হাড়ের বাঁশি (ষড়বিংশ পর্ব)

1

সকাল সাড়ে দশটা, জনবহুল বিলাসপুর রেল ইস্টিশান গমগম করছে কোলাহলে, প্রথম শ্রেণির কামরা থেকে নামতেই বন্যার মনে হল, অনেকদিন পর সে আবার বেড়াতে এসেছে!
নিজের ছোট ব্যাগটি প্ল্যাটফর্মে
পায়ের কাছে রেখে হঠাৎ চা খেতে ইচ্ছে হল। সামনেই সারি সারি চা-দোকান, গরম পুরি-সবজির সুবাস ভাসছে বাতাসে। পরমুহূর্তেই মনে পড়ল, এখানে সময় নষ্ট করা মানেই পেন্ড্রা হয়ে অমরকণ্টক পৌঁছাতে বেশ বেলা হয়ে যাবে। একটা গাড়ি করে নিলেই আর ঝামেলা থাকে না। গতরাত্রে নির্মলানন্দ মহারাজ তেমনই বলেছিলেন। সহসা শ্যাম তালুকদারের কণ্ঠস্বরে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল, ‘আপনি স্টেশনের সামনেই অমরকণ্টকের গাড়ি পেয়ে যাবেন, যেতে খুব বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। তবে দরদাম করবেন। অচেনা যাত্রী দেখলেই এখানকার চালকরা বেশি ভাড়া চায়।’

রেলগাড়ি থেকে নামার আগেই কাকস্নান সেরে পোশাক বদলে নিয়েছে বন্যা। পরনে চাপা নীল জিন্স আর কনুই অব্দি ভাঁজ করা জলপাই-রঙা ফুলহাতা জামা। হাতখোঁপার উপর একখানি সাদা গলফ্‌ ক্যাপ। চোখ থেকে রোদচশমা নামিয়ে তরুণ সহযাত্রীর দিকে একপলক চেয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘আপনিও তো ও-পথেই যাবেন, চলুন একসঙ্গেই যাই! এদিককার সবই আমার অচেনা, আপনি থাকলে পথঘাট চিনিয়ে দিতে পারবেন!’

কাপড়ের ঝোলাটি ডান কাঁধ থেকে বামকাঁধে নিয়ে শ্যাম এক মুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে বন্যার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার মতো অচেনা সহযাত্রীর ভরসাতেই কি আপনি কলকাতা থেকে এতদূর এসেছেন?’
এমন স্পষ্ট প্রশ্ন সচরাচর কেউ আশা করে না।
বন্যা মুহূর্তের মধ্যে ইতস্তত ভাব সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘এমন ভরসা কোনও স্বাভাবিক মানুষই করবে না! আমাকে দেখে কি আপনার খুব নির্বোধ আর অসহায় মনে হচ্ছে?’
শ্মশ্রুগুম্ফের
আড়ালে কুয়াশা মোছা রৌদ্রের মতো একফালি হাসি ফুটে উঠল শ্যামের মুখে, ‘আপনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী!’
রোদচশমাটি
আবার চোখে তুলে বন্যা নির্বিকার স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে?’
–আজ্ঞে, তাহলে কিছুই না।
আসুন, আগে এককাপ চা খাওয়া যাক। তবে এখানে নয়, বড়ো কোলাহল! বাইরে একটি নিরিবিলি চা-দোকান রয়েছে, ওখানে বসে কথা বলতে আপনার ভালো লাগবে।
–এদিককার সবই তো দেখছি আপনার নখদপর্ণে!
বন্যার ব্যাগটি হাতে তুলে শ্যাম ধীর স্বরে বললেন, ‘যতটা চে
না হলে মানুষ পথ হারায়, এই জগত আমার ঠিক ততখানিই পরিচিত!’
কথাটি বন্যাকে সামান্য
বিস্মিত করলেও মুহূর্তে সেই ভাব গোপন করে ডান হাতখানি শ্যাম তালুকদারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ব্যাগটি দিন। জানেন তো নিজের ভার নিজেকেই সর্বদা বহন করতে হয়!’

