হাড়ের বাঁশি (ঊনত্রিংশ পর্ব)

1

আসন্ন সন্ধ্যার দুয়ারে বনস্থলী গৃহাভিমুখী পাখিদের কলরবে চঞ্চল। দূরে অস্পষ্ট মেঘাবৃত শৈলরাজির অঙ্গে দিনান্তের আলো অল্পক্ষণ পূর্বে তার উত্তরীয়খানি আনমনে ফেলে রেখে পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। বিস্মৃত প্রেমাখ্যানের মতো মন্দ মন্দ আলোয় নর্মদা তীরবর্তী শূলপাণি ঝাড়ের মহারণ্য ভাবগম্ভীর। অদূরে উচ্চৈঃস্বরে একটি ময়ূর ডেকে ওঠার পরমুহূর্তেই কোটরা হরিণের ভীরু কণ্ঠ জানান দিল কোনও অদৃশ্য শ্বাপদের উপস্থিতি। প্রস্তরনির্মিত সুপ্রাচীন শিবমন্দিরের ভগ্ন প্রাঙ্গণে বসে রয়েছেন শ্যামানন্দ ও ভস্মীবাবা, সম্মুখে আরও একজন তরুণ সাগ্রহে তাঁদের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পরনে একখানি সাদা ধুতি ও ফতুয়া, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখমণ্ডলে চোখ দুটি প্রতিভাবান বালকের মতো উজ্জ্বল, মস্তকে একখানি রক্তবস্ত্র পাগড়ির ভঙ্গিমায় বাঁধা। ছন্দটি ভারি সুন্দর, দেখে মনে হয়, পাগড়িটি যেন তরুণের রাজমুকুট!শ্যামানন্দ ভস্মীবাবার দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যাপ্রদীপের মতো মৃদু কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ দ্বিপ্রহরে স্নানান্তে নর্মদাতীর হইতে যে শিবলিঙ্গ পাইয়াছি, তাঁহার যথাবিহিত অর্চনা না করিলে মন শান্ত হইতেছে না! এইরূপ চঞ্চলতা পূর্বে কখনও প্রত্যক্ষ করি নাই। ইহার বিশেষ তাৎপর্য কি কিছুমাত্র রহিয়াছে?’
ভস্মীবাবা প্রায়-নগ্ন।
ফাল্গুনের মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় বাতাসে মৃদু হিমস্পর্শ অনুভব করা গেলেও তিনি নির্বিকার। পরনে কাষ্ঠকৌপীন, সমস্ত অঙ্গ ভস্মাবৃত। শ্মশ্রুগুম্ফাচ্ছন্ন মুখমণ্ডল প্রাচীন ঋষি-আশ্রমে প্রজ্জ্বলিত হোমাগ্নির মতোই ভাবগম্ভীর ও উজ্জ্বল। ডান হাতের মুঠি খুলে শ্যামানন্দ কথিত শিবলিঙ্গটি দেখে মৃদু কুসুম হাসি ক্ষণিকের জন্য ওষ্ঠপ্রান্তে ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। সুললিত কণ্ঠে বললেন, ‘আকৃতি ও বর্ণ দেখিয়া অনুমান করিতে পারি, ইহাই দুর্লভ বাণলিঙ্গ। মধুবর্ণ, হংসডিম্বাকৃতি, সহস্রকোটি লিঙ্গ উপাসনাতুল্য ফলপ্রদ এই বাণলিঙ্গ তুমি স্বয়ং নর্মদা মাতার কৃপায় পাইয়াছ। আগামীকাল সূর্যোদয়ের পর স্নানান্তে শাস্ত্রানুযায়ী নর্মদা-জাত বাণলিঙ্গের পূজা করিবে। তাঁহার কৃপায় নিশ্চয় তোমার চঞ্চল মন শান্ত হইবে।’
শ্যামানন্দ বিস্মিত কণ্ঠে
প্রশ্ন করলেন, ‘যোনিপীঠ ব্যতিরেকে বাণলিঙ্গের পূজা কী প্রকারে সম্ভব হইবে?’
ভস্মীবাবা পুনরায় মৃদু হাসলেন,
‘প্রস্তরবেদির উপরেও বাণলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা যাইতে পারে।’, একমুহূর্ত নীরব থাকার পর ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘তাম্রী বা স্ফটিকী স্বার্ণী পাষাণী রাজতী তথা, বেদিকা চ প্রকর্তব্য তত্র সংস্থাপ্য পূজয়েৎ। প্রত্যহং যোহর্চয়েল্লিঙ্গং নর্মদা ভক্তিভাবতঃ, ঐহিকং কিং ফলং তস্য মুক্তিস্তস্য করে স্থিতা।’ভস্মীবাবার দিকে তাকিয়ে পাশ থেকে তরুণ বিনীত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘কয়েক বৎসর পূর্বে নর্মদা তীরস্থ এক প্রাচীন মন্দিরে রক্তবর্ণ স্ফটিক লিঙ্গ দর্শনের সৌভাগ্য হইয়াছিল। ইহা কি রৌদ্রলিঙ্গ নামে খ্যাত?’
কৌতুহলী শ্যামানন্দ
সাগ্রহে তরুণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মুণ্ড মহারণ্যে প্রায় ভগ্ন নির্জন দেবালয়ে দর্শন করিয়াছিলে?’
–আজ্ঞা, মুণ্ড মহারণ্যে
দিকভ্রষ্ট হইয়া রাত্রে উক্ত জনহীন মন্দিরে আশ্রয় লইয়াছিলাম। রাত্রে বিচিত্র অভিজ্ঞতাও হইয়াছিল!
–কীরূপ অভিজ্ঞতা?
কয়েক মুহূর্ত কী
যেন চিন্তা করে দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে তরুণ বলল, ‘তাহা স্পষ্ট কহিতে পারিব না। স্বপ্নদৃশ্যের ন্যায় অসংলগ্ন। তখন মধ্যরাত্রি অতিক্রান্ত হইয়াছে। অবিরল বৃষ্টিধারায় চরাচর ভাসিয়া যাইতেছে। মুহুর্মুহু বজ্রপাতের শব্দে মনে হইতেছে মহাপ্রলয় আসন্ন। জগৎসংসার গহিন অন্ধকারাবৃতা। নিজ হাতখানিও স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি না। সেই দুর্ভেদ্য আঁধারে মধ্যরাত্রি অতিক্রম করিয়া কাহারা যেন মন্দির প্রাঙ্গণে আসিল। শিলাবৃষ্টির ন্যায় অজস্র পাথরের টুকরা প্রতি মুহূর্তে মন্দিরগাত্রে আসিয়া পড়িতেছে। তাহার সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে ডম্বরুনাদ শুনিতে পাইতেছি… গর্ভগৃহের এককোণে বসিয়া নিরন্তর ইষ্টমন্ত্র জপ করিয়া চলিয়াছি। কখন যে নিদ্রা আসিল তাহা স্মরণ করিতে পারি না… পরদিন প্রত্যুষে উঠিয়া দেখি, নির্মেঘ আকাশ উজ্জ্বল রৌদ্রালোকে ভাসিয়া যাইতেছে, স্নান করিয়া আসিয়া স্ফটিক লিঙ্গের পূজা সমাপন্তে প্রণাম জানাইয়া বিদায় লইয়াছিলাম। অস্পষ্ট স্মৃতির মতো হইলেও অপরূপ লিঙ্গটির কথা আজও ভুলিতে পারি নাই।
তরুণের কথা শুনে
শ্যামানন্দের সহসা নিজ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ল। ওই মন্দিরেই সেই রহস্যময়ী স্নেহশীলা বালিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। অবাক হয়ে ভাবলেন, তিনি নিজে সারারাত্রি কাটিয়েছিলেন, কিন্তু ওইরূপ কোনও উপদ্রব তো প্রত্যক্ষ করেন নাই! পরক্ষণেই বুঝতে পারলেন, মা নর্মদা বিচিত্র লীলাময়ী। মানুষের সাধ্য কী তাঁর ইচ্ছা বুঝতে পারবে! নিজের মনে অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন, নর্মদা হরে! জয় জগদানন্দী হো মাঈয়া! জয় জগদানন্দী হো রেবা! জয় জগদানন্দী!

