হাড়ের বাঁশি (বিংশ পর্ব)

বনবিহারীর যৌবনকালে আলবোটু ছিল। গুরু কলার পাঞ্জাবি পরে বেরোলে যুবতিদের হৃদয়ে তিরতির করে কাঁপন লাগত। বাবার সিন্দুক থেকে টাকা চুরি করে একবার পালিয়েছিল, বোম্বের ফিলিম ইস্টার হবে! বাসনা ছিল মনে। রাঢ়দেশে বলে, অম্বা তো কম নয়!

একটি বালকের সামনে, হাতে চায়ের গেলাস নিয়ে পা নাচাতে নাচাতে ছড়া কাটতো, বুলবুলি বুলবুলি তোর পুকটি ক্যানে রাঙা, বিধাতা করেছেন মোর খয়েরখেকো পোঁঙা। বালকটি মজা পেয়ে খিলখিল করে হাসত।
গলার আওয়াজ বাজখাঁই,
হাঁকডাক দিলে দুপাশের বাড়ি থেকে লোকে বুঝতে পারে। বনবিহারীর ডাকনাম টাবু। টাবুদা বলতে পাড়ার মানুষজন অজ্ঞান। জেলার নামকরা গোলকিপার, এখনও পায়ের ডিম দেখলে বোঝা যায়। তা সেই টাবু, ধবধবে ফর্সা রং, মোটা পৈতে গলায়, এক বছরের একটি শিশুকে কোলের ওপর ফেলে ঘুম পাড়াচ্ছে। শিশুর মা, পালা দেখতে গেছে। কী নাম পালার? না, বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা! শিশুটিও বেশ থাকে পিতৃব্যর কাছে। জ্বালাতন করে না। মাই খেতে চায় না। কে জানে কোন পুরাতন সম্পর্ক! এই হল বড় বয়সে ওই বালক। 

গেরস্ত বাড়ির দাওয়ায় একটা খাঁচায় টিয়াপাখি দোলা খায়, ওর নাম কেষ্টদাস। শিস দিয়ে সরু গলায় মা, মা বলে ডাকে। রসগোল্লা দিলে ঠুকরে ঠুকরে মুখে নেয়, ভারী ভালবাসে মিষ্টি! খরগোশের নাম টেঁপি আর লাল গাইয়ের বাছুর মুংলি। উঠানে ধানের গোলা, বড় বড় বগি থালায় দুপুরবেলা সেই ধানের অন্ন বেড়ে দেওয়া হয়। আকাশ থেকে কলতলায় তখন নেমে এসেছে রোদ্দুরের আলো। নিঝুম কুয়োতলায় স্নান করে ঠাকুরানি। খিড়কির ঘাটে বাঁশঝোপ, ওখান থেকে পাখিটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে, চোখ গেল! চোখ গেল! স্নান সেরে ঠাকুরঘরে মহাদেবের মাথায় চড়াবে বেলপাতা। আর দুটো গন্ধরাজ কুসুম। বাণেশ্বর শিব। গায়ে পৈতের দাগ, চাঁদির সাপ আর ছাতি। গৌরীপট্টটি রুপোর। এক সন্নিসি দিয়েছিল বাড়ির কত্তাকে ওই বাণেশ্বর লিঙ্গ। সেই থেকেই তিনি আছেন। আপদে বিপদে, সবাই বলে, শূলপাণি রক্ষা করেন এই গৃহ।