ইস্টিশানের অদূরে দোকানটি সত্যি নির্জন। লোকজন তেমন কেউ নেই। বাঁশের বেঞ্চ পাতা বাইরে। পাশেই একখানি প্রকাণ্ড আমলকি গাছ নির্মেঘ আকাশ পটচিত্রে অজানা চিত্রকরের নিপুণ রেখাচিত্রের মতো ডালপালা মেলে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কার্তিকের কুসুম রৌদ্র আর তিরতির বাতাসে পাতায় পাতায় আলোছায়ার আলপনা। টিনের চালের একফালি দোকানে এখনও কাঠের উনান দেখে অবাক হল বন্যা। সহসা তার মনে হল অদৃশ্য সুতোর টানে সে শত বৎসর পূর্বের নিস্তরঙ্গ কোনও জনপদে চলে এসেছে!

বাঁশের বেঞ্চির উপর নিজের ঝোলাটি রেখে শ্যাম বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বসুন! আরাম করে বসুন।’

বৃদ্ধ চা-দোকানি সম্ভবত শ্যামের পূর্বপরিচিত। তাদের দেখেই শশব্যস্ত হয়ে বাইরে এসে শ্যামের পানে চেয়ে একগাল হেসে বললেন, ‘আইয়ে প্রভু, কিত্‌না দিন বাদ শ্যামজী কো দর্‌শন মিলা!’
মানুষটির পোশাকও ভারি বিচিত্র।
একখানি ধুতি শুধু পরনে। শিমশিম ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝেও দেহ অনাবৃত। মাথা মুণ্ডিত, চোখ দুখানি ভারি শান্ত, কণ্ঠে তুলসী কাঠের মালা, কপালে রসকলির অলংকার। মুখে অস্ফুট বনতুলসী মঞ্জরীর হাসি। বন্যার অকারণেই মনে হল, এই বৃদ্ধকে কোথাও যেন সে দেখেছে, অথচ তন্দ্রাচ্ছন্ন স্বপ্নের মতো কিছুতেই এখন স্মরণ করতে পারছে না।

শ্যাম দু-পা এগিয়ে বৃদ্ধ মানুষটির দুটি হাত নিজের মুঠির মধ্যে নিয়ে সহাস্যে বললেন, ‘ই ক্যায়সা বাত চরণদাসজী, আপ প্রভু কে মাফিক সদা মেরে মন’মে বৈঠতা হ্যে!’
চরণদাস আন্তরিক সুরে
 বাঁশের বেঞ্চিটি দেখিয়ে মিনতির সুরে বললেন, ‘বেঠ্যিয়ে প্রভু, কৃপা করকে থোড়া বেঠ্যিয়ে!

শ্যাম বেঞ্চির উপর পা দুটি ভাঁজ করে গুছিয়ে বসলেন। দেখে বন্যার মনে হল এই মানুষটির কোথাও যাওয়ার তাড়া নাই। সুদূর শ্যামাঙ্গী গ্রামদেশের ধুলিমাখা পথ বেয়ে পুরাতন দিঘির উত্তরে ছায়াচ্ছন্ন তালবন ক্ষুদ্র গৃহাঙ্গণ শীতরৌদ্রে উড়ে বেড়ানো গাঙশালিখের দল, দিগন্তপ্রসারী আকুল ধানখেত আলপনা আঁকা দালানকোঠা পার হয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু চৈত্র বাতাসের মতো অচেনা সহযাত্রী ভুলে গেছেন সে-কথা। হয়তো কাউকে কথা দিয়েছিলেন। আঙিনায় পদ্মপাতায় ক্ষুধার অন্ন সাজিয়ে সে অপেক্ষা করছে, কিন্তু শ্যাম ভুলে গেছেন তাকে! যেমন প্রতিবার ভুলে যান! সত্যি কি কাউকে কথা দিয়েছিলেন শ্যাম তালুকদার?

 

‘কী ভাবছেন?’, শ্যামের কণ্ঠস্বরে সংবিত ফিরল বন্যার।
দূরে জনবহুল ব্যস্ত
ইস্টিশানের দিকে একপলক তাকিয়ে রোদচশমাটি খুলে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার সঙ্গে চরণদাসজীর অনেকদিনের পরিচয় বুঝি?’
–নামটি অবধি খেয়াল করেছেন?
রুক্ষ শীতবাতাসের মতো
 ওষ্ঠচাপা হাস্যে বন্যা শুধোল, ‘বললেন না তো আপনাদের কতদিনের পরিচয়?’

