হাড়ের বাঁশি (পঞ্চবিংশ পর্ব)

বাগবাজার গঙ্গার ঘাট থেকে কয়েক পা দক্ষিণে মহেশ্বর সেনের পৈতৃক ভিটা। শতাব্দী প্রাচীন দ্বিতল গৃহটি জীর্ণ, ছোট লোহার গেট আর একফালি উঠোন পার হয়ে মূল ভদ্রাসন। পেছনে গাছপালা ঘেরা বাগান। দোতলায় অর্ধচন্দ্রাকৃতি বারান্দাটি অবশ্য এই গৃহের অলংকার। সম্মুখে চঞ্চলা সুরধুনী, একটি বকুল গাছ সোহাগি যুবতির মতো ডালপালা মেলে বারান্দাটি প্রায় আগলে রেখেছে। এখানে আরাম কেদারায় বসেই মহেশ্বর বাবুর দিনের অনেকটা সময় কেটে যায়। বৃদ্ধ অবিবাহিত, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া থেকে অবসর নেওয়ার পর পৈতৃক বাড়িতে থিতু হয়ে বসেছেন। চাকরিসূত্রে যৌবন ও প্রৌঢ় বয়সে ভারতবর্ষের নানা স্থানে যেতে হয়েছে। এখন প্রায় সত্তর বছর বয়সে নিজের পাড়া ছাড়া আর বিশেষ কোথাও যেতে উৎসাহ পান না। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়স্বজন সবার সঙ্গে যোগাযোগও কমে এসেছে। নিজের লেখাপড়া, গানবাজনা নিয়েই ভারি আনন্দে থাকেন। সে-কারণেই হয়তো আজ সকালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক মনোজ ব্যানার্জির ফোন পেয়ে খানিকটা বিস্মিতই হয়েছিলেন। মনোজরা ছেলেবেলায় একসময় এই বাগবাজারেই ভাড়া থাকত। পাড়ার ছেলে হিসাবে পরিচয়, কিন্তু দীর্ঘদিন কোনও যোগাযোগ নাই। এতদিন পর ফোনের রিসিভার তুলে পরিচয় পর্ব শেষে অবাক হয়েই বলেছিলেন, ‘তোর সঙ্গে প্রায় পনেরো বছর কথা হয়নি অথচ এখন গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে এই সেদিনকার ঘটনা!’
–ভাগ্যিস তোমার
ল্যান্ড-লাইন নাম্বার একই রয়েছে!
সামান্য হাসলেন মহেশ্বর।
 ‘মোবাইল ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছি, ফলে ওই পুরোনো ল্যান্ডলাইন-ই ভরসা! যাকগে কেমন আছিস বল?’

পুরাতন দিনের দু-চারটি কথার পর প্রসঙ্গ বদলে মনোজ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ বিকেলে কি তুমি ফ্রি আছ?’
–কেন বল তো? আসবি?
–না, না, আমি
একদিন রবিবার দেখে যাব। আসলে আমার এক ছাত্রী, খুবই গুণী মেয়ে, তার আর্কিওলজি নিয়ে কীসব জানার আছে! ওর মুখে আর্কিওলজি শুনেই তোমার কথা মনে পড়ল!

বিস্মিত কণ্ঠে মহেশ্বর শুধোলেন, ‘তোর ছাত্রী মানে তো কম্পিউটর সায়েন্স! তার আবার আর্কিওলজি নিয়ে কী প্রয়োজন হল?’
–পুরোটা আমিও জানি না মহেশ্বরদা!
শুধু শুনলাম, নর্মদা তীরে কোন্‌ এক অরণ্য নিয়ে নাকি জানতে চায়! তুমি তো দীর্ঘদিন ওই অঞ্চলে ছিলে, সম্ভব হলে একটু হেল্প কর। মেয়েটি এই বিষয় নিয়ে ক’দিন ধরেই খুব উতলা হয়ে রয়েছে!’
কয়েক মুহূর্ত চুপ
করে থাকার পর মহেশ্বর মৃদু স্বরে বললেন, ‘বেশ তো, আজ বিকেলে পাঠিয়ে দিস। কী নাম মেয়েটির?’
–ঋষা, ঋষা ভট্টাচার্য।
নম্র স্বভাবের মেয়ে। মনে হয় তোমার কথা বলতে খারাপ লাগবে না।

ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল বৃদ্ধের মুখে। দীর্ঘদিন পর আবার নর্মদা তীরবর্তী ক্যাম্পের দিনগুলির কথা সহসা মনোপটে ভেসে এল, ‘সে বুঝেছি। নাহলে আজকালকার মেয়ে নর্মদা তীরের অরণ্য, সম্ভবত মুণ্ড মহারণ্য নিয়ে আগ্রহী হত না! তুই নির্দ্বিধায় আসতে বলিস!’

কার্তিক মাসের অপরাহ্ণ, কিন্তু আজ কলকাতার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মলিন আলোয় সুরধুনীর বুকে একটি ডিঙি নৌকো আপনমনে ভেসে চলেছে। অদূরে ঘাটের কাছে একটি পুরাতন বটবৃক্ষের প্রায়ান্ধকার ডালপালায় গৃহাভিমুখী পাখিদের কলরব স্থানটিকে মুখর করে রেখেছে। পথে লোকজনও তেমন নাই। ঘাটে একজন প্রৌঢ় স্নানান্তে ভেজা ধুতি পরে কার উদ্দেশ্যে যেন দুহাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করছেন। হেমন্তের অপরাহ্ণ বড়ো দ্রুত সন্ধ্যাদেবীর গর্ভে নিজেকে সমর্পণ করে, আজও তার ব্যতিক্রম হয় নাই। ক্ষীণ স্মৃতির মতো কোনও গৃহস্থ বাড়িতে বেজে উঠল সন্ধ্যা-শঙ্খ। উদাসী বাতাসে আসন্ন বৃষ্টির ইশারা। মহেশ্বর সেনের দোতলার বারান্দায় বসে এমন নির্জন শতাব্দী-প্রাচীন উত্তর কোলকাতার জনপদের দিকে তাকিয়ে ঋষার সহসা মনে হল, এই মেঘাবৃত সন্ধ্যা যেন অবিকল তার জীবন, নিঃসঙ্গ, একাকী। ভালোবাসার মানুষটি অসময়ে বকুল ফুলের মালা উপহার দিয়ে ধুলাপথ বেয়ে কোন্‌ দূর দেশে চলে গেছে আর তার যাত্রাপথের দুপাশে বেজে চলেছে অভিমানের মতো মধুর একতারা!
সামনের টেবিলে
রাখা পেয়ালা ভর্তি উষ্ণ চা আর প্লেটে সাজানো ফুলকপির বড়ার দিকে ইশারা করে মহেশ্বর বললেন, ‘আগে খেয়ে নাও, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! একে শীতকাল তায় আবার আজ এমন বাদুলে দিন!’
স্বাভাবিক ভদ্রতার হাসি মুখে
রেখে চায়ের কাপ হাতে ঋষা সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল, ‘এভাবে হঠাৎ এসে বোধহয় আপনাকে বিরক্ত করলাম!’
–আরে না না, বিরক্ত কেন
 হব! তবে তোমার স্যর মানে মনোজের মুখে বিষয়টি শুনে একটু অবাক হয়েছি। তুমি কি মুণ্ড মহারণ্য সম্পর্কে কিছু জানতে চাও?

চায়ে একটি চুমুক দিয়ে ঋষা বামদিকে গঙ্গা পানে একবার চাইল। তিরতির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। উত্তরপথগামী হিম বাতাস জলকণার স্পর্শে আরও শীতল। মিহি বৃষ্টিরেণু আনমনে ভেসে আসছে। কাশ্মীরি শাল ভালো করে গায়ে জড়িয়ে বলল, ‘এমন সব আশ্চর্য ঘটনা… কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না।’
বৃদ্ধ মহেশ্বরের পরনে প্যান্ট-শার্ট
আর হালকা জ্যাকেট। একমাথা কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। ঋষার দিকে স্থির দৃষ্টিতে দু-এক মুহূর্ত চেয়ে থাকার পর শান্ত স্বরে বললেন, ‘তুমি একেবারে গোড়া থেকে শুরু কর।’

