অভিশপ্ত ‘ফ্লাইট-সেভেন্টি থ্রি’, মৃত্যুর আগে নীরজা বাঁচিয়ে গিয়েছিলেন কয়েকশো বিমানযাত্রীকে

বিজ্ঞপনেরও জনপ্রিয় মুখ ছিলেন নীরজা।

Neerja Bhanot

রূপাঞ্জন গোস্বামী

অভিশপ্ত ফ্লাইট-সেভেন্টি থ্রি

১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। মুম্বই থেকে যাত্রা শুরু করে, প্যান আমেরিকান এয়ার ওয়েজের ফ্লাইট-সেভেন্টি থ্রি (Pan Am Flight 73) নেমেছিল করাচির জিন্না আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। পাকিস্তানে তখন ভোর সাড়ে চারটে। করাচি, ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে বিমানটি যাবে নিউইয়র্ক। বিমানে ছিলেন ১৪টি দেশের ৩৬৫ জন যাত্রী ও ২৩ জন বিমানকর্মী। যাত্রীদের মধ্যে ছিল ন’টি শিশুও। বিমানকর্মীদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন ভারতীয়।

তখনও ভোর হয়নি, টারম্যাকে দাঁড়িয়ে ফ্লাইট-সেভেন্টি থ্রি

ভোরের আলো ফুটছিল ধীরে ধীরে। বিশালকায় বোয়িং- ৭৪৭ বিমানটি দাঁড়িয়েছিল টারম্যাকে। করাচিতে নেমে গিয়েছিলেন ১০৯ জন যাত্রী। করাচি থেকে বিমানে উঠেছিলেন প্রায় সমসংখ্যক যাত্রী। সকাল ছ’টা নাগাদ, যাত্রীদের নিয়ে শেষ বাসটি আসছিল বিমানের দিকে। হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে বিমানের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল একটি সিকিউরিটি ভ্যান। গাড়িটি থেকে নেমেছিল পাকিস্তান এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্সের আকাশি নীল ইউনিফর্ম পরা দুই ব্যক্তি। হাতে রাইফেল। আকাশে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা উঠে পড়েছিল বিমানে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই, আরও দুই ব্যক্তি এলোমেলোভাবে গুলি চালাতে চালাতে উঠে পড়েছিল বিমানে। এদের একজনের পরনে ছিল পাকিস্তানি পোশাক। তার হাতে ছিল একটি ব্রিফকেস। এই চারজনই ছিল প্যালেস্টাইনের কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী আবু নিদালের সদস্য। এদের নেতা ছিল সাফারিনি ওরফে মুস্তাফা। বাকি তিনজনের নাম ফাহাদ, খলিল ও মনসুর। তিরিশের মধ্যে প্রত্যেকেরই বয়স।

সন্ত্রাসবাদীদের প্ল্যান ছিল, বিমানটি ছিনতাই করে প্রথমে তারা নিয়ে যাবে সাইপ্রাস, সেখান থেকে ইজরায়েলের তেল আবিবে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের হাতে বন্দি ‘আবু নিদাল’ সন্ত্রাসবাদীদের মুক্ত করবে, তাদের হাতে বন্দি বিমানযাত্রীদের বিনিময়ে।

Neerja Bhanot
ছিনতাইকারীদের নেতা সাফারিনি ওরফে মুস্তাফা

দুঃসাহসী বিমান সেবিকা নীরজা ভানোট

বিমানটিতে ছিলেন বাইশ বছরের বিমান সেবিকা নীরজা ভানোট (Neerja Bhanot)। অসামান্য সুন্দরী নীরজা ছিলেন বিজ্ঞাপনের সফল মডেল। মাত্র এক বছর আগে মডেলিং ছেড়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন প্যান আমেরিকান এয়ার ওয়েজে। দশ হাজার প্রার্থীর মধ্যে থেকে তাঁকে বেছে নিয়েছিল সংস্থাটি। নিজের কর্মদক্ষতায় এক বছরের মধ্যেই সিনিয়র ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট হয়ে গিয়েছিলেন নীরজা।