রৌদ্রের তেজ তেমন নাই। রিনিঝিনি বাতাসে শিমুল তুলোর মতো উড়ছে ছায়াআলো। আমলকি গাছ থেকে দু-একটি শুকনো পাতা খসে পড়ল ধুলার উপর। নীচু হয়ে একটি পাতা হাতে তুলে যত্ন করে মুছে নিজের ঝোলায় রাখলেন শ্যাম, মুখে মন্দমন্দ হাসি। ‘কুড়িয়ে রাখি বুঝলেন, যা পাই জগতে তার থেকে দু-একটি কুড়িয়ে এই ঝোলায় রাখি, বলা যায় না কখন কাজে লাগে!’, একমুহূর্ত নীরব থেকে পুনরায় বললেন, ‘সঞ্চয় বাসনা যায় নাই এখনও, সেজন্য সাধু হওয়া হল না!’
‘কুপথ্যং বদরী ফলং,
 আমলকী রসায়নং! বড়ো মিঠে ফল, কত যে গুণ! সেদ্ধ আমলকি আর দুধ দিয়ে অনেকদিন আগে চরণদাসজীর সঙ্গে এক শীতের দুপুরে বসে নরম চাপাটি খেয়েছিলাম। সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে রয়েছে।’
বিস্মিত বন্যা বলল,
‘আমলকি সেদ্ধ আর দুধ? এমন অদ্ভুত কম্বিনেশন কখনও শুনিনি!’
মৃদু স্বরে কোনও প্রাচীন
প্রহেলিকার মতো কণ্ঠে শ্যাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শোনেননি? দেখেননিও কখনও?’

সহসা বন্যার চোখের সামনে থেকে কুয়াশাবৃতা অচেনা কোনও জগতের আস্তরণ মুছে গেল। তার স্পষ্ট মনে পড়ল সেই আশ্চর্য সন্ধ্যার কথা। জংলা পাহাড়ি পথ বেয়ে হেঁটে চলেছেন দুজন সন্ন্যাসী। সেই ভগ্নপ্রায় সীতা দেবীর মন্দির, সহস্র বৎসরের পুরাতন ধুলামলিন মন্দির চাতালে সন্ন্যাসীদের সম্মুখে শালপাতায় রাখা ঘিয়ের চাপাটি, আমলকি, পাশে মাটির সরায় দুধ। এত স্পষ্ট ছিল সেই স্বপ্ন… না না, স্বপ্ন তো নয়, যেন জাগ্রত অবস্থায় দেখা এক অলীক চলচ্ছবি। তাহলে কি সেই সন্ন্যাসী দুজন শ্যাম আর চরণদাস? বিস্ময়াহত বন্যা সে কথা জিজ্ঞাসা করার জন্য মুখ খুলতেই বুঝতে পারল, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর শ্যাম কিছুতেই দেবেন না। থাক! এমন রহস্যময় মানুষের সঙ্গে সাঁটে কথা বলাই শ্রেয়। কৌতুক হাসি ওষ্ঠে ভাসিয়ে বন্যা অতি স্বাভাবিক গলায় শুধোল, ‘খাঁটি ঘিয়ের চাপাটি ছিল, তাই না? পাশে মাটির সরায় উষ্ণ দুধ?’
শ্যাম কিছু বলার আগেই
চরণদাস দুহাতে খাবার নিয়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে কোমল স্বরে বললেন, ‘বহুত দূর সে আয়া হ্যে প্রভু, থোড়া সেবা কর্‌ লিজিয়ে!’
অবাক হয়ে বন্যা দেখল
, চা কোথায়! তার পরিবর্তে দুটি মাটির পাত্রে শালপাতার উপর লুচি পরমান্ন আর মালপোয়া রাখা। কতগুলি তুলসী পাতা সুখাদ্যের উপর ছড়ানো, ভুরভুর করছে ঘিয়ের সুবাস!
বন্যা তাড়াতাড়ি উঠে
দাঁড়িয়ে বৃদ্ধের হাত থেকে পাত্রদুটি নিয়ে বিস্মিত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইতনা জল্‌দি আপ ক্যায়সে বনায়ে?’
শিশিরের মতো হাস্যে
ভরে উঠল বৃদ্ধের মুখ। ‘আভি নেহি বেটি, ইয়ে মেরা গোপাল জিউকা শুভহ্‌কা পরসাদ! দুসরে দিন অ্যায়সে হি বাঁট দেতা, লেকিন আজ কোন্‌ জানে কিঁউ, স্যয়দ মেরা প্রভু শ্যামজী কে লিয়ে রাখ্‌খা থা!’

