হাড়ের বাঁশি (অষ্টবিংশ পর্ব)

1

অমরকণ্টক শহর থেকে মাইল সাতেক দূরে রেবার দক্ষিণতটে মৈকাল পাহাড়ের শীর্ষে অবধূত আশ্রমটি খুব বড়ো নয়, ডানহাতে মূল সন্ন্যাসী আবাস- একতলা সাদা বাড়ি। কাঠের নীচু গেট পার হয়ে সামনে লম্বা বারান্দা, চারপাশে সুবিশাল আমলকি, শাল, কাঁঠাল, আমগাছ নিঃসঙ্গ মানুষের যাত্রাপথে বেজে চলা উদাসী সুরের মতো ডালপালা বিছিয়ে রেখেছে। অদূরে শূলপাণি মন্দিরের পাশেই একখানি কাকচক্ষু দিঘির জলে কতগুলি রাজহংসী আপনমনে খেলা করছে। ছায়াচ্ছন্ন অপরাহ্ণে আমলকি গাছের তলায় বাঁধানো বেদির উপর বসে রয়েছে বন্যা। সামান্য দূরে বৃদ্ধ মনোহরদাস অবধূতের কোলের উপর একটি আড়বাঁশি রাখা। মৃদু হেসে তিনি বন্যাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি সত্যিই পরিক্রমাবাসী হতে ইচ্ছুক?’
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের
এই আশ্রমের অতিথিশালায় থাকতে কোনও বাধা নেই। মোহান্ত মনোহরদাসজীর নির্দেশে বন্যা রহমানের জন্যও একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘরটি ভারি শ্রীমণ্ডিত। বাহুল্য-বর্জিত, নিরাভরণ, একখানি ছোটো তক্তপোষে গদির উপর পরিষ্কার সাদা চাদর বিছানো, দুটি কম্বল ও বালিশ মাথার কাছে রাখা। এছাড়া কাঠের টেবিল-চেয়ার, জলের কুঁজো, পাথরের গেলাস, একটি দেয়াল ঘড়ি ছাড়া আসবাবপত্র আর কিছু নেই। দুটি প্রশস্ত জানলার অপর প্রান্তে ফুল বাগান। পুরাতন আমগাছের ডালপালা মাথা নীচু করে অতিথি-নিবাসের ছাদের উপর নেমে এসেছে। ছায়াময় দ্বিপ্রহরে পাখিদের কলরবে স্থানটি মধুর হয়ে ওঠে, জানলার পাশে অল্পক্ষণ বসে থাকলে মনে হয়, কোন্‌ দূর দেশে একটি তিরতিরে অচেনা নদী আপন খেয়ালে বয়ে চলেছে আর তার মিহি নূপুরধ্বনির সুরে মনমহলে আঁকা হয়েছে একখানি কোলাহলশূন্য শান্ত পটচিত্র।

বিলাসপুর থেকে গাড়ি নিয়ে অমরকণ্টক আসার পথেই বেলা পড়ে এসেছিল। কার্তিকের দিন বড়ো ক্ষীণতনু, কান পাতলে ঝিমঝিম বাতাস আর বাসন্তী আলপনার মতো রৌদ্রে দিনান্তের পদধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যায়।বন্যা অবাক চোখে দেখছিল সুদূর ঘন নীল আকাশের সীমান্তে অস্পষ্ট শৈলরাজির শীর্ষদেশ কী অপরূপ মেঘ ও কুয়াশার অলংকারে আবৃত। শুধুমাত্র শৈলশিরা নয়, সমস্ত পথটিই ভারি মনোরম। পথের দুপাশে সুপ্রাচীন বৃক্ষরাজি। কখনও পাকদণ্ডি পথ নেমে এসেছে সমতলে, আবার কিছু দূর এগোলেই খাড়া চড়াই। মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো জনপদ, দেবালয়, হরিৎ গমক্ষেত। তবে এই অঞ্চল বঙ্গদেশের ন্যায় শ্যামাঙ্গী নয়, বরং রুক্ষ ভূমি, উপলব্যথিত রক্তবর্ণ ধুলাপথ, নির্জন বনানী, ভুজঙ্গ মালিকায় সজ্জিত সেই নির্মোহ যোগীপুরুষের কথাই যেন বারংবার মনে করিয়ে দেয়। তাই হয়তো নর্মদা তীর্থযাত্রীরা বলেন, ইঁহাকা হর কংকরমে শংকর!নির্মলানন্দ মহারাজ মনোহরদাসজীর সঙ্গে ফোনে কথা বলায় অতিথি নিবাসে আশ্রয় পেতে কোনও অসুবিধাই হয়নি। আশ্রমের সমস্ত কর্মীদের ব্যবহার বড় আন্তরিক। মালপত্র ঘরে এনে একটি অল্পবয়সী ছেলে শীতবেলার রৌদ্রের মতো মিঠে গলায় বলেছিল, ‘মাঈজি থোড়া রুকিয়ে, আপকি নাহানেকে লিয়ে গরম্‌ পানি আভি লাতে হ্যে!’
বন্যা ছেলেটির হাতের মুঠোয় একশো টাকার একখানি নোট জোর করে রেখে হাসল, ‘গরম্‌ পানি নেহি চাহিয়ে ভাই! স্রিফ থোড়া পিনে কি পানি চাহিয়ে!’
ঘরে টেবিলের উপর রাখা কুঁজো আর গেলাস দেখিয়ে ছেলেটি বলল, ‘আগর কিসি চিজ কি জরুরত পড়ে তো মুঝে জরুর বুলানা মাঈজি!’