জনপ্রিয় মডেল থেকে বিমানসেবিকা হওয়া নীরজা ভানোট

বিমানের বাইরে গুলির আওয়াজ শুনেই, নীরজা ইন্টারকমের মাধ্যমে ‘হাইজ্যাক’ কোড পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিমান সেবিকা শিরিন পবনের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে কোডটি টাইপ করে ককপিটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শিরিন। পাইলটের আসনে ছিলেন ক্যাপ্টেন উইলিয়াম কিয়াঙ্কা। সহকারী পাইলট ছিলেন টেহান ডজ। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন জন রিজওয়ে।

ক্যাপ্টেন কিয়াঙ্কা মুহূর্তের মধ্যে বিমান ছিনতাই হওয়ার কোডটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কন্ট্রোল টাওয়ারে। যোগাযোগ করেছিলেন প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের করাচি বিমানবন্দরের কর্তা ভিরাফ দারোগার সঙ্গে। পাইলটদের বিমান ছেড়ে পালিয়ে আসতে বলেছিলেন ভিরাফ দারোগা। টারম্যাকে যাত্রীভর্তি বিমান রেখে, ককপিটের হ্যাচ খুলে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিন ককপিট ক্রু।

ভেপোরেক্সের বিজ্ঞাপনে নীরজা

শুরু হয়েছিল ছিনতাইকারীদের তাণ্ডব

এক বিমান সেবিকার পায়ের সামনে গুলি করে, তাকে দিয়ে বিমানের দরজা বন্ধ করিয়েছিল ছিনতাইকারীরা। দরজা বন্ধ হওয়ার পর, ছিনতাইকারীদের নেতা মুস্তাফা “যে যেখানে আছ সেখানেই বসে পড়ো।’ সদ্য বিমানে ওঠা পাকিস্তানী যাত্রীরা তখনও সিট খুঁজে পাননি। আতঙ্কিত হয়ে তাঁরা বসে পড়েছিলেন করিডোরেই।

লাথি মেরে যাত্রীদের সরাতে সরাতে ককপিটে পৌঁছে গিয়েছিল মুস্তাফা। ককপিট তখন জনশূন্য। ক্রোধে উন্মত্ত মুস্তাফা ককপিট থেকে বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলেছিল “মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও সবাই”। একজন ছিনতাইকারী যাত্রীদের দেখিয়েছিল তার কোমরে থাকা বিস্ফোরক ভর্তি বেল্ট ও একজন দেখিয়েছিল ব্রিফকেস ভর্তি গ্রেনেড। আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করেছিলেন অনেক যাত্রী।

প্রতীকী ছবি

তখন বিমানের বাইরে 

বিমানটিকে ঘিরে ফেলেছিল পাক আর্মির স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ ও পাকিস্তান রেঞ্জার্সের কমান্ডোরা। কিন্তু তাদের ওপর বিমানে হানা দেওয়ার আদেশ ছিল না। দর্শক হিসেবে তারা নজর রাখছিল ঘটনাক্রমের ওপর। কিছুক্ষণ পরে, মুস্তাফা ডেকেছিল দুই ভারতীয় বিমান সেবিকা সানশাইন ও শাহিনকে। দরজা খুলতে বলেছিল রাইফেল উঁচিয়ে। দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন বিমান সেবিকারা।

দরজার সামনে মানব ঢাল হিসেবে সানশাইন ও শাহিনকে দাঁড় করিয়েছিল মুস্তাফা। কারণ অতর্কিতে তার দিকে ছুটে আসতে পারে কমান্ডোদের গুলি। বিমান সেবিকাদের আড়াল থেকে মুস্তাফা চেঁচিয়ে বলেছিল, তার সঙ্গে প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের করাচির কর্তাদের সঙ্গে যোগযোগ করিয়ে দিতে। না হলে পনেরো মিনিটের সে বিমানটি উড়িয়ে দেবে। হ্যান্ড মাইকের সাহায্যে মুস্তাফার সঙ্গে কথা শুরু করেছিলেন বিমান সংস্থাটির পাকিস্তানের কর্তা ভিরাফ দারোগা।