প্রায়ান্ধকার মন্দির প্রাঙ্গণে তরুণ একখানি দীপ জ্বেলে দিল। মাটির প্রদীপ ও ঘি গর্ভগৃহে যেন তাদের জন্যই কেউ সাজিয়ে রেখেছিল। ধুনি জ্বালানোর শুকনো কাঠও কিছু রয়েছে। তবে কি এই জনমানবশূন্য অরণ্যের মাঝে এই মন্দিরে কারও নিত্য যাতায়াত রয়েছে? অরণ্য এখন প্রায় নিথর। মাঝে মাঝে দু-একটি রাতচরা পাখির ডাক ভেসে আসছে। ক্ষীণ দীপালোক যেন ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ ও অতীন্দ্রিয় ভুবনের মাঝে শীর্ণা নদীস্রোতের মতো বয়ে চলেছে। অদূরে কোথাও একটি ফেউ অদ্ভুত স্বরে আর্তনাদ করে উঠল। গহিন আঁধার সমুদ্রে শূলপাণি ঝাড়ের প্রাচীন মন্দিরটি স্তিমিত আলোয় যেন কারোর জন্য প্রতীক্ষারত। কয়েকটি নীরব মুহূর্ত কালস্রোতে ভেসে যাওয়ার পর ভস্মীবাবা ধীর স্বরে বললেন, ‘শুনিয়াছি মধ্যরাত্রে ওই প্রাচীন দেবালয়ে রুদ্র পিশাচেরা আসিয়া থাকে। তুমি তাহাদেরই সম্ভবত প্রত্যক্ষ করিয়াছিলে। বহুকাল পূর্বে আমি ওই মন্দিরে রুদ্রলিঙ্গ দর্শন করিয়াছিলাম। অপূর্ব স্ফটিক-নির্মিত লিঙ্গের মধ্যভাগে অতি উজ্জ্বল রক্তচ্ছটার ন্যায় বর্ণ দৃশ্যমান; ইহাই শিবচিহ্ন। এইরূপ লিঙ্গ অত্যন্ত দুর্লভ। কথিত রহিয়াছে, সহস্র লিঙ্গ দর্শনের পুণ্য শুধুমাত্র একবার রৌদ্রলিঙ্গ দর্শনেই সম্ভব।’
ভস্মীবাবার কথা শেষ
হতেই শ্যামানন্দের কণ্ঠ মৃদুস্বরে বেজে উঠল, ‘নর্মদাসম্ভবাং রৌদ্রং শ্বেতং রক্তং গোলাকৃতি, রৌদ্রলিঙ্গং তথা খ্যাতং সর্বজাতিষু সিদ্ধিদম্‌।’