উচ্ছল কিশোরীর মতো বৃষ্টি দ্রুততর ছন্দে বেজে উঠল। টলোমলো বাতাস যেন তার খেলার সঙ্গী। ঋষা কয়েক সপ্তাহ পূর্বে দেখা স্বপ্ন-বৃত্তান্ত বলে চলেছে। মুণ্ড মহারণ্য, শ্যামানন্দ, গেরুয়া বসন সেই তরুণ সন্ন্যাসী, শালাই আর সাজি গাছের মাঝে অস্ফুট সন্ধ্যার মতো কতগুলো দৃশ্য, দীর্ঘকায় নগ্ন পুরুষের ‘কিঞ্চিৎ ঘৃতং দেহি মে!’র অলীক প্রার্থনা, পৃথ্বীশের কথা, এড়োয়ালির ভদ্রাসনের বাণেশ্বর শিব মন্দিরে দেখা আশ্চর্য ঘটনা… কথার মাঝেই একবার মহেশ্বর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পৃথ্বীশের সঙ্গে এর মাঝে তোমার দেখা হয়নি?’

প্রশ্ন শুনে পৃথ্বীশের গোপন প্রজেক্টের কথা বলবে কিনা বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল ঋষা। ভারি উন্মনা দেখাচ্ছে তাকে। পরনে একখানি আসমানি নৌকোর মতো সুতির শাড়ি। কলকাতা ফিরেই দিঘল কেশরাজি কেটে ফেলায় ঢেউ দোলানো ফুলের মতো তারা গ্রীবামূলে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। চোখদুটো কাজলের অভাব সত্ত্বেও গভীর কোনও দিঘি। হাতের আঙুলগুলি যেন সামান্য চঞ্চল। ঋষার দ্বিধা বুঝতে পেরে মৃদু কণ্ঠে বৃদ্ধ বললেন, ‘দ্যাখো মা, এখনও অব্দি যা আমায় বললে তা একটু অদ্ভুত হলেও বিচিত্র কিছু নয়। মানুষ কত কিছুই তো স্বপ্নে দেখে, তুমিও দেখেছ। তবে মুণ্ড মহারণ্যে বেশ কয়েকবার যাওয়ার সুবাদে বলতে পারি স্থানটি তুমি যেমন স্বপ্নে দেখেছ অবিকল তাই, অন্তত বছর ত্রিশ আগে তেমনই ছিল।’
চোখ তুলে বৃদ্ধের মুখের দিকে
এক মুহূর্ত তাকাল ঋষা। তারপর দৃঢ় স্বরে বলল, ‘না, কাকু, আমার সন্দেহের বিষয় ভিন্ন।’
–সন্দেহ? কী সন্দেহ?