পুরাতন পরিবারে গমগম করে লোকজন। ঝি, মুহুরি, বাগাল, মুনিষ- দিনান্তে আট দশটি পেট। পৌষলক্ষ্মী হেঁটে চলে বেড়ান, চৌকাঠে তেল সিঁদুরের ছোপ লাগানো হয়। বাড়ির দুটি যুবতি মেয়ে সন্ধেবেলা হারমোনিয়ামের বেলো টিপে গান ধরে, ঝরা ফুলদলে কে অতিথি! সচল বচল দিন, মান অভিমান আনন্দ আর হাসি থইথই সংসার।
তারপর একদিন ধুলো
জমে। দূর স্বপ্নের মতো মিলিয়ে যায় সব চরিত্র। একা একা বসে থাকেন মহাদেব। বলিরেখায় শীর্ণ তাঁর মুখ। কপালের চাঁদটি খসে পড়েছে, জং ধরেছে ত্রিশূলে। মুখের হাসিটি শুধু একইরকম। ফি বছর নীলের আগে গাজনের সন্নিসিরা সিধে চাইতে আসলে মলিন কবেকার বাঘছাল পরে উঠে আসেন দুয়ারে! ভাঁড়ারঘর খুলে খুদকুঁড়ো যা হোক দুটি দেন, আদর করেন কাঁচা বেলকাঠ দিয়ে বানানো নীল ঠাকুরকে।তিনি আর বনবিহারী দুজনেই আছেন। বনবিহারীর কথা বন্ধ, হাত পা অবধি নাড়াতে পারে না। সারাদিন গোঁ গোঁ আওয়াজ মুখে। কী বলতে চায় কে জানে! অতীতের রূপবান দাপুটে পুরুষের শরীরে শুধু ধুকপুক করে এক অনির্বাণ দীপশিখা। চটকে ভাত ডাল জলের মতো করে নল দিয়ে অন্ন দিতে হয়। হাগা মোতা সব বিছানায়। পাউডারে সাদা অয়েলক্লথ, না হলে হাড়ের নীচে মাংসের লোভে পোকা আসবে। ওৎ পেতে তারা বসে আছে।
ওঘরে এক
বৃদ্ধা হাঁ করে চেয়ে বসে থাকে, পঙ্গু জ্যেষ্ঠ পুত্রের কষ্ট কবে শেষ হবে। তার নিজের শরীর এখনও অটুট। বড় মায়া, যেতে বড় ভয় হয়। আয়ু কেউ কাউকে দান করতে পারে না, অতি দামি ও বস্তু!

যে দেয় সে নিজেও জানে না, সে দান গ্রহণ করে চেনা সংসার। অতি প্রিয় ভালোবাসার জন উঠানে গোবর ছড়া দেবে! আগুন নিমপাতা লোহা ছুঁয়ে গৃহে উঠে আসে তারা। যেন ওই অশরীরী কিছুতেই ফিরে আসতে না পারে গেরস্ত ভালোবাসায় ! সেই ভালোবাসা বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে জ্বলজ্বল করে দিবস রজনী!
কেঁদে কেঁদে মরে
 শরীরহীন প্রাণ, কেউ তাকে চিনতে পারে না। জল নাই আলো নাই আঁধারও নাই চারপাশে, কিছুতেই চিনতে পারে না পথ। আলোর তন্তু দিয়ে তৈরি যে পথ চলে গেছে আকাশ পার হয়ে অলীক উত্তর অথবা দক্ষিণ দিকে। 