শ্যাম উঠে দাঁড়িয়ে চরণদাসের কাঁধ দুটি স্পর্শ করে ছায়াচ্ছন্ন কণ্ঠে বললেন, ‘কব্‌ কা বাত, আভিভি আপ কিতনা পেয়্যার সে লে কর বইঠ্যে হ্যে! আপকে লিয়েই প্রভু ইঁহা ম্যে আতা হ্যু!’
বৃদ্ধ শ্যামের হাতদুটি কপালে স্পর্শ করে
সজল কণ্ঠে বেজে উঠলেন, ‘বাস্‌ ওহি তো মেরা সবকুছ্‌ হ্যে প্রভু!’
ঝোলা থেকে একটি চন্দন কাঠ
বের করে চরণদাসের হাতে দিয়ে শ্যামের মুখে ফুটে উঠল নরম হাসি। ‘বাস্‌ আভি অনুমতি দিজিয়ে প্রভু, যানা হোগা!’
আকুল স্বরে চরণদাস
অবোধ বালকের মতো জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ফির্‌ কভ দরশন হোগা প্রভু?’
নির্মেঘ আকাশের পানে
তর্জনি দেখিয়ে শ্যাম বললেন, ‘প্রভুকা মর্জি! এইসে হি বখ্‌ত আনে পে মুলাকাত হো যায়েগি!’

এমন বিচিত্র দৃশ্য বন্যাকে সহসা বিহ্বল করে তুলল। তার মনে হল কোলাহলমুখর বিলাসপুর শহরে এই দুজন মানুষ কোন্‌ সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে যেন নেমে এসেছেন। এমন অস্ফুট কোমল ভাব আগে কখনও সে দেখেনি। শুনেছে শ্রীবাস অঙ্গনে এমনই সুমধুর ভাবে নাকি বিহ্বল হতেন নিমাই। আর কী অদ্ভুত, এখানে চরণদাস আর শ্যাম দুজনেই পরস্পরকে প্রভু বলে সম্বোধন করছেন! তাহলে শ্যাম তালুকদার নিজেও কি কোনও বৈষ্ণব সাধক? পরক্ষণেই ভাবল, তা কী করে হবে! বৈষ্ণবরা কি শিব অথবা নর্মদা দেবীর পুজো করে? কে জানে! হিন্দুদের জটিল এবং নানাবিধ পৃথক ধর্মভাবনা বোঝা সত্যিই অসম্ভব।

 শ্যাম অতি সামান্য প্রসাদ মুখে দিয়ে জলে হাত ধুয়ে বন্যাকে বললেন, ‘আপনাকে অমরকণ্টক অব্দি একটি গাড়ি করে দিই, আপনি এবার রওনা দিন। শীতের দিন, এরপর দেরি করলে পৌঁছাতে বেলা পড়ে যাবে।’
এমন সুস্বাদু খাবার বন্যা বহুদিন খায়নি।
একটি লুচি অমৃতগন্ধী পায়েসে মেখে মুখে তোলার আগে শ্যামের কথা শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আর আপনি?’
সুবাসি রৌদ্র আর কার্তিকের উন্মনা
বাতাসে আকাশ ঝুমকোলতার মতো দুলে উঠেছে। ব্যস্ত জনমুখর শহরের উপরে সুদূরের ইশারার মতো কতগুলি পাখি ডানা মেলে এসে বসল আমলকি গাছে। কী পাখি বন্যা জানে না। ইদের দিনের খুশি তাদের কলতানে। অদূরে গাড়িওয়ালারা হাঁকডাক করছে। ওদিকে দোকানপাটেও বেশ ভিড় শুধু অজ্ঞাত কোনও কারণে চরণদাস বাবাজির দোকানটি জনহীন। বন্যার কথা শুনে শ্যাম মৃদু হেসে বললেন, ”আমি যাব, তবে পায়ে হেঁটে!’
–পায়ে হেঁটে?
আশ্চর্য, এতটা পথ আপনি পায়ে হেঁটে যাবেন? কেন?
–না, সম্পূর্ণ পথ হাঁটব না।
এখান থেকে পেন্ড্রা যাব দুপুরের রেলে তারপর ওখান থেকে ভোটেঙ্গা জঙ্গলের পথ ধরে অমরকণ্টক চোদ্দ মাইল। আগামীকাল দিনমণির মুখ দেখার আগেই পৌঁছে যাব!’
মাটির পাত্রটি বেঞ্চির উপর সাবধানে
 রেখে বন্যা সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সারা রাত্রি হাঁটবেন? তাও জঙ্গলের পথে?’