শংকর বন্দনায় কৌমুদীর ন্যায় স্মিত হাস্যে ভরে উঠল ভস্মীবাবার সমগ্র মুখণ্ডল। শান্ত স্বরে বললেন, ‘সন্ধ্যা হইয়াছে, অধিক বাক্যালাপে সময় নষ্ট না করিয়া ইষ্টচিন্তায় মনোনিবেশ করাই শ্রেয়। আমাদিগের পথ ক্ষুরধারার ন্যায় তীক্ষ্ণ। সর্বদা বিচার করিতে হয়, নচেৎ সমূহ বিপদের সম্ভাবনা রহিয়াছে।’ কথার মাঝে একমুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে কী যেন চিন্তা করে পুনরায় বললেন, ‘নর্মদা মাঈয়ার কৃপা হইলে আমাদিগের মনোবাঞ্ছা নিশ্চয় পূর্ণ হইবে।’
বাক্যটি শেষ হয়েছে
কী হয়নি, শূলপাণি ঝাড়ের তমসাবৃত গহিন অরণ্যে ভেসে এল একটি অদ্ভুত সুর। করুণ স্বরে অলীক কোনও বাঁশি যেন বেজে উঠেছে। সুরের প্রকৃতি ঠিক বোঝা যায় না। আনন্দধ্বনি নয়, আবার করুণ বিলাপও বলা চলে না। প্রকৃতপক্ষে দৃশ্যমান জগতের কোনও বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গেই ওই সুরের মিল নাই। একমুহূর্তের জন্য বাঁশি বলে ভ্রম হলেও পরক্ষণেই বোঝা যায়, এইটি বাঁশি নয়। তাহলে কী সেই বিচিত্র যন্ত্র? নাকি কোনও যন্ত্রই নয় এইটি, অপ্রাকৃত অথবা ইন্দ্রিয়াতীত কোনও জগতের অস্পষ্ট ইশারা রূপে সহস্রকোটি আলোকবর্ষ পার হয়ে তা ভেসে আসছে এই মরজগতে? ঈষৎ শঙ্কিত মুখে ভস্মীবাবা ও শ্যামানন্দের মুখপানে চাইল তরুণ। চোখদুটি নীরব কৌতূহলে পরিপূর্ণ। স্মিত হাসির রেখা ভস্মীবাবার মুখ হতে এখনও মুছে যায় নাই। শ্যামানন্দের নয়ন মুদিত। অস্ফুট স্বরে কী যেন বলছেন তিনি! ওই সুর কিন্তু এখনও বয়ে চলেছে। তরুণের মনে হল- পুণ্যতোয়া নর্মদার মতোই সে কলকলনাদিনী, প্রাচীন বেদমন্ত্রের ন্যায় গম্ভীর ও মধুর। পারিজাত কুসুম সুবাসে জগত ভাসিয়ে আপনমনে অদৃশ্য সুরতরণী ভেসে চলেছে কোন্‌ অপরূপ মনোভূমি পানে! সেখানে হয়তো সকল ভাব নষ্ট হয়ে যায়, রুদ্ধ হয় মনোবৃত্তি। অপূর্ব চলন এই সুরতরঙ্গমালার। কখনও মনে হচ্ছে একটি ধারা, আবার পরমুহূর্তেই মনে হয় সহস্র ধারায় আচ্ছন্ন সমস্ত চরাচর!

প্রায় দ্বিপ্রহর, শীতবেলার কবোষ্ণ রৌদ্রও অতি মনোহর। চারপাশ প্রেমকথার মতো উজ্জ্বল। গাছের পাতায় আলো প্রজাপতির ঝিলিমিলি তুলে আপন খেয়ালে যেন ফুটে রয়েছে। নর্মদা মায়ের মন্দিরে প্রণাম জানিয়ে সহসা বন্যার মনে পড়ল, শ্যাম তালুকদারের একটি কথা -হাড়ের বাঁশির সুর এখনও শোনা যায়; সত্যিই শোনা যায়? হাড়ের বাঁশি প্রকৃতপক্ষে কী? একটি সাধারণ বাঁশি, নাকি কোনও প্রাচীন অভিজ্ঞান?

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

হাড়ের বাঁশি (অষ্টবিংশ পর্ব)

 

You might also like
1 Comment
  1. […] হাড়ের বাঁশি (ঊনত্রিংশ পর্ব) […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.