সমস্ত রাত্রি রেলপথে আসার ক্লান্তি মুছে দিতে হিমশীতল জলে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করেছিল বন্যা। প্রতি মুহূর্তে সোহাগি জলধারার স্পর্শে মনে পড়ছিল শ্যাম তালুকদারের মুখখানি, বিলাসপুর রেল ইস্টিশানের বাইরে সেই বৃদ্ধ বৈষ্ণবের নির্জন দোকান, অপূর্ব প্রসাদ, মুণ্ড মহারণ্যের গহিন অরণ্যাবৃত গিরিপথ… সেসব কি তাহলে স্বপ্ন? আর হাড়ের বাঁশি? শ্যামের লেখা কাগজের চিরকুটটি যত্নে রেখে দিয়েছে বন্যা। সত্যিই কি ওঁর সঙ্গে রেলগাড়ির কামরায় দেখা হয়েছিল? নাকি সেটিও স্বপ্ন? আচ্ছা, স্বপ্ন কি কখনও এত স্পষ্ট হয়?
নাছোড় প্রশ্নগুলো
মাথায় নিয়েই স্নানান্তে একখানি সাদা-সবুজ রঙে ছোপানো সালোয়ার কামিজ পরল বন্যা। প্রায় মুছে যাওয়া স্মৃতির মতোই সামান্য কাজল দিল চোখে। সিক্ত কেশরাজি পিঠের উপর আলতো বিছানো। কালো সুতির চাদর জড়িয়ে নিলো শরীরে। ক্ষীণ চন্দন সুবাস কুসুম রেণুর মতো সর্বাঙ্গে ভেসে রয়েছে। প্রসাধন শেষে হাত-আয়নায় নিজেকে দেখে সামান্য অবাকই হল, যেন অন্য কোনও অচেনা নারী আজ তার রূপ ধরে এই অবধূতাশ্রমে এসেছে!মনোহরদাসজীর প্রশ্নের উত্তরে দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বন্যা ধীর স্বরে বলল, ‘পূর্ণ পরিক্রমা সম্ভব নয়, সে-কথা জানি। তাই পঞ্চক্রোশী পরিক্রমার ব্যবস্থা যদি কোনওভাবে করা যায়, তাহলে আমার এতদূর আসা সার্থক হয়।’
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী
মনোহরদাসের পরনে একখানি গ্রন্থিহীন সাদা ধুতি ও উত্তরীয়। মুণ্ডিত মস্তক, নির্ভার শ্বেতবর্ণ শ্মশ্রুগুম্ফাবৃত মুখমণ্ডলে মধুবাতাসের মতো দুটি নয়ন জেগে রয়েছে। অল্পক্ষণ চেয়ে থাকলে বঙ্গদেশের নিস্তরঙ্গ শ্যামলা দিঘির কথা মনে ভেসে আসে। আমলকি-তলায় জোড়াসনে বসে রয়েছেন, কোলের উপর আড়বাঁশি। কার্তিক অপরাহ্ণের ম্রিয়মাণ আলো বৃক্ষের এলোঝেলো পাতা স্পর্শ করে ধুলার উপর সুরমূর্ছনার মতো পড়ে রয়েছে। সেদিক পানে চেয়ে মনোহরদাস শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এখানে কোটিতীর্থ থেকে যাত্রা শুরু করে কপিলধারা, বরাতীনালা, জালেশ্বর, মাঈ-কি-বাগিয়া, সোনামূড়া ও ভৃগুকমণ্ডলু ঘুরে পুনরায় কোটিতীর্থ ফিরে এলে পঞ্চক্রোশী পরিক্রমা সম্পূর্ণ হয়। সময়ও খুব বেশিদিন লাগে না, দিন পাঁচেক। কিন্তু আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে মা!’
বন্যা বিনীত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী প্রশ্ন মহারাজ?’