গতরাত্রির সাদা সুতির কাপড় ঝোলা থেকে বের করে মাথায় ও গলায় জড়িয়ে ধীর স্বরে শ্যাম বললেন, ‘ইচ্ছে নাহলে পথে কোনও সাধুর কুঠিয়ায় আশ্রয় নেব। পথই আমার ঘরবাড়ি বন্যাদেবী, জঙ্গলে ভয় কী!’
–আর জন্তু জানোয়ার?
ধুলামলিন পথের পাশে
পড়ে থাকা বুনোফুলের মতো হেসে উঠলেন শ্যাম, ‘তারাও রয়েছে। তবে মজা কী জানেন আমাকে কিছু বলে না! কেন কে জানে!’

কোনও কথা না বলে প্রায় নিঃশব্দে খাবার শেষ করল বন্যা, একটি কণাও আর অবশিষ্ট নাই-খাওয়ার সময় ভাবল একটি কথা, পরক্ষণেই মন নিষেধ করে বলল, খবরদার না! তুমি তাড়াতাড়ি অবধূত আশ্রমে চলে যাও। 

পরক্ষণেই তার অন্তরের চিরচঞ্চলা বালিকা জেদ ধরে বসল, না যাব না! আমি অজ্ঞাত স্বপ্নদৃশ্যের উৎস সন্ধানেই এসেছি, একজন সাধুর কুঠিয়ায় গিয়ে কী করব! 

অপরজন বাঁকা হেসে জিজ্ঞাসা করল, আর নির্মলানন্দ? তাঁর কথা অগ্রাহ্য করবে তো?

অগ্রাহ্য করছি না কিন্তু আমার সত্য জানা প্রয়োজন!

অল্পক্ষণ পর মনের অন্তরমহলে মধু-কৈটভের লড়াই সমাপান্তে মাটির থালাটি ক্ষুদ্র দোকানের ভেতরে রেখে এসে ঘটির জলে হাত মুখ ধুয়ে খানিকটা জল খেল বন্যা, বেঞ্চির উপর বসে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে হাসিমুখে শ্যামের পানে তাকাল।

শ্যাম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘চলুন, আপনার গাড়ির ব্যবস্থা করি।’

হঠাৎ পুরাতন স্মৃতির মতো বাতাস উঠল ভুবনডাঙায়, আমলকি গাছের পাতাগুলি গতজন্মের সখী হয়ে নেচে উঠল আনন্দে, রৌদ্রে চঞ্চল বালকের ঝিলিমিলি আর এই আনন্দমুখর জগতের মাঝে হাসিমুখে বসে রইল বন্যা। শ্যাম তার হাসি দেখে নিজেও স্মিত হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হল? চলুন!’

নির্বিকার অথচ দৃঢ় স্বরে বন্যা বলল, ‘আমিও আপনার পথেই যাব। হেঁটেই যাব অমরকন্টক।’

গাড়ি থেকে পেন্ড্রা রোডে নামার পর বন্যা দেখল আকাশে কতগুলি খণ্ড মেঘ অপরাহ্নের দূত হয়ে দিনান্তের ভেরি বাজিয়ে চলেছে, স্তিমিত আলোয় চারপাশ ছায়াচ্ছন্ন, দূরে অস্পষ্ট কুয়াশাবৃতা শৈলরাজি, চুম্বনপ্রত্যাশী শিখরদেশে মেঘ নতমুখে তাকিয়ে রয়েছে-সহসা তার মনে পড়ল পরিচিত দুটি পঙতি, প্রান্ত ছেয়ে আছে আম্রবনরাজি, ঝলক দেয় তাতে পক্ক ফল, বর্ণে চিক্কণ বেণীর মতো তুমি আরূঢ় হলে সেই শৃঙ্গে…এ কি তবে সেই আম্রকূট পর্বত?