চলছে কথা, মাটিতে পাতা সারি সারি স্ট্রেচার

মুস্তাফাকে ভিরাফ বলেছিলেন, তার কথা শোনা যাচ্ছেনা। বিমানের মধ্যেই আটকে আছে মেহেরজি খারাস নামের এক ‘গ্রাউন্ড ক্রু’। সে ককপিট থেকে রেডিও কলের সাহায্যে মুস্তাফার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুস্তাফা ও ভিরাফের মধ্যে দর কষাকষি ও সময় চুরি করার খেলা শুরু হয়েছিল রেডিও কলের মাধ্যমে। সকাল সাড়ে ন’টার সময়, ভিরাফকে মুস্তাফা বলেছিল, আধঘন্টার মধ্যে বিমানে পাইলট পাঠানো নাহলে, তারা একে একে সব যাত্রীদের হত্যা করবে।

আরও পড়ুন: ক্লাস থ্রি পাশ কবির কবিতা আজ গবেষণার বিষয়, তাঁকে পদ্মশ্রী দিয়ে গর্বিত হয় দেশ

তখন নীরজা

বিমানের বেশিরভাগই কর্মীই ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকছিলেন ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন নীরজা। তাঁকে দেখে মন হচ্ছিল, যেন কিছুই হয়নি। শ্বাসরুদ্ধ করা পরিবেশকে নীরজা হালকা করার চেষ্টা করছিলেন হাসিমুখে। যাত্রীদের স্যান্ডউইচ, জল, ফলের রস, চা, কফি দিচ্ছিলেন ভিড় ঠেলে। ভয়ে বোবা হয়ে যাওয়া শিশুদের দিচ্ছিলেন চকোলেট। আসলে এইভাবে ছিনতাইকারীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছিলেন নীরজা। তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কিও করছিল ছিনতাইকারীরা। তাদের সঙ্গে সাইপ্রাস যেতে বলছিল।

বিজ্ঞাপনের জনপ্রিয় মুখ নীরজা

নীরজা জানতেন এই পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। কোনওভাবেই ছিনতাইকারীদের উত্তেজিত করা যাবে না। তাই তিনি হাসিমুখে কথা বলছিলেন ছিনতাইকারীদের সঙ্গে। তিনিই যে হাইজ্যাক কোড পাঠিয়ে সতর্ক করেছিলেন পাইলটদের, তাঁর জন্যেই যে করাচির মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে ফ্লাইট-সেভেন্টি থ্রি, তা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি ছিনতাইকারীরা। জানলে হয়ত প্রথম গুলিটি নীরজাকেই খেতে হতো।

শুরু হয়েছিল রক্তের হোলি 

আধ ঘণ্টা কেটে যাওয়ার পর, ঠিক বেলা দশটার সময়, সিটে বসা প্রবাসী ভারতীয় রাজেশকুমারকে তুলে নিয়েছিল মুস্তাফা। ঊনত্রিশ বছরের রাজেশকুমারকে ধাক্কা মারতে মারতে নিয়ে আসা হয়েছিল বিমানের বাঁ দিকে থাকা ‘এল-টু’ দরজাটির সামনে। খুলে দেওয়া হয়েছিল দরজাটি। আতঙ্কিত রাজেশ কুমারকে দরজাটির সামনে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল। বিমানের বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল রাজেশ কুমারকে।

এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী একটা বলেছিল মুস্তাফা। পরমুহূর্তেই পিস্তল দিয়ে গুলি চালিয়ে দিয়েছিল রাজেশ কুমারের মাথার পিছনে। দরজার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন রাজেশ কুমার। পনেরো ফুট ওপর থেকে রক্তাক্ত রাজেশ কুমারকে লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল মাটিতে। তখনও শ্বাস নিচ্ছিলেন রাজেশ কুমার। তাঁকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটেছিল হাসপাতালে। সেখানেই জীবনের শেষ শ্বাসটি নিয়েছিলেন রাজেশ কুমার।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাজেশ কুমারকে

নীরজার বুদ্ধিমত্তায় প্রাণে বেঁচেছিলেন আমেরিকার অনেক যাত্রী 

রাজেশ কুমারকে হত্যা করার পর, মুস্তাফা ডেকেছিল নীরজাকে। কয়েকজন বিমান সেবিকাকে নিয়ে যাত্রীদের কাছে থাকা পাসপোর্টগুলি সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছিল। আমেরিকার পাসপোর্টগুলি আলাদা একটি ব্যাগে রাখার নির্দেশও দিয়েছিল। যাত্রীদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিতে শুরু করেছিলেন নীরজা, সানশাইন ও মাধবী। নীরজা সহকর্মীদের বলেছিলেন, সময় নিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করার জন্য। 