রাত হয়ে এসেছে। টাবুর ঊষা ও সন্ধ্যা একইরকম। বাড়িটি চুপ করে বসে আছে। তার সব কোলাহল মিলিয়ে গেছে মহাশূন্যে। বুনো আগাছায় ছেয়ে গেছে বাগান, একটি ফুলের গাছও আর বেঁচে নাই। ভেঙে পড়েছে পুরোনো ভিটার ছাদ। ওদিকে কেউ যায়না এখন। গৃহলক্ষ্মী বিদায় নিয়েছেন অনেকদিন। দীপ জ্বলে না, শঙ্খ বাজে না, ফুরিয়ে গেছে যত প্রাণ।যদি এখান থেকে চল্লিশ বছর পিছিয়ে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে উত্তরদিকের মফস্সল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন যুবক মাস্টারমশাই, তিনিই বনবিহারী। রেলগাড়ি চেপে নিজের দেশে ফিরবেন। এদিককার সরকারি ইস্কুল থেকে বদলি হয়ে গেলেন গঞ্জের বড়ো বিদ্যালয়ে। কতই বা বয়স, তিরিশটা বছরও পার করতে পারেননি। হলুদ পাঞ্জাবি পরেছেন, কাঁধের ঝোলা ব্যাগে অকিঞ্চিৎকর সব জিনিস। একটা প্লাস্টিকের বাঁশি, নড়বড়ে হাতে লেখা প্রিয় স্যার, অনাদরে ঝোপে ফুটে থাকা দু-চারটে বেগনিরঙা ফুল, তিন টাকার বলপেন, একটা মোটা রাবার, এইসব আর কী!
অবোধ বালকেরা হাতে তুলে দিয়েছে
ওঁকে। তিনি দুটো করে টফি দিয়েছেন সবাইকে। মিষ্টি খাওয়ানোর সামর্থ্য নাই। কতই বা আর মাইনে পান! টিফিনের ঘণ্টা বাজার আগেই যুবকের ছুটি হয়ে গিয়েছে। অনেক পুরোনো লম্বা করিডর দিয়ে শেষবারের মতো হাঁটা সাঙ্গ হল তাঁর। একেকটা ক্লাসরুম পার হয়ে যাচ্ছেন আর কত কুসুম কুসুম চোখ ফুটে উঠছে বাতাসে। অলীক কল্পনার মতো তারা কোথায় যেন সব মিলিয়ে গেছে।
ওই তো ক্লাস নাইন, বি!
মাস্টারমশাইয়ের জীবনের প্রথম ক্লাস। সেও এমনই টিফিনের ঘণ্টা বাজার আগে! সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। একটি ডেঁপো ছেলে ধাঁধার মতো প্রশ্ন করছে, তিনি উত্তরও দিচ্ছেন। এই তো সেদিনের কথা! দুটো বুড়ো দেবদারু গাছ আছে মাঠ। তাদের পাতায় পাতায় বয়ে যাচ্ছে চিরকালের বাতাস। ধুলো মেখে বল খেলছে কয়েকটি বালক, সাদা জামায় মাটির দাগ। সাদা ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি পরা হেডমাস্টারমশাইকে চলে যাওয়ার আগে প্রণাম করছেন যুবকটি। হেডস্যারের গায়ে অনেক পুরোনো বই আর কড়া তামাকের গন্ধ। হাত দিয়ে যুবকের দুটো কাঁধ চেপে ধরে বলছেন, অনেক বকেছি তোকে। তুই তো আমার ছেলের বয়সী। যত্ন করে পড়াস বাবা! ভালবাসিস। 

ট্রেন ছুটে চলেছে, দুপাশে আশ্বিনের খাঁ খাঁ প্রান্তর। কত নীরব শান্ত জনপদ দুধারে, মানুষের সংসার। ব্যথা পায় তারা। কষ্ট পায়। নিংড়ে হাড়মাস চুষে চুষে খায় জন্মপরবর্তী মহাজীবন। তবুও বর্ষাবিধৌত অপরূপ নীল আকাশের তলায় তারা পুনরায় হেসে ওঠে। পিরিত করে মেয়েমানুষের সঙ্গে। কোন সুদূর ঊর্দ্ধলোক থেকে নেমে আসে তাদের ঘরে শিশুর দল। একই গল্প, কত অযুত নিযুতবার বলা হয়ে গেছে, তাও কী নতুন!

যুবকটি ব্যাগ খুলে নেড়েচেড়ে দেখছেন, সদ্য পাওয়া উপহার। একটা জারুল ফুল হাতে দিয়ে, শেষ বেঞ্চের ফেল করা রজত বলেছিল, স্যার আপনি চলে যাচ্ছেন! আমাদের কথা কে শুনবে তাহলে? যুবকের করতলে এখন ওই কুসুম তিরতির করে কাঁপছে। জানলার ওপারে পান্নার মতো সবুজ রঙের পৃথিবীর ওপর ভেসে আছে আদিগন্ত আকাশ। বিরাট সেই জগতে শোনা যাচ্ছে ক্ষুদ্র রেলগাড়িটির ভেঁপুর আওয়াজ।
আর শরতের অপরাহ্ণে
রেলকামরার ভেতর যুবকটি কেঁদেই চলেছেন। কেঁদেই চলেছেন। অবিরল স্রোতধারার মতো চোখের জল নেমে আসছে মুখ বেয়ে শরীরের দিকে। ওই প্রতিটি জলকণায় লেগে আছে অনন্তের ঐশ্বর্য্য। তার সামান্য স্পর্শে আলো হয়ে ফুটে ওঠে নশ্বর জীবন।
এখন উত্তরের বাঁশঝোপ
 আর মজা পুকুর পার থেকে ভেসে আসছে আনমনা রাত্রি-বাতাস। তার কিছুই বলার নাই, শুধু বয়ে চলাই ওই বাতাসের নিয়তি। কালের যাত্রাপথে সে এক নিরন্তর পথিক।

 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                   পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (ঊনবিংশ পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More