ব্যস্ত রাজপথের পাশে একটি আমগাছেরই ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা, শ্যাম অন্যমনস্ক বন্যার পানে চেয়ে বললেন, ‘আপনি মিথ্যে জেদ করলেন, আজ আকাশে মেঘ, অল্পক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে আসবে,পাহাড়ি পথে যেতে আপনার সত্যিই খুব সমস্যা হবে।’

পাহাড়ি পথের কথা শুনে কী মনে হওয়ায় শ্যামের পা’দুটির দিকে তাকিয়ে বন্যা দেখল অতি মলিন টায়ার কাটা চপ্পল পায়ে, এই নিয়ে মানুষটি পাথর বিছানো চোদ্দ মাইল পথ হাঁটবেন কী করে! কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বন্যা সামান্য হেসে বলল, ‘আমার অসুবিধা না হলেও আপনার হবে! চলুন সামনের বাজার থেকে আপনার জন্য একটি স্নিকার কিনি!’     

বিস্মিত শ্যামানন্দ কী বলবেন বুঝতে না পেরে দু-এক মুহূর্ত বন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর কৌতুকের সুরে বললেন, ‘জুতো! আমার জন্য? নাহ! আপনার মাথা সত্যিই খারাপ হয়েছে!’

–কেন আপনার কী নতুন জুতো পরা নিষেধ?

–তা নয়! কিন্তু এখানে ওই কারণে সময় নষ্ট করার কোনও অর্থ হয় না!

নিজের ব্যাগটি ডানহাতে তুলে বন্যা প্রায় মায়ের আদেশের সুরে বলল, ‘সে আমি বুঝব, এখন দোকানে চলুন তো দেখি!’

 

দু-বোতল জল, কিছু শুকনো খাবার কিনে শহরের বাইরের পথ ধরল দুজন, ঘড়িতে তিনটে বাজে কিন্তু এর মধ্যেই সন্ধ্যা তাঁর আঁচল বিছিয়ে দিয়েছেন জগত উঠানে, নতুন স্নিকার শ্যাম তালুকদারের পায়ে বেশ মানিয়েছে, পুরনো টায়ারের চটি জোড়া ঝোলায় রেখে দিতে বন্যা বিস্মিত সুরে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ওই জুতো জোড়া আবার বইছেন কেন? ফেলে দিলেই তো হয়!’

বালক যেমন ছেঁড়া বই, রেলগাড়ির টিকিট, ভাঙা কলম বাতিল তামাদি কত জিনিস আপন খেয়ালে সঞ্চয় করে তেমনই বিচিত্র খেয়ালি সুরে শ্যাম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘থাক! একদিন আপনার মতো ওই দুটিও কেউ ভালোবেসে উপহার দিয়েছিল। মানুষের উপহার ফেলে দিতে নাই!’

 

ধীরে ধীরে অস্ত আলোর মতো জনপদ ফুরিয়ে এল, শীর্ণ বন্ধুর পথ, দুপাশে সাজি আর শাল গাছের সারি, শুকনো পাতায় দুজনের পদশব্দ ছাড়া জগত প্রায় নিথর, মাঝে মাঝে দু-একটি অচেনা পাখির ডাক ভেসে আসছে, কখনও মেঘ কখনও রৌদ্র, আলোর তন্তু প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে, দুজনের হাতেই গাছের ডালভাঙা লাঠি, বন্যার সহসা মনে হল-এই যাত্রাপথ অবিকল সেই চলচ্ছবির মতো, তারা দুজনে চলেছে, আচ্ছা এই পথেই কি মুণ্ড মহারণ্য? পৃথ্বীশ কি এখন সেখানে পৌঁছে গেছে? যদি তাকে এমন পথে দেখত-পৃথ্বীশের মুখটি কেমন হবে কল্পনা করতেই আপনমনে হেসে উঠল বন্যা!

ক্রমশ উপল বিছানো পথ খাড়া হয়ে উঠছে, সামনে শ্যাম এক মুহূর্তের জন্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কষ্ট হচ্ছে?’

দ্রুত শ্বাসের মাঝে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল বন্যার মুখে, ‘নাহ! চলুন, সবে তো শুরু!’