বিমানের সিটে ও মেঝেতে বসে থাকা চারশো যাত্রীর পাসপোর্ট নেওয়া সহজ কাজ নয়। ভিড় ঠেলে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হচ্ছিল নীরজাদের। সেটা বুঝতে পেরে ছিনতাইকারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কথা বলার কাজে। এই সুযোগে নীরজা করেছিলেন অসামান্য একটি কাজ। যাঁদের পাসপোর্ট নিচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কারও আমেরিকার পাসপোর্ট থাকলে, সেটি নীরজা লুকিয়ে ফেলছিলেন সিটের তলায়। কখনও ডাস্টবিনের ময়লার নীচে। কখনও কমোডে ফেলে ঢুকে ফ্ল্যাশ করে দিচ্ছিলেন। কারণ তিনি আঁচ করেছিলেন, আমেরিকানদের আগে মারবে ছিনতাইকারীরা।

বিমানের দরজা আবার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল

ধৈর্য্য হারিয়েছিল ছিনতাইকারীরা

পাসপোর্ট নিতে নীরজাদের দেরি হওয়ায় একসময় ধৈর্য্য হারিয়েছিল মুস্তাফা। তখনও পর্যন্ত জমা পড়া পাসপোর্টগুলি ছিনিয়ে নিয়ে নীরজাদের কাছ থেকে। কিছুক্ষণ পর বিমানের সামনে ডেকে নেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ নাগরিক জন থেকস্টনকে। ভিড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে বিমানের সামনে এসেছিলেন মধ্য চল্লিশের থেকস্টন। তাঁকেও দরজার সামনে হাঁটু মুড়ে বসতে বলেছিল মুস্তাফা। রেডিও মারফত বিমান বন্দরের কর্তাদের জানিয়েছিল, সে এবার একজন ব্রিটিশ নাগরিককে হত্যা করতে যাচ্ছে।

মৃত্যু আসন্ন, তাই বুকে ক্রস এঁকে নিয়েছিলেন থেকস্টন। ঠিক এই সময়, ককপিট থেকে এসেছিল এক ছিনতাইকারী। সে মুস্তাফাকে বলেছিল, বোয়িং বিমান ওড়ানোর উপযুক্ত দু’জনকে পাওয়া গেছে। আর একজনকে পাওয়া গেলেই তিনজনকে একসঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বিমানে। মুস্তাফা সেই ছিনতাইকারীকে বলেছিল, থেকস্টনকে জল খাইয়ে, তার সিটে বসিয়ে দিয়ে আসতে।

জন থেক্সটন

চলে গিয়েছিল বিদ্যুৎ

কাঁদতে থাকা শিশুদের কোলে নিয়ে, সেই অসহনীয় পরিবেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নীরজা। ভুলিয়ে রাখার জন্য তাদের সঙ্গে খেলা করছিলেন। দুহাত ভরে টফি এনে দিচ্ছিলেন। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল এসেছিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। পাকিস্তান সরকার তখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছিল ছিনতাইকারীদের সঙ্গে। ছিনতাইকারীরাও ভেবেছিল বিমানে আসবেন পাইলটেরা। রাতের মধ্যেই বিমান উড়ে যাবে সাইপ্রাসের দিকে।

রাত ন’টার সময় হঠাৎ চলে গিয়েছিল বিদ্যুৎ। নিভে গিয়েছিল বিমানের সমস্ত আলো। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এয়ার কন্ডিশনার। টিম টিম করে জ্বলছিল বিমানের ইমার্জেন্সি লাইটগুলি। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল যাত্রীদের। প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে আবার কাঁদতে শুরু করেছিল শিশুরা। তবুও বিমানের দরজা খোলার অনুমতি দেয়নি মুস্তাফা। মুস্তাফাকে নীরজা জানিয়েছিলেন, “আর মাত্র পনেরো মিনিট জ্বলবে ইমার্জেন্সি লাইটগুলি।”