মন স্থির করে ঈশ্বরের কথা বলার আগে কুলদেবতা বাণেশ্বরকে মনে মনে প্রণাম জানাল ঋষা। সমস্ত বৃত্তান্ত শোনার পর চুপ করে রইলেন মহেশ্বর। দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে। ইতিমধ্যেই বাড়ির সর্বক্ষণের কাজের লোক- মাঝবয়সী দেবু এসে বারান্দার একপাশে মৃদু পীতবর্ণ বিজলিবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। পুরাতন শ্বেতপাথরের মেঝের উপর ছায়ার চৌখুপি। বৃষ্টির আঁচলে ভিজে বকুল গাছের পাতা থেকে টুপটাপ শব্দে খসে পড়ছে জলকণা। টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একখানি লম্বা সিগারেট নিয়ে অগ্নিসংযোগ করলেন বৃদ্ধ। দু-তিনবার বাতাসে মৃদু তামাকের সুগন্ধ ভাসিয়ে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা এই যে ঈশ্বর রাও ভদ্রলোক, কোন্‌ ডিপার্টমেন্টে রয়েছেন, কী করেন, পৃথ্বীশ কিছু জানে?’
মাথা নাড়ল ঋষা,
‘আমাকে বলেছে ওদের এইচওডি নাকি বলেছেন এই গোপন প্রজেক্ট লিড করবেন ঈশ্বর। দিল্লি পিএমও সরাসরি ওঁকে পাঠিয়েছে। এর বাইরে পৃথ্বীশ অতিরিক্ত কিছু জানলেও আমাকে অন্তত বলেনি।’
–হুঁ, পৃথ্বীশ কি কিছু এড়িয়ে যাচ্ছে বলে তোমার মনে হয়? কথা হয়েছে এর মধ্যে?
–গতকাল দিল্লি পৌঁছে ফোন করেছিল।
তারপর রাত্রে মেসেজে বলল, ফোন সুইচ অফ রাখছে, আবার সুযোগ মতো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এই সুইচ অফ রাখার বিষয়টিই আমাকে খুব চিন্তায় ফেলেছে কাকু। ফোন বন্ধ করবে কেন!
সিগারেট ছাইদানে নিভিয়ে
মহেশ্বর স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘দাঁড়াও, কফি করতে বলি! আজ বেশ ঠান্ডা পড়ল!’, গলা তুলে ঘরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘দেবু, ও দেবু, আমাদের দু-কাপ কফি দিয়ে যা বাবা।’
‘হুঁ, আচ্ছা পৃথ্বীশের বাড়ি কোথায়?
ওর পরিবারের সঙ্গে তোমার আলাপ রয়েছে?’
পথভ্রষ্টা অসহায় বালিকার মতো মুখে ঋষা বলল,
‘আমি জানি না কাকু। কখনও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি!’
বিস্মিত কণ্ঠে বেজে উঠলেন মহেশ্বর সেন, ‘মানে?
প্রায় একবছর তোমাদের সম্পর্ক, আর তুমি ওর বাড়ি-পরিবার-বাবা-মা কারোর সম্পর্কে কিছুই জানো না? এরকম কখনও হয় নাকি?’

নিদ্রাতুরা হেমন্ত সন্ধ্যা অলস চরণে জগৎ ঘাটের পৈঠায় এসে বসেছেন। অন্ধকারাচ্ছন্ন সুরধুনীর বুকে জোনাকির মতো কতগুলি আলো দৃশ্যমান। গম্ভীর ও করুণ ভেঁপু বাজিয়ে একটি লঞ্চ ধীর গতিতে কোথায় যেন ভেসে চলেছে। নদীপারে নগরী আলোকসজ্জায় মুখর, পথে ভেপার বাতিগুলি নিঝুম বৃষ্টির মাঝে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে রয়েছে। অলীক বীণার তারে বেজে ওঠা এই বিষণ্ন সন্ধ্যার মতো মলিন কণ্ঠে ঋষা বলল, ‘অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি, ঝগড়া করেছি, কিছুতেই বলতে চায় না। একবার শুধু বলেছিল মাণিক্যহার গ্রামে নাকি ওদের আদি ভিটা ছিল, কলকাতায় দূর সম্পর্কের এক মাসি থাকে। এর বেশি জোর করলে অভিমানের সুরে বলে, তোমার জন্য কি আমি মানুষটি যথেষ্ট নই?’–আর বাবা-মা?
–বাবা-মা দুজনেই গত হয়েছেন, সে-কথা অবশ্য বলেছে। মা ছেলেবেলায় আর বাবা তিনবছর আগে। পরিবার নিয়ে পৃথ্বীশের সম্ভবত একটা চাপা অভিমান রয়েছে।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন মহেশ্বর, তারপর ঋষার দিকে চেয়ে শীতল গলায় বললেন, ‘নাহ! এরকম হয় না। কোথায় থাকতেন বাবা, ভাই-বোন কেউ আছে নাকি… এসব খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন ঋষা। কোনও বড়ো গোলমাল না থাকলে কেউ এ-কথা এড়িয়ে যায় না। আচ্ছা, তোমাকে একটি প্রশ্ন করব? প্লিজ, মন্দভাবে নিও না কিন্তু!’
–না, না, কাকু!
নির্দ্ধিধায় জিজ্ঞাসা করুন। স্যর নিশ্চিন্তে সব কথা আপনাকে বলতে বলেছেন!
–পৃথ্বীশ কি ইদানীং
 অন্য কোনও সম্পর্কে, মানে, অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল? সেরকম কিছু সন্দেহ কখনও তোমার হয়েছে?