 

অদূরে কোথাও মধুর স্বরে কী একটি পাখি ডেকে চলেছে, চারপাশ নৈঃশব্দে বাঙ্ময়, ঝিরিঝিরি বাতাসে মৃদু হিমের স্পর্শ, দিগন্তপ্রসারী কুয়াশাবৃত বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতমালা এখন কুয়াশায় প্রায় অস্পষ্ট, সন্ধ্যার পূর্বেই ঘরে ফেরার ধুলাপথের মতো কেমন ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে জগত, আমলকি গাছ থেকে দু-একটি জীর্ণ পাতা আনমনে খসে পড়ল ভূমির উপর, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘মা, আমি অবধূত, এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম ভিন্ন জাতি সংসার সমাজ জগতে বিশ্বাস নাই, তবুও জিজ্ঞাসা করি, আপনি ইসলাম ধর্মাশ্রিত, সেখানে আল্লাহ্‌ ভিন্ন অপর কোনও ঈশ্বরের কথা স্বীকার করা হয় না আর এই পরিক্রমা শরণাগতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা, আপনি কি তাহলে নর্মদা মাঈয়ের কৃপা স্মরণ করেই পরিক্রমা শুরু করতে চাইছেন?’

পদ্মকুসুম হাস্যে ভরে উঠল বন্যার মুখ, ‘মহারাজ, আমি কি তীর্থযাত্রী না হয়ে শুধুমাত্র ভ্রমণার্থী হিসাবে এই পরিক্রমা করতে পারি না?’

–নিশ্চয় পারবেন মা, কেন পারবেন না! তাই করুন, পথটি সত্যিই ভারি সুন্দর। কবে যেতে চান?

এক মুহূর্ত চিন্তা করে বন্যা সহজ গলায় বলল, ‘যদি সম্ভব হয় তাহলে আগামীকালই যাত্রা শুরু করতে চাই।’

‘বেশ, তবে আমি বলি কী, পরশু অর্থাৎ শনিবার যাত্রা শুরু করুন। আগামীকাল অমরকন্টক দর্শন করুন।’, এক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর মৃদু হেসে বললেন, ‘তীর্থযাত্রী নয়, ভ্রমণার্থী হয়েই শহরটি ঘুরে দেখুন!’

কথা শেষ করে মনোহরদাস উঠে দাঁড়ালেন, ‘মা, আমাকে এবার যেতে হবে, নিত্যকর্মাদি পড়ে রয়েছে। রাত্রি জেগে এসেছেন, আপনি বরং এখন বিশ্রাম করুন, ইচ্ছে হলে আশ্রম ঘুরে দেখতেও পারেন।’

বন্যাও উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলল, ‘নিশ্চয় মহারাজ, আপনার অযথা দেরী হল। শুধু একটি কথা, যদি অনুমতি দেন তাহলে জিজ্ঞাসা করি।’

সামান্য বিস্মিত কন্ঠে মনোহরদাস শুধোলেন, ‘কী কথা মা?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বন্যা ইতস্তত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘মহারাজ, শ্যাম তালুকদার নামের কোনও ব্যক্তি কি আপনার পরিচিত?’

 

বন্যার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অবধূত, আশ্রমের এই দিকটি ভারি নির্জন,প্রায় জনমানবশূন্য, অস্ত অপরাহ্নে ঝিঁঝিঁ পোকার দল একটানা ডেকে চলেছে, কয়েকটি অলস মুহূর্ত নিঃশব্দে বয়ে চলার পর শান্ত স্বরে মনোহরদাস শুধোলেন, ‘আপনি তাঁর কথা কীভাবে জানলেন?’

চাদরটি গায়ে ভালো করে জড়িয়ে বন্যা বলল, ‘আসার পথে ট্রেনে আলাপ হল, আমার কামরায় ওঁর সিট পড়েছিল।’

‘ট্রেনে আলাপ হল? আসার পথে? আশ্চর্য!’,বিস্মিত কণ্ঠে বেজে উঠলেন অবধূত।

মনোহরদাসের কণ্ঠ আশ্চর্য করল বন্যাকে, সন্ন্যাসীর হঠাৎ বিস্মিত হওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন? আশ্চর্য কেন?’

কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলেন সন্ন্যাসী, দৃষ্টি প্রায় শূন্য, সামনে তাকিয়ে রয়েছেন কিন্তু জগতের কিছুই যেন তিনি দেখছেন না, সামান্য সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ধীর স্বরে বললেন, ‘বলব। সন্ধ্যার পর, এই সাড়ে আটটা নাগাদ আপনি আশ্রমের আপিসে আসুন, তখন সব কথা বলব।’আশ্রমে রাত্রিকালীন আহারের সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা, মন্দির ও উপাসনাস্থল পার হয়ে ভোজনের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছে বন্যা দেখল, লোকজন কেউই প্রায় নাই, অতিথি নিবাসেও তীর্থযাত্রীর সংখ্যা খুবই কম, অথচ এই কার্তিক মাসে সারা দেশ থেকেই পরিক্রমাবাসী ও পুন্যার্থীরা আসেন এখানে, ফলে বাকি সমস্ত আশ্রম, পান্থশালা, হোটেল, ধর্মশালা পূর্ণ হয়ে থাকে কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে অবধূত আশ্রম প্রায় শূন্য। বন্যা মনে মনে ভাবল, আশ্রমটি মূল শহর এবং নর্মদা মন্দির থেকে অনেকটা দূরে, ফলে হয়তো তীর্থযাত্রীরা এদিকে তেমন আসেন না, তাছাড়া নির্মলানন্দ মহারাজের মুখে শুনেছিল, অমরকন্টকে পরিক্রমাবাসীদের মনে সর্বদা একটি ভয় কাজ করে-তা হল অজান্তে অন্তঃসলিলা নর্মদা অতিক্রমের, বিষয়টি প্রথমবার শুনে বন্যা বিস্মিত কণ্ঠে নির্মলানন্দ স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘অন্তঃসলিলা নর্মদা মানে?’

বালিকাকে বোঝানোর ভঙ্গিমায় মহারাজ বলেছিলেন, ‘দেখো মা, পরিক্রমায় কোনও অবস্থাতেই রেবা মাঈয়াকে অতিক্রম করা চলে না, অর্থাৎ সমুদ্র সঙ্গম ব্যতীত নর্মদার উত্তর তট থেকে দক্ষিণ তটে অথবা দক্ষিণ থেকে উত্তরে আসা যাবে না, যদি ভুলবশত কোনও পরিক্রমাবাসী রেবা অতিক্রম করেন তৎক্ষণাৎ তাঁর পরিক্রমা খণ্ডিত হবে। এখন অমরকন্টকে মাঈ-কি-বাগিয়ার উদ্‌গম কুণ্ডে আবির্ভূতা নর্মদা অন্তঃসলিলা রূপে প্রবাহিত হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নর্মদা কুণ্ডে পুনরায় লোকচক্ষুর সম্মুখে প্রকট হন-এই পথে যেহেতু তিনি অন্তঃসলিলা তাই তাঁর গতিপথ নির্ধারণ করা অভিজ্ঞ সন্ন্যাসী ছাড়া অন্য কারোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব, সেই কারণেই অমরকন্টকে পরিক্রমাবাসীরা কোথাও যেতে বড়ো একটা ভরসা পান না! অনেকে তো নর্মদা মন্দির দর্শনে যেতেও আপত্তি করেন!’

পুরনো কথা মনে পড়তেই বন্যা স্থির করল, আজ রাত্রে নির্মলানন্দ মহারাজকে একবার ফোন করবে!

 