আতঙ্কের প্রহর এগিয়েছিল এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে

পনেরো মিনিট পরে নিভে গিয়েছিল বিমানের ইমার্জেন্সি লাইটগুলিও। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিলেন বিমানের যাত্রীরা। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে, ডিক মেলহার্ট নামে এক যাত্রী, খুলে ফেলেছিলেন বিমানের ডানার ওপর থাকা একটি দরজা। নীচে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করেছিলেন যাত্রীরা সেই দরজা দিয়ে।

পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে আঁচ করে, বিমানে থাকা যাত্রীদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে দিয়েছিল ছিনতাইকারীরা। বিস্ফোরকভর্তি বেল্ট ফাটিয়ে বিমান উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এক ছিনতাইকারী। এক ছিনতাইকারী গ্রেনেড ছুঁড়েছিল যাত্রীদের দিকে। কিন্তু কোনও কারণে বিস্ফোরণ দু’টি হয়নি। হলে হয়ত বিমানের চারশো যাত্রীই নিহত হতেন।

বিমানের ভেতর তখন নারকীয় পরিবেশ

অন্ধকারে একে একে লুটিয়ে পড়ছিলেন গুলিবিদ্ধ যাত্রীরা। মৃত সহযাত্রীর শরীর মাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করছিলেন বাকিরা। বিমানের মেঝেতে শুয়ে আর্তনাদ করছিলেন আহত যাত্রীরা। তাঁদের গলার আওয়াজ পেয়ে, সেদিকে আন্দাজে গুলি ছুঁড়ছিল ছিনতাইকারীরা। স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল কোনও কোনও আহত যাত্রীর আর্তনাদ। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বিমানের মেঝে। বিভিন্ন দেশ, ভাষা, জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষদের রক্তধারা এক হয়ে গিয়ে, বিমানের খোলা দরজা দিয়ে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছিল টারম্যাকে।

বিমানের গা বেয়ে নামছে রক্ত

বিমানের ডান দিকে থাকা ‘আর ফোর’ দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন, বিমানে থাকা গ্রাউন্ড স্টাফ মেহেরজি খারাস। বিমান থেকে মাটিতে নেমে এসেছিল রাবারের স্লিপ। সেটা বেয়ে পালিয়েছিলেন বহু যাত্রী। এরপর এক দুঃসাহসী কাজ করেছিলেন নীরজা। অন্ধকার ও ধাক্কাধাক্কির সুযোগ নিয়ে, সিটের ওপর দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন ছিনতাইকারীদের কাছাকাছি থাকা ‘এল-থ্রি’ দরজাটির সামনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুলে দিয়েছিলেন দরজাটি। যাত্রীরা পালাতে শুরু করেছিলেন দরজাটি দিয়ে।

নীরজা বাঁচিয়ে চলেছিলেন বয়স্ক ও শিশু যাত্রীদের

বিমানের জানলা ও খোলা দরজাগুলি দিয়ে সামান্য আলো আসছিল ভেতরে। সেই আলোতেই বয়স্ক ও শিশুদের খুঁজতে শুরু করেছিলেন নীরজা। যাকে কাছে পাচ্ছিলেন, সামনে থাকা দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলছিলেন। নীরজা জানতেন পনেরো ফুট ওপর পড়লে আহত হতেই হবে। তবুও প্রাণটা তো বাঁচবে। একসময় নীরজা দেখতে পেয়েছিলেন তিনটি শিশুকে। একটি সিটের পিছনে তারা লুকিয়ে ছিল। সঙ্গে তাদের বাবা মা ছিল না। হয় তাঁরা মৃত, না হলে শিশুগুলিকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছেন।

নীরজা তিনটি শিশুকে দ্রুত দরজা দিয়ে বাইরে বের করে দিতে চাইছিলেন। সামনে থাকা দরজাটি দিয়ে সেই মুহূর্তে অনেক যাত্রী একসঙ্গে বেরোতে চাইছিলেন। ওদিকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তাঁদের দিকেই এগিয়ে আসছিল এক ছিনতাইকারী। নীরজার চোখের সামনেই গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়েছিলেন কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ যাত্রী।