–সামনে কুশঝোপে ঢাকা পথ রয়েছে, সাবধানে আসুন। শরীরে আঁচড় লাগলে রক্তপাত হবে।

শাল ও সাজি গাছের মাঝে কত আমলকি ভেলা আর লেবু গাছ, পাকা ফলভারে ডালগুলি ভূমির কাছে নেমে এসেছে, দূরে দিকচক্রবালরেখার উপর নীলবর্ণ শৈলরাজি নর্মদা স্রোতের মতো বয়ে গেছে-তাদের মাথায় মেঘভাঙা মলিন আলো, তবে পথ ক্রমশ ছায়াময় হয়ে উঠছে, চড়াইয়ে আলোর দেখা মিললেও উৎরাইয়ে নামলেই শ্বাপদ আঁধার স্থির দৃষ্টিতে যেন তাকিয়ে তাকিয়ে রয়েছে, দুপাশে বুনো ঝোপের মাথায় বালিকার মতো চঞ্চল ফুলের কী আহ্লাদ, কতগুলি প্রজাপতি উড়ছে তাদের পাশে, নিথর জনহীন ভূখণ্ডে প্রগলভা যুবতির হাসির মতো বাতাস বইছে, বন্যা টুপিটি খুলে হাতখোঁপা ভেঙে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল-আহ! মাথা ভারী হয়ে ছিল এতক্ষণ! খুব ইচ্ছে করছে বুনোফুল তুলে কানের পাশে রাখে কিন্তু বহুকষ্টে ইচ্ছা সংবরণ করল! মাঝে পথে একখানি ঝোরা পড়ল, নামমাত্র জল, গোড়ালি না ভিজিয়ে পাথরে পা দিয়ে পার হয়ে এল দুজন, শ্যাম ঝোরার স্বচ্ছ স্রোতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘বৃথা জল কিনে অর্থ অপচয় করলেন, এমন খনিজ পদার্থে পূর্ণ জল আর কোথাও পাবেন না আপনি!’

বন্যা অল্প শ্বাস নিয়ে কৌতুকের সুরে বলল, ‘খনিজ ধাতুর সম্পর্কেও আপনার বেশ জ্ঞান রয়েছে দেখছি!’

–কেন, সে কি শুধু কলেজের ছাত্রছাত্রীই জানবে? আমার মতো ভবঘুরের জানার অধিকার নাই?

–উফ্‌, সে-কথা বলিনি!

শ্যাম পাকদণ্ডী পথে মুখ ফিরিয়ে বন্যার পানে চেয়ে অন্যমনস্ক গলায় বললেন, ‘আমার কী মনে হয় জানেন এই পাহাড় অরণ্যে তেজস্ক্রিয় ধাতুও রয়েছে!’

হাতের ব্যাগটি ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে, পাথরের উপর রেখে বন্যা বিস্মিত স্বরে শুধোল, ‘তেজস্ক্রিয় মানে রেডিও অ্যাকটিভ? কী করে বুঝলেন?’

একখানি তীক্ষ্ণ ছুরিকার মতো আলোর রেখা কোন্‌ দূর শৈলরাজির শিখর স্পর্শ করে শ্যামের শ্মশ্রুগুম্ফাবৃত মুখে এসে পড়েছে, একপলক দেখলে মনে হয় এই ভবঘুরে মানুষটি সম্ভবত এই জগতের কেউ নয়-কী প্রশস্ত ললাট, উন্নত নাসা, ভাবগম্ভীর দুটি নয়ন, যেন কোনও পথভ্রষ্ট উদাসী বালক বেখেয়ালে নশ্বর মানুষের জগতে চলে এসেছে- শাল গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতার সুবাসের মতো মৃদু হেসে বললেন, ‘তা জানি না, মনে হয় তাই বললাম! আমি কি অত বুঝি!’

কথার মাঝেই একটি চিতল হরিণ ত্রস্ত পায়ে ঝোরার বামদিকের গহিন অরণ্য থেকে বেরিয়ে ডানদিকে চলে গেল, মুগ্ধা বন্যা এমন অপূর্ব দৃশ্যের সামনে প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠল, ‘আরে হরিণ!’

–হুঁ, তবে এবার একটু দ্রুত পা চালাতে হবে আমাদের, এই ঝোরার আশেপাশে ভালুকের বড়ো উৎপাত!

 

অল্প পথ উতরাইয়ে নামার পর একমুহূর্তের জন্য থামলেন শ্যাম, নিচু হয়ে ঝোপের মাথা থেকে কতগুলি বনকুসুম তুলে ডানহাতখানি বন্যার দিকে এগিয়ে দিয়ে সহজ সুরে বললেন, ‘মনের ইচ্ছা অপূর্ণ রাখবেন না!’