আশ্রমের ভোজনালয়টি যথেষ্ট প্রশস্ত, চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা নাই, মেঝের উপর নির্দিষ্ট দূরত্বে কম্বলের আসন পাতা রয়েছে, প্রতিটি আসনের সম্মুখে একটি নিচু কাঠের জলচৌকি-তার উপরেই থালা এবং গেলাস রাখার প্রথা, তবে এখানে সন্ন্যাসীদের পৃথক বসার ব্যবস্থা নাই, তাঁরাও সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক পঙতিতে বসেই আহার করেন। আজ তিনজন গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী জলচৌকির উপর থালা রেখে বসে রয়েছেন, এছাড়া দুইজন পুরুষ ও একজন মহিলা ভিন্ন অন্য কোনও মানুষ নাই, অধিকাংশ আসনই শূন্য, বন্যা অল্প দূরে একটি আসনের উপর বসতেই একজন তরুণ সন্ন্যাসী এসে নমস্কার জানিয়ে একটি ঝকঝকে স্টিলের থালা, দুটি বাটি ও গেলাস জলচৌকির উপর সাজিয়ে দিয়ে গেলেন। কতগুলি সোলার ল্যাম্প জ্বলছে মাথার উপর, জানলাগুলি পরিপাটি করে বন্ধ, আলোগুলি কোনও কারণে নিস্তেজ, সমস্ত ঘরটি অলীক কোনও জগতের গোধূলিলগ্নের মায়ায় যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। কয়েক মুহূর্ত পর সেই তরুণ সন্ন্যাসী এসে একটি বড়ো পাত্র থেকে দুই হাতা ঘন অড়হড়ের ডাল বাটিতে ঢেলে দিলেন, খাঁটি ঘিয়ের সুবাস ভেসে আসছে, অপর বাটি ভর্তি হল উষ্ণ দুধে, তাঁর পেছনে অপর একজন সন্ন্যাসী দুটি চাপাটি থালায় রেখে আরও দুটি দিতে যেতেই বন্যা ডান হাতখানি থালার উপর রেখে স্মিত হেসে বলল, ‘বাস্‌ মহারাজ,ঔর নেহি!’

 

সারাদিন ভালো করে কিছু মুখে তোলা হয়নি, খিদের মুখে সামান্য আয়োজনই অমৃত তুল্য মনে হয়, চাপাটি আঙুল দিয়ে ছিঁড়তে যেতেই হঠাৎ বন্যা খেয়াল করল, সামনের পঙতি থেকে একজন গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী হাসিমুখে হাতের ইশারায় তাকে খেতে নিষেধ করছেন! বিস্মিত বন্যা সেই মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিয়ে ভাবল, অন্ন মুখে তোলার পূর্বে এই আশ্রমে নিশ্চয় কোনও বিশেষ আচার রয়েছে, তাই হয়তো সন্ন্যাসী নিষেধ করছেন।

উপস্থিত সবাইকে খাদ্য পরিবেশন শেষ হতেই বন্যা দেখল, তার অনুমান অভ্রান্ত। তরুণ সন্ন্যাসী কক্ষের মাঝে দাঁড়িয়ে ভরাট কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন, ‘ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হতম্‌। ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্ম কর্মসমাধিনা।’

শ্লোকটি নিঃশব্দে স্মরণ করে আপনমনেই সামান্য হাসল বন্যা, বৈদান্তিক অবধূত আশ্রমে ব্রহ্ম ব্যতীত অপর কোনও বস্তুকে যে স্বীকার করা হবে না সেটিই স্বাভাবিক।ডালে ভিজিয়ে চাপাটি মুখে দিতেই মধুর স্বাদে ভরে উঠল মুখ, একমনে খেয়ে চলেছে বন্যা, সহসা একটি ভারী কণ্ঠস্বরে সংবিত ফেরায় মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল, সামনে একজন প্রৌঢ় সন্ন্যাসী ছোট্ট একখানি পাথরের বাটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, শ্মশ্রুগুম্ফ শোভিত মুখে কস্তুরী সুবাসের মতো স্মিত হাসি, পরনে গ্রন্থিহীন গেরুয়া ধুতি ও উত্তরীয়, একমাথা চুল কাঁধ অবধি নেমে এসেছে-এমন সৌম্য প্রভাতী আলোর মতো মানুষ বন্যা কখনও দেখেনি, বিস্মিত স্বরে কিছু জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই সেই সন্ন্যাসী হাতের ক্ষুদ্র বাটি জলচৌকির উপর রেখে সুললিত কন্ঠে বললেন, ‘লিজিয়ে, পরসাদ লিজিয়ে!’