ছিনতাইকারীটি এরপর পেয়েছিল নীরজার সঙ্গে থাকা তিনটি শেতাঙ্গ শিশুকে। নীরজা বুঝতে পেরেছিলেন, ছিনতাইকারীটি এবার শিশু তিনটিকে গুলি করে মারবে। তাঁর অনুমান ঠিক ছিল, ছিনতাইকারীটি শিশুদের দিকে চালিয়ে দিয়েছিল গুলি। তার আগেই নীরজা পিছন ঘুরে নিজের শরীর দিয়ে শিশু তিনটিকে আড়াল করে ফেলেছিলেন। গুলিটি সরাসরি এসে লেগেছিল নীরজার কোমরে। বিমানের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিলেন রক্তাক্ত নীরজা। এরপরও শিশুগুলিকে তাক করে গুলি চালাতে গিয়েছিল ছিনতাইকারীটি। কিন্তু শেষ হয়ে গিয়েছিল তার রাইফেলের গুলি।

ভারতের স্ট্যাম্পে নীরজা

বিমানে হানা দিয়েছিল কমান্ডোরা

একসময় ছিনতাইকারীদের সঙ্গে থাকা গুলি ফুরিয়ে গিয়েছিল। সেটা আঁচ করে বিমানে হানা দিয়েছিল পাক কমান্ডোরা। কার্যত বিনা লড়াইয়ে ধরা দিতে বাধ্য হয়েছিল ছিনতাইকারীরা। সাতদিন পরে ধরা পড়েছিল, পঞ্চম ছিনতাইকারী হাফিজ। সে অভিশপ্ত দিনটিতে বিমানে ছিল না। কিন্তু বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিল।

পাক আদালতে শুরু হয়েছিল ছিনতাইকারীদের বিচার। ১৯৮৮ সালের ৬ জুলাই, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল ছিনতাইকারীদের। পরে অজানা কোনও কারণে, মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আমেরিকার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল মুস্তাফাকে, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তাকে ১৫০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল আমেরিকা। বাকি চার ছিনতাইকারীকে ২০০৮ সালে পাকিস্তান পাঠিয়ে দিয়েছিল প্যালেস্টাইনে। সেখানে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাদের।

বাকি চার ছিনতাইকারী (২০০৮ সাল ও এখন, ছবি-এফবিআই)

যখন শেষ লড়াই লড়ছিলেন নীরজা

রক্তের নদীতে শুয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন নীরজা। তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল। সেই অবস্থাতেও সবাইকে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন অস্ফুট কণ্ঠে। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছিল নীরজার গলার আওয়াজ। সানশাইন ও দীলিপ নামে দুই বিমানকর্মী, জ্ঞান হারাতে থাকা নীরজাকে রাবারের স্লিপ দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছিলেন নীচে। বেশ কিছুক্ষণ পরে এসেছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। স্ট্রেচার ছিল না সেটিতে। অ্যাম্বুলেন্সের মেঝেতে শুইয়ে নীরজাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল করাচির জিন্না হাসপাতালে। সেখানে তখন কয়েকশো আহত যাত্রীর চিকিৎসা চলছিল। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসছিল নিহতদের দেহ।

বেডও জোটেনি নীরজার। হাসপাতালের করিডোরে, একটি স্ট্রেচারে শুয়েছিলেন রক্তাক্ত নীরজা। তাঁর সহকর্মীরা হাসপাতালের চিকিৎসকদের হাতে পায়ে ধরছিলেন, নীরজার চিকিৎসা শুরু করার জন্য। দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছিল রক্ত, নীরজার শরীর থেকে। এক সময় এসেছিলেন চিকিৎসক, কিন্তু তার অনেক আগেই চলে গিয়েছিলেন নীরজা। যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে জয়ী হয়ে, শত্রুদেশের মাটি থেকে মাথা উঁচু করেই পৃথিবী ছেড়েছিলেন তিনি।

Neerja Bhanot
নিথর নীরজা

নীরজা ভানোটের সাহসিকতা ও আত্মবলিদানকে সম্মান জানিয়ে ভারত তাঁকে দিয়েছিল সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘অশোক চক্র’ (মরণোত্তর)। এক ভারতীয় নারীর বীরত্বের সামনে মাথা ঝোঁকাতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানও। নীরজাকে দিয়েছিল পাকিস্তানের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘তামঘা-ই- পাকিস্তান’।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More