টেবিলের উপর বাতাসের দোলায় একটি বকুল পাতা এসে পড়েছে। ঋষা জলে ভেজা পাতাটি তুলে সযত্নে হাতের মুঠির মধ্যে রাখল- যেন কোনও স্মৃতিকথা। দু-এক মুহূর্ত পর মৃদু কুসুমহাস্য ক্ষণিকের জন্য ওষ্ঠ স্পর্শ করেই মিলিয়ে গেল মনের কোন্‌ গহিন অতলে, ‘হয়েছে সন্দেহ কিন্তু কখনও কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। এই প্রসঙ্গে চর্চা করলে মনে হয় মানুষ হিসাবে আমি খুব ছোটো হয়ে যাব, কাকু!’
সহসা বৃদ্ধের মন
কী এক আশ্চর্য স্নেহে দুলে উঠল! সামনে বসে থাকা এই রূপবতী নম্র ধীর স্বভাবের মেয়েটির কোথাও যেন আপনজন বলতে কেউ নাই। বহুবার ভবহাটের ধুলায় হাত পেতে মানুষের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সেই রিক্ত করতলে কেউ প্রেমধন তুলে দেয় নাই। অথচ শান্ত দুটি নয়ন সদা অচঞ্চল, অনাদরে ফুটে ওঠা বুনো ফুলের হাসি মুখে নিয়ে দূরে চলে গেছে। হয়তো মৃদু স্রোতের মতো অভিমানে আচ্ছন্ন হয়েছে, তবুও কেউ কখনও বুঝতে পারে নাই এই অভিমানিনীর বেদনা! স্নেহার্দ্র স্বরে মহাদেব বললেন, ‘ঠিকই বলেছ মা, জোর করে তো কাউকে ধরে রাখা যায় না!’

কয়েকটি মুহূর্ত ভেসে গেল কালস্রোতে। অদূরে কোথাও বর্ষাছন্দে কণ্ঠ সাজিয়েছে নিজেদের, রাস্তার উপর ছাতিম গাছটি আজ পুষ্পশূন্য। বৃষ্টির স্পর্শে ওই আদরিণী আত্মগোপন করে। গাছপালার উপর দিয়ে দিকভ্রষ্ট নাবিকের মতো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাতাসিয়া নাওয়ের স্পর্শ বাঁচিয়ে পুনরায় একটি সিগারেট ধরিয়ে মহাদেব চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, ‘দেখো, কতগুলি জায়গায় আমার খটকা রয়েছে। আমি নিজে আইএসআই-এর অনেক এক্সপিডিশন করেছি, কিন্তু কখনও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা পিএমও ইন্টারফেয়ার করেছে বলে শুনিনি। দ্বিতীয়ত, পৃথ্বীশ মেটালার্জির গবেষক। আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের তাকে ইনভলব করার কথাই নয়। এবং লাস্ট পয়েন্ট, দ্যাট ইজ মোস্ট ইমপরট্যান্ট, মুণ্ড মহারণ্য বা ওই অঞ্চলে আর্কিওলজিক্যাল এক্সপিডিশন অনেক হয়েছে, কিন্তু আমি যতদূর জানি জায়গাটি এখন এক্সপিডিশন পয়েন্ট নয় ফলে হঠাৎ ওখানে কী কারণে ডিপার্টমেন্ট ইন্টারেস্টেড হল বুঝতে পারছি না।’
বৃদ্ধের কথা শুনে উদ্বিগ্ন
স্বরে ঋষা জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে এখন কী করব কাকু?’
সামান্য হাসলেন মহাদেব।
উজ্জ্বল দুটি চোখ ঋষার চোখে রেখে দৃঢ় প্রত্যয়ী কণ্ঠে বললেন, ‘চিন্তা করো না মা, আমি কাল সকালেই আইএসআই চিফ প্রবীণ, প্রবীণ ভার্গবের সঙ্গে কথা বলব! আমি ডিরেক্টর থাকার সময় সে মধ্যপ্রদেশের দায়িত্বে ছিল। আমার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র! প্রবীণকে জিজ্ঞাসা করলেই মনে হয় কুয়াশা অনেকটা কেটে যাবে!’
বিস্মিত স্বরে বেজে
উঠল ঋষা, ‘আপনি আইএসআইয়ের ডিরেক্টর ছিলেন? স্যর তো সে কথা আমায় কিছু বলেননি!’
মেঘমুক্ত সকালে
হেমন্তের ঝিলিমিলি রৌদ্রের মতো কৌতুক হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধের মুখে, ‘এসব বলার মতো কিছু নয়। দরকারে পরিচয়টি প্রকাশ পেল মাত্র!’