কথাক’টি শেষ হতেই একমুহূর্তও অপেক্ষা না করে কক্ষের দরজার দিকে ধীর পায়ে চলে গেলেন সন্ন্যাসী, এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় হতবাক বন্যা পাথরের বাটির দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল-দুটি আমলকি যত্নে সাজানো, দেখেই বোঝা যায় ফল দুটি সুসিদ্ধ! থালায় ঘি মাখানো চাপাটি, পাশে ঘন দুধ আর দুটি সেদ্ধ আমলকি-এক মুহূর্তের জন্য বন্যার মনে হল, সে স্বপ্ন দেখছে, কিন্ত না, স্বপ্ন কোথায়, এই তো বসে রয়েছে অবধূত আশ্রমে, তাহলে? এভাবে বারংবার স্বপ্ন আর বাস্তব দৃশ্যমান জগত কখনও একাকার হয়ে যায়? বিস্ময়াবিভূতা বন্যা প্রস্তর মূর্তির মতো ক্ষুধার অন্নের সামনে স্থির হয়ে বসেই রইল। ভোজনালয়ের দেয়ালে কোথাও একটি টিকটিকি গম্ভীর স্বরে ঠিক তখনই ডেকে উঠল, পরপর তিনবার!

 

আশ্রমের আপিস ঘরটি বড়ো যত্নে সাজানো, সুন্দর অথচ অনাড়ম্বর, মাঝারি আয়তনের কাচঢাকা কাঠের টেবিলের উপর কতগুলি ফাইল, কলমদানি, কাচের কাগজচাপা, পিন-ক্লিপ রাখার পাত্র, পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, মোমবাতি, একখানি মোটা বাঁধানো খাতা রাখা, একপাশে একটি টেলিফোনও চোখে পড়ে, ফুলদানির মধ্যে একগোছা চন্দ্রমল্লিকা হাসিমুখে চেয়ে রয়েছে, ঘরের দেয়াল নিরাভরণ, উজ্জ্বল বিজলি বাতির আলোয় টেবিলের অপর প্রান্তে একটি কাঠের চেয়ারে বসে মনোহরদাস একমনে খাতায় কী যেন লিখছিলেন, দরজায় বন্যার গলা শুনে মুখ তুলে সহাস্যে বললেন, ‘আসুন! আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম!’

বন্যা নমস্কার করে সামনে রাখা একটি চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনাদের আশ্রমটি ভারি নির্জন মহারাজ! কী শান্ত, কোথাও কোনও কোলাহল নেই!’

খাতা বন্ধ করে হাতের কলমটি সামনের কলমদানে রেখে কৌতুকের সুরে অবধূত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার বুঝি নির্জনতা প্রিয়?’

কিছু না-বলে শুধু মৃদু হাসল বন্যা!

–আশ্রমের খাবার ভালো লাগল?

–অপূর্ব! কতদিন এমন গরম রুটি আর ডাল খাইনি! খুব তৃপ্তি হয়েছে মহারাজ!

চাঁপাবনে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো মধুর হাস্যে ভরে উঠল বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর মুখ, ধীর স্বরে বললেন, ‘আসলে কী জানেন মা, অন্নের স্বাদ নির্ভর করে আন্তরিকতার উপর! চিরকাল আমাদের দেশে অতিথিকে নারায়ণ হিসাবে দেখা হয়েছে, এ তো আজকের কথা নয়, কত সহস্র বৎসরের লোকাচার মিশে রয়েছে, জগতে মানুষের হৃদয়ের তুল্য মহৎ বস্তু আর কিছুই নাই!’

–ঠিকই, অতিথি দেব ভবঃ! কবে ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি!

 

মনোহরদাস বন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, ঠিক মুখ নয়, প্রকৃতপক্ষে চোখের উপর সন্ন্যাসীর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ-বন্যার সেই তীক্ষ্ণ, প্রেমময় অথচ উদাসী চৈত্র বাতাসের মতো দৃষ্টির সামনে মনে হল, মহারাজ তার অন্তরমহলের সমস্ত গোপন কথা যেন এক লহমায় দেখে নিয়েছেন, সামান্য অস্বস্তি হওয়ায় লজ্জাবতী পাতার মতো চোখ নামিয়ে নিল। কয়েক মুহূর্ত পর অবধূত অতি ধীর স্বরে বললেন, ‘শ্যামানন্দ বা শ্যাম তালুকদার-যে নামেই ডাকুন, তাঁর আখ্যান বড়ো বিচিত্র!’

সহসা শ্যাম তালুকদারের নাম শুনে হেমন্ত প্রভাতের শিশিরসিক্ত অস্ফুট কুসুমের মতো নয়ন দুটি মেলে বন্যা কোনও কথা না বলে সাগ্রহে বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি (সপ্তবিংশ পর্ব)

You might also like
1 Comment
  1. […] হাড়ের বাঁশি (অষ্টবিংশ পর্ব) […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.