হাড়ের বাঁশি (ত্রাত্রিংশ পর্ব)

পাঁচ বৎসর পূর্বের দিনটি মনে পড়ছে। তখন তুমি চঞ্চলা প্রজাপতির মতো উজ্বল। আমারও বয়স কম এবং আমি চেষ্টা করছি আমার নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার। সেই অস্থির সময়ে তুমি এসেছিলে। প্রেমিকা নয়, বান্ধবী নয়, কোনও সম্পর্কও নয়, এক ভুবনহীন অলীক জগতের আখ্যান নিয়ে মধুবাতাসের মতো এলে আমার মনোজগতের উঠানে। সেখানে তখন শুধু জল আর জল, জীর্ণ দালান, প্রবল ঝড়ে নষ্ট হয়ে গেছে সকল দিশা। তুমি এসে অপরূপ স্পর্শে যে অনির্বাণ প্রাণচিহ্ন পড়ে ছিল তাকে জাগিয়ে তুললে পুনরায়। সামান্য আদরে দুহাতে তুলে মুখের কাছে নিয়ে এসে বললে, ‘তুমি কি বিস্মৃত হয়েছ সকল কথা, তুমি কি সত্যই ভুলে গিয়েছ নিজেকে?’
আমি উত্তরে কী বলেছিলাম মনে নাই।
শুধু এইটুকু এখন বুঝতে পারি প্রত্যুত্তরে তুমি বলেছিলে, ‘কেন সেই যে কত শাপলা ফুলে অযত্নে সাজানো দিঘি, পুরাতন ঘাট, সুরধুনীর তীরে কত আষাঢ় অপরাহ্ণে লকলকে পাটখেতের পাশ দিয়ে বয়ে চলা আমাদের তালকোন্দা নাও। আকাশে দলছুট বালকের মতো সাদা মেঘের অলঙ্কার, কত শ্মশানে অগ্নিমুখে জেগে ওঠা নশ্বর চিতা, সারাজীবনের বেদনা ও অশ্রু স্রোত, কত অপরূপ আনন্দ এবং অস্ত আলোর রেণু বেয়ে বারংবার এই মরপৃথিবীর বুকে নেমে আসার খেলায় আমাদের দেখা হওয়ার কথা ছিল। সেই প্রতিজ্ঞা তোমার মনে নাই? আমার কিন্তু আজও মনে রয়েছে, ভুলে যাই নাই! যদিও আমি জানি শেষ অবধি এই কথা রাখব না বলেই তোমাকে আমার মনে থাকবে আজীবন আর তুমিও কখনও আমাকে ভুলে যেতে পারবে না।’
আজকাল সেই পুরাতন কথা মনে পড়ে। ভাবি নিঃসঙ্গতা একটি বোধ, আর একজন আমার মতো নিঃসঙ্গ মানুষ আরেকজন একাকী মানুষকে তার নিজের কথা বলতে চায়!
তুমি গুপী-বাঘার চলচ্চিত্র দেখেছ? নিশ্চয়ই দেখেছ!
গুপী সেই যখন
গ্রাম থেকে চলে যাচ্ছে গাধার পিঠে চড়ে, তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই, গুপীর বাবা চাদরের খুঁটে চোখের জল মুছছে। মাত্র দশ সেকেন্ডের দৃশ্য, কিন্তু কী অপরূপ একাকীত্ব প্রকাশ করে! ভেবে দেখ, অপু, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র ওই যুবক, কাপুরুষ মহাপুরুষের সৌমিত্র, উদয়ন পণ্ডিত, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র সিদ্ধার্থ, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র চারজন যুবক, আগন্তুকের মনমোহন, ‘শাখাপ্রশাখা’র উন্মাদ জেষ্ঠ্য পুত্র প্রশান্ত, এমনকি ফেলুদাও কী নিঃসঙ্গ! লালমোহন বা তোপসে তো তার বন্ধু নয়! আসলে কী জানো এই নিঃসঙ্গতা সত্যজিতের নিজের। তিনি কখনও কারোও প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু হতে পারেননি। তিনি অলৌকিক প্রতিভাবান এক মানুষ, যিনি সারাজীবন সমস্ত সম্পর্ক থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। এই একাকীত্ব কিন্তু কোনও বিষাদজাতক নয়, যেমন ছিল কাফকার বা জীবনানন্দের। ওই যে জীবনানন্দ লিখেছিলেন, সকলের মাঝে নিজের মুদ্রাদোষে হতেছি আলাদা-এ কিন্তু তেমন নয়। এই নিঃসঙ্গতা কিন্তু কুরোশোওয়ারও নয়। সেখানে বরং তিনি শেষ অবধি জানেন আমাকে একাই চলে যেতে হবে। অনেকটা প্রাচ্যের ভাব, সত্যজিৎ যেন ভিড়ও ভালোবাসেন আবার একা থাকতেও ভালোবাসেন, তাই না বল?
সত্যজিৎবাবুর স্থিরচিত্র দেখেও কি তোমার মনে হয় না তিনি কত একা? ভেবে দেখো একবার।