কফির কাপ শেষ করে ঈষৎ অন্যমনস্ক গলায় মহেশ্বর বললেন, ‘আমার প্রসঙ্গ বাদ দাও। আমি অন্য একটি কথা ভাবছি।’
সাগ্রহে ঋষা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কথা?’
–জাগতিক বিষয়টি কাল সকালে
প্রবীণের সঙ্গে কথা বললেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু তোমার ওই স্বপ্ন, কালভৈরব, চলচ্চিত্রের মতো স্পষ্ট দৃশ্যমান এক জগত, রহস্যময় নর্মদা পরিক্রমা- এসব বোঝা আমার সাধ্যাতীত। তাই ভাবছিলাম যদি একজনের কাছে তোমায় নিয়ে যাওয়া যায়, তিনি দিশা দেখাতে পারেন! আমার যে খুব বিশ্বাস রয়েছে তা নয়, তবে কিছু ক্ষমতার কথা অস্বীকারও করতে পারি না।
বিস্মিত স্বরে ঋষা জিজ্ঞাসা করল, ‘কে তিনি?
আপনার বিশেষ পরিচিত কেউ?’
–ভদ্রলোকের পৈতৃক ভিটা আহিরিটোলা।
গঙ্গার পাশেই বাড়ি। নাম ভৈরব চট্টোপাধ্যায়। অত্যন্ত প্রাচীন শাক্ত বংশ। এঁর পূর্বপুরুষ সেনাপতি চট্টোপাধ্যায় মহাপণ্ডিত ছিলেন, উচ্চকোটির সিদ্ধ সাধক, সেই সময় সমগ্র বঙ্গদেশ এমনকি আসাম অবধি ওঁর খ্যাতি বিস্তৃত ছিল। মাতৃসাধক বৃদ্ধ ভৈরব বংশের মর্যাদা রেখেছেন। বিশেষ কিছু ক্ষমতাও রয়েছে। তাই ভাবছি যদি এঁর কাছে তোমাকে নিয়ে যাওয়া যায়, আচ্ছা ক’টা বাজে বল তো?
ডান হাতের মণিবন্ধে ছোট্ট ডায়ালটির দিকে একপলক তাকিয়ে ঋষা বলল, প্রায় সাড়ে ছ’টা!’
কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন মহেশ্বর, ”তুমি কোথায় ফিরবে?’
–আমি হোস্টেলে ফিরব, ডানলপ।
সিগারেটের প্যাকেট জামার
 পকেটে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে মহেশ্বর সামান্য হেসে বললেন, ‘ফেরার পথে আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব। চলো আজই ভৈরব দর্শন করে আসি। সময় নষ্ট করে লাভ নেই।’

