ নো রয়, আমি অন্ধ্রার গ্রামের মানুষ, না গ্রামা পেরু ভীরাভরম’, পরমুহূর্তেই একটু হেসে বলে উঠলেন, ‘সরি আই ইউজড মাই মাদার ল্যাঙ্গোয়েজ! গ্রামের নাম হলো ভীরাভরম, গোদাবরী,ইউ নো দ্য রিভার, তার পাশেই ভীরাভরম।’

পাশ থেকে পৃথ্বীশ বলল, ‘আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম! খুব মিষ্টি ভাষা তো, না গ্রামা পেরু ভীরাভরম!’

–সব ল্যাঙ্গোয়েজই নাইস রয়, মায়ের ভাষা খারাপ হয় না। আর জানো আমাদের এথিক্যাল বাইন্ডিংস ওই মায়ের ভাষাতেই পসিবল। কজ, যখন এক বাচ্চা মাদার ল্যাঙ্গোয়েজ শেখে তখন তার লজিক্যাল মাইন্ড ডেভলপ করে না সো সে শেখে ইনটিউশন থেকে, সে বলে সাপোজ কগগগ, দ্যাট মিনস সামথিং, এভাবে তার ভোকাবুলারি ডেভলপ করে আর ক্রিয়েট হয় ওই এথিক্যাল বাইন্ডিং!

–ভেরি ইন্টারেস্টিং! আপনার কি ভাষা নিয়েই কাজ?

পৃথ্বীশের কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন রাও, হাসতে হাসতেই বললেন, ‘নো নো, আই এম একচুয়ালি জ্যাক অব অল ট্রেডস বাট মাস্টার অব নাথিং! ওই তোমাদের বেঙ্গলিতে কী একটা কথা আছে না, ডিফিকাল্ট ওয়ার্ড, মাই বেঙ্গলি গার্লফ্রেন্ড বলতো আমাকে! কী যেন, সামথিং প, তুমি জানো?’

মুখ টিপে সামান্য হেসে পৃথ্বীশ বলল, ‘পল্লবগ্রাহীতা!’

‘ইয়েস ইয়েস, আফটার সো মেনি ইয়ারস আই হার্ড দ্যাট ওয়ার্ড!’, কথা শেষ করেই পৃথ্বীশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে?’

মুখ নামিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল পৃথ্বীশ। 

–গুড, ভেরি গুড, মে আই নো হার নেম?

পূর্ববর্তী সন্ধ্যার কিছু কথা চিন্তা করে, অথবা হয়তো কিছু না ভেবে নিজের অজান্তেই পৃথ্বীশের মুখ থেকে বেরিয়ে দুটি শব্দ, বন্যা রহমান! পরক্ষণেই বেদনায় বা বলা ভালো অনুশোচনায় ভরে উঠল মন, দ্রুত নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে নীচু গলায় বলল, ‘সরি, হার নেম ইজ ঋষা, ঋষা ভট্টাচারিয়া।’

ভ্রু দুটি সামান্য উপরে তুলে স্মিত হেসে রাও জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এন্ড দ্যাট লেডি, বন্যা, বন্যা রহমান?’

বামদিকে একটি পুরনো কাঠচাঁপা গাছের অন্ধকার ডালপালার দিকে মুখ ফিরিয়ে পৃথ্বীশ উত্তর দিল, ‘সি ইজ মাই কোলিগ।’

 

দু-এক মুহূর্ত পর শীতবাতাসের মতো বিবাগী অন্যমনস্ক গলায় রাও বলে উঠলেন, ‘ইউ নো রয়, মাই ফাদার রাভাল্লা রাও ভীরাভরমে গোদাবরীর পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে একবার বলেছিলেন, আই ওয়াজ দেন এইট্টিন, মি মানসাসুপাই নামমাকম লেডু, তাক্কুভা মানাসসু ইলাপ্পুদু মিমমালনি তাপ্পুতুন্দি।’

ভাষাটি কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক চোখে রাওএর দিকে চেয়ে রইল পৃথ্বীশ, ঈশ্বরের চোখ দুটি লুব্ধকের মতো জ্বলজ্বল করছে, মুখমণ্ডল কী এক অপরূপ কোমল পদ্মপাতার আলোয় আচ্ছন্ন, স্বপ্নোত্থিতের মতো গলা শোনা গেল তাঁর, ‘দ্যাট মিনস নেভার ট্রাস্ট অন ইয়োর মাইন্ড। নীচের দিকের মন সবসমোয় তোমাকে মিসগাইড করবে! আমি বাবার কথা এখনও মনে রেখেছি, দ্যাট ওয়াজ আ গ্রেট ডে ফর মি।’

কথা শেষ করেই জামার পকেট থেকে মোবাইল বের করে দ্রুত হাতে কাকে যেন একটা মেসেজ পাঠালেন রাও, যন্ত্রটি ভারি অদ্ভুত, সাধারণ কোনও মোবাইলের মতো দেখতেও নয়, হাতের আঙুলের মতো ক্ষুদ্রাকায় যন্ত্রটি পুনরায় পকেটে ঢুকিয়ে পৃথ্বীশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ইট ইজ কোডেক্স, আ স্পেশাল মোবাইল।’

 

ক্যাম্পাসের উঁচু বাতিগুলি ইতিমধ্যেই অলীক ভুবনের মতো হয়ে উঠেছে, শিমিশিম বাতাসে কান পাতলে কার যেন পদধ্বনি শোনা যায়,আকাশে মেঘ নাই অথচ সমস্ত চরাচর অস্পষ্ট মেঘসাজে আজ অপরূপা-সেদিকে একবার তাকিয়ে রাও একটু অদ্ভুত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ডু ইউ বিলিভ ইন গড?’

এই নির্দিষ্ট সরল অথচ তীক্ষ্ণ প্রশ্নের উত্তর পৃথ্বীশের কাছে এতই অস্পষ্ট ও কুয়াশাচ্ছন্ন যে কোনও কথা না বলে সে চুপ করে রইল।

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রাও হঠাৎ কেজো গলায় বলে উঠলেন, ‘লুক রয়, আওয়ার আপকামিং প্রজেক্ট প্লেস ইজ নর্মদা ভ্যালী, আই থিংক ইন্ডিয়াজ মোস্ট পাওয়ারফুল স্পিরিচুয়াল প্লেস। দু তিনদিনের মধ্যে উই উইল সিট টুগেদার ইন দেলহি, ওখানে তুমি ব্রিফিং পেয়ে যাবে।’, কথা শেষ করে কী যেন একটু চিন্তা করলেন তারপর পুনরায় পূর্বের মতো সহজ ভঙ্গিমায় বললেন, ‘ইন দ্য মিন টাইম থিঙ্ক, থিঙ্ক আবাউট মাই লাস্ট কোয়েশ্চেন।’

সামান্য ইতস্তত করে নিচু গলায় পৃথ্বীশ জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি বিশ্বাস করেন?’

ঈশ্বরের মুখে ক্ষণিকের জন্য একটুকরো হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, দৃঢ় গলায় জবাব দিলেন, ‘ইয়েস আই ডু। কালভৈরব ইজ মাই লর্ড।’

 

       চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                       পরের পর্ব : এ মাসের  চতুর্থ শনিবার

 

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।  

 

 

   আরও পড়ুন:

হাড়ের বাঁশি (চতুর্থ পর্ব)

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.