তবে কী জানো এই নিঃসঙ্গতা খণ্ডিত, কারণ তা এক এবং একমাত্র সত্যে নিয়ে যায় না। এখান থেকে মানুষ বলতে পারে না কখনও ‘তুঁহু তুঁহু’, সে শুধু নিজের কথাই চিন্তা করে।
তবে এই
খণ্ডিত একাকীত্বের পথ ধরেই শুরু হয় প্রকৃত যাত্রা। সেই অপরূপ সৌন্দর্য আর বাসনাশূন্য জগতে, তখন আমার-আমি বলে কিছু নেই। তখন ওই তুঁহু তুঁহু শব্দে বেজে ওঠে অনন্ত বীণা।

এলোমেলো চিন্তা খুব ভারী হয়ে গেল বুঝি?
আমি সরে যাই এবার এই চিন্তা থেকে। আমি কেউ নই। এইসব কথার মূল্যও তেমন কিছুই না। আর যে কিছুই পারি না। সামনের বার দেখা হলে সাতমহলা বাতাসবাড়ি আর তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো হিরের পদ্মফুল গড়িয়ে দেব, ততদিন ভালো থেকো।
যদিও জানি,
সামনের বার আর আমাদের দেখা হবে না, কারণ আমরা ওই গানটির কথার মতোই এমনি এসে ভেসে যাই! তাই না, বনকুসুমু?

পৃথ্বীশ। ৫ই মে। কলকাতা।

সম্বোধনহীন এই চিঠিটি সাত্যকি পাঁচবার পড়ল। কোনও হৃদয়াবেগ নয়, বরং সজাগ যন্ত্রের মতো বারবার দেখল, প্রতি দুই লাইনের মাঝখানে আরও কিছু না-বলা কথা রয়ে গেছে কিনা, কোনও ইশারা বা অস্পষ্ট চিন্তাসূত্র! এই চিঠিখানি অ্যাকসিডেন্টের সময় ঋষার হাতে ধরা ছিল। সাদা কাগজে সর্বত্র কালচে রক্তের দাগ। দু-এক জায়গায় অক্ষর অস্পষ্ট হয়ে এসেছে, কিন্তু কী আশ্চর্য উপায়ে কাগজটি নষ্ট হয়ে যায়নি।
উডল্যান্ডস হাসপাতালের
বাইরে ফুটপাতের মায়াচ্ছন্ন স্তিমিত আলোয় চিঠিখানি পড়ে ভাঁজ করে জামার বুকপকেটে রাখল সাত্যকি। অল্পক্ষণ পূর্বে একজন ছায়ার মতো ময়লা তালঢ্যাঙা লোক এসে একটি সাদা খাম দিয়ে গেছে, লোকটির বামদিকের গালে একটি বড়ো আঁচিল। এক পলক দেখে সাত্যকির মনে হয়েছিল, কোথাও যেন লোকটাকে দেখেছে। নাম ঠিকানা কিছুই মনে পড়ছে না কিন্তু ওই আঁচিল খুব চেনা! অন্যমনস্ক ভঙ্গিমায় হাত বাড়িয়ে খামটি নেওয়ার সময় দুই পা কাছে এসে আগন্তুক অস্পষ্ট খসখসে গলায় বলেছিল, ‘বড়ো সাহেব দেরি করতি নিষেদ করচেন!’
কথার কোনও উত্তর না দিয়ে
কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়েছিল সাত্যকি। খোচড়দের সঙ্গে বেশি কথা বলতে সে একেবারেই পছন্দ করে না।

পকেটে রাখা কৌটো থেকে মৌরিভাজা বের করে মুখে দু-চারটি দানা ফেলে ঠাণ্ডা মাথায় দুটি কথা ভাবল সাত্যকি। ঋষা মে মাসে লেখা পৃথ্বীশের চিঠি এখন পড়ছিল কেন? আর দ্বিতীয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, পৃথ্বীশ কি কিছু কথা ঋষার কাছে গোপন করেছে? যেমন এই নর্মদাতটে যাওয়ার কথা! কিন্তু তাই যদি হয়, তাহলে ঋষা নিজ উদ্যোগে অমরকণ্টক যাওয়ার পরিকল্পনা করল কেন? সে কি শুধুই সমাপতন?
নাকি ঋষা সমস্ত পরিকল্পনার কথাই জানে?
অনেকগুলো প্রশ্ন
মাথায় ভিড় করেছে। এইসব কূট প্রশ্নের জট খোলাই তার কাজ। যেমন একটি নিঁখুত অ্যালগোরিদম ধাপে ধাপে সমাধানে পৌঁছায় তেমনই সাত্যকি মনমহলে প্রশ্নগুলি সযতনে সাজাল। এইবার তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবেই নড়াচড়া করবে উত্তর। এ তো কোনও প্রাণহীন বস্তু নয়, অ্যালগোরিদমের মতোই সমস্যা অর্থাৎ প্রবলেম সেটের প্রাণ রয়েছে, তবে তা অতি সূক্ষ্ম, যেন সন্ধ্যা বাতাস। ঝিমঝিম শব্দে বয়ে চলে, সেদিকে চাইলে স্পষ্ট বোঝা যায় একখানি রেশমি বস্ত্রের আড়ালে সমাধান রত্নটি কেউ যেন সযত্নে রেখে গেছে।
আলগোছে একবার ঘড়ি দেখল সাত্যকি। প্রায় ছ’টা বাজে, অপারেশন কি শেষ হল?
নাকি বাঁচার কোনও আশাই নেই?
দুটির মধ্যে
যে কোনও একটা খবর আজ রাত্রেই হেডকোয়ার্টারে পাঠাতে হবে। সহসা মণিবন্ধে ক্ষুদ্রাকৃতি যন্ত্রটি দু’বার তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল। চোখ নামিয়ে সাত্যকি দেখল, স্পষ্ট কতগুলো নীল আলোর অক্ষর পর্দায় ফুটে উঠেছে, ডেস্টিনেশন অমরকণ্টক, এলিমিনেট হার।

যন্ত্রটির আলো নিভিয়ে দিতেই ঝুমঝুম নুপূর বাজিয়ে চঞ্চলা বালিকার অভিমানের মতো সন্ধ্যা-বৃষ্টি এল। আকাশের দিকে মুখ তুলে একবার চাইল সাত্যকি। তালকোন্দা নাওয়ের মতো মেঘ ভেসে চলেছে। সহসা মনে পড়ল তার জন্মভিটা বরনগর গ্রামের কথা। কতদিন সেই দেশে যাওয়া হয়নি! প্রমাতামহী হেমলতা ঠাকুরাণির ভিটাখানি বড়োই নিঃসঙ্গ!  বরনগরের হেমলতা দাওয়া থেকে আকাশের দিকে মুখে তুলে দেখল, ঘন কুয়াশার মতো মেঘে ভরে উঠেছে চরাচর! অদূরে মদনমোহনের জোড়বাংলা মন্দিরটি এমন মেঘের দিনে মনে হয় পটচিত্র। হেমলতা কান পেতে বসে থাকে। নির্জন দ্বিপ্রহরে সত্যই বেজে ওঠে ঝুমঝুমি আর আড়বাঁশি! ব্রজ কি কোনও স্থান! না, হেমলতা নিজেকেই শুনিয়ে বলল, হৃদয়পুরই ব্রজধাম, সেখানেই লীলাময়ের নিত্যলীলা!
তবে সকালে উঠে ঘন
মেঘ দেখলে হেমলতার মনে হয়, আজ সব ছুটি। কুসুম মেঘ ভারী মেঘ কেমন অলস মন্থর পায়ে নাচ শুরু করেছে দালানে! সেই উন্মনা মানুষটি এমন দিনে সকালে উঠেই হাঁক পাড়তেন, ‘কই গো গেরস্ত বউ, উনানে চাল-ডাল চাপাও।’

সেদিনও খুব জল। কোন দূর গহিন দেশে পুবালি বাতাসি নাওয়ে উঠে বসেছে চাষাদের আউশ খেত, পাট খেত। স্মৃতিপটচিত্রের মতো বাগানে জল টলোমলো হাসনুহানা আর জুঁই। কাল সন্ধ্যায় চন্দ্রশেখর হেলতে দুলতে ভাঙা পাঁচিলের গর্তে ঢুকে গেল। কিছু বলে না কাউকে, পুরোনো দিনের বাস্তুসাপ। বাগান থেকে জলফোটা জুঁই তুলে আনে কিশোর, মালা গেঁথে দুয়ার সাজানোর বড়ো বাসনা। বাতিল কাগজের নৌকো মোচার খোলায় তুলে ভাসিয়ে দেয় বউডুবির ঘাটে, যেন বেহুলার মান্দাস। পায়ে পায়ে অভিমানিনী বৃষ্টি এসেছে আজ, গলা তুলে হেমলতাকে বলে, ‘ওকে দুমুঠো দুর্বা, তেল হলুদ সিঁদুর দিয়ে বরণ কর, কতদিন পরে ঘরে ফিরল!’

আঁধার হয়েছে দিবসের বেলা। ভরা পোয়াতি মেঘ নদীর উপর বাজিয়ে চলেছে জলতরঙ্গ। দূর দিকচক্রবাল রেখার কাছে লি লি করছে কুয়াশার মতো জলের পর্দা দিয়ে ঘেরা ছোট ছোট গ্রাম, তাল সুপারির সারি। ছায়া জমেছে দিঘির পৈঠায়, আতা গাছের তলায়। ঘরের দেয়ালে জীর্ণ আঁধার, যত্ন করে প্রদীপ জ্বেলে দিল কিশোর।

বাতাসি নাও বহুদূর যাবে, কত সজল শ্যামলা প্রান্তর খোড়ো চালের ঘর ভরন্ত নদী কত মানুষের সুখ-দুঃখ ভরা সংসার পার হয়ে ভেসে যাবে আরও পুবদিকে। তার বন্ধন নাই। লোকলজ্জা নাই। বসন নাই, ক্লান্তি নাই, প্রতিদিনের অতিসাধারণ জীবনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে শুধু বয়ে চলে। সেই অনির্বাণ যাত্রাপথের দুপাশে এখন মরা আলো। সন্ধ্যা প্রদীপের মতো হেমলতার দিকে তাকিয়ে কিশোর বলে, ‘বসো না দুদণ্ড, অত কীসের কাজ তোমার!’

সজল হাসি হেমলতার ওষ্ঠাধরে পাপড়ি মেলে দিয়ে উত্তর দেয়, ‘দ্যাখো কেমন আঁধার থই থই বটতলা! চিঁ চিঁ করে কাঁদছে লক্ষ্মী বেড়ালের ছানাপোনা। উনোনে ছাইগাদায় তুলে এনে ওম দিতে হবে, কাজ কী কম গা!’
–আজ আর ঘাটে যেও না। শ্যাওলায় পেছল পৈঠা। বউডুবির ঘাটে বড়ো গোখরোর উৎপাত।
আনমনা হেমলতা
কথার জবাব না দিয়ে মলিন স্বরে বেজে ওঠে, ‘শুনছো, আবার শকুনের বাচ্চা কাঁদে বাঁশঝাড়ে, ঠিক আমার সেই আঁতুড়ে ছেলের মতো।’
মুখ নামিয়ে নেয় কিশোর, ‘কী করব বলো, যার যেমন কপাল! চোখ ফোটার আগেই চলে গেল।’
চিরকালের বাতাস
আর জলের ছায়ার মতো চোখদুটি তুলে তাকায় হেমলতা, ‘অমন নাম কেউ রাখে সংসারে! শখ করে নাম দিলে শঙ্কর। পালাই পালাই ছেলে, তাকে আঁচলে বাঁধব সাধ্য কী আমার!’

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (দ্বাত্রিংশ পর্ব)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More