বিস্মিত বন্যা করতল পেতে দেওয়ার পূর্বেই গম্ভীর জলদধ্বনি শোনা গেল, পশ্চিমাকাশে ক্ষণিকের জন্য সৌদামিনী দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলেন শৈলরাজির শিখরে, সহসা আলো নিভে প্রায়ান্ধকার অরণ্যে বেজে উঠল এক অপার্থিব বাঁশি-এমন করুণ অথচ ভাববিহ্বল সুর লহরী জগতে বড়ো দুর্লভ, শংকরসূতা নর্মদা স্বয়ং যেন সেই সুরের ছন্দে বালিকা শরীর ধারণ করে নেমে এলেন মর্তধামে, বেজেই চলেছে বাঁশি, অলীক মন্ত্রের মতো তার সুরচ্ছটায় ক্রমশ আলোকিত হয়ে উঠছে অরণ্য-সেই আলো ঊষাকালের নয় আবার প্রদোষের অস্তরাগও সেখানে মিশে নাই, রাত্রি নয় দিবসের মতো উজ্জ্বল নয়, কুয়াশাবৃতা আলো এবং সুর পরস্পরের হাত ধরে মুহূর্তে এক অপরূপ নৃত্যকলার জন্ম দিল, বিস্ময়ে হতবাক বন্যা শূন্য কৃষ্ণতারার মতো দুটি আঁখি তুলে নিঃশব্দে চাইল শ্যামের পানে, তিনি স্মিত হেসে নিচু স্বরে বললেন, ‘বহু বৎসর পর পুনরায় হাড়ের বাঁশি বেজে উঠেছে!’

 

হঠাৎ রেলগাড়ির দোলায় ঘুম ভেঙে বন্যা উঠে বসে দেখল কাচের জানলার ওপারে ঝলমলে দিনের আলো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরার মাঝেও সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে, এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, কোথায় গেল সেই অলীক সুর লহরী?

আচ্ছন্ন অবস্থায় কয়েক মুহূর্ত বসে থাকার পর উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখল, কেউ কোথাও নাই, শ্যাম তালুকদার গেলেন কোথায়? দরজা খুলে বাইরে করিডোর দেখল একবার, নাহ, কেউ নাই সেখানে। ওঁর সঙ্গের ঝোলাটিও তো নাই, উপরের বার্থে পরিপাটি করে কম্বল চাদর ভাঁজ করে রাখা, কী মনে হওয়ায় বালিশ দুটি তুলে দেখল একখানি সাদা কাগজের টুকরো, পরিষ্কার হস্তাক্ষরে কালো কালি দিয়ে লেখা রয়েছে একটি মাত্র বাক্য-হাড়ের বাঁশির সুর এখনও শোনা যায়!

 

কাগজের টুকরোটি হাতে নিয়ে প্রায় অচৈতন্যের মতো নিজের বার্থে বসে রইল বন্যা, তাহলে কি সে স্বপ্ন দেখেনি? সত্যিই পেন্ড্রা রোড থেকে তারা গিরিপথে হাঁটছিল? কিন্তু তা কী করে সম্ভব! এই তো সে এখন এই রেলগাড়ির কামরায় বসে রয়েছে কিন্তু ওই অলীক বংশীধ্বনি? সে-সুর যে এখনও কানে লেগে রয়েছে! তবে কি হাড়ের বাঁশি সর্বার্থেই বেজেছে তার জীবনে? 

সহসা বন্যার মনে হল, কোনটি স্বপ্ন? এই কামরায় বসে থাকা বন্যা রহমান সত্য নাকি শ্যাম তালুকদারের সঙ্গে যে অরণ্য পথে হাঁটছিল সে সত্য?

 

অসংখ্য অজানা প্রশ্নের সামনে বন্যা রহমানকে একলা রেখে কোনও প্রাচীন অতিকায় সরীসৃপের মতো রেলগাড়ি মন্থর পায়ে বিলাসপুর ইস্টিশানের প্ল্যাটফর্ম স্পর্শ করল! ইস্টিশানের বড়ো ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে দশটা, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস আজ মাত্র এক ঘন্টা পাঁচ মিনিট দেরী করে বিলাসপুর এসেছে!

 

চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

হাড়ের বাঁশি (পঞ্চবিংশ পর্ব)

You might also like
1 Comment
  1. […] হাড়ের বাঁশি (ষড়বিংশ পর্ব) […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.