দিল্লির ক্ষীণকায় হেমন্তে মধ্যরাত্রি আসন্ন। ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন রাজধানীর পথঘাট ইতিমধ্যেই নির্জন হয়ে উঠেছে। ছেলেবেলার রুশ উপকথায় পড়া সিভকা-বুর্কার ডাইনির চোখ হয়ে ওঠা ভেপার আলোগুলি নিদ্রাতুরা কুহকিনীর মতোই অস্পষ্ট। নিষ্প্রাণ বিগতযৌবনা হিমশীতল বাতাসের মাঝে বারোতলায় শিবা রেসিডেন্সির বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথ্বীশ। গহিন রাত্রি পানে চেয়ে তার সহসা মনে হল দিল্লি বড়ো বিচিত্র নগরী। কত লোভ হিংসা কামনা গুপ্তহত্যা ষড়যন্ত্র আর ভালোবাসার সাক্ষী এই নগর। এখনই যেন কালস্রোতের বিপরীতে ছুটে আসবে অশ্বারোহী মুঘল সৈন্যের দল, দেওয়ান-ই-আমে আবুল-ফৎ জালালুদ্দিন মুহম্মদ আকবর পদার্পণ করা মাত্রই সকলে উঠে দাঁড়িয়ে তিনবার ভূমি স্পর্শ করে অভিবাদন করলেন। প্রথম স্তরে দশহাজারি মনসবদার, দ্বিতীয় স্তরে হিন্দুরাজগণ, উজীর বখ্‌শী শিপাহশালার খানসামান, সদর-উস্-সদুর, কাজী উল্‌ কুদ্দৎ ও সমস্ত প্রধান সুবাদার উঠে দাঁড়িয়েছেন, তৃতীয় স্তরে বাদশাহের পুত্র, জামাতা ও আত্মীয়- সকলের মুখেই জয়ধ্বনি… ওই যে ধুলাধুসরিত পথে মোগল, আফগান, ইরাণি, তাতার, রাজপুতের রক্তপিপাসু শামসের প্রতিশোধস্পৃহায় উদ্যত, সহস্র উষ্ট্র, অশ্ব এবং হস্তীদলের গগনবিদারী শব্দে আকাশ-বাতাস মুখরিত… বাদশাহী নাকারার ধ্বনি, অন্তরমহলের হারেম থেকে কার যেন ক্রন্দনধ্বনি ভেসে আসছে… পরমুহূর্তেই কাল স্পর্শে মুছে গেল দৃশ্যপট। কৌমুদী সুরভিত নির্জন জনশূন্য ফতেপুর সিক্রি অলীক মানুষের পদশব্দে চঞ্চল, কুসুম জ্যোৎস্নায় কামনা-বাসনায় জর্জর ছায়া মানব-মানবীদের বাতাসি কণ্ঠস্বর… কান পাতলে শোনা যায় কে যেন নৈঃশব্দ্যের সুরে বলে চলেছে- বিদারি-ই মা চিরাগ্‌-ই আলম বাহশাদ, ইয়েক শাব তো চিরাগ্‌ রা নেগহাহ্‌দার মাখুসব্‌! 

 

‘টুমরো আর্লি মর্নিং উই হ্যাভ আ মিটিং, ইউ নিড স্লিপ ম্যান!’, ঈশ্বরের ভারী গলায় সংবিত ফিরল পৃথ্বীশের। মৃদু হেসে বলল, ‘ইয়েস, জাস্ট কেম ফর আ ফ্যাগ!’
নিজের প্যাকেট থেকে সিগারেট
পৃথ্বীশের দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটি ধরালেন, কয়েক মুহূর্ত পর নীচু অথচ দৃঢ় স্বরে পৃথ্বীশকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ডু ইউ নো হোয়্যার ইজ ইওর বন্যা?’
বন্যার কথায় বিস্মিত পৃথ্বীশ হতভম্বের মতো প্রশ্ন করল, ‘কোথায়?’
গূঢ় ইশারার মতো আলো-ছায়ার মাঝে এক মুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃ
ষ্টিতে পৃথ্বীশের দিকে চেয়ে রইলেন ঈশ্বর। তারপর শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘হার লাস্ট নোন লোকেশন ইজ বিলাসপুর! সি ওয়াজ মুভিং টুওয়ার্ডস পেন্ড্রা!’
কোনও কথা না-বলে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথ্বীশ।
পুনরায় ঈশ্বর রাওয়ের কণ্ঠ ইস্পাতের ছুরির মতো বেজে উঠল, ‘আই হোপ ইউ ডিডন্ট টেল হার এনিথিং। ইট ইজ নট আ গেম পৃথ্বীশ! ইফ থিং গোজ রং আই শ্যাল নট স্পেয়ার হার! প্লিজ রিমেমবার মাই ওয়ার্ডস।’

 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

হাড়ের বাঁশি ( চতুর্বিংশ পর্